Home / Uncategorized / ‘মন্মথের মেলানকোলিয়া’-এক অবিনাশী বিষাদ আখ্যান

‘মন্মথের মেলানকোলিয়া’-এক অবিনাশী বিষাদ আখ্যান

‘মন্মথের মেলানকোলিয়া’-এক অবিনাশী বিষাদ আখ্যান
-সাদিয়া সুলতানা

মন্মথের মেলানকোলিয়া
ধরণ: উপন্যাস
লেখক: হাসান মাহবুব
প্রকাশকাল: ২০১৮
প্রকাশনী: চৈতন্য

একটা আলো ঝলমলে রঙিন শহরের বাতাসে বিষাদগ্রস্ততার কতই না গল্প লুকিয়ে থাকে! আর একজন প্রখর অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ মুক্তো খোঁজার মতোন খুঁজে এনে সেই গল্পগুলোকে শব্দের ঘেরাটোপে বন্দী করে আর লেখকের আঙুলের স্পর্শে বিষণ্নতার সেই গল্পই পাঠকের কাছে পরম আদৃত হয়ে ওঠে। তেমনই এক ঘনঘোর বিষাদ আর বিভ্রমের গল্প কথাসাহিত্যিক হাসান মাহবুবের প্রথম উপন্যাস ‘মন্মথের মেলানকোলিয়া।’

গল্পকার হাসান মাহবুব ২০১৮ সালের অমর একুশে বইমেলাতে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘মন্মথের মেলানকোলিয়া’র মাধ্যমে ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ‘মন্মথের মেলানকোলিয়া’ মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। তবে প্রাণীকূলের মনোজগতের জটিল রহস্যের সাথে সাথে এই উপন্যাসে নির্মিত হয়েছে সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতের আখ্যান ।

এই উপন্যাসের নামকরণ আর প্রচ্ছদের মধ্যে বিষাদের অদ্ভুত এক কুহক ঘিরে আছে। পাঠের প্রথম দিকে একটু থমকে গেলেও পাঠক ক্রমশ বেশ তরতরিয়েই গল্পের ভেতরে ঢুকতে শুরু করবেন। উপন্যাসে লেখক দুটি পৃথক প্রাণীর জীবনালেখ্য এঁকেছেন। উপন্যাসের শুরুতে বেসরকারি কর্মকর্তা বিষাদগ্রস্ত কাজলীর দেখা পাওয়া যায় যার ব্যভিচারী মা অন্যপুরুষের সাথে ঘর ছেড়েছে। মায়ের প্রস্থানে বাবার আকাস্মক মৃত্যু, বোন বিজলীকে খুঁজে পাবার তাগিদ আর মায়ের প্রতি ঘৃণার প্রচণ্ডতা, কর্মজীবনের কর্মক্লান্তি…এসবকিছু মিলিয়ে একঘেঁয়ে ক্লান্তিময় দিনযাপন করা কাজলী ভীষণ বিষাদময়তায় আক্রান্ত থাকে। এই বইয়ে কাজলী চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরুষজাতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ এক নারীর অন্তর্নিহিত মানসলোক সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কাজলীর পাশাপাশি এই উপন্যাসে পাঠক বিট্টুর জীবনযাপন দেখতে পাবে। আমার মনে হয় এই উপন্যাসের ‘বিট্টু’ চরিত্রটি লেখকের তুখোড় এক সৃষ্টি। অনুভূতিশীল কিশোর মিরুর চোখ দিয়ে পাঠক যখন রাস্তার কুকুর বিট্টুর চরিত্রকে আবিষ্কার করবে তখন যারপরনাই বিস্মিত ও মোহিত হবে। ‘কাজলী’ চরিত্রকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে এই ‘বিট্টু’ চরিত্রটা যে নিষ্প্রভ হয়েছে তা কখনোই মনে হয়নি। বরং বিট্টু চরিত্রের নির্মাণ পাঠকের কাছে বেশ ব্যতিক্রম ও শক্তিশালী লাগবে। পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে মিরুও ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লেখক দক্ষতার সাথে কাজলী ও বিট্টু চরিত্র দুটির সমান্তরাল বয়ানের মাধ্যমে প্রাণিকূলের মনস্তত্ত্ব উন্মোচন করেছেন।

এই উপন্যাসের শেষটা পাঠককে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দেয়। একাকিত্ব আর বিষন্নতা থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য পরিশ্রমী, মেধাবী, শিল্প সমঝদার, রুচিশীল কাজলী একসময় লেখালেখিতে ব্যস্ত হতে চায় এবং একে একে নিজের প্রাপ্য ছুটি শেষ হবার পরও একটা লম্বা ছুটিতে যাবার পরিকল্পনা করে আর দেয় এক অদ্ভুত বিজ্ঞাপন। যা দেখে পাঠক চমকে যাবেন। পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে এই বইয়ের শক্তিশালী দিক হলো, পাঠ-পরিক্রমায় পাঠক ভাবতেই পারবেন না যে শেষ অবধি তার জন্য কী অদ্ভুত এক পরিসমাপ্তি অপেক্ষা করছে।

এই উপন্যাসে সংলাপের মাধ্যমে ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনার কমতি থাকলেও পটভূমি উপস্থাপন ও চরিত্র নির্মাণের স্বাতন্ত্র্য এর কাহিনীকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। তাই লেখক যখন লেখেন, ‘বিট্টুর জানার কথা নয়, মাঝে মাঝে দুই জীবনের অসংগত বিন্দুগুলো কীভাবে যেন মিলে যায়, অথবা যায় না’-‘কখনো কখনো মানুষ হয়ে যায় কুকুরের মত আর কুকুর হয়ে যায় মানুষের মত’ অথবা ‘জগতের সকল কুকুর যেদিন সুখী হবে, সেদিনই মানুষের প্রকৃত সুখ আসবে’ তখন পাঠক দ্বিতীয়বার এসব বাক্য পাঠ করতে বাধ্য হয়।

হাসান মাহবুবের এই উপন্যাসের বাক্য নির্মাণ সরল মনে হলেও প্রকৃতঅর্থে তা সরল না। তাই এর বর্ণনায় হঠাৎ জুড়ে দেয়া মেটাফোর অথবা জীবনদর্শন পাঠককে খানিকক্ষণ বই হাতে রেখে একাকী নির্জন হতে প্রলুব্ধ করে। বিশেষ করে মন্মথের মেলানকোলিয়া’য় তিনি নিজস্বতা অটুট রেখে অনন্য এক নির্মাণশৈলীতে পাঠককে ঘোরে ফেলে বিপন্ন করার মতো দক্ষতা দেখিয়েছেন।