Home / Uncategorized / সরদার ফজলুল করিমের শুভ জন্মদিন উপলক্ষে বইনিউজের বিশেষ সংখ্যা

সরদার ফজলুল করিমের শুভ জন্মদিন উপলক্ষে বইনিউজের বিশেষ সংখ্যা

সরদার ফজলুল করিমের শুভ জন্মদিন উপলক্ষে বইনিউজের বিশেষ সংখ্যা

sordar-1

 

 

সরদার ফজলুল করিম-এর শুভ জন্মদিন উপলক্ষে বইনিউজের বিশেষ সংখ্যা

sordar-2
সম্পাদকের কথা

সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে এই প্রজন্মের আমার ব্যক্তিগত পরিচয় প্রায় দেড় যুগের ও বেশি সময় আগে। ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পাঠচক্রে সরদার স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। সে সময় থেকে মুগ্ধতা। শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতা থেকেই আমি চেয়েছি স্যারকে নিয়ে কিছু লিখতে। স্যারের সঙ্গে দেখা করা, দেখতে যাওয়া, একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অনুভূ তিনিয়ে লেখা স্যার কে পড়ে শোনানো— এভাবেই বিনিময় হয় অনুভূতির। ছোট ছোট অনুভব, ক্ষুদ্রপ্রচেষ্টা, অতি সামান্য কিছু লেখাপড়ে স্যারের মন্তব্য, আত্মবিশ্বাস নির্মাণে অনুপ্রেরণা, স্বপ্নতৈরির প্রচেষ্টা থেকেই আমি চেয়েছি, সরদার স্যারের অসমাপ্ত কোনো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে।এখন থেকে প্রায় একযুগ আগের এক সন্ধ্যায় আমার ডায়েরিতে লেখা গর্ভস্থভ্রূণের সঙ্গে কথোপকথনের কিছু অংশ পড়ে শুনিয়ে ছিলাম সরদার স্যারকে। ডায়েরি শুনে তিনি আমাকে বলেন, ‘তোমার গদ্যটা সুন্দর, তুমি লিখো, আমাকে নিয়েইলিখো’।পরবর্তীতে সে ডায়েরিটির নির্বাচিত অংশ প্রকাশিত হয় দেশের দুটি জাতীয় দৈনিকে। পরে পূর্ণাঙ্গ ডায়েরিটি প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে আমার মেয়ে: আত্মজার সাথে কথোপকথন নামে।

 

সরদার ফজলুল করিম ছিলেন আমাদের সময়ের এক অসাধারণ মানুষ। আজ থেকে ৯২ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান শিক্ষক, দার্শনিক, বিপ্লবী সরদার ফজলুল করিম। ৮৯ বছর সময়কাল অতিবাহিত করে তিনি মৃত্যু বরণ করেন ২০১৪ সালের ১৬জুন। জন্মদিন ও মৃত্যু দিন সম্পর্কে সরদার ফজলুল করিমের নিজের কথা, ‘মানুষের মৃত্যুদিন হচ্ছে তাঁর সত্যি কারের জন্মদিন। কাজেই আমরা যে জন্ম দিবস পালন করি কেউ পঞ্চাশে, কেউ চল্লিশে বাষাটে— এটা খুব একটা যথার্থ নয়। কারণ তখনো পর্যন্ত পুরো পোর্ট্রেটটা আমাদের সামনে নেই । সার্কিটটা পূর্ণ হয়নি তখনো।’

কালোত্তীর্ণ ছোট খাটো দেহের প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষ সরদার ফজলুল করিম, যিনি মনে করতেন তাঁর পুরো জীবনটাই লাভের— ১১ বছরের জেল জীবন, ৫৮ দিনের অনশন, বিলেতের বৃত্তির আমন্ত্রণপত্র ছিঁড়েফেলা,  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যাওয়া— এসব অভিজ্ঞতার কোনো কিছুই তাঁর হিসাবে লোকসান নয়।

২০১৩ সালের ১২ জুনের সন্ধ্যায় সরদার ফজলুল করিম স্যারের উপস্থিতিতে অধ্যাপক এম এম আকাশ এবং আত্মজা— আফসানা করিম স্বাতীর সৌজন্যে প্রায় সাত দশকের বিভিন্ন সময়ে লেখা ডায়েরি আমার হাতে আসে। ডায়েরির বিভিন্ন সময়ে লেখা ছিল অসম্ভব দুর্বোধ্য। বিশেষত শেষের দিকের সরদার স্যারের হাতের লেখা এতটাই দুর্বোধ্য যে, তা পাঠোদ্ধার করা কখনো কখনো দুরূহ, প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছে। আতশিকাচ দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে পাঠোদ্ধার করতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সকলের বিশেষত— পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, ছাত্র, রাজনৈতিক সঙ্গীও প্রকাশকের সহযোগিতায় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ‘সরদারফজলুলকরিম: দিনলিপি’ পাঠোদ্ধারকরে, বিন্যস্তকরে একটা শৃঙ্খলায় পাঠকের কাছে তুলে ধরার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত ডায়েরির লেখানিয়ে মাওলা ব্রাদার্স থেকে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় সরদার ফজলুল করিম: দিনলিপি। দীর্ঘচার বছর সময় কালে তাঁর দিনলিপি পাঠ, সম্পাদনা ও বিভিন্ন গ্রন্থপাঠ সরদার ফজলুল করিম জীবনী গ্রন্থপ্রণয়নে আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। অমর একুশের বইমেলা ২০১৭ তে প্রকাশিত হয় গদ্যপদ্য থেকে প্রকাশিত হয় সরদার ফজলুল করিম জীবনীগ্রন্থ।উল্লেখ্য জীবনী গ্রন্থেশিক্ষা, রাজনীতি ও জেলজীবন, মানবিক গুণাবলি, দর্শনচিন্তা এবং রাজনৈতিক ভাবনা, গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও লেখালেখি, রচনা নিদর্শন, চিঠি গ্রন্থপঞ্জি মৃত্যু ও সমকালীন প্রতিক্রিয়া, সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি সংকলিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, জীবনীগ্রন্থ প্রণয়নে আমি সরদার ফজলুল করিমের মাধ্যমে অনেক মনীষী, শিক্ষক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সহযোগ লাভ করেছি।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীনআহমদ, মণিসিংহ, রবিগুহ, রণেশদাশগুপ্ত, মুজফ্ফরআহমদ, সত্যেনসেন, হরিদাসভট্টাচার্য, সোমেনচন্দ, মুনীরচৌধুরী, কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ মনীষীর সংস্পর্শে সরদার ফজলুর করিম প্রত্যক্ষ ভাবে প্রভাবিত হন, যাঁরা তাঁর জীবন গঠনে উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রভাব বিস্তার করেন।

জীবন পরিক্রমায় তিনি বিভিন্ন ক্ষণজন্মা মানুষে রসান্নিধ্য ও ভালোবাসা পেয়েছেন।একারণে ১১ বছরের জেলজীবন ও ৫৮ দিনের অনশন শেষে বলতে পেরেছেন ‘তাঁর জীবনে পুরোটাইলাভ, কোনো লসনেই। ’ তিনি যাঁকে স্পর্শ করেছেন তাঁর মধ্যে আলোর সঞ্চার  করেছেন। ২০১১ সালে তাঁকে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘জাতীয়অধ্যাপক’ স্বীকৃতিদেওয়াহয়।উত্তরজীবনেরকোনোপরিচয়ইতাঁরমধ্যেপরিবর্তনআনতেপারেনি, মাটির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি তাঁর আত্মীয়তা। মানব মুক্তির দর্শনে আজীবন বিশ্বাসী বাঙালি জাতির বাতিঘর,

তিনি বাংলা ভাষায় মানুষদের সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল, প্লেটো, রুশোদের চিনতে সক্রিয় ভাবে চেষ্টা করেছেন। ক্লাসে ও ক্লাসের বাইরে দর্শন, ইতিহাস ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানে তাঁর অবাধ বিচরণ ও দক্ষতা ছিল। তাঁর গ্রিকসাহিত্যের বাংলা ভাষায় অনুবাদ ধ্রুপদী সম্পদ, যামৌলিক জ্ঞান চর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে অনন্তকাল।

সরদার ফজলুল করিম শুধু বিনয়ী আদর্শ শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আত্মত্যাগী বিপ্লবী, দার্শনিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, অনুবাদক এবং সর্বোপরি একজন চিরায়ত আশাবাদী মানুষ। তাঁর আদর্শ, কর্ম, চিন্তার প্রবহমানতায় মহত্ জীবন সৃষ্টির সংগ্রামকে প্রবাহিত করবে নিঃসন্দেহে অনাগত প্রজন্মে, কালের পরিক্রমায় মানব সমাজে।তাঁরস্বপ্নে, তাঁরকর্মে, চিন্তার প্রবহমানতায় মহৎজীবন সৃষ্টির সংগ্রামকে সমর্পিত করতে চেয়েছেন অনাগত প্রজন্মে, কালের পরিক্রমায় মানব সমাজে।

২০১৭ সালের ১মে সরদার ফজলুল করিম-এর ৯২ তম জন্মদিন উপলক্ষে অনলাইন পত্রিকা বইনিউজ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর প্রতি অর্পণ করতে যাচ্ছে শ্রদ্ধাঞ্জলি। এ বিশেষ সংখ্যায় বিভিন্ন বিষয়ে যাঁরা  লেখা দিয়েছেন -তাঁদের সবার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা ।

 

(লেখকপরিচয়: মার্জিয়ালিপি: লেখক,সম্পাদক ও পরিবেশবিদ

সম্পাদক: সরদার ফজলুল করিম: দিনলিপি এবং লেখক: সরদার ফজলুল করিম জীবনীগ্রন্থ)

 

 

sordar-4

সরদার ফজলুল করিম আমাদের কালের একজন অসাধারণ মানুষ।

আনিসুজ্জামান

নিজেকে তিনি কৃষকের সন্তান বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন। ওই পরিচয় দানের মধ্যে নিজেকে এবং অন্যদের স্মরণ করিয়ে দিতেন তাঁর উৎসের কথা; এবং জানিয়ে দিতেন যে উত্তর জীবনে তাঁর সকল পরিবর্তন সত্ত্বেও মাটির সঙ্গে সত্য আত্মীয়তা বর্জিত হয়নি। এ তাঁর এক ধরনের অহংকার বটে।
তবে সেই সত্তার ওপর প্রলেপ পড়েছিল তাঁর মেধার, আধুনিক শিক্ষার, বিপ্লবী চিন্তার। এক কৃষক সন্তান ‘সরদার ফজলুল করিম’ হয়ে ওঠেন মেধা ও সাহসের জোরে।
আনুষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার প্রতিটি ধাপে তিনি যে অসাধারণ ফল লাভ করেছিলেন, তাতেই আছে তাঁর মেধার পরিচয়। ২১বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিযুক্ত হয়েছিলেন সেই ১৯৪৬ সালে। ততদিনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির একজন কর্মীও, চোখে-মুখে তাঁর সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন। বিলেতে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন পার্টির নির্দেশে। পদত্যাগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আত্মগোপন করে বিপ্লবী রাজনীতিচর্চা করার সংকল্প করেন। গোপন সভা থেকে ধরা পড়েন। কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। প্রথম দফায় আটবছর। সরদার অবিচলিত। এসবের জন্য যে সাহস লাগে, সে সাহস তাঁর সহজাত।
জ্ঞানচর্চা অব্যাহত থাকে তাঁর কারাগারে গিয়েও। কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন পাকিস্তান গণ পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পর্যায়ে রাজনীতিতে যে একটা বড় ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি, তা নয়। সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। এ কে ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ করেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন নতুন সম্ভাবনা।
সামরিক শাসন জারির সঙ্গে সঙ্গে সরদার ফজলুল করিম আবার কারাগারে। সেখান থেকে বেরিয়ে যোগদেন বাংলা একাডেমিতে, মুনীর চৌধুরী এবং পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের আগ্রহে। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে আর সংস্রব নেই, কিন্তু জ্ঞানচর্চা অব্যাহত। ১০-১১ বছর পরে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে যখন সংসার জীবনে স্থিত, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তখন আবার কারাগারে। বেঁচে যে রইলেন, সেটাই ভাগ্য।
স্বাধীন বাংলাদেশে এবারে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-সরদার ফজলুল করিম যাঁকে নিজের দ্বিতীয় পিতা বলতেন, তিনি চাইলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরদারকে ফিরিয়ে আনতে। স্বভাবতই দর্শন বিভাগে— যে বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি এককালে। কিন্তু আমাদের শিক্ষকদের দলাদলি আছে না? ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব কষাকষি আছে, পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার আছে, তাকে গৌরবান্বিত করতে আমরা বলি শিক্ষকদের রাজনীতি। সেই রাজনীতি বাধা হয়ে দাঁড়ায় সরদারের প্রত্যাবর্তনে। আবদুর রাজ্জাক তখন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষ। সেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগেই সরদারকে শিক্ষক করে আনেন। উপাচার্য মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী তাঁর সবকথাই শুনতে প্রস্তুত। তবু বঙ্গবন্ধুকে একটু বলে নেয়া হয়, তিনি সোত্সাহে সম্মতি দেন।
১৩ বছর সেখানে কাটে সরদারের। একের পর এক অনুবাদ করেন প্লেটো, অ্যারিস্টটল, এঙ্গেলস— জ্ঞানতত্ত্বের একেবারে গোড়ায় চলে যান। যুক্তিবিদ্যার বই লেখেন। মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে সংকলন করেন দর্শন-কোষ। আবদুর রাজ্জাকের কথোপকথন দিয়ে প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূর্ব বঙ্গীয় সমাজ। বিতর্কের ঝড়ের মধ্যে পড়ে যায় শেষোক্ত বইটি। দ্বিতীয় পিতাকে বিব্রত করছেন জেনে বিব্রত হন সরদার নিজেও।
তারপরও অদম্য থাকেন লেখালেখিতে। টেপ-রেকর্ডার নামের যন্ত্র তাঁর এখন চিরসঙ্গী। সুযোগ পেলেই কাঁধের ঝোলা থেকে সেটা বের করেন। শব্দধারণ করেন অন্যের। এসবই ইতিহাসের উপকরণ। আর দিনপঞ্জি লেখেন প্রত্যহ। অনেক তুচ্ছকথা থাকে তাতে, অনেক উচ্চভাব। সরদার ফজলুল করিমের কাছে ‘জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা’।…
ধানমন্ডিতে যখন এসেছেন, তখন যাতায়াতের পালায় প্রায় ছেদ পড়েছে।
মুখের হাসিটি যায়নি তব মিলিয়ে, আশাবাদ অব্যাহত রেখেছেন। সে-আশাবাদকে উসকে রেখেছে জ্ঞানচর্চা। জ্ঞানের শক্তিকে উপলব্ধি করেছেন। নিজের মধ্যে অপরের মধ্যে জাগাতে চেয়েছেন সেই শক্তি। দাঙ্গা-দুর্ভিক্ষ কলহ-নিপীড়ন দৈব-দুর্বিপাকের মধ্যেও পড়ালেখায় ছেদ ঘটতে দেন নি। সামান্যের মধ্যেও প্রত্যক্ষ করেছেন অসামান্যকে। কৃষক-সন্তান জাতীয় অধ্যাপক হয়েছেন। আগা গোড়া রয়ে গেছেন সরদার ফজলুল করিম। মৃত্যু তাঁর দেহটিকে নিয়ে গেছে, আর কিছুই নিতে পারে নি
এম. এ পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিলেতে উচ্চশিক্ষালাভের জন্য পেয়েছিলেন সরকারি বৃত্তি। মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে সংকল্পবদ্ধ এই বৃত্তি প্রত্যাখান করেছিলেন, ছেড়ে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ম। আত্মগোপন করে কমিউনিস্ট পার্টির কাজ শুরু করেছিলেন। সেই অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় আট বছর ছিলেন কারান্তরালে। তারই মধ্যে আরেক বিস্ময়। কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী রূপে জেল থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য। সে গণপরিষদ যখন ভেঙে দিলো স্বৈরাচারী চক্র, তখন তাঁর স্থান হলো আবারো কারাগারে। বেরিয়ে এসে যোগ দিলেন বাংলা একাডেমিতে, শুরু করলেন অরাজনৈতিক জীবন। অরাজনৈতিক কেবল সংগঠনের সঙ্গে সংস্রবের ক্ষেত্রে, অন্তরের দীপশিখা রইল অমলিন। তাই ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে আবার নিক্ষেপ করল কারান্তরালে। মুক্তিলাভ করলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের পরে। প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আহ্বানে ফিরে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পঠন-পাঠনের পাশাপাশি চলল দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদী সব গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ, কোষগ্রন্থের বাংলা অনুবাদ, গ্রন্থ রচনা, নানাবিষয়ে মৌলিক লেখা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়া সত্ত্বে লেখালেখি চলেছে অবিরাম, পড়িয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। মৃত্যু এসে যেদিন নিয়ে গেল তাঁকে, সেদিন রয়ে গেল রচনার অবিস্মরণীয় সম্ভার।

sorder-3

জীবনব্যাপী অঙ্গীকার
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সব বড় মাপের মানুষই অন্যদের চাইতে বেশি ভিন্ন হন। তারা প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে খাপ খান না। সরদার ফজলুল করিমও অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিলেন এবং তিনি খাপ খাননি। ছাত্র হিসেবে ভীষণ মেধাবী ছিলেন। দর্শন বিভাগের একজন ভালো ফলাফলের অধিকারী ছাত্র হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। এটাই সবাই করে। তারপর স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে যায়; নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। মধ্যবিত্তের যেমনটি আকাক্সক্ষা থাকে।
উনি তো গর্ব করেই বলতেন, আমি কৃষক পরিবার থেকে এসেছি। তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান, তার আত্মীয়-স্বজনরা তাকে কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছে। তাদের যে আকাক্সক্ষা- সেটি পূরণ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির খুব সুন্দর একটা সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এখানে থাকলেন না। এখানেই তার ব্যতিক্রম। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার নিশ্চিত জীবন ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন রাজনীতিতে। কেবল রাজনীতিতে গেলেন বলাটাও ভুল হবে- তিনি সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন।
রাজনীতির ধারা ছিল দুটি। এখনও আছে। একটা ধারা হচ্ছে জাতীয়তাবাদী। আরেকটি ধারার নাম সমাজতন্ত্র। জাতীয়তাবাদী ধারায় গেলে সুবিধা আছে অনেক। এমএলএ-মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা, বিষয়-সম্পত্তি হওয়ার হাতছানি সেখানে। এই ধারায় তিনি যেতে পারেন; এবং মেধাবান মানুষ হিসেবে সেখানে গিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন। সে জন্য তাকে যেতে হতো মুসলীম লীগে। কিন্তু তিনি সেই জাতীয়তাবাদী ধারায় গেলেন না, তিনি গেলেন সমাজতান্ত্রিক ধারায়। যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। এই পার্টিকে জাতীয়তাবাদী ধারায় মুসলিম লীগ ঘোরতর শত্রু মনে করে। জাতীয়তাবাদীদের মূল শত্রæই যেন সমাজতন্ত্রীরা। এদিক থেকে সব দেশের জাতীয়তাবাদীরাই এক। সমাজতন্ত্রীদের প্রশ্নে লীগ এবং কংগ্রেসের অবস্থানটা একই ছিল। ভারতে জাতীয়তাবাদী ধারা দল কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করেছে। তাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। কিন্তু মুসলিম লীগকে তারা ভারতে নিষিদ্ধ করেনি। অর্থাৎ এই দুই ধারা স্পষ্টভাবেই আলাদা ছিল। যারা এই রাজনীতিতে গেছেন- পার্থক্যটা তারা আরও বেশি মর্মে মর্মে বুঝেছেন।
সরদার ফজলুল করিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে গেলেন। তিনি তখন থাকতেন বিভিন্ন জায়গার কৃষকদের সঙ্গে। এসেছেন কৃষক পরিবার থেকে। সাধারণত কৃষক পরিবার থেকে আসা একজন মানুষের কৃষকের সঙ্গে থাকার কথা নয়। এ জায়গাতেই সরদার ফজলুল করিমের ব্যতিক্রম। তিনি থাকতে চাইলেন কৃষকদেরই সঙ্গে। এ সময়ে নানান জায়গায় তাকে আশ্রয় খুঁজতে হয়েছে- ঢাকার শাঁখারীবাজারে। শাঁখারীবাজারেও তিনি নিম্নবিত্তদের সঙ্গে থাকতেন। সেখানে একটা আশ্রয়ে থাকাকালে ১৯৪৯ সালে তিনি ধরা পড়লেন। জেল থেকে বেড়িয়ে এসেছিলেন ১৯৫৫ সালে। যখন যুক্তফ্রণ্ট জয়লাভ করেছে। যুক্তফ্রণ্ট থেকে তিনি সংবিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হলেন। যুক্তফ্রণ্টের যে সমাজতন্ত্রী অংশটা ছিল- তারাই তাকে প্রার্থী করেছিলেন এবং তাদের ভোটেই তিনি নির্বাচিত হয়ে সংবিধান সভায় গেলেন। ৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন শুরু হলে, সরদার ফজলুল করিমকে আবার গ্রেপ্তার করা হলো। এবার ১৯৬৩ সালে কারাবাস থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যোগ দিলেন বাংলা একাডেমিতে। বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি সেখান থেকে আবারও গ্রেপ্তার হন। পাকিস্তানিরা তাকে আটকে রেখেছিল। জেল থেকে রেব হলেন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার পর। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় জেলে ছিলেন; আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময়েও মুক্তিযুদ্ধের সময় জেলে ছিলেন।
মনে পড়েছে, একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে নাজমা আজিজ স্মারক বক্তৃতায় তিনি একটা ঘটনা বলেছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের দিকে উনি যখন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলেন- বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে গেছেন, সেখানে গ্রন্থাগারের একজন লোক তাকে দেখে বলছে, ‘আপনি তো স্যার সাংঘাতিক লোক! সেই আটচল্লিশ সালে একদিন আপনি বেরিয়ে গেলেন এই কথা বলে যে, পাকিস্তানকে ভাঙবেন। আবার সত্যি সত্যি পাকিস্তান ভাঙার পরে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আপনি এলেন। এর মাঝখানে, পাকিস্তানকে ভাঙার আগে আর আপনি এদিকটায় এলেন না।’ এই ঘটনাকে সরদার ভাই উপভোগ করেছিলেন। তবে সত্যিই তার জীবন সম্পর্কে এটা বলা যায় যে, তিনি পাকিস্তানকে ভাঙতে বেরিয়েছিলেন এবং ভাঙার পরেই তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন।
সমাজতন্ত্রীদের ওপরে পাকিস্তানিরা এত নিপীড়ন চালিয়েছিল যে, তাদের পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পারিবারিক জীবন নেই, তাকে ধরে এনে জেলে ভরে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, ওই যে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন- সেটাও বিভক্ত হয়ে গেছে। পিকিংপন্থি, মস্কোপন্থিতে ভাগ হয়ে গেছে কমিউনিস্টরা। কিন্তু সরদার ভাই কোনো একটা পন্থার দিকে যাননি কখনো। তিনি আগাগোড়াই সমাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। একটা বিপ্লব, একটা আন্দোলন প্রয়োজন, পরিবর্তন হবে-এ বিশ্বাস থেকে তিনি কখনো সরে যাননি। তিনি তার অঙ্গীকারে অবিচল ছিলেন।
সরদার ভাইয়ের মর্মমূলে ছিল তার ব্যক্তিগত একটা দার্শনিক অবস্থান। এই দার্শনিক অবস্থান থেকেই তিনি রাজনীতিতে গেছেন। দার্শনিক অবস্থান থেকেই সাহিত্যচর্চা করেছেন। তার শিক্ষকতায়ও ছিল সেই ছাপ। শিক্ষকতাকে তিনি কেবল চাকরি হিসেবে নেননি।
আরেকটা দিক হলো, সরদার ফজলুল করিমের মধ্যে একজন লেখক ছিল। সেই লেখক ও রাজনীতিকের মধ্যে আমি কোনো বিরোধ দেখি না। কারণ এরা দু’জনই একই মতাদর্শগত অবস্থান থেকে কাজ করেছেন। দু’জনের অঙ্গীকার ছিল একই সুতোয় গাঁথা। লেখার মধ্য দিয়ে যে অঙ্গীকার- রাজনৈতিক কর্মের মধ্যেও সেই একই অঙ্গীকার তিনি ধারণ করতেন।
আমি তার লেখা প্রথম পড়েছিলাম যখন দশম শ্রেণির ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্ষিকী বের হতো। ১৯৫০ সালের সেই বার্ষিকীতে দুটি লেখা আমার কিশোর মনে খুব চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। একটা লেখা ছিল নাজমুল করিমের। নাজমুল করিমের ‘ভূগোল ও ভগবান’ নামের লেখাটির সঙ্গে ছিল সরদার ফজলুল করিমের ‘সাহিত্যের সংকটটা কি’ শিরোনামের লেখাটি। সেই লেখার মধ্যে এই কথাটা ছিল যে, সাহিত্যের সংকটটা এইখানে যে, এখানে মধ্যবিত্তের সাহিত্যই শুরু হচ্ছে। কৃষককে বা শ্রমজীবীরাও সাহিত্যচর্চা করছে না। কাজেই সাহিত্যের পাঠকও মধ্যজীবী, সাহিত্যের উপজীবী ও মধ্যজীবী এবং বৃহৎ যে জনগণ- সেই জনগণ সাহিত্য থেকে উপেক্ষিত থাকছে। তাদের কথা সাহিত্যে আসছে না। এই লেখা আমাকে নাড়া দিয়েছিল।
সরদার ভাই আমাদের কাছে প্রবাদপ্রতীম ছিলেন। এই অর্থে যে, তাকে আমরা দেখতে পাইনি। তার লেখা পড়েছি, তার কথা আমরা শুনেছি। তিনি দর্শন বিভাগের খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। মুসলমানদের মধ্যে দর্শন বিভাগের ভালো ছাত্র হওয়া, দর্শনের মতো বিষয় পড়া, ধারণ করা; বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়ে কমিউনিস্ট রাজনীতি করা, জেলে যাওয়া- এসব অভাবনীয়।
তাকে আমরা প্রথম দেখি বাংলা একাডেমিতে। আমি তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। বাংলা একাডেমির যত অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি বিষয়ক আয়োজন হতো, তাকে দেখতাম। আস্তে আস্তে পরিচয় হলো। ১৯৭২ সালে তিনি যখন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন, তখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হয়েছি। তখন তার সান্নিধ্য পেলাম।
উনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু রাজনীতি যে দর্শন ছাড়া হয় না অর্থাৎ দর্শন ও রাজনীতি যে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত- এটা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকও এটা জানতেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকই তাকে নিয়ে আসার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন এবং তিনি সরদার ভাইয়ের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা নতুন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার এটা তিনি বিশ্বাস করতেন। সরদার ভাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে গেলেন। কারণ দর্শন বিভাগে তার স্থান সংকুলান কঠিন ছিল। আর সে জায়গাটা ছিল অনেকটা ভাববাদী। অর্থাৎ আমাদের এখানে দর্শনের যে চর্চা হতো সেটা হচ্ছে ভাববাদী। কিন্তু সরদার ভাই তো বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি তার বস্তুবাদী দর্শন, মার্ক্সইজম এসব ওখানে পড়াতেন না। পদে পদে বাধা আসত। মার্ক্সইজমের কথা তখন দর্শন বিভাগে পড়ানো যেত না। তিনি রাষ্টবিজ্ঞানে এসে রাজনৈতিক দর্শন পড়ানোর সুযোগ পেলেন এবং তিনি আরও যে বড় কাজটা করলেন, তা হলো- রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যে ধ্রæপদ কতগুলো সাহিত্য আছে, সেগুলো একের পর এক অনুবাদ করা শুরু করেন।
সরদার ফজলুল করিমের প্রথম কাজটা ছিল একটা দর্শন কোষ তৈরি করা। দর্শন কোষটা আমাদের কাজে লেগেছে অনেক। দর্শনের সমস্ত ধারণাগুলোর ব্যাখ্যাসহ খুব সুন্দর একটা কোষ তিনি তৈরি করেছিলেন। তারপর তিনি অনুবাদ করলেন, প্লেটোর রিপাবলিক, প্লেটোর সংলাপ, এ্যারিস্টটলের পলিটিক্স। এ্যাঙ্গেলসের এ্যান্টিডুরিং-এর অনুবাদ তার একটা বড় কাজ। এটা আর কেউ করতে পারেনি। অন্য বইগুলো অনেকে অনুবাদ করলেও, তার মতো এতো গভীর অভিনিবেশ নিয়ে কেউ করতে পারেননি। রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট, দ্য কনফেশনসও সরদার ফজলুল করিমের উল্লেখযোগ্য কাজ। সরদার ফজলুল করিমের বিদেশে উচ্চ ডিগ্রি ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার এই কাজগুলোর জন্যই নি:সন্দেহে তাকে ডিগ্রি দেয়া যেত। কিন্তু আমরা সে জায়গাটায় পৌঁছতে পারিনি।
তিনি প্রবন্ধও লিখেছেন। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বই তিনি রেখে গেছেন আমাদের জন্যে। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তার লেখার মধ্যে একটা নিজস্বতা ছিল। নিজস্বতাটা এমন যে, তিনি তার লেখার মধ্যে নিজেকে উপস্থিত রাখতে পারতেন। লেখার মধ্যে তিনি নিজেকে যেন দেখেন। নিজেকে যুক্ত করে লেখার মধ্যে একটা কথোপকথনের মেজাজ তিনি সৃষ্টি করতে পারতেন। তার লেখার মধ্যে যে ব্যক্তি সরদার ফজলুল করিমকে পাওয়া যেত- সেটা কোনো আগ্রাসী ব্যক্তিত্ব নয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে যেমন সদালাপী ছিলেন, তেমনই তার লেখার মধ্যে পাওয়া যেত। লেখার ধরনও ছিল খুব মর্মগ্রাহী।
সরদার ভাইয়ের আর একটা বিশেষ দিক ছিল; তিনি কারও লেখা পড়লে প্রশংসা করতেন। এটা কেউ করে না।
একজন সরদার ফজলুল করিম আমাদের কাছে যে উত্তরাধিকার রেখে গেলেন- তা আমাদের জন্য, প্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার জীবন ও কর্ম আমাদের সমাজ-রাজনৈতিক জীবনে রক্তের মতো কাজ করবে যুগে যুগে। তিনি আমাদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত। সরদার ভাই যে দার্শনিক মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন- তা থেকে কখনই তিনি সরে দাঁড়াননি। তার মতো এমন জীবনব্যাপী অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ আমাদের অতীতেও কম, ভবিষ্যতেও দুর্লভ। তিনিই আমাদের প্রগতির শেষ সরদার।

( প্রাবন্ধিকও শিক্ষাবিদ )

sorder- 00

 

কেমন আছেন সরদার ভাই?
যতিন সরকার

দু’দশকের আগে, বিগত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কোনো একটি দিনে, বাংলা একাডেমিতে সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে দেখা হতেই তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কেমন আছেন সরদার ভাই?’ সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বলেন, ‘ম বাদ দিন, ম বাদ দিন।’ কথাটা শুনেই হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। কী বলতে চাইছেন তিনি?
একটু পরেই ধাতস্থ হয়ে বুঝতে পারলাম : আমি যে তাঁকে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করেছি, সেই ‘কেমন শব্দটির ‘ম’ অরটি বাদ দিতে বলেছেন তিনি। অর্থাৎ তাঁকে আমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল ‘কেন আছেন তিনি?’
সরদার ভাইয়ের কথাটার মধ্যে অবশ্যই ছিল বহুমাত্রিক শ্লেষ। নিজেকেই তীক্ষ্ন বিদ্রুপে বিদ্ধ করে তোলার, এবং নির্মম আত্মসমালোচনায় নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলবার অসীম ক্ষমতা ধারণ করেন সরদার ফজলুল করিম।
সে জন্যই ‘কেমন আছেন’- এর চেয়ে ‘কেন আছেন’-ই তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ‘কেন আছি আমি?’- সব সময় নিজেকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখেন বলেই সরদার ফজলুল করিম এখনও অর্থহীন জীবন-যাপন করেন না, কখনও গড্ডালিকা প্রবাহে বা নিষ্ক্রিয় আয়েশে গা ভাসিয়ে দেন না, কিংবা ‘শুধু দিন যাপনের শুধু প্রাণ ধরণের গ্লানি’ বহন করে চলেন না। ‘এই জীবন লইয়া আমি কী করিব?’- ভাববাদী বঙ্কিমচন্দ্রের মতো বস্তুবাদী সরদার ফজলুল করিমও সারা জীবনভর এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করেছেন, এবং নির্ভুল ও সঠিক উত্তরটিই পেয়ে গেছেন। জীবনের বাঁকে বাঁকে বাস্তবের বিভিন্ন রকম অবস্থায় অবস্থান করতে হয়েছে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তিনি তাঁর মৌলিক আদর্শগত অবস্থানটি পরিত্যাগ করেননি, অবস্থা অনুযায়ী অবস্থানের রঙ বদলিয়ে নিয়েছেন কেবল।
আর এই খানেই আমরা- স্বল্পবুদ্ধি ও সহৃদয়তাহীন ও একচোখা মানুষেরা- সরদার ফজলুল করিমকে বুঝতে ভুল করি বা তাঁকে ভুল বুঝি। জীবনে বৈষয়িক প্রতিষ্ঠার সব ধরনের সুযোগকে তুচ্ছ করে তিনি সমাজ বদলের কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে সামাজিক দায়িত্ব পালনকে অনেক বড় করে দেখেছেন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তাঁকে দীর্ঘকাল কারাযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। কারাবাসেরই এক পর্যায়ে তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের সংকটজনক অবস্থান অবলোকন করে মানসিক যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছেন। এ রকম যন্ত্রণাবিদ্ধ অবস্থাতেই তাকে পারিবারিক দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েই তিনি সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে বাধ্য হয়েছেন। সে রকম করে কি তিনি ভুল করেছিলেন?
ভুল বা অন্যায় কোনোটাই যে করেননি, দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি তাঁর প্রমাণ রেখেছেন। সে-সব প্রমাণের প্রতি অনেকেই মুদিতদৃষ্টি হয়ে থাকে, সহৃদয়তার অভাবের দরুনই তাঁকে অন্যায় অভিযোগে বিদ্ধ করে, এবং এভাবে নিজেদেরই মূঢ়তা ও সংকীর্ণতার প্রমাণ রাখে। তাঁর অনেক প্রাক্তন সহযোগীর মধ্যে যেমন এ রকমটি দেখতে পেয়েছি, তেমনই দেখতে পেয়েছি অনেক অর্বাচীন বুলিবাগীশ বিপ্লবীর মধ্যেও।
জেল থেকে বাইরে এসে যখন তিনি বাংলা একাডেমিতে চাকরি নেন এবং সেই চাকরিতে তাঁর ওপর সংস্কৃতি-বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন অর্থাৎ বিগত শতকের ষাটের দশকে, খুবই কাছ থেকে আমি সরদার ভাইকে দেখেছি। এবং তাঁর  স্নেহ-সান্নিধ্যে ধন্য হয়েছি। তখনও পাকিস্তানের গণবিরোধী শাসকেরা সরদার ফজলুল করিমকে মোটেই বিশ্বাস করতে পারেনি। তারা তাঁকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছে, তাঁর গতিবিধি ঢাকা শহরের বিশেষ এলাকায় সীমিত করে দিয়েছে। অথচ, এ রকম এক আবদ্ধ পরিবেশেও সরদার ফজলুল করিম তাঁর আদর্শের প্রতি অনুগত থেকেছেন, এবং সেই আদর্শানুরাগ দায়িত্ব পালনের পথ খুঁজে নিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকেরা বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের ওপরও নানা নিষেধের খরগ ঝুলিয়ে রেখেছিল যখন, তখনও সেই খরগের নিচে অবস্থান করেও, সরদার ফজলুল করিম অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে বেশ কিছু দুঃসাহসী কাজ সম্পন্ন করেছেন। সোমেন চন্দের মতো বিপ্লবী লেখকের স্মরণসভা করার জন্য বাংলা একাডেমির অঙ্গনকে ব্যবহার করার কায়দা তিনি বের করে নিয়েছেন। বাংলা একাডেমি থেকে, সেই দুঃশাসনের যুগেও, এমন একটি গ্রন্থ তিনি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন যে- গ্রন্থটিতে বিধৃত অনেক তথ্য ও বক্তব্যই ছিল পাকিস্তানবাদীদের ঘোষিত আদর্শের বিরোধী। গ্রন্থটির নাম ‘পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য’। এই নামটিতেই পাকিস্তানবাদীরা তুষ্ট ও তৃপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সরদার ফজলুল করিম, বলতে গেলে, সম্পাদিত গ্রন্থটির এ রকম নামকরণ করেই ওদের ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পেরেছিলেন। কারণ সে সময়কার ইসলামি জমহুরিয়াত পাকিস্তানের স্বঘোষিত হর্তা-কর্তা-বিধাতারা প্রায় সবাই ছিল মোটা মাথাওয়ালা। ও-রকম মোটা মাথা দিয়ে কোনো উন্নতমানের গ্রন্থের মূল মর্ম হৃদয়ঙ্গম করা মোটেই সম্ভব ছিল না। পাকিস্তানের জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল তা মুসলিমদের রচিত সাহিত্যে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, কিংবা মুসলিম সাহিত্য সেই পাকিস্তান-আন্দোলনকে কীভাবে শক্তি জুগিয়েছে, এসব কথাই যে গ্রন্থটিতে লেখা আছে, যে কেউ অতি সহজেই এমন ধারণা করে নিতে পারেন। সে ধারণা ভুলও নয়। তবে এতদিন ধরে পাকিস্তানের এস্টাবিøশমেন্টের পক্ষ থেকে পাকিস্তান-আন্দোলনের যে রকম ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, সরদার ফজলুল করিম সম্পাদিত গ্রন্থটির লেখকদের ব্যাখ্যা মোটেই সে রকম নয়। তাঁর পাকিস্তান আন্দোলনের সময়কার মুসলমানদের রচিত সাহিত্যকর্মকে নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন, ওই সব সাহিত্যকর্মে বিধৃত সে সময়কার মুসলমানদের মনোভাবকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন, সময়ের ব্যবধানে সেই মনোভাবে কী ধরনের রূপান্তর ঘটেছে- সেদিকটির প্রতিও নজর রেখেছেন। সে সময়কার যে তরুণ প্রজন্ম পাকিস্তান সম্পর্কে মোহমুক্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধির জন্য বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনায় মনোযোগ দিয়েছিলেন, বিশ শতকের ষাটের দশকের সেই তরুণদের ভাবনার অনেক খোরাক জুগিয়েছিল ‘পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য’ শীর্ষক ওই গ্রন্থটি। রবীন্দ্রনাথকে ঘোর পাকিস্তান বিরোধী বলে সাব্যস্ত করে রবীন্দ্র অনুরাগী যে কোনো মানুষকেই ‘পাকিস্তানের দুশমন’ আখ্যা দিত যে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটি, তাদেরকে লা-জওয়াব করে দেয়ার মতো করে একটি রচনা সরদার ফজলুল করিম ওই গ্রন্থটিতে সংযুক্ত করেছিলেন। রচনাটি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের। ‘পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথকৃত ওই রচনাটিই ‘পাকিস্তান কেন?’- এই শিরোনামে মুদ্রিত হয়েছিল। মোটা মাথাওয়ালা পাকিস্তানবাদীদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়াই ছিল এ রকম শিরোনাম দেয়ার উদ্দেশ্য। বিরূপ পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করার জন্য প্রকৃত নীতিনিষ্ঠ মানুষকে নীতিমালায় অবিচল থেকে এ রকম নানা কৌশল উদ্ভাবন করে নিতে হয় শত্রুর দুর্বলতার ক্ষেত্রগুলো চিনে নিয়েই। ঘোরতর সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা কথায় কথায় ইসলামের দোহাই দিত, সমাজতন্ত্রসহ সব রকম অগ্রসর চিন্তাই ওদের বিবেচনায় ছিল ইসলাম-বিরোধী, প্রতিনিয়তই ওরা ‘ইসলাম বিপন্ন’-র ধুয়া তুলত। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ওই স্বঘোষিত ইসলাম রক্ষকদের কাণ্ডকারখানা দেখে মিশরের বাদশাহ ফারুক বলেছিলেন, ‘মনে হয়, পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পূর্বে ইসলাম বলতে কিছু ছিল না।’ বাদশাহ ফারুক নিশ্চয়ই কোনো প্রশংসার্হ ব্যক্তি ছিলেন না। তবু, এই অসাধারণ শ্লেষাত্মক বক্তব্যটির জন্য তাঁকে প্রশংসা না- করে পারা যায় না। সব রকম ইসলাম-বিরোধী কর্মকাণ্ডের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল যে পাকিস্তান, সেই পাকিস্তানের চূড়ান্ত ইসলাম-বিরোধী হর্তাকর্তারা মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতেই ইসলাম শাসন কায়েমের শপথ ঘোষণা করত। লাম্পট্যেও ওরা কম যেত না। লম্পট চ‚ড়ামণি ইয়াহিয়ার নির্দেশেই তো তার সারমেয়-প্রতিম সৈন্যবাহিনী ইসলাম রক্ষার নাম করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেই ইসলাম রক্ষী (!) দখলদারদের কাছে এ দেশের নিতান্ত নিরীহ মানুষেরাও যেখানে ঘোর শত্রæ বলে বিবেচিত, সেখানে সরদার ফজলুল করিমের মতো বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত অগ্নিগিরি-সন্নিভ মানুষটিকে তারা বিশ্বাস করবে কি করে? বিশ্বাস করেওনি। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামেরই এক পর্যায়ে তাকে জেলখানায় আটকে রাখল। এখন মনে হয়, কাজটি তারা ভালোই করেছিল। তা না হলে তো ওই সারমেয়দের এ দেশীয় দোসরদের হাতে তাঁকে প্রাণবিসর্জনই দিতে হতো, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় আরও একটি নাম যুক্ত হতো।
স্বাধীন বাংলাদেশে ফজলুল করিমের বেঁচে থাকার আবশ্যকতাটা আমরা প্রতি মুহূর্তেই উপলব্ধি করছি। অন্তত আমাদের বৌদ্ধিক সংকটের মুহূর্তগুলোতে তো বটেই। এক সময় যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন, সেই তিনিই স্বাধীনতার পর ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে হলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। এতে তাঁর চর্চার একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটল। দুনিয়াটাকে বদলানের যে মার্কসীয় অনুজ্ঞার ভিত্তিতে তাঁর জীবন দর্শন নির্মত, সেই দর্শনই তো তাকে হাজার হাজার বছরের সকল মানবিক কৃতির সদর্থক উত্তরাধিকার বহন করতে শিখিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপনা করতে গিয়েই বোধ হয় মানবিক উত্তরাধিকার বিষয়ে মার্কসীয় অনুজ্ঞার তাৎপর্য তাঁর কাছে আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে একদিন রাষ্ট্রবিহীন সমাজের উদ্ভব ঘটবে- এই প্রত্যয় নিশ্চয়ই মার্কসের মাথায় আকস্মিকভাবে গজিয়ে ওঠেনি। দাসতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রমরমার সময়েই গ্রিক চিন্তাবিদ প্লেটোর চৈতন্যে-অস্পষ্টভাবে হলেও অনাগতকালের সেই ‘রিপাবলিক’-এর ছায়াপাত ঘটেছিল। প্লেটো কিংবা তাঁর অনেক পরবর্তীকালে মহান-চিন্তকদের চিন্তাকে অস্পষ্ট বা কেবলই বিশেষ শ্রেণিস্বার্থের ধারক বা নিতান্ত ইউটোপিয়া বলে অবজ্ঞা করে মার্কস ও এঙ্গেলস সমাজবীক্ষা ও সমাজবদলের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নির্মাণ করতে পারতেন না। মার্কস এঙ্গেলসের শিক্ষাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে আমাদেরও যে প্লেটো কিংবা তাঁর শিষ্য এরিস্টটলের কিংবা ইউটোপিয়ান বলে পরিচিত অন্য অন্য সমাজ চিন্তকদের শিক্ষাকে উপেক্ষা করা চলবে না, বরং তাঁদের উত্তরাধিকারের ধারা বেয়েই- যে নতুনতর সমাজ নির্মাণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে- সুষ্ঠুভাবেই সরদার ফজলুল করিম তা অনুভব করেছেন। তাই স্বদেশের তথা সকল বাংলা ভাষাভাষী শিক্ষাবিলাষী মানুষদের বিপ্লবীদের উত্তরাধিকারের ধারাটি পৌঁছিয়ে দেয়ার  জন্যই তিনি গ্রহণ করলেন বিপ্লবী ভ‚মিকা। সেই ভ‚মিকারই উজ্জ্বল পরিচয় রেখেছেন প্লেটো-এরিস্টটলের মতোও ধ্রুপদী চিন্তাবিদদের অবিস্মরিণীয় গ্রন্থগুলোর বাংলা রূপান্তরের মধ্যে, সে দেশের ও সেকালের চিন্তার- স্রোতস্বিনীকে যুক্ত করে দিতে চেয়েছেন এ দেশের ও একালের মানুষের চিত্তটটে।
একালের তথা তাঁর স্বকালের স্বদেশের উত্তরাধিকারের কথা উত্তরকালের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্বও তিনি ভুলে থাকেননি। বিশ শতকের চল্লিশের দশকটি ছিল খুবই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। ইতি ও নেতির বৈপরিত্যে ভরা এই দশকটিতেই নবচৈতন্যে জেগে উঠে সরদার ফজলুল করিমকে হতে হয়েছিল ‘উজান তরীর মাঝি’। সে সময়কার নবোদ্ভ‚ত মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই দ্বিজাতিতত্তে¡র মৌতাতে আচ্ছন্ন। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যকামী দৃষ্টি দিয়েই তারা সমাজ ও সংসারের সবকিছু দেখতে চায়। মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের বিবেচনায় সকল সমস্যার সমাধান। সকল সম্প্রদায়ের মানুষেরই মুক্তচৈতন্য ও বিজ্ঞানচৈতন্য তখন সাম্প্রদায়িক অপচৈতন্যের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। এ রকম এক কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে তখনকার ঢাকায় যে ক’জন মুষ্টিমেয় তরুণ বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের নিশান হাতে নিয়ে পথ চলেছিলেন, সরদার ফজলুল করিম ছিলেন তাদেরই সামনের সারিতে। সেকালের সেই বিপদসংকুল পথচলার নানা কথা সরদার তাঁর স্মৃতির কোটায় ধরে রেখেছেন, এবং একালের মানুষের সামনে সে সবই উন্মোচন করে দিয়েছেন কখনও স্মৃতিকথা-মূলক রচনায়, কখনও জিজ্ঞাসু জনের সঙ্গে আলাপচারিতায়। অন্তত বিশ শতকের চল্লিশের দশকের ঢাকা সম্পর্ক জানতে চাইলে সরদার ফজলুল করিমের স্মরণ নেয়া ছাড়া আমাদের উপায়ন্তর নেই।
বিশ শতক পেরিয়ে একুশ শতকেও সরদার ভাই আছেন, সগৌরবেই আছেন। ‘কেন আছেন তিনি?’- এ প্রশ্নের উত্তর তিনিও জানেন, আমরাও জানি। আমাদের ভেতর যাঁরা তা জানেন না, তাদের জানা উচিত।
সরদার ভাই জীবিত আছেন, এবং বেঁচে আছেন। যারা জীবিত থাকে, তারা সবাই সব সময় বেঁচে থাকে না। সারা জীবন বেঁচে থাকে যারা, এমন লোকের সংখ্যা তো খুবই কম। জানা উচিত: জীবিত থাকা আর বেঁচে থাকা মোটেই এক কথা নয়।
বেঁচে থাকা মানে প্রতিনিয়ত সামনের দিকে পথ হাঁটতে হাঁটতে জীবিত থাকা, কখনও থেমে না যাওয়া, অথবা কখনও পেছন দিকে পা না চালানো। কেবলই ‘চরৈবেতি চরৈবেতি’- এগিয়ে চলা আর এগিয়ে চলা। নিজে এগিয়ে চলা, অন্যকেও সাথে নিয়ে চলা, বিভ্রান্তজনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলা। এ রকম চলাই সরদার ভাই সারা জীবন ধরে চলে এসেছেন। তাই বলছি, সরদার ভাই কেবল জীবিত নন; তিনি বেঁচে আছেন।
আগেই দেখেছি, পাকিস্তান জামানাতেই কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক প্রক্রিয়া থেকে তিনি নিজেকে বিযুক্ত করে নিয়েছিলেন। তবে কমিউনিস্টদের মূল দর্শন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও যে তিনি বিযুক্ত হননি, তাও দেখেছি। সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে পার্টির অবশ্যি এ দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয়তা ব্যাহত হয়নি। পার্টি ভেঙে তথাকথিত মস্কোপন্থি ও পিকিংপন্থি রূপে বিভাজিত হওয়ার পরও কম্যুনিজমের ভাবাদর্শের অনুসারী মানুষের সংখ্যা কমে যায়নি। পিকিংপন্থি নামে পরিচিতরা একান্ত তুচ্ছ সব অজুহাতে শতধা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন যদিও, তবু বিভক্ত হয়েও, এঁদের অনেকেই কমিউনিজমের আদর্শে অবিচল থেকেছেন। মস্কোপন্থিরা অনেক ছোট-বড় ভুল করে, এবং ‘সংশোধনবাদী’ ও ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের দালাল’ আখ্যাকে শিরোভ‚ষণ করে নিয়েই, পতন অভ্যুদয়-বন্ধুর পথ ধরে অবিরাম চলেছেন। তাঁদের সাফল্যও একেবারে ফেলনা নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁদের অবদান তো ইতিহাসের সমর্থনেই পুষ্ট।
কিন্তু বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের গোড়াতেই যখন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে অচিন্তিতপূর্ব বিপর্যয় নেমে এলো, তখন অনেক ত্যাগব্রতী ও নিষ্ঠাবান কমিউনিস্টেরও ত্যাগব্রতে ও নিষ্ঠায় বিচলন ঘটতে দেখলাম। ‘সারা জীবন ধরে কমিউনিজমের নামে একটা মরীচিকার পেছনেই ছুটে গেলাম কেবল’- প্রচণ্ড হতাশায় এমন কথা বলতে শুনেছি কোনো কোনো পোড় খাওয়া প্রবীণ কমিউনিস্টকেও। ‘ধনতন্ত্রে পৌঁছেই ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে গেছে’- ফুকুয়ামার এমন সিদ্ধান্তকে সত্য বলে মানেন, এমন প্রাক্তন কমিউনিস্টের সংখ্যাও এখন মোটেও কম নয়।
এ রকম এক দু:সময়ে সরদার ভাই তাঁর বেচে থাকার সার্থকতা বা সার্থকভাবে বেঁচে থাকার প্রমাণ রাখলেন। বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের দার্শনিক প্রত্যয়ে উদ্বুদ্ধ এই মানুষটির কাছ থেকেই বিভ্রান্তি নিরসনের মন্ত্র গ্রহণ করলেন অনেকে, ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক গতির পথ দেখিয়েই অনেক পথভোলা মানুষের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন তিনি।
২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন (শহীদ বিপ্লবী কর্ণেল আবু তাহেরের ভাই) একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন-
“দু:খজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের এ সময়ের বাম বিপ্লবীদের চিত্তাকর্ষক মেটামরফোসিস আজকে আমাদের দেখতে হচ্ছে। পরিবর্তনমান বিশ্বে বামপন্থি বিপ্লবীদের মত ও পথের পরিবর্তন হতেই পারে। কিন্তু একটি বিষয়ে বিপ্লবীদের কখনও পরিবর্তন হবার কথা নয়। সত্যিকার বামপন্থি বিপ্লবী আজীবন বিপ্লবী থাকেন। তার কোনো মতবাদ, দীক্ষা বা দিক-নির্দেশনা কখনও প্রগতি ও জনমানুষের স্বার্থের পরিপন্থি হয় না। উদাহরণ হিসেবে এ ব্যাপারে জীবিতদের মধ্যে চট করে যে নামটি মনে পড়ল, তিনি সরদার ফজলুল করিম। নিপীড়িতদের মধ্যে প্রতিনিয়ত আশার আলো জ্বালিয়ে রাখার অসীম ক্ষমতাধর এই মহান মানুষটি আমাদের জন্য উত্তাল সমুদ্রে হঠাৎ পাওয়া এক বাতিঘরের মতো।”

এই বাতিঘরের আলোতেও যদি আমরা দিক-নির্দেশনা না পাই, তবে সেটি হবে আমাদেরই মূঢ়তাজনিত দুর্ভাগ্য।

(লেখক, শিক্ষাব্রতী ও শিশু সংগঠক)  

sordar-5
প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে দূরের মানুষ সরদার ভাই
এম এম আকাশ

১৯৭২-’৭৫ এই সময়টা ছিল এক স্বপ্নেভরা সময়। দেশ স্বাধীন হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমরা একগুচ্ছ স্বপ্নে বিভোর কিশোর-তরুণ-যুবক দেশে ফিরে এসেছি। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তখন সদ্য প্রকাশিত পোস্টারই তৈরি করে দিয়েছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। সেই অনিন্দ্য সুন্দর পোস্টারে লেখা হয়েছে :
‘লাখো শহীদের মৃত্যুতে
মুক্ত স্বদেশ
এসো দেশ গড়ি!’
এরকম একটা সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়তে পড়তে প্রথম সরদার ভাইকে দেখি এবং তাঁর কথা শুনি। তবে তখন তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। কিন্তু ইতিহাসে তখনই তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। পাকিস্তানি আমলের দুঃসহ কঠিন সময়ে মুসলিম ধর্মাবলম্বী পরিবার থেকে যে গুটি কয়েক উজ্জ্বল ব্যতিক্রমী যুবক সাম্যবাদী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং এক একটি ‘লাইটহাউস’ হিসেবে সমাজে দীর্ঘকাল আলো বিকিরণ করে গেছেন, এখনও যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে সরদার ভাইও একজন। মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, কে.জি. মুস্তফা, মোঃ ইমদুল্লাহ্ এই একগুচ্ছ মুসলিম পরিবার থেকে আগত যুবক দেশভাগের পর ‘দাদাদের’ তথা প্রবীণ বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সাম্যবাদী আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ রণেশ দাশগুপ্তের ভাষায় শেষ পর্যন্ত ‘জীবনের মোহের কাছে পরাজিত হয়ে, সাম্যবাদী আন্দোলন থেকে অবসর নিয়েছিলেন।’ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও সাম্যবাদী রাজনীতি এবং তার পথিকৃৎ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে এঁদের প্রত্যেকেরই যোগাযোগ পরবর্তীতে সব সময়ই ছিল কম-বেশি সজীব এবং সহানুভ‚তিপূর্ণ। আমরা যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলাম, তাদের কাছে পার্টির প্রাক্তন এসব মানুষগুলো ছিল কিছুটা ‘দূরের মানুষ’। আমাদের সামনে তখন ‘আদর্শ কমিউনিস্ট’ হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে বিরাজ করতেন পার্টির নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত সব ত্যাগী দাদারা : কমরেড মণি সিংহ, কমরেড অনিল মুখার্জী, কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী, অনিমা দি, হেনা দি এঁরা। আরও প্রত্যক্ষভাবে আমরা তখন যুক্ত ছিলাম ষাট দশকের উজ্জ্বল সার্বক্ষণিক কর্মী ছাত্র তারকাদের সঙ্গে- মোঃ ফরহাদ, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী প্রমুখ দ্বিতীয় সারির কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে আমরা দাদাদের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতাম। এরপর তৃতীয় সারিতে ছিলেন আরও তরুণ আরও টগবগে আরও উজ্জ্বল মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আব্দুল কাইয়ুম মুকুল, আয়েশা আপা, রীনা আপা প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। তাঁরা ছিলেন গণসংগঠনে কর্মরত কমিউনিস্ট। আমার বিশ বছর বয়সের তদানীন্তন স্মৃতি যতটুকু মনে আছে, তাতে তখন সরদার ভাইকে মনে হত কমিউনিস্ট পার্টির পরিবারভুক্ত সদস্য না হলেও, কমিউনিস্ট পার্টির পরিবারের একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। নিজের নয় কিন্তু তাই বলে দূরেরও নয়। অনেক পরে অবশ্য সরদার ভাইকে যখন নিজের করে জেনেছি, তখন জেনেছি যে, তিনি হচ্ছেন সেই বরিশালের কৃষকসন্তান, যিনি একদিন ডেকার স্ট্রিটে অবস্থিত সি পি আই অফিসে হাজির হয়ে কাকাবাবুর (কমরেড মোজাফ্ফর আহ্মদ) সামনে বিলেতগমনের ছাড়পত্রটি ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন সেই সরদার ভাই, যিনি আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনে বছরের পর বছর মাথায় হুলিয়া নিয়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিরাপদ সংসার পরিত্যাগ করে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বছরের পর বছর কাটিয়েছেন কারান্তরালে, হাঙ্গার স্ট্রাইক করে কারাগারের ভেতরে কাটিয়ে দিয়েছেন দিনের পর দিন। আবার তিনিই হচ্ছেন সেই সরদার ভাই, যিনি পূর্ববঙ্গের বঙ্গীয় গণপরিষদে যুক্তফ্রন্টের টিকিটে কমিউনিস্ট প্রার্থী হিসেবে অনায়াসে নির্বাচিত হয়েছেন। আমার সরদার ভাই হচ্ছেন সেই সরদার ভাই, যিনি সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের কালপর্বের একটা বড় সময় ধরে পাকহানাদার বাহিনীর কারাগারের বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনে কালাতিপাত করেছেন। সরদার ভাইয়ের আরও অনেক উজ্জ্বল পরিচয় আছে, তা আমি আরও পরে উদ্ঘাটনের প্রয়াস পাব। কিন্তু আমি যেই সময়ের কথা বলছি, অর্থাৎ ১৯৭২-’৭৫ স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের কথা, তখন যখন এসব কিছুই আমার জানা ছিল না, সরদার ফজলুল করিম তখনও পর্যন্ত আমার ঘনিষ্ঠ পরিচিত কমরেড সরদার ফজলুল করিম হননি। তখনও তিনি আমার কাছে একজন নিভৃতচারী অধ্যাপক মাত্র, অবসরগ্রহণকারী বামপন্থী যাঁর সঙ্গে পার্টির একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। যিনি থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা ফুলার রোডের একটি বাড়িতে এবং যে বাড়িতে ‘সাম্যবাদের ভ‚মিকা’ এবং ‘শ্রমিক আন্দোলনের হাতে খড়ি’র লেখক কমরেড অনিল মুখার্জী নিয়মিত যাতায়াত করেন। অনিলদা তখন আমাদের জন্য একজন ‘আইকন’। অনিলদা নিয়মিত ‘সরদার ভাই’-এর বাসায় যান। এটাই তখন আমাদের জন্য ছিল তাঁর প্রতি অনুরাগ ও কৌত‚হল সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। সেই যুগে ব্যাপারগুলো এভাবেই ঘটতো। এরই ফাঁকে ফাঁকে অনেক ঘটনা ঘটতে থাকল। দূরের সরদার ভাই আস্তে আস্তে আমার মনের কাছাকাছি চলে আসতে শুরু করলেন। ১৯৭৩ সালে হাতে পেলাম সরদার ভাইয়ের অসামান্য সৃষ্টি ‘দর্শনকোষ’। এত সহজ-সুন্দর, সাবলীল বাংলায় দর্শনের দুর্বোধ্য ‘ক্যাটেগরি’ বা প্রত্যয়ের সংজ্ঞায়ন দুই বাংলা মিলিয়ে দ্বিতীয় একটি আর পাওয়া যাবে না। এই মুগ্ধতার রেশ কাটতে না কাটতেই পরিচয় হল, তাঁর কন্যা ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী স্বাতীর সঙ্গে। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক, স্বাতী এবং তাঁর একঝাঁক উজ্জ্বল সপ্রতিভ বন্ধুরা মিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে তখন গড়ে তুলেছিলেন একটি শক্তিশালী পাঠচক্র-আন্দোলন। সেখানে যাওয়া আসার সুবাদেই স্বাতী ও শাকিলের সঙ্গে পরিচয় এবং স্বাতীর বাবা সরদার ভাই এবং সরদার ভাইয়ের কন্যা স্বাতী এই পরিচয়টাও তখন প্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদের চোখের সামনে প্রবীণ কমিউনিস্ট হিসেবে তখনও যাঁরা বিরাজমান ছিলেন, তাঁরা অধিকাংশই ছিলেন সংসারহীন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো। তাঁরা ছিলেন অকৃতাদার। অত্যন্ত স্বল্পভোগী এবং নিরহঙ্কার প্রকৃতির মানুষ। কঠোর কৃচ্ছ্রতা তাঁদের শরীর এবং মনে এক ধরনের ত্যাগী আভা তৈরি করে দিয়েছিল, যার বিচ্ছুরণে আমরা তরুণরা ছিলাম আপ্লুত এবং কিছুটা সম্মোহিত। পার্টির ভেতরে এই প্রায় দেবতাসুলভ কমিউনিস্টদের তুলনায় সরদার ভাইদের মতো প্রাক্তন কমিউনিস্টদেরকে (পরে অবশ্য সরদার ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি এবং বিশ্বাসও করি যে, একজন ব্যক্তি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েও কমিউনিস্ট নাও হতে পারেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য না হয়েও একজন কমিউনিস্ট হতে পারেন।) তখন আমরা কিছুটা দূরের লোক হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। তবে এঁদেরকেও বন্ধুই ভাবতাম, শত্রæ ভাবতাম না। মনে আক্ষেপ ছিল, কেনই-বা তাঁরা কমিউনিস্ট আন্দোলনে আবার সক্রিয় হচ্ছেন না? আসলে তখন প্রাণে উচ্ছ্বাস ছিল প্রচুর। ভাবতাম বাংলাদেশই হবে বিশ্বের বুকে ১৭ তম সমাজতান্ত্রিক দেশ। এখন পরিণত বয়সে মনে হয় কে যে কাছের, কে যে দূরের তা বলা কঠিন। বিপ্লবও যে একটি চলমান প্রক্রিয়া সেটাও সরদার ভাইয়ের কাছে পরে শিখেছি। তিনি প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশে বিপ্লব তো হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, এটা একটা বড় বিপ্লব। আর বাংলাদেশের নারীরা এই মুসলিমপ্রধান একটি দেশে ঘর থেকে বেরিয়ে মুক্ত হরিণীর মতো ছুটে বেড়াচ্ছে, এটাও কোনো অংশে বিপ্লবের চেয়ে কম কিছু নয়। এই চলমান প্রক্রিয়ায় বিপ্লব আগায় অর্কেস্ট্রার মতো নানা বাদকের-গায়কের নানা ধরনের সুরমুর্ছনার অপূর্ব সংশ্লেষণের মাধ্যমে। এখানে সর্বত্যাগী জ্ঞান চক্রবর্তীর যেমন দরকার- তেমনি সরদার ভাইয়েরও রয়েছে অমূল্য ভ‚মিকা। জ্ঞান চক্রবর্তী প্রবীণ বিপ্লবীদের মধ্যে একজন অত্যন্ত আদর্শ স্থানীয় কমিউনিস্ট ছিলেন- তাঁকে দেখেছি ‘বলাকা বেøড’ দিয়ে দুই-দুইবার দাড়ি না কামানো পর্যন্ত বেøডটা ফেলে দিতেন না। এরকম ‘স্পার্টান’ কঠিন মানুষ আমার ৫৩ বছর বয়সে খুব বেশি দেখতে পাইনি। আবার নিজের অবাধ্য ছেলের প্রতি অন্ধ অপত্য স্নেহে নিজের শ্রম-মেধা-অর্থ সবই ঢেলে দিচ্ছেন, এরকম একজন দুর্বল পিতা হিসেবে নরম মানুষ সরদার ভাইকেও দেখেছি। আবার এই সরদার ভাইকে দেখেছি, আশি-উত্তীর্ণ বয়সে রিকশা থেকে লাঠি ভর করে নামতেÑকিন্তু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখান করতেও তাঁকে দেখেছি। তাই মনে হয় কৃচ্ছতা বা ভোগের প্রতি বিরূপতা এবং নিজের ব্যাপারে সাহায্যবিমুখতা এটি এই উত্তাল চল্লিশের গৃহী বিপ্লবী সরদার ভাই এবং সন্ন্যাসী বিপ্লবী জ্ঞান চক্রবর্তী উভয়েরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য বটে। কিন্তু গৃহী বিপ্লবীদের ক্ষেত্রে মায়ার বাঁধনে লতায়পাতায় জড়িয়ে সংসারের বাস্তবতা বিদ্যমান থাকায় সেখানে কিছু মানবিক দুর্বলতাও (?) যুক্ত হয়েছে। তবে ব্যক্তি মানুষের জন্য সে বিপ্লবী হলেও সেটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এঁদের একজন কঠিনকে ভালোবাসেন আরেকজন নরম এবং দুর্বলকে ভালোবাসেন কিন্তু উভয়ের মিল এক জায়গায়। ভালোবাসায় মমতায় মানবপ্রেমে মানবিকতায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সার্থক হওয়ার সাধানায় এঁরা উভয়েই ছিলেন এক। কিন্তু বিলিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রটা একেকজনের জন্য একেক রকম। সরদার ভাই যা কিছু করেছেন কোনোটাই কোনোদিনই একান্ত নিজের জন্য করেননি। এমনকি ছেলে-মেয়েদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেও সরদার ভাই বেছে নিয়েছেন সেই সন্তানটিকেই যার সাফল্য সবচেয়ে কম, যে তুলনামূলকভাবে একটু পিছিয়ে পড়েছে এবং যার সাহায্যের প্রয়োজনও হয়তো অন্যদের তুলনায় বেশি। এখানেও দুর্বলের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়ার একটি প্রচ্ছন্ন নীতিবোধ হয়তো অজান্তে তাঁর ভিতরে কাজ করেছে বলে আমার মনে হয়। যদিও পরিবারের অন্য সদস্যরা এজন্য তাঁকে হয়তো একজন স্নেহান্ধ পিতা হিসেবেই দেখেছেন। সংসারে সকলের প্রতি সমান কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে তাদের রয়েছে। তবে বিপ্লবীদের জন্য এটুকু মানবিক দুর্বলতা বিরাট কোনো অপরাধ নয়। জ্ঞান দা’ও সারা জীবনে যা কিছু করেছেন একান্ত নিজের জন্য তা করেননি। ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে জ্ঞান চক্রবর্তীরা বিশ্বাস করতেন না। সমস্ত শ্রম মেধা প্রজ্ঞা যা কিছু তাঁদের ছিল, তা ছড়িয়ে দিয়েছেন পার্টির ভেতরে বাইরে বৃহত্তর জন-মানুষের মধ্যে। পার্টিই ছিল তাঁদের ঘর, তাঁদের পরিবার। ঘরের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও বাইরের মানুষের প্রতি ভালোবাসা দুইই বা তাঁদের প্রজন্মের কমিউনিস্টদের ছিল এবং অনেক বেশি পরিমাণেই ছিল। জ্ঞান দা, অনিলদা, সুনীলদা প্রমুখ প্রবীণ বিপ্লবীরা আজীবন অকৃতদার ছিলেন। আবার অন্য দিকে কমরেড মণি সিংহ, কমরেড খোকা রায়, কমরেড রবি নিয়োগী এঁরা বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁদের সন্তান-সন্ততিও ছিল। কিন্তু এঁদের কেউই কারো চেয়ে কম আত্মত্যাগী ছিলেন বলে মনে হয় না। এসব সমস্যা নিয়ে চে গুয়েভারার একটি অবিস্মরণীয় উক্তি এখানে তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না। চে লিখেছেন, ‘বিপ্লবী নেতাদের শিশুসন্তান রয়েছে। যারা সবেমাত্র আধো আধো কথা বলতে শুরু করেছে, যারা এখন বাবা ডাকটি বলতে শেখেনি, রয়েছে তাদের প্রিয়তমা বধূরা, এঁদের সকলকেই বিপ্লবের ভবিষ্যতের জন্য, বিপ্লবদের জীবন দানের অংশ হিসেবে আত্মত্যাগ করতে হয়। বিপ্লবীদের বন্ধুমহল হয় সংকীর্ণ বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ, বিপ্লবী সাথীদের নিয়েই গড়ে ওঠে তাঁদের সমগ্র জীবন। সেই সংকীর্ণ বৃত্তের বাইরে তাঁদের অন্য জীবন প্রায়ই থাকে না। এই অবস্থায় একজন বিপ্লবীর মধ্যে অবশ্যই উপমাত্রার মানবিকতা বোধ থাকতে হবে, থাকতে হবে উচ্চ মাত্রার ন্যায়বোধ এবং সততা যাতে করে তিনি ‘গোঁড়ামি’ বা ‘চরমপন্থা’ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন। শীতল যুক্তিবাদ বা এক ধরনের গণবিচ্ছিন্নতা এড়ানোর জন্যও এটা দরকার। বিপ্লবীদের প্রতিদিন সচেতনভাবে চেষ্টা করতে হবে যাতে জীবন্ত মানবতার জন্য বিপ্লবীদের যে অফুরন্ত ভালোবাসা রয়েছে সেটি বাস্তব কাজে রূপান্তরিত হয়। এমন কাজে যা হবে দৃষ্টান্তস্থানীয় এবং অনুপ্রেরণাদায়ক [(চে গুয়েভারা, ‘সমাজতন্ত্র এবং কিউবা দেশের মানুষ’ (১৯৬৫)]। আমি ১৯৭১ সালে ভারতে মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে থাকাকালে জ্ঞানদাকে দেখেছি কীভাবে তিনি সবচেয়ে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাটির খাবারের ব্যাপারেও তীব্র মনোযোগী ছিলেন। প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থী গেরিলার জন্য ছিল তার সমান যতœ ও ভালোবাসা। আবার সরদার ভাইকে দেখেছি চলতি পথে প্রতিটি রিকশাচালকের সঙ্গে অপার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে। নিজের বাড়ি রাজাবাজার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজাবাজার থেকে নিউমার্কেট যখনই তিনি কোনো রিকশায় উঠতেন তখনই তাদের সঙ্গে তার চলতো নানা সুখ-দুঃখের অবিরাম সংলাপ। কখনোই ভাড়া নিয়ে তাদের সঙ্গে তাঁর কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি। তারাও এই সাধাসিধে লাঠিতে ভর দিয়ে দণ্ডায়মান ভদ্রলোকটিকে কখনো ঠকানোর চেষ্টা করেননি। রিকশায় উপবিষ্ট সরদার ভাইকে দেখে আমার সবসময় মনে হয়েছে যে তিনি যেন সহাস্য বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

দূরের লোক কাছের হল- কাছের লোক দূরে সরে গেল

আশির দশকের শেষে এসে আমাদের দেশের সোভিয়েত ঘরানার কমিউনিস্ট শিবিরে এক টাল-মাটাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখন মনে হয়েছিল যে, সব চিন্তা, সব বিশ্বাস বুঝি শিথিল হয়ে যাবে। ‘সমাজতন্ত্র’ নিয়েই যেন নতুন করে নানা প্রশ্নের ঢেউ সৃষ্টি হয়েছিল। কেউ কেউ বলতে থাকেন ‘সমাজতন্ত্রের কোনোই সুকৃতি নেই’। ‘ইতিহাসে অক্টোবর বিপ্লব একটি দুর্ঘটনা মাত্র’। ‘পুঁজিবাদই টিকে আছে, টিকে থাকবে’ এবং সমাজতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। এই সময় আমাদের পার্টির মূল নেতৃত্বই কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ করেন। বহু সমাজতান্ত্রিক কর্মী তখন মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ একদম বসে যান। কেউ কেউ বিলোপবাদীদের খুন করার জন্য উগ্র উত্তেজনায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর কেউ কেউ হতভম্ব হয়ে ভাবতে থাকেন কী করা যায়। অন্তত একজন কর্মী ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে তখন খবর পেয়েছিলাম। সেদিনের সেই দিনগুলিতে আমরা আনুজ কয়েকজন নতুন প্রজন্মের মানুষ খুব অসহায়ভাবে ‘কমিউনিস্ট’ পার্টিকে রক্ষা করার জন্য দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলাম। সেই অসহায় অবস্থায় লক্ষ করলাম যাঁরা বহুদিন কাছাকাছি থেকে কমিউনিস্ট পার্র্টি করেছেন বা যাদের জীবনের ঐহিক সাফল্যে সোভিয়েতের কমিউনিস্ট পার্টির অবদান যথেষ্টই উঁচু মাত্রার ছিল তাঁদের অনেকেই সমাজতন্ত্রবিরোধী শিবিরে যোগ দিচ্ছেন। কেউ কেউ অবশ্য ‘নবায়িত সমাজতন্ত্রের’ ধারণা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা শুরু করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং চাইলেন ‘কট্টরপন্থী’ অপবাদের চক্র থেকেও মুক্ত থাকতে এবং ‘বিলোপবাদের’ বিরুদ্ধেও লড়াই অব্যাহত রাখতে। এরকম একটা সংস্কারমুক্ত কিন্তু সমাজতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তখন খুব সাবধানে পা ফেলছিলেন অনেকে। ইতিহাসের এই জটিল সময়টা ছিল কমিউনিস্টদের জন্য সবচেয়ে সংকটজনক সময়, সবচেয়ে অসহায় মুহূর্ত। এর আগেও এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন কখনো কখনো সংকটে পতিত হয়েছে। অতীতেও কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত হয়েছে- যেমন ষাট দশকে চীন-মস্কো বিভেদের সময় সরদার ভাইরাই ছিলেন সেসময়কার বিভেদের সাক্ষী। কিন্তু তখন পার্টিতে বিভেদ তৈরি হয়েছিল সমাজতন্ত্র নিয়ে নয়, বরং কে বেশি খাঁটি সমাজতন্ত্রী সেটা নিয়েই ছিল বিতর্ক। ফলে তখন কমিউনিস্টরা এতটা অসহায় বোধ করেন নি, বরং তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতামূলকভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলন তখন কমবেশি সামনেই এগিয়ে গেছে, যদিও তাতে দুই কেন্দ্রের অন্ধ অনুকরণবৃত্তির প্রভাবই ছিল বেশি।
কিন্তু এবারকার এই ভিন্নধর্মী সংকটমুহূর্তে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, কাছের লোকেরা দূরে চলে গেলেও আমাদের বহু পুরানো ঘুমন্ত সমর্থক এবং বিশেষত বুদ্ধিজীবীরা যাঁরা অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী অসা¤প্রদায়িক চিন্তা-ভাবনায় অভ্যস্ত, যাঁদেরকে ঠিক কমিউনিস্ট বলা যাবে না। যাঁদেরকে চলতি রাজনীতির ভাষায় ‘রেডিকেল ডেমোক্র্যাট’ বা ‘বিপ্লবী গণতন্ত্রী’ বলে ডাকা হয়, তাঁরাই বরং সদলবলে এগিয়ে এসে কমিউনিস্ট পার্টি রক্ষার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করলেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, অনেক অপরিচিত হাত এসে শক্ত হাতে লাল ঝাণ্ডা আঁকড়ে ধরছে। এছাড়া পার্টির অগণিত সাধারণ ছাত্র-শ্রমিক কৃষক-ক্ষেতমজুর সদস্য-সমর্থকরা সকলেই পার্টিকে রক্ষার পক্ষেই মূলত অবস্থান গ্রহণ করলেন। যা-ই হোক তারপরেও দুঃখজনকভাবে আমাদের পার্টি ও পার্টির সম্পত্তি সেসময় দুভাগে বিভক্ত করা হল। যদিও আমরা কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যালঘিষ্ঠ কমিউনিস্ট সদস্যরা একত্রেই কংগ্রেস করতে চেয়েছিলাম এবং সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, তা মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম এবং সেজন্য সারা দেশে প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে দুটো দলিলও প্রচারিত হয়েছিল, কিন্তু তারপর শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ কংগ্রেস করা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত ভোটে হেরে যাওয়ার ভয়ে বিলোপবাদীরা শেষ পর্যন্ত একত্রে কংগ্রেস করতে চাননি। আর আমরা ভাড়া করা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আশঙ্কায় শান্তিপূর্ণ বিভক্তির পদ্ধতি মেনে নিয়েছিলাম বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। যদিও এজন্য এখন পর্যন্ত আমাদের সমর্থকরা আমাদের অনুযোগ করে থাকেন।
এত ইতিহাসের কথা এখানে লিখলাম এইজন্য যে, এই সময় আমাদের মতো যারা সাম্যবাদ ও কমিউনিস্ট পার্টিকে রক্ষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিল, তাদের জন্য একটা অত্যন্ত বড় অনুপ্রেরণার স্থলে ছিল সরদার ভাইয়ের মর্মভেদী দৃঢ় উচ্চারণমালা। সরদার ভাই প্রথম আমাকে বলেছিলেন, সমাজতন্ত্রের কোনো বিপর্যয় হয়নি। বিপর্যয় কথাটা তোমরা শুধু শুধু ব্যবহার করেছো। এই কথাটা ব্যবহার করা উচিত নয়। সরদার ভাই-ই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি খবরের কাগজে লিখেছিলেন। ‘সমাজতন্ত্র যদি দশ লক্ষ বছর লাগে তাহলেও!’ সরদার ভাই-এর আরেকটি প্রিয় উক্তি ছিল ‘সমাজতন্ত্র তো আছেই- নাই কে বলছে? প্রতিটি পরিবার চলে সমাজতন্ত্রের আদি নিয়মটি অনুসরণ করে। ‘ফ্রম ইচ অ্যাকটিং টু হিজ ক্যাপাসিটি অ্যান্ড টু ইচ অ্যাকটিং টু হিজ নিডস্’ অর্থাৎ প্রত্যেকের কাছ থেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী এটাই প্রতিটি পরিবারের প্রাথমিক সংবিধান। সরদার ভাই-এর মুখ থেকে প্রথম যখন এই বক্তব্যটি শুনেছিলাম, তখন এর অন্তর্নিহিত গভীরতায় এবং আশ্চর্য সরলতায় পুরোপুরি অভিভ‚ত হয়ে গিয়েছিলাম। সত্যই তো সব পরিবারই একার্থে সমাজতন্ত্রের এক একটি জীবকোষের মতো সংগঠন। ‘পণ্য’কে যেমন কার্ল মার্কস গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পুঁজিবাদের একক ইউনিট হিসেবে, কোষ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, তেমনি সরদার ভাই-এর ‘পরিবার’ সংক্রান্ত এই ধারণাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে আরেকটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি। গভীরভাবে ভেবে দেখলে বোঝা যায় যে-
১.    পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত মালিকানা বলে কিছু নেই। একান্ত ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র বাদ দিলে বাকি সবকিছুই সেখানে পরিবারের যৌথ সম্পত্তি। কাগজ-কলমে দলিলে হয়তো ব্যক্তির নামেই সম্পত্তি লেখা থাকে কিন্তু কার্যত সম্পত্তি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণে পরিবারের সকল সদস্যই কমবেশি ভ‚মিকা রাখেন।
২.    পরিবারের শিশু বা বৃদ্ধদের যেহেতু কাজ করার সামর্থ্য নেই, সেহেতু তাদেরকে সচরাচর কোনো কঠিন কাজ করতে বলা হয় না। কিন্তু তাদের খাদ্য, বস্তু, সেবা, চিকিৎসা, বিশ্রামের প্রয়োজনটুকু পরিবারের সামর্থ্যবান অন্য সদস্যদের উদ্বৃত্ত উৎপাদন থেকেই মেটানো হয়। যাঁরা সক্ষম তাঁরা পরিশ্রম করে সম্পদ উৎপাদন করেন এবং নিজের প্রয়োজনটুকু রেখে বাকিটুকু পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন মেটানোর জন্যই ব্যয় করেন। এতে কোনো দুঃখবোধ তাদের হয় না, এই প্রয়োজনটা তাঁদের জন্য কোনো দুঃখজনক প্রয়োজন নয়, এটি নৈতিক এবং আনন্দদায়ক দায়িত্বপালন মাত্র!
৩.    পরিবারে শ্রম বিভাজনের সময় সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ যোগত্যা ও সামর্থ্য, বয়স ইত্যাদি স্বাভাবিক উপাদানগুলোকেই গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি। কোনো বাধ্যতামূলক শারীরিক দাসত্ব বা মজুরির বিনিময়ে দাসত্ব পরিবারের অভ্যন্তরে সাধারণত সম্ভব হয় না।
৪.    পিতৃতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী পরিবারগুলোর কথা বাদ দিলে আজকাল আধুনিক সভ্য পরিবারগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও হয় গণতান্ত্রিক এবং অংশীদারিত্বমূলক। ফলে কর্তৃত্ববাদ বা একনায়কত্ব এখানে চলে না।
উপরে সভ্য মনুষ্যপরিবারের যে উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যগুলির বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে, তা হয়তো অক্ষরে অক্ষরে প্রতিটি বিদ্যমান পরিবারের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না, কিন্তু এর পরেও সরদার ভাই-এর কথার মূল সত্যটি এই জায়গায় নিহিত যে, প্রতিটি পরিবারের আর্দশ রূপকল্পটি হচ্ছে অনেকটাই এরকম। সুতরাং সরদার ভাই যখন বলেন, সমাজতন্ত্র তো আছেই এবং তা খুঁজে পাওয়ার জন্য দূরে তাকানোর দরকার নেই, আশেপাশে মানুষের সৃষ্ট মানবিক পরিবারগুলোর ভেতরের মানবিক সম্পর্কের দিকে তাকালেই তাকে ধরা যাবে, দেখা যাবে, তখন তিনি আসলে একটি গভীরতর সত্যের প্রতিই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এভাবে বোঝাতে পারলে হতাশা আমাদেরকে কখনোই স্পর্শ করতে সক্ষম হবে না। আমরা বুঝতে সক্ষম হব যে, ব্যক্তিমানুষের সামজিক স্বভাবধর্মই হচ্ছে সমাজতন্ত্র। তবে ছোট মানুষদের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারণে তার সামাজিকতার মাত্রা পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র জাতি এবং অবশেষে সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ছড়িয়ে যেতে এখনও পারেনি। কিন্তু একদিন তা অবশ্যই বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হবে। সামাজিকতার আবেদন যে কত গভীরে প্রোথিত তা বোঝা যায় বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত বিশ্বধর্মগুলোর মর্মবাণীর দিকে তাকালে। এযাবৎ প্রণীত সবগুলি ধর্মগ্রন্থই মূলত মানবজাতিকে একই পরিবারভুক্ত সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হিসেবেই বর্ণনা করে গেছে। সরদার ভাই তাই যখন পরিবারের পারস্পরিক সৌহার্দ্যরে মধ্যে সমাজতন্ত্রের বীজকে আবিষ্কার করেন, তখন সেটা তাঁর গভীর দার্শনিক বোধেরই প্রকাশ ঘটায়।
সরদার ভাইয়ের কাছ থেকেই আমি প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমদের ডায়েরির কথা শুনতে পেয়েছিলাম। সরদার ভাই নিজেও তাজউদ্দিন আহমদের মতোই নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন মুক্তার অক্ষরে তার ডায়েরি মেইনটেইন করেন। তাঁর এই অভ্যাসের কথাটা আমার জানা ছিল। আজও তাই খুবই কৌতূহল রয়েছে তাঁর অসংখ্য ডায়েরিগুলো পাঠ করার। যদিও এই অন্যায় আবদার আমি তাঁর কাছে কখনোই করিনি, করাটা উচিতও হবে না। তবু আমার ধারণা এগুলো যদি কোনোদিন প্রকাশিত হয়, তাহলে তা থেকে বাংলাদেশের জন্ম, বিকাশ ও অগ্রগতির ক্রম উন্মোচনশীল একটি বর্ণনা ও ব্যাখ্যার সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে। সরদার ভাই নিজের ডায়েরির কথা তেমন একটা না বললেও মৃত্যু-পরবর্তীকালে প্রকাশিত তাজউদ্দিন আহমেদের ডায়েরির থেকে একটি দিনের কথা আমাকে এত আগ্রহভরে বর্ণনা করেছিলেন যে, তা আজও আমার মস্তিষ্কে গেঁথে আছে। তিনি গান্ধি প্রসঙ্গে আলোচনাকালে একদিন আমাকে বলেছিলেন যে, গান্ধি যেদিন আততায়ীর হাতে নিহত হন, সেদিন তাজউদ্দিন আহমেদের দিনলিপিতে তিনি নাকি লিখেছিলেন যে, তাঁর কাছে যেন সবকিছু খালি খালি লাগছে এবং মনে হচ্ছে যেন আপন পিতৃবিয়োগের বেদনার মতো বেদনা অনুভব করছেন তিনি। সেদিন পথে পথে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বহু রাতে হলে ফিরেছিলেন জনাব তাজউদ্দিন আহমদ। এই কথাগুলো বলার সময় সরদার ভাইয়ের গভীর আবেগপূর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে আমি অনুভব করেছিলাম যে, মহাত্মা গান্ধি বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো জনগণনন্দিত নেতাদের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটি ঠিক আমাদের মতো অঙ্ক কষে নিরাসক্তভাবে তিনি স্থির করেননি। আমরা যেমন এসব নেতার ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় দিক মিলিয়ে শ্রেণি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন অভ্যন্ত, তিনি ঠিক তেমনভাবে তা করেন না। এসব ক্ষেত্রে তাঁর এক ধরনের প্রাজ্ঞ ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে, যা সাধারণ জনগণ বা তাজউদ্দিন আহমদের মতো গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অধিকতর মিলে যায়। এরকম উদার মনোভঙ্গির পেছনে নিশ্চয়ই বাস্তব কারণ আছে। আমার বিশ্বাস সরদার ভাইদের প্রজন্ম সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করেন এবং ভয়ও করেন। সেই তুলনায় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ফাঁকি বা অসাম্য বা শ্রেণিশোষণের বিরুদ্ধে যে লড়াই, সে সম্পর্কে তাঁদের আগ্রহ ও একাত্মতা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। যেহেতু তাঁদের জীবনটাই অতিবাহিত হয়েছে ঐসব বড় বড় শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সেহেতু শ্রেণিসংগ্রামের উচ্চতর পর্যায়ে উন্নততর শ্রেণি সমাবেশ সম্পর্র্কে মনোযোগ দেয়ার অবকাশ তাঁদের হয়নি। অবশ্য সেই লড়াইটা এখনও পর্যন্ত ঠিকমতো আমরা শুরুও করতে পারিনি। সমাজও কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। হয়তো এখনও পর্যন্ত দুটো লড়াইই পরস্পর পরিপূরকভাবে অগ্রসর হবে। কমিউনিস্টদের সঙ্গে বুর্জোয়াদের অসা¤প্রদায়িক অংশের ঐক্য না হলে সরদার ভাইদের প্রজন্ম অধিকাংশ সময়ই মনঃক্ষুণœ বোধ করতেন। এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমি যেহেতু তাঁদের এই মনঃক্ষুণœতার বাস্তব ভিত্তিটি জানি, তাই এ নিয়ে কখনো তাঁর সঙ্গে তর্ক করিনি। শুধু অপেক্ষা করে থেকেছি, কখন আপন অভিজ্ঞতায় নিজেই তিনি বুঝতে পারবেন বুর্জোয়াদের মেকি অসা¤প্রদায়িকতার দেউলিয়াত্ব। সৌভাগ্যবশত চলমান রাজনৈতিক ঘটনাবলি খুব শিগগিরই বুর্জোয়া দলগুলোর দেউলিয়াত্বটুকু উদ্ঘাটিত করে দিয়েছে এবং রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্নেও সরদার ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের নবপ্রজন্মের কমিউনিস্টদের দূরত্ব অনেকখানি কমে আসতে শুরু করেছে, তবে সরদার ভাই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি অনুরক্ত থাকলেও সব সময়ই একটি গভীর সত্য কথা বলে এসেছেন। তিনি বলেছেন যে, কমিউনিস্টরা সা¤প্রতিককালে যে ‘হাসিনা-খালেদার’ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে কখনো হাসিনার পক্ষে জিন্দাবাদ কখনো মুর্দাবাদ দিচ্ছে- তা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। বরাবর তিনি বলেছেন, এই দ্বন্দ্বের বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে এসে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, রিকশাওয়ালা, বস্তিবাসী এদের জীবনের মাঝে কমিউনিস্টদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে তাদের প্রতি, গড়ে তুলতে হবে মধ্যবিত্ত কমিউনিস্টদের সঙ্গে শ্রমজীবীদের অঙ্গাঙ্গি যোগাযোগ। শ্রমজীবীদের জীবনের দ্ব›দ্বকে রাজনীতির প্রধান দ্ব›েদ্ব পরিণত করতে হবে। সরদার ভাই-এর এই পরামর্শকে আমি সঠিক মনে করি। এইসঙ্গে আরেকটি কথা সরদার ভাই প্রায়ই বলেন, তা হচ্ছে, ‘ক্ষুদ্র সময়ের গণ্ডিতে চিন্তা করলে হবে না- চিন্তা করতে হবে দীর্ঘ মেয়াদে। এটিও খুবই মূল্যবান কথা। ‘ক্যাডাররা’ এখন খুবই কম পড়াশোনা করে থাকে- এটাও সরদার ভাই-এর একটা তীব্র ক্ষোভ। কমিউনিস্ট পার্টির সোমেন-তাজুল পাঠাগার উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘যে-বইপাঠ করা হয় না- সে-বইকে বই বলা অর্থহীন’। এই পাঠাগারের বইগুলো পার্টির তরুণ পাঠকরা সত্যই ভাজা ভাজা করে পড়ে ফেলবেন নাকি দিনের পর দিন এগুলোর ওপর খালি ধুলোর আস্তরণ জমা হতে থাকবে- এ নিয়ে তার মনে সংশয় তৈরি হয়েছিল এবং সেই সংশয় অযৌক্তিকও ছিল না।
এইসব অবিরাম দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনার বিনিময়ের মধ্য দিয়ে কখন যে সরদার ভাই এবং আমি একই লড়াইয়ের কাফেলার সহযাত্রীতে পরিণত হয়েছিলাম- পরস্পর অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিলাম- একাত্ম হয়েছিলাম- তা আর আজ মনে নেই। কিন্তু এভাবেই ইতিহাসের ধারায় হয়তো দূরের মানুষেরা নিকট মানুষে পরিণত হয় এবং নিকট মানুষেরা দূরে হারিয়ে যায়।

প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে

এমন এক সময় ছিল, যখন পথে-ঘাটে, নানা অনুষ্ঠানে, গাছতলায়, পাঠকচক্র, আজিজ সুপার মার্কেটে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকে, টিচার্স লাউঞ্জে, ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে, ক্যাসেটের দোকানে, নিউমার্কেট, বাজারে, বিদ্যুতের বিল শোধের দীর্ঘ লাইনে সর্বত্রই বৃদ্ধ সরদার ভাইকে দেখা যেত। একজন শীর্ণকায় মানুষ লাঠি হাতে ঠুকঠুক করে কারো সাহায্য ছাড়াই দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছেন। যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই সক্রেটিসের শিষ্যদের মতো সরদার ভাইকেও তাঁর শিষ্যরা ঘিরে পরিবেষ্টিত করে ফেলেছে। তিনিও আনন্দের সঙ্গে প্রশ্ন করছেন, জবাব দিচ্ছেন, এগিয়ে যাচ্ছেন। এরকম পথে-প্রান্তরেই তৈরি হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের জন্য হীরা-জহরৎ-মণি-মুক্তার মতো রাশি রাশি মূল্যবান চিন্তারাজি। এরকম একটা চলন্ত বিদ্যালয় পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়। কখনো কখনো এই বিদ্যালয়কে অনুসরণ করার সৌভাগ্য আমারও হয়েছে। সেই সর্বব্যাপী সরদার ভাইয়ের বয়স আস্তে আস্তে বাড়ছে। দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসছে। আগের মতো শরীরের যন্ত্রগুলি আর স্বনিয়ন্ত্রণে নেই। বাধ্য হয়েই ঘরেই তাঁকে এখন থাকতে হচ্ছে বেশিরভাগ সময়। তাঁর জন্য চার দেয়ালের মধ্যে এভাবে বন্দি হয়ে থাকাটা যে কতখানি দুঃসহ একটি ব্যাপার তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু বার্ধক্যের অমোঘ নিয়ম তাঁকেও ক্ষমা করেনি।
তাঁর কন্যা স্বাতী আমার কাছে অভিযোগ করেছে- ‘বাবা কারো কথা শোনেন না- নিজে নিজেই গোপনে বাড়ি থেকে বের হয়ে হয়তো একাই সিএনজি-তে চেপে রওনা হয়ে যান, সেই সুদূর টিকাটুলীতে অবস্থিত সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজের পানে। কিন্তু এতে পরিবারের সবাই দুশ্চিন্তায় ভোগেন। পথে কিছু একটা দুর্ঘটনা হলে কে দেখবে সরদার ভাইকে?
কিন্তু সরদার ভাই যতক্ষণ বাধ্য হয়ে শয্যাশয়ী না হচ্ছেন, ততক্ষণ এসব কথা মানেন না। ঝুঁকি মাথায় নিয়েই সুদূরের পানে ছুটে যান। আমরা যারা তাঁর ভক্ত, সাথী, বন্ধু তারাও এত ব্যস্ত যে, নিয়ম করে তাঁর সঙ্গে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা করতে সবসময় পেরে উঠি না। তাঁর অভাবটা বুঝি, কিন্তু অভাবটা পূরণের জন্য যে-সময়টা বের করা দরকার তা সবসময় বের করা সম্ভব হয় না। আজ-কাল-পরশু করতে করতে একটি ব্যস্ত মুহূর্তের সঙ্গে আরেকটি ব্যস্ত মুহূর্ত যুক্ত হতে হতে, একসময় হঠাৎ মনে হয় মেঘে মেঘে কত বেলাই না পার হয়ে গেল- সরদার ভাইকে অনেকদিন দেখি নি, অনেক মাস দেখিনি। ভয় হয়, এখন দেখা করতে গেলে এই অভিমানী বিপ্লবী মুখ ফিরিয়ে নেবেন না তো? এই ভয়ে আরও যাওয়াটা ক্রমাগতই পেছাতে থাকে। কিন্তু সরদার ভাইকে দেখতে যাব- এই প্রতিজ্ঞাটা প্রাণের ভেতরে থেকেই যায়। সংসারের নানা টানাপোড়েনে প্রতিটি প্রাজ্ঞ মুহূর্তে তাঁকে নিজের মাঝে নিজেই আবার ফিরে পাই। মনে হয়, তিনি তো আমার চারপাশেই আছেন। হয়তো অনেকদিন তাঁর শরীরের সঙ্গে দেখা হয় না, এই যা। কিন্তু তাঁকে তো আমি ভুলিনি। তাঁর উজ্জ্বল বাক্যগুলো আজও ঘুরছে আমার মননে। তাঁকে ভোলা অসম্ভব। রবি ঠাকুরের ভাষায় বলতে ইচ্ছা করে :
আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে,
তাই হেরি তায় সকল গানে।
আছে সে নয়ন তারায় আলোক ধারায়, তাই না হারায়-
ওগো তাই দেখি তায় যেথায় সেথায়
তাকাই আমি যে দিক্ পানে।
সরদার ভাই, সত্য হচ্ছে এই যে, আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়, দেখা হচ্ছে, দেখা হবে, একদিন, এক জায়গায় নয়। বহু দিন, বহু জায়গায়, বহুবার, বহুভাবে।’’

(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় )

sorder- 00
আমার বাবা : সরদার স্যার

আফসানা করিম স্বাতী

আমার বাবা সরদার ফজলুল করিম। ছোটবেলা থেকেই জেনেছি সবার প্রিয় সরদার ভাই- সরদার স্যার আমার বাবা। বাবার সাথে প্রথম দেখা কারাপ্রাচীরের ভেতরে। আমার বাবা তখন রাজবন্দি। এই শব্দটা শিখিয়েছেন আমার মা। মা’র হাত ধরে বাবাকে দেখতে যেতাম কারাগারে। ছোটবেলার স্মৃতিতে খুব অবাক করা ব্যাপার হলো সেই সময়-এর (১৯৫৮-১৯৬২) কারাগারের কয়েদিদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ! তারা আমার মাকে উপহার দিয়েছেন বেতের মোড়া। কখনও কারাগারটাকে খুব ভীতিপ্রদ কিছু মনে হয়নি। কারণ বোধহয় আমার বাবার আপন করে নেয়ার ক্ষমতা; সেন্ট্রি, কয়েদি সবাইকে।
আমার ৪ বছর বয়সে বাবা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাসায় এলো ‘মুক্ত মানুষ’ হয়ে। ছোটবেলা থেকেই ‘বন্দি বাবা’ ছিল আমার কাছে ‘অবাক বিস্ময়’। তাই যখন মুক্ত বাবা পরিবারের একজন সদস্য হলো আমি তাঁর কাছে যেতে চাইতাম না। কেমন করে বাবা আমাকে কাছে টানল- সে সব এখন আমার কাছে হারানো স্মৃতি।
তবুও মনে পড়ে- রাতের বেলায় ঠাকুরমা’র ঝুলি থেকে গল্প শোনাত বাবা। কোনো কোনো সময় Fairy tales-এর ইংরেজি সংস্করণ তিনি প্রথমে ইংরেজিতে- পরে বাংলায় অনুবাদ করে শোনাত। আমি ঘুমিয়ে যেতাম। তিনি যখন ১৯৬২ তে জেল থেকে ছাড়া পেলেন, আমার মা তখন মতিঝিল সরকারি (কেন্দ্রীয়) বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিয়িত্রী- মার নামে বরাদ্দ ছিল মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে দুই রুমের কোয়ার্টার। সেই ছোট্ট দু’রুমের বাসা এখনও আমার কাছে ‘স্বর্গ’ বলে মনে হয়। সকাল বেলায় বাবা আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে কোনো কোনো দিন হাঁটতে বেরুতো- গাছ চেনাত, শিউলি ফুল কুড়ানো শিখাত।
তখন কমলাপুর রেলস্টেশন তৈরি হয়নি। বাবার হাত ধরে চলে গেছি, কমলাপুরের অনেক ভেতর- সেখানে ছিল বৌদ্ধ মন্দির। প্রায় ছুটির দিনে তিন ভাই-বোনকে নিয়ে যেতো রমনা পার্কে। তখন চিড়িয়াখানাও ওখানে ছিল। শীতকালের ছুটিটা ছিল আমার সাংঘাতিক প্রিয়; পড়াশোনা নেই, আর পরীক্ষার ভালো ফল করার চাপও নেই। ফলাফলের ব্যাপারে বাবার মতামত ছিল: প্রথম, দ্বিতীয় হওয়ার দরকার নেই, ভালোভাবে পরের শ্রেণিতে উঠে যাওয়াটাই প্রয়োজন।
আমার বাবার কারণেই আমি সব বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে এসেছি- এ আমার পরম সৌভাগ্য। উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন কাকু, কমরেড অনিল মুখার্জী, কঁচিকাঁচার দাদাভাই রোকনুজ্জামান, ‘ধানশালিকের দেশ’-এর সম্পাদক হাসানুজ্জামান, বিজ্ঞানী আবদুল­াহ আল-মুতি শরফুদ্দিন, বিলেতের আবদুল মতিন, দার্শনিক সাইদুর রহমান এবং ছায়ানটের সন্জিদা খালা- অবলীলায় সে তো আমার বাবার জন্যই তাঁদের কাছে পৌঁছে গেছি। সত্তর-এর দশকে সমাজতন্ত্র-রাশিয়া-সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। প্রত্যেক্ষভাবে না- হলেও পরোক্ষভাবে কিশোর মনকে তিনিই প্রভাবিত করেছিলেন। রুশ সাহিত্যের জানালাটা খুলে দিয়েছিলেন।
আমাদের বইয়ের আলমারীতে ছিল ম্যাক্সিম গোর্কীর ‘মা’, ‘আমার ছোটবেলা’, ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’, ‘পৃথিবীর পথে’। সমাজতন্ত্রের প্রয়োজন কেন- একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি। একদিন আকাশ ভাই, আব্বার ‘প্রিয় আকাশ’ ঢাকা মেডিকেল চত্বরে অনুরোধ করেছিল ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেবার জন্য। এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা করিনি। কারণ সমাজতন্ত্রের দীক্ষাতো বাবা আগেই দিয়ে রেখেছিল।
’৭১-এর সেপ্টেম্বর-এ বাংলা একাডেমি থেকে পাক আর্মিরা বাবাকে ধরে নিয়ে গেল। বন্দি করে রাখলো কেন্দ্রীয় কারাগারে। সে সময় মতিঝিলে আমাদের ছোট পরিবারটি সাংঘাতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। অনেক ঝামেলা করে আমার মা বাবার সাথে দেখা করার অনুমতি পেল। বাবাকে দেখেছিলাম হাতকড়া পড়া অবস্থায়। তখনও তাঁকে দেখেছি অবিচল এবং শান্ত। সেই অবয়ব এখনও আমার চোখে ভাসে। জেলখানা থেকে ভীষণ সুন্দর একটা চিঠি আমার উদ্দেশে লিখেছিল। তা আমাকে দু:সময়ে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
বাবা ১৯৬৩ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমিতে কর্মরত ছিল। সে সময় তিনি একজন সাধারণ চাকরিজীবী। সকাল বেলায় বাজারের থলে নিয়ে ফকিরাপুলে বাজার করতে যেত। বাজার করে বাসায় এসে শার্ট-প্যান্ট পরে বাংলা একাডেমি ছুটতো। অনুবাদ বিভাগে চাকুরি। তার হাত ধরেই ছায়াঘেরা বর্ধমান হাউস বাংলা একাডেমিতে গিয়েছি। সে-সময় আমি সদ্য কিশোরী। বাবার যে দিকটা আলোড়িত করেছে তা হলো তাঁর অসম্ভব সাংগঠনিক ক্ষমতা। বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে যে সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো হয়েছিল তা স্বাধিকার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। সেইসব অনুষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নিভৃতে, নীরবে মঞ্চের পেছন থেকে বাবা মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন। সেই উত্তাল সময়ে মানুষের ঢল নামতো বাংলা একাডেমি আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে।
বাবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ, চিরঋণী। তিনিই আমাকে চিনিয়েছেন একুশের শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমির বইমেলা, রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং কঁচিকাঁচার মেলা। আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে সঞ্চিতা, সঞ্চয়িতা, Children’s Encyclopedia, কোরান শরীফ, গীতা, Gilmpses of World History-এর মতো গ্রন্থগুলো; রেকর্ড বাজিয়ে শুনিয়েছে রবীন্দ্র সংগীত, সেকালের আধুনিক গান। সিনেমার টিকিট কিনে নিয়ে গেছেন গুলিস্তানের সেই বিখ্যাত NAZ সিনেমা হলে, দেখেছি Uncle Tom’s Cabin, Guns of Navaron, সুভাস দত্তের সুতরাং প্রভৃতি। আমাকে চেনালেন মঞ্চনাটক। রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে দেখলাম মঞ্চ নাটক গোর্কীর ‘মা’, এখনও মনে আছে পাভেল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শক্তিমান অভিনেতা আনোয়ার হোসেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার জন্য বাবা আমাকে কৌশলে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বলেছিল, ‘মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়ে Human Anatomy  জানবা, মানুষের চিকিৎসা করতে পারবা- এটা একটা বিশাল সুযোগ’। আমার তখন ফার্মেসি পড়বার ভীষণ শখ। বাবা একদিন রিকশা করে নিউমার্র্কেট নিয়ে গেল, Gray’s Anatomy কিনে দিল। আমি পরের দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের চত্বরে পা রাখলাম। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবার সুযোগ যখনই পেয়েছি, সব সময় তাঁর কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি। পারিবারিক নানা দোটানার মাঝে তিনি শিখিয়েছে যে, অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে- এটাই জীবনের অভিধান’।
১ মে ২০১৪ বাবার ৮৯তম জন্মদিনে কয়েকজন গুণমুগ্ধ তরুণ তাঁর সাথে সময় কাটিয়েছিল; সে সময় তাঁর চোখে-মুখে ছিল এক উজ্জ্বল আলোর আভা। তারুণ্যের সান্নিধ্য ছিল তাঁর ভীষণ কাক্সিক্ষত। আশা করি, সেই তরুণ প্রজম্মই তাঁর চিন্তা-চেতনা ধারণ করবে এবং তারাই সরদার ফজলুল করিমকে উপস্থিত করবে অনাগত ভবিষ্যত প্রজম্মের কাছে।

(অধ্যাপক, ফার্মাকোলজি, বারডেম)  

 

 

sorder- 00

ভাব-অনুভাব
আব্দুল্লাহ আল মোহন

আজন্ম দার্শনিক সরদার ফজলুল করিমের কথা মনে ভাসলেই মনে পড়ের রবীন্দ্রনাথকে, যেমনটি তিনি বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক জাতিই আপনার সভ্যতার ভিতর দিয়ে আপনার শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে প্রার্থনা করছে।’ সরদার ফজলুল করিম হলেন ঠিক সে রকম একজন মানুষ, যাকে আমরা চাই এই সভ্যতার সুস্থতার জন্যেই। পরম নি:স্বার্থ পর আমাদের প্রিয় সরদার ফজলুল করিম স্যারের আজ প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী। সরদার ফজলুল করিম নানা অর্থেই এক অসামান্য চরিত্র। রাজনীতি করেছেন আদর্শের, আজীবন মগ্ন ছিলেন জ্ঞানের সাধনায়। তারও চেয়ে বড় কথা, তাঁর চিন্তা আর জীবনযাপন ছিল একই সুতোয় গাঁথা। যিনি যাপন করেছেন সরল জীবন, নিরলস চর্চা করেছেন গভীর মনন শীলতার। আক্ষরিক অর্থেই তিনি ‘সিম্পল লিভিং উহথ হাই থিংকিং’ করেছেন তিনি। আজন্ম দার্শনিক, মনীষী সরদার ফজলুল করিম ২০১৪ সালের ১৫ জুন আমাদের ছেড়ে চলে যান অচেনা জগতে। শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও, জীবন ও কর্মের নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে নিত্যদিন আমাদের সঙ্গেই থাকবেন সরদার স্যার। আদর্শবান মহান এই মানুষটির স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্রশ্রদ্ধা। উল্লেখ্য যে, সরদার ফজলুল করিমের জন্ম ১৯২৫ সালের মে মাসের পয়লা তারিখে৷

সমাজে এমন কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন যাদের কাজও চিন্তার বহুমুখিতা অনুকরণীয়। সরদার ফজলুল করিম তেমনই অনুকরণীয় একজন অন্যরকম মানুষ, ভিন্নপথের পথিক। সরদার ফজলুল করিমের স্নেহও পাণ্ডিত্য সূর্যের মতো, সবখানেই পড়ে। তাঁর চরিত্রের প্রধান দিক হচ্ছে, জ্ঞান তাঁর কাছে সবসময়ই প্রিয় বিষয়, মানুষই তাঁর চরম আরাধ্য, যুক্তি বাদ আর মানবতার আজন্ম সংগ্রামী সৈনিক তিনি। আজীবন শিক্ষাব্রতী সরদার ফজলুল করিম একজন রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষক কিংবা লেখক হিসেবে আমাদের সমাজে রুচিও ব্যক্তিত্বের এক অনন্য উদাহরণ। আমাদের সক্রেটিস হিসেবে আলোচিত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের বিশেষ প্রভাবও পরিলক্ষিত হয় সরদার স্যারের জীবনে। তাঁদের আলাপচারিতা গ্রন্থটি তারই স্বাক্ষ্য দেয়। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, রুশো তাঁর পরম প্রিয়জন। আরতাই তো দেখি ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ ‘এরিস্টটলের পলিটিকস’, ‘রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট’সহ বিশ্ব-জ্ঞানভাণ্ডারের চিরায়ত নানা সৃষ্টির সরল ও সাবলীল বাংলা রূপান্তর করে যেমন তিনি সমাদৃত হন, তেমনি আপন ভাবনার সাবলীল প্রকাশেও অসম্ভব সরল কিন্তু স্পষ্টভাষী হিসেবে সম্মানিত হন।

স্কুলে পড়ার বয়সে প্রায়রাতেই ঘুম হতো না কিশোর ছেলেটার৷ বই বগলে নিয়ে হোস্টেলের দেয়াল টপকে চলে যেতেন বরিশালের জাহাজঘাটে৷ সেখানে রাস্তার ল্যাম্পের আলোয় বসে পড়তে নরাজ্যের সববই৷ ছাত্র হিসেবেও ছিলেন বেশ ভালো৷ ক্লাশ নাইনে পড়ার সময় তাঁর বন্ধু মোজাম্মেল হক তাঁকে একরাতের মধ্যে ‘পথের দাবী’ পড়ে শেষ করতে দেন৷ শরৎচন্দ্রের লেখা এই বইটি তাঁর ভাবনার জগত পুরোপুরি বদলে দেয়৷ পরবর্তী জীবনে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্ষীয়ান বামপন্থী রাজনীতিবিদও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসুর মতো তিনিও রাজনীতিতে এসেছিলেন এই বইটি পড়ে৷ এখান থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বিপ্লবী চেতনায়৷ ফলাফল তিনি জেল খেটেছেন, শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-অনশন করেছেন আবার ছাত্রদের মাঝে দর্শনের জ্ঞান বিতরণ করেছেন, লেখালেখি তো আছেই৷

জ্ঞানপিপাসু বিপ্লবী শিক্ষাবিদ আমাদের অতি শ্রদ্ধেয় সরদার ফজলুল করিম৷ তাঁর জীবনের প্রতিটা অধ্যায়ই বৈচিত্র্যে ভরপুর৷ যখন যা মনে হয়েছে তখন তিনি সেভাবেই চলেছেন, মনে লালিত আদর্শকে কখনো বিসর্জন দেননি বরং প্রতিনিয়ত তাকে আরো দৃঢ় করেছেন৷ বৈপ্লবিক আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছেন, দীর্ঘ চার দফায় মোট ১১ বছর জেল খেটেছেন৷ তবুও জীবন নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ কিংবা অপ্রাপ্তি নেই বরং মনে করেন, তাঁর জীবনের পুরোটাই লাভ!

সরদার ফজলুল করিমের জন্ম ১৯২৫ সালের মে মাসের পয়লা তারিখে৷ বরিশাল জেলার উজিড়পুর থানার আটিপাড়া গ্রামে এক কৃষক পরিবারে৷ বাবা খবির উদ্দিন সরদার কৃষিকাজ করতেন৷ মাসফুরা বেগম ছিলেন গৃহিণী৷ তাঁরা দুই ভাই তিন বোন৷ সরদার ফজলুল করিমের শৈশবকাল কেটেছে গ্রামে৷ ছেলেবেলায় বড় ভাইয়ের ঘাড়ে চড়ে তাঁর কর্মস্থলে যাওয়ার বায়না ধরতেন৷ ফজলুল করিমের পীড়াপীড়িতে তিনি মাথায় করে তাঁকে কর্মস্থল নাজিরপুরে নিয়ে যান৷ বর্ণ পরিচয়ের পর থেকে তিনি গড় গড় করে বাংলা পড়তেন৷ তাঁর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় মামাবাড়ি আটিপাড়া গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ তখন শিক্ষক বাঁশের কলম কালিতে চুবিয়ে সিদ্ধ তালপাতায় বর্ণ লিখে দিতেন৷ সেটাই তিনি দেখে দেখে পড়তেন৷ আর সবাই মিলে সুর করে নামতা পড়তেন৷ এরপর ১৯৩৫ সালে রহমতপুর বয়েজ হাইস্কুলে সরদার ফজলুল করিম চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন৷  বড় বোন মেহেরুন্নেসাও তিনি এক স্কুলে এক ক্লাসে পড়তেন৷ থাকতেন বড় ভাইয়ের  কোয়ার্টারে৷ রহমতপুরের আইনজীবী ও হাবখানের বাড়িটাকে সরকার সাবরেজিস্ট্রারি অফিস হিসেবে ব্যবহার করে৷ নিচতলায় অফিস আর দোতলায় ছিল সাব-রেজিস্ট্রারের কোয়ার্টার৷ প্রতিদিন দুই ভাইবোন কোয়ার্টার থেকে মাইলখানেক পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন৷ সরদার ফজলুল করিম গণিত ভালো পারতেন না৷

১৯৪০ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় চলে আসেন৷ ভর্তি হন ঢাকা কলেজে৷ থাকতেন কলেজের হোস্টেলে৷ উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন৷ এরপর ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই রেজি বিভাগে বিএ অনার্স ভর্তি হন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দিন তিনি ইংরেজি বিভাগে থাকলেন৷ ঘুরে ঘুরে শিক্ষকদের বক্তৃতা শুনতেন৷ কোন শিক্ষক কিভাবে বক্তৃতা দেন তা দেখলেন৷ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন৷ তিনি সব ক্লাশের পাশ দিয়ে ঘুরতেন৷ করিডোর দিয়ে যাবার সময় এপাশে-ওপাশের বিভিন্ন ক্লাস দেখতেন৷ দর্শনের হরিদাস ভট্টাচার্য্যের বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে যেতেন৷ তাঁর বক্তৃতা সরদারকে আকৃষ্ট করে৷ তিনি ‘সত্য’ এবং ‘মিথ্যা’ কি, এ নিয়ে একদিন আলোচনা করছিলেন৷ সরদার ফজলুল করিম কাছে গিয়ে বললেন, ‘স্যার, আমি দর্শনে ভর্তি হব৷’ চলে এলেন দর্শন বিভাগে৷ তিনি দর্শনের বাইরে অন্য ক্লাসও করতেন৷ আব্দুল হাদী তালুকদার ছিলেন দর্শনের শিক্ষক৷ তাঁর ইংরেজি বক্তৃতা তিনি বাংলায় অনুবাদ করে দিতেন৷ ১৯৪৫ সালে সরদার ফজলুল করিম দর্শন শাস্ত্রে বিএ অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন৷ ১৯৪৬ সালে এম.এতে তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন৷ রাজনীতির কারণে তিনি লন্ডনের স্কলারশিপ প্রত্যাখ্যান করেন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এসএন রায়ের ভাই বিনয় রায় ছিলেন দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান৷ সরদার ফজলুল করিমের এম.এ.  পরীক্ষার ফল বেরুতেই বিনয় রায় তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে ক্লাস  নিতে বললেন৷ তিনি পর দিন থেকে অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে লেকচারার হিসেবে ক্লাস নিতে শুরু করেন৷ ১৯৪৮ সালে রাজনীতির কারণে স্বেচ্ছামূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ইস্তফা দেন তিনি৷ ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমীর অনুবাদ শাখায় যোগদেন৷ ১৯৭১ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি শাখার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন৷ স্বাধীনতাযুদ্ধের পর১৯৭২ সালে তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন৷ কারাগারে থেকে পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভার সদস্যও নির্বাচিত হন তিনি৷

ছাত্রাবস্থায়ই সাম্যবাদী আন্দোলনের সাথে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে৷ ১৯৩৯-৪০ সালে স্কুলে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা ছিল শতকরা ৫ থেকে ১০জন৷ হিন্দু কিশোর বন্ধুদের মধ্যে তিনি বৃটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের আভাস পান৷ তখন তিনি বরিশাল জেলা স্কুলের নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র৷ সহপাঠী মোজাম্মেল হক মুসলমান হলেও একটু ভিন্ন ধরণের ছিলেন৷ তিনি তাঁকে পড়তে দিলেন ‘প্রেস ক্রাইবড’, ‘পথের দাবী’৷ এরপর দিলেন লাল অক্ষরে মুদ্রিত বিপ্লবীই শতে হার, স্বাধীনতা এবং সমাজতন্ত্রের ইশতেহার৷ তিনি গোপনে তাঁকে জানান তিনি যোগ দিয়েছেন বেআইনি গুপ্ত দলে৷ সে দলের নাম ‘বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল’ (আর.এস.পি)৷ মোজাম্মেল তাঁকে সাবধান করে দেন, কেউ যেন কথাটি না জানে৷ কেউ যেন টের না পায়৷ ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র রবি গুহের সাথে তিনি নেত্রকোণা কৃষক সম্মেলন দেখতে যান৷ তিনি দেখেন দূরদূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে কৃষক প্রতিনিধির দল এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে৷ পাহাড়ি এলাকা থেকে এসেছে হাজং কৃষকের দল৷ তাদের মাঝেই মাঠের এককোণে জায়গা করে নেন সরদার ফজলুল করিম৷ মঞ্চে একে একে নেতারা বক্তৃতা দেন৷ এই মঞ্চে মণি সিংহ বক্তৃতা দেন৷ মণিসিং-এর নাম ঘোষণার সাথে সাথে হাজং কৃষকরা সকলে সোজা হয়ে বসে৷ কেউ মন লাগাতে দেরি করছে দেখতে পাওয়া মাত্রই অন্যরা ধমক দিয়ে বলে উঠে- “শোন শোন আমাদের মণি বেটা বলছে৷ কৃষকদের এইক থাটি তাঁর মনকে শিহরিত করে দেয়৷ ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি আত্মগোপনরত কমিউনিস্ট পার্টির কাজে মনোনিবেশ করেন৷ আণ্ডারগ্রাউণ্ডে থেকে কাজ চালিয়ে যান তিনি৷পুলিশ তাঁকে খুঁজছে৷ দিনের বেলা বের হন না৷ রাতের অন্ধকারে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন৷ রাজনীতির অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন৷ সংগঠনের সিদ্ধান্তও ডাককে পোস্টারে লিখে সেই পোষ্টার শহরের দেয়ালে দেয়ালে লাগিয়ে দেন৷ পূর্ব বাংলার সরকার বুঝতে পারে আন্দোলনরত রাজনীতির মূলে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি৷ সেপার্টিবে আইনি না হলেও তাঁর প্রকাশ্যে চলাফেরা অসম্ভব করে দেয় সরকারি পুলিশ৷ ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে জিন্নাহর ঢাকা আগমন এবং তাঁর উক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের পর সরকারি এই আক্রমণ অধিকতর তীব্র হয়৷ ঢাকা বা পূর্ববঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে বন্ধুদের পরামর্শে তিনি কল কাতায় চলে যান৷ এবং নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পর ঢাকায় ফিরে এসে কিছুকাল ঢাকার গ্রামাঞ্চলে, কৃষকদের মধ্যে, ঢাকার চালাকচর, পোড়াদিয়া, সাগরদি, হাতিরদিয়া অঞ্চলে আত্মগোপনে থাকেন৷

১৯৪৯ সালের মধ্য ভাগে ঢাকা জেলে রাজবন্দিরা ৪০ দিনব্যাপী অনশন ধর্মঘট শুরু করেছেন৷ সরদার ফজলুল করিম তখনও গ্রেফতার হননি৷ এ অনশনের খবর পাওয়ার ভিত্তিতে কর্মীরা দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার দেওয়ার চেষ্টা করে৷ সে সময় দেওয়ালে পোস্টার লাগানো ছিল বিপজ্জনক৷ তরুণকর্মী রারাতের আঁধারে দেওয়ালে পোস্টার লাগাবার চেষ্টা করত৷ তালা গাতে গিয়ে অনেক ছাত্র ও তরুণকর্মী গ্রেফতার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন৷ এদের মধ্যে ছিলেন আলমুতী, কিশোর আলী আকসাদ প্রমুখ৷ ৪০ দিনের অনশনে রাজবন্দিরা কোনো দাবি আদায় করতে পারেন নি৷ জেল কর্তৃপক্ষ এবং মুসলিম মলীগের কোনো কোনো নেতার প্রতিশ্রুতিতে সে অনশন তাঁরা প্রত্যাহার করেন৷ কিন্তু তাঁদের উপর নির্যাতনের আদৌ কোনো উপশম না হওয়ায় ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকা জেলের রাজবন্দিরা আবার অনশন ধর্মঘট শুরু করেন৷ ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা শহরের তাঁতী বাজার থেকে সরদার ফজলুল করিম তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন৷ তিনি যখন কারাগারে যান তখন রাজবন্দি হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে রাজবন্দিদের অনশন ধর্মঘট চলছিল পুরোদমে এবং কারাগারে ঢুকে সাথীদের সঙ্গে তিনিও অনশনে যোগ দেন রাজবন্দি হিসেবে মর্যাদা আদায়ের দাবিতে৷ অনশনের প্রথম ছ’দিন ‘সেলের’  মধ্যে দিন রাত মেঝেতে চোখ বুজে শুয়ে থাকতেন৷ মাথার কাছে জেলের সিপাহী জমাদার সকাল-বিকাল ভাত-তরকারি থালায় করে রেখে যায় তাঁর সামনে৷ কিন্তু তিনি সেগুলি ছুঁতেন না৷ শুধু মাঝে মধ্যেকে বল সামান্য লবন মিশিয়ে পানি খেতেন৷ ছ’দিন পর সরদার ফজলুল করিম স্বেচ্ছায় অনশন না ভাঙ্গার কারণে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয় এবং তাঁকে অন্যান্য অনশনরত বন্দিদের সঙ্গে জবরদস্তিক রেখাওয়ানোর বা ‘ফোর্সড ফিডিং’ ব্যবস্থার অন্তভূর্ক্ত করাহ য়৷ রোজ সকালে দশটার দিকে তা গড়া, জোয়ান একদল সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীসহ জেল হাসপাতালের কম্পাউন্ডার বা ডাক্তার একটা বাহিনী নিয়ে এসে চড়াও হতো৷ তাদের হাতে থাকত বালতির মধ্যে পানির সঙ্গে দুধের পাউডার মেশানো ‘দুধ-পানি’৷ ফোর্সড ফিডিংএর এই বাহিনী প্রত্যেক বন্দির কাছে গিয়ে বন্দিরা যেন বাধা দিতে না পারে সে জন্য তাঁর হাত-পা চেপে ধরত৷ তাঁদের হাত-পা চেপে ধরে তাঁদের নাকের মধ্যদিয়ে একটা রবারের নল পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করত৷ এই রবারের নলের উপর দিকে রাখা বাটিবা কুপিতে সেই দুধ মেশানো পানি একসের কি আধ সের ঢেলে দিত৷ এ ভাবেই খাওয়ানো হতো অনশনরত বন্দিদের৷ গোড়া থেকে যারা অনশন করেছিলেন তাঁদের ৫৮ দিন পুরো হওয়ার পরে একটা ফয়সালা হয়৷ আর সরদার ফজলুল করি মত্রিশ দিন পুরো অনশন করে৷ এর মাধ্যমে কাপড়-চোপড় এবং থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে কিছু মর্যাদা এবং উন্নত অবস্থার স্বীকৃতি দেয়া হয় তাঁদের৷ ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে দীর্ঘ পাঁচ বছর বন্দী জীবনের পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান৷ এরপর তিনি আরও তিনবার কারাবরণ করেন৷

১৯৫৭ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি সুলতানা রাজিয়াকে বিয়ে করেন তিনি৷ বিয়ের পর সুলতানা রাজিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি নেন৷ এছাড়া তিনি জাতীয় শিক্ষাক্রমও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে প্রেষণে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন৷ তাঁদের এক মেয়ে এবং দুই ছেলে৷ বড় মেয়ে আফসান করিম ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন৷ সরদার ফজলুল করিম তখন জেলে৷ আফসান করিম ফার্মাকোলজির চিকিত্সক৷ তাঁর স্বামী শাকিল আখতার একজন চিকিত্সক৷ বড় ছেলে সরদার মারুফ করিম৷ ছোট ছেলে সরদার মাসুদ করিম একজন স্থপতি৷

মুক্তি যুদ্ধের সময় সরদার ফজলুল করিম পরিবার নিয়ে ঢাকাতেই ছিলেন৷ এই সময় তিনি বাংলা একাডেমীর সংস্কৃতি শাখার বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলেন৷ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি ১০টা সাড়ে ১০টার সময় অফিসে পৌঁছেন৷ এর কিছুক্ষণ পর কয়েকজন লোক এসে তাঁকে ধরে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয়৷ জেলে তাঁর উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়৷ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করল৷ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার খবরটা তিনি জেলে বসেই শুনতে পেলেন৷ ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা এসে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের দরজা খুলে দেয়৷ ঐ দিন অন্য সব কয়েদির সাথে তিনি মুক্তিপান এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বহু স্মৃতি-বিজড়িত গেটটি পার হয়ে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখেন৷

১২.
সরদার ফজলুল করিম ছাত্রাবস্থায়ই প্রগতি লেখক সংঘের কাজে সম্পৃক্ত হন৷ ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা মিলে হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন৷ এছাড়া তিনি অনেক বই রচনা করেছেন৷ সরদার ফজলুল করিম চিরায়ত গ্রিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো অনুবাদ করেই দেশের বিদ্বৎ সমাজে এবং সাধারণ পাঠক মহলে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। অনুবাদ কর্ম ছাড়া তাঁর মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যাও কম নয়।

আজীবন শিক্ষাব্রতী সরদার ফজলুল করিম তাঁর সৃজনশীল গবেষণা, লেখালেখি ও অনুবাদ কর্মের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি সিধু ভাই স্মৃতিপদক (১৯৯৮), দৈনিক জনকণ্ঠ গুণীজন সম্মাননা (১৯৯৯), শেরেবাংলাপদক (২০০০), দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক (২০০৫), সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮), ২০০১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ তাঁকে গুণীজন সম্মাননা দেয়৷ অনুবাদের জন্য পান বাংলা একাডেমী পুরস্কার৷ শিক্ষাক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার থেকে শিক্ষাবিদ হিসাবে শিক্ষা পুরস্কার পান, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (২০০০) ও ২০১১ সালে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক পদ প্রদান করা হয়।

 

 

 
sorder- 00

সরদার ফজলুল করিম-এর জীবনপঞ্জি

 

. ১৯২৫ সাল- জন্ম ১ মে, ১৯২৫ সাল।
. ১৯৩৫ সাল- প্রাথমিক শিক্ষা পর্ব সম্পন্ন এবং বড় ভাই মৌজে আলীর সঙ্গে বরিশালের আঁটিপাড়ার নিজ গ্রাম থেকে নাজিরপুরে আগমন।
. ১৯৩৮ সাল- বরিশাল জেলা স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন।
. ১৯৪০ সাল- বরিশাল জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং কলেজে ভর্তির জন্যে ঢাকায় আসেন।
. ১৯৪২ সাল- ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (ঢাকা কলেজ) থেকে আই. এ. পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন; পরবর্তীতে বিভাগ পরিবর্তন, দর্শন বিভাগে ভর্তি হন।
. ১৯৪৩ সাল- ’৪৩ এর দূর্ভিক্ষে (মনান্তর) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে লঙরখানায় দায়িত্বপালন ও শহর ও গ্রামাঞ্চলের ত্রাণ বিতরণে অংশগ্রহণ করেন।
. ১৯৪৪ সাল- প্রগতি লেখক সংঘের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে লেখালেখিতে সক্রিয় হন। কমিউনিস্ট ভাবধারায় প্রভাবিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী (সৈনিক ও চিন্তাবিদ) কমিউনিস্ট ক্যাডারদের সান্নিধ্যে আসেন।
. ১৯৪৫ সাল- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক (সম্মান) প্রথম শ্রেণীতে প্রথমস্থান অর্জন করেন। কমরেড রবি গুহ ও মণি সিংহের সঙ্গে পরিচয় এবং নেত্রকোনায় কৃষক সম্মেলনে যোগদান করেন।
. ১৯৪৬ সাল- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় (দর্শনশাস্ত্র) প্রথম শ্রেণীতে প্রথমস্থান অর্জন। কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের সঙ্গে আলোচনা ও কমিউনিষ্ট পার্টির সিদ্ধান্তে বিলাতের স্কলারশিপের প্রত্যাখান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন শাস্ত্রের শিক্ষক হিসেবে যোগদান। সার্বক্ষণিক বামপন্থী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।
. ১৯৪৮ সাল- পার্টির নির্দেশে আত্মগোপনের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে পদত্যাগ। ভাষা আন্দোলনের অংশগ্রহণ। কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির সেক্রেটারি মনোনীত এবং সে রাতেই (২৫ ডিসেম্বর) সন্তোষ গুপ্তের বাড়ি থেকে গ্রেফতার এবং জেলজীবনের শুরু। জেলখানায় চলমান ৫৮ দিনের অনশন ধর্মঘটে অংশগ্রহণ।
. ১৯৫০ সাল- ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সিলেট এবং রাজশাহী কারাগারে স্থানান্তর।
. ১৯৫৩ সাল- কুমিল্লা কারাগারে স্থানান্তর। কমরেড ও সাহিত্যিক সত্যেন সেন ও অজয় ভট্টাচার্যের সান্নিধ্য লাভ করেন।
. ১৯৫৪ সাল- কেন্দ্রিয় কারাগার, ঢাকায় স্থানান্তর।প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের জয়লাভ। পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্যপদে প্রতিদ্বন্ধীতার জন্য কমিউনিষ্ট পার্টি থেকে মনোনীত হন।
. ১৯৫৫ সাল- কেন্দ্রিয় কারাগার থেকে মুক্ত হন। পূর্ব পাকিস্তানের গণপরিষদের (সংবিধান সভা) সদস্যপদ অর্জন। পুলিশ ধর্মঘটে কমিউনিষ্টদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার পুনরায় কারাগারে স্থানান্তর এবং মুক্তি লাভ করেন।
. ১৯৫৫ সাল- সুলতানা রাজিয়ার (সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক) সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন।
. ১৯৫৮ সাল- পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসন জারি এবং সংবিধান সভার বিলুপ্তি ঘোষণা। প্রথম সন্তান আফসানা করিম স্বাতীর জন্মলাভ। তৃতীয়বারের মতো গ্রেফতার হয়ে ঢাকায় কেন্দ্রিয় কারাগার এবং পরে রাজশাহীতে স্থানান্তর।
. ১৯৬২ সাল- পারিবারিক ব্যবস্থাপনায় শ্বশুর ডেপুটি সেক্রেটারির জামিনদারিতে শর্তসাপেক্ষে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ। কমিউনিস্ট পার্টির নিষ্ক্রিয় মিত্র হয়ে রাজনীতিতে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন।
. ১৯৬৩ সাল- বাংলা একাডেমিতে সংস্কৃতি বিভাগে (অনুবাদ শাখায়) অধ্যক্ষ পদে যোগদান।
. ১৯৬৯ সাল- গণ-অভুত্থান সংগঠিত। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অব্যহতি এবং তাঁর (শেখ মুজিবের) সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ।
. ১৯৭০ সাল- জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন।
. ১৯৭১ সাল- সংগ্রাম কমিটির জন্য চাঁদা সংগ্রহ, ৭ মার্চের গণ জমায়েতে যোগদান। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলা একাডেমি আক্রান্ত; সরদার ফজলুল করিমের অফিস কক্ষ, আসবাবপত্র, দরজা ভাংচুর ও বুলেটবিদ্ধ। ৭ সেপ্টেম্বর বাংলা একাডেমি থেকে পাকিস্তানী মিলিটারী কর্তৃক গ্রেফতার, দুই বছরের ডিটেনশনে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ; ১৭ ডিসেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
. ১৯৭২ সাল- ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের প্রচেষ্টায় ও শেখ মুজিবের নির্দেশে দ্বিতীয় মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ লাভ করেন।
. ১৯৭৩ সাল- বাংলা ভাষায় অমূল্য সংযোজন দর্শনকোষ এবং প্লেটোর সংলাপ প্রকাশিত হয়।
. ১৯৭৪ সাল- প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের বাংলা ভাষায় প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ প্রকাশিত হয়।
. ১৯৭৬ সাল- বাংলা একাডেমি পুরষ্কার লাভ।
- ১৯৮৩ সাল- এ্যারিষ্টটলের দুর্লভ গ্রন্থ ‘পলিটিক্স’-এর বাংলা অনুবাদ ‘এ্যারিষ্টটলের পলিটিক্স’ প্রকাশিত হয়।
. ১৯৮৫ সাল- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ। ‘এঙ্গেল্স এর এ্যান্টি ডুরিং’ এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
. ১৯৯১ সাল- পারিবারিক অভিভাবক ও বড় ভাই মৌজে আলীর মৃত্যু।
. ১৯৯৮ সাল- মঞ্জুরি কমিশনের প্রস্তাবে যুগোশাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে গমন।
. ২০০০ সাল- শিক্ষাক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ  রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক ‘স্বাধীনতা পদক’ লাভ করেন।
. ২০০২ সাল- স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘সেই সে কাল : কিছু স্মৃতি কিছু কথা’ প্রকাশিত হয়।
. ২০০৬ সাল- ‘আমি রুশো বলছি : দি কনফেশানস’ প্রকাশিত হয়।
. ২০০৯ সাল- স্ত্রী সুলতানা রাজিয়ার প্রয়াণ।
. ২০১১ সাল- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘জাতীয় অধ্যাপক’ নিযুক্ত হন।
. ২০১৪ সাল- ১৫ জুনে মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

sorder- 00

 সরদার ফজলুল করিমের  সাক্ষাৎকার- শ্যামল চন্দ্র নাথ

সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে এই কথাবার্তা আজ থেকে দুই বছর আগের। তখন তাঁর স্মৃতি কাজ করে না আগের মতো। তবুও স্মৃতির কাছেই ফিরে যান বারবীার। টুকরো টুকরো কথার ভেতর দিয়ে এ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ইতিহাস, দর্শন ও তাঁর শেষ জীবনের নানা তরঙ্গ। -সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ।

শ্যামল চন্দ্র নাথ : আপনি জন্মেছিলেন ১৯২৫ সালের ১ মে। পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ জীবন। যদি প্রশ্ন করি, কেমন কাটালেন এ জীবন, কী বলবেন?

সরদার ফজলুল করিম : জীবনভর সবাই ভালোবেসেছে আমাকে। কেন এত ভালোবাসা পেলামশ্যামল চন্দ্র নাম, তাও জানি না। কেন আমাকে এত ভালোবাসে সবাই? দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে আজ বলতে ইচ্ছে করে, সুখে-দুঃখে যেভাবে কাটল জীবন, ভালোভাবেই তো কাটালাম।

শ্যামল : জন্মদিন নিয়ে আপনার ভাবনা কেমন?

সরদার : দেখুন, জন্মদিন নিয়ে কখনো আমার মধ্যে তেমন কোনো ভাবনা কাজ করে না। আর আমি যখন জন্মেছিলাম, তখন এখনকার মতো জন্মদিন পালনের চল ছিল না। তবে আমি মনে করি, আমার মৃত্যুদিনই হবে আমার জন্মদিন। কারণ, সেই দিন সবাই দেখতে আসবে আমাকে। আমার সব কাজ নিয়ে আলোচনা হবে। হয়তো হবে সমালোচনাও। আসলে বিষয়টা কী জানেন, একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পরই তার পুরো অবয়বটা দেখতে পাই আমরা। ভালো-মন্দ সব মিলিয়েই দেখতে পাই। আমি কোনো বড় মানুষ নই, বড়সড় পণ্ডিত নই, নামজাদা অধ্যাপকও নই। আসলে আমি কিছুই না। কিছু জানি না- তেমনভাবে এখনো কিছুই শিখতে পারিনি। কিন্তু বরাবরই আমি জীবনের পক্ষে- জীবনকে দেখতে দেখতেই কাটিয়ে দিলাম জীবন।

শ্যামল : জীবন সম্পর্কে আপনার ধারণা কিংবা দর্শন কী?

সরদার : জীবন বোঝার সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখো, নিজের মতো করে জীবনটা যাপন করো। জীবন ও মৃত্যু পরস্পর সম্পর্কযুক্ত দুটি শব্দ। সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের আগ মুহূর্তে যখন তাঁকে বন্ধনযুক্ত করা হয়, সে সময় তিনি শিষ্যদের বলেছিলেন, বন্ধন না থাকলে আমি বন্ধন মুক্তির আনন্দ বুঝতে পারতাম না। জীবনকে বুঝতে হলে তাই মৃত্যুকেও বোঝার চেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

শ্যামল : আপনার কি মনে হয় জীবনের কখনো মৃত্যু হয়?

সরদার : জীবন কখনো মরে না। একটা জীবন যখন মৃত্যুর মুখ থেকে উঠে আসে, সে আনন্দ ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। আমার সে অভিজ্ঞতা আছে। জীবনের অর্থই জীবন। জীবন জীবিত থাকে আর মৃত্যু মারা যায়- এ রকম ভাবনা নিয়েই বেঁচে আছি আমি।

শ্যামল : বরিশালের আঁটিপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে আপনার জন্ম। কৃষিকাজে বাবাকে আপনি সাহায্য করতেন। সেই সময়ের কথা, শৈশবের কথা কি মনে পড়ে?

সরদার : ব্যাপারটাতো সবাই জানে- এখন আমার স্মৃতি সেভাবে কাজ করে না, অনেক কিছুই ভুলে গেছি। মনে পড়ে না। তবে হ্যাঁ, কৃষক পরিবারের ছেলে আমি। আমাদের পরিবারকে মধ্যবিত্ত বলা চলে না। নিম্নমধ্যবিত্ত বললে ঠিক আছে। ছেলেবেলায় বাবা আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘তুই লাঙলটা ধর; কখনো বা বলতেন, মইয়ে একটু ওঠ, আমি একটু বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।’ তখন বাবাকে কৃষিকাজে সাহায্য করেছি। আমার মা-বাবা ছিলেন নিরক্ষর, কিন্তু একেবারে মাটির মানুষ ছিলেন। তাঁদের মতো লোকের কথা ছিল না আমাকে স্কুলে পাঠানোর। তবে আমাকে তাঁরা স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। শিক্ষকরা খুব যত্ন করে পড়িয়েছেন আমাদের। এই মানুষগুলোর কাছে আমি বড় ঋণী; আরেকটা কথা বলি, এ দেশের মাটির প্রতি আমার মনের মধ্যে একটা ভক্তি জেগে আছে।

শ্যামল : আপনার স্মৃতিচারণা থেকে জেনেছি, আপনার বন্ধু মোজাম্মেল হক, যিনি আপনাকে শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবি’ উপন্যাসটি পড়তে দিয়েছিলেন, যাঁর হাতে বামপন্থি রাজনীতিতে আপনার হাতেখড়ি; তাঁর সম্পর্কে আপনার কিছু কি মনে আছে?

সরদার : না, তেমনভাবে কোনো স্মৃতি এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে এতটুকু মনে আছে, মোজাম্মেল আমাকে একটি বই দিয়ে বলেছিল, ‘এই বইটি তুমি নাও। এক রাতের মধ্যে পড়ে শেষ করতে হবে। তবে বইটি কেউ যেন না দেখে।’ সাধারণত বইয়ের ওপরের দিকে লেখা থাকে বইয়ের নাম। কিন্তু এ বইটির ওপরে নামের জায়গাটুকু কাটা ছিল। এ বইটিই কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবি। বড় সাংঘাতিক বই। এ বই সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি বলেছিলেন, ‘এটা কি একটা উপন্যাস হলো?’ শরৎচন্দ্র জবাব দিয়েছিলেন, ‘যা হয়েছে তা তো হয়েছে।’ যখন বইটি প্রথম পড়েছিলাম তখন আমি ক্লাস নাইন-এ পড়ি।

শ্যামল : ৪০ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন আপনি। বরিশাল থেকে এরপর ইন্টারমিডিয়েট পড়তে এলেন ঢাকায়। সেই সময়ে কথা মনে আছে?

সরদার : হ্যাঁ, ম্যাট্রিক পরীক্ষায় জেলাভিত্তিক স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। তখন তো ভর্তির ব্যাপারে কোনো কড়াকড়ি ছিল না। তবে কড়াকড়ি না থাকলেও আমি ছাত্র মোটামুটি ভালো ছিলাম। তো, ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হলাম ঢাকায়। এ সময় আমার পেছনে একটি গ্রুপ দাঁড়িয়ে যায়- জাতীয়তাবাদী গ্রুপ আর কি। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় আমি যতটা না কমিউনিস্ট, তার চেয়ে বেশি ছিলাম জাতীয়তাবাদী।

শ্যামল : ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর দর্শন বিষয়ে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৪২ সালে। যতদূর জানি, প্রথমদিকে আপনি ইংরেজি বিভাগেও পড়েছিলেন কিছুদিন। আচ্ছা, আপনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়ে ঢাকায় পড়লেন কেন?

সরদার : আমার মুরুব্বি ছিলেন বড় ভাই। সে সময় তিনি ভাবলেন, তাঁর পক্ষে কলকাতায় থাকা-খাওয়াসহ আমার পড়ালেখার খরচ জোগানো কঠিন হবে, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হলাম। হ্যাঁ, ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে ঢুকে প্রথম কিছুদিন ইংরেজি বিভাগে পড়েছিলাম। তখন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের বক্তৃতা শুনতাম। দেখতাম কোন শিক্ষক কী রকম বক্তৃতা দেন। এভাবে একদিন দর্শন বিভাগের শিক্ষক হরিদাস ভট্টাচার্য্যরে বক্তৃতা শুনলাম। সেটা ছিল সাংঘাতিক বক্তৃতা। তাঁর বক্তৃতা এত ভালো লাগল-দর্শনে ভর্তি হয়ে গেলাম আমি। দর্শনের বাইরে অন্য বিভাগেও ক্লাস করতাম তখন। কবি জসীমউদ্দীন সে সময় পড়াতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেখতাম, জসীমউদ্দীন স্যারকে ছেলেরা পরিহাস করছে। তিনি ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন না। তবে এখানে একটা কথা বলি, সেকালে শিক্ষকরা ছিলেন ছাত্র-অন্তঃপ্রাণ। ছাত্রদের কল্যাণের জন্য এমন কিছু সেই যে তাঁরা করতে পারতেন না।

শ্যামল : আপনি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ জন্য জেল খেটেছেন। রাজনীতির জন্য বিলেতে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েও যাননি। মনে পড়ে সে সময়ের কোনো কথা?

সরদার : এসব তো সবাই জানে। কী আর বলব, অনেক কিছুই তো মনে পড়ে না এখন। বাড়ির বাইরে কোথাও বেরও হই না। যাঁরা আসেন, তাঁদের সঙ্গেই কথা হয়। তবে হ্যাঁ, বিলেত যাওয়ার সুযোগ এসেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি করার জন্য যাওয়া হলো না। আসলে বিলেত যাব, পাস করে আসব, তখন এসব নিয়ে ভাবতাম না।

শ্যামল : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে আছে?

সরদার : অনেক আগের কথা সেসব। মনে আছে আবছা আবছা। তখন আমি ঢাকায় থাকি। যুদ্ধের খবর নিয়মিত পেতাম আমরা। প্রতিদিন বিকেলের মধ্যে কলকাতা থেকে এসে পৌঁছাতো খবরের কাগজ। ফলে যুদ্ধের প্রায় তাজা খবরই পেতাম। তখন এখানে দাঙ্গা হয়েছিল, কিন্তু এর বাইরে আমরাও অনেক কিছু করেছিলাম। ঢাকা কিন্তু আন্তর্জাতিক নগরে পরিণত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে।

শ্যামল : ১৯৪৮ সালেই তো আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান আপনি। এরপর গ্রেপ্তার হলেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে কি যোগাযোগ ছিল আপনার?

সরদার : যখন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলাম, তখন আমি শিক্ষকতা করি। তবে নিজেকে কখনোই টিচার বা লিডার মনে করতাম না। পার্টি যখন যেভাবে বলত, সেভাবেই কাজ করতাম। এরপর পার্টির কথায় এক সময় চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। সে সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকাই ছিল আমার কাজ। অবস্থা এমন যে, যত দিন পুলিশের হাতে ধরা না পড়ে জীবন রক্ষা করা যায়। তবুও এক সময় ধরা পড়লাম। গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমার ভাই আমাকে দেখতে আসতেন। তিনি খুব রাগ করেছিলেন। আমাকে বুঝিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সেটা সম্ভব হয়নি।

শ্যামল : অনেক বছর কাটিয়েছেন জেলে। কেমন মনে হয়েছিল সে সময়?

সরদার : কেমন আর মনে হবে? আমি একটু ভাবুক টাইপের ছিলাম তো, তাই হয়তো মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। এ রকম না হলে জেলখানায় নিজেকে ম্যানেজ করাটা সমস্যাই হতো বলতে পারেন।

শ্যামল : মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁর কথা মনে আছে?

সরদার : মুনীর চৌধুরীকে গোঁড়া মুসলিম ছাত্ররা কমিউনিস্ট বলে মনে করত। ও ছিল খুবই সাহসী- কাউকে ভয় পেত না। মুনীর পরবর্তীকালে জেলেও গিয়েছিল। আমি এক সময় মুনীর চৌধুরীর একটি না দিয়েছিলাম- King of Words অর্থাৎ শব্দের রাজা।

শ্যামল : আজীবন দর্শন চর্চা করেছেন। প্লেটো, সক্রেটিস- এই গ্রিক দার্শনিকদের অনেক বিষয়-আশয় আমরা জেনেছি আপনার লেখা থেকে। এখন যদি প্লেটো-সক্রেটিস সম্পর্কে বলতে হয়, তবে কী বলবেন?

 

সরদার : প্লেটোর মধ্যে রিয়েলিজম আছে। বাস্তবতাবোধ থেকেই নিজের মতো করে তিনি দর্শনের রাজা। দর্শন বিভাগে ভর্তি, পাঠাভ্যাস, রাজনীতি- এই সবকটিই কিন্তু আমাকে প্লেটোর মধ্যে ঢুকিয়েছে, সক্রেটিসের মধ্যে ঢুকিয়েছে।

শ্যামল : বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।

সরদার : আমি তো এখন পুরো সময় ঘরে থাকি। কারও সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। দেশ নিয়ে কি ভাবব? মানুষ এখন মানুষকে খাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে চলছে অমানুষের রাজত্ব। তাই বলে কি আমি স্বপ্ন দেখি না? দেখি, এখনো আমি স্বপ্ন দেখি।

শ্যামল : সাম্য ও শোষণহীন সমাজের জন্য সংগ্রাম করেছেন। আজকের এই পুঁজিতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আপনার কি মনে হয় বিপ্লব আসবে?

সরদার : হ্যাঁ, বিপ্লব আসবে। আসবেই বা বলি কেন? বিপ্লব তো এসেছে। বিপ্লবের মধ্যেই বাস করছি আমরা। সব মহৎ সংগ্রামের, মহৎ ঐতিহ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী হচ্ছে নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষ। তাঁরাই বিপ্লব করে এই পৃথিবীকে আমাদের বাসযোগ্য করে তুলছে। আমি হতাশ নই।

 

 

sorder- 00

সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রসঙ্গে

সরদার ফজলুল করিম

 

রচনা নিদর্শন – সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রসঙ্গে

সমাজতন্ত্র : সমাজভুক্ত সকল ব্যক্তির হিতার্থে (ভূমি ও কল-কারখানা প্রভৃতি) উৎপাদকের সহায়ক সমস্ত কিছুই রাষ্ট্রের হস্তে ন্যস্ত হওয়া উচিত : এই মতবাদমূলক শাসনব্যবস্থা ÔSocialismÕ (সংসদ বাঙালা অভিধান)। যার কোনো বিকল্প নেই, সে কারুর ভালো কিংবা মন্দ যা বলেই বিবেচিত হোক না কেন, তাকে মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টায় অহেতুক পরিশ্রমেরই ব্যয়। এর অপর কোনো সার্থকতা নেই। অবশ্য অনিবার্যকে নিবারণ করার চেষ্টা করে তারা, যারা সেই অনিবার্যের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে দেখে। যারা সেই অনিবার্যকে নিজেদের জীবনের ও সংগ্রামের পরিমাণ হিসেবে দেখে তারা তাকে নিবারণের চাইতে স্বাগত জানাতে চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সেকালের এরূপ উক্তিকে অনুধাবন করার চেষ্টা করা যায় যে, বুদ্ধিমানরা ইতিহাসের সঙ্গে যায়, নির্বোধকে ইতিহাস টেনে নেয়।

সমাজতন্ত্র কাকে বলে। নানা জনের নানা ব্যাখ্যা। কিন্তু ব্যাখ্যার পূর্বে মূলকে মানতে হবে। সমাজই মূল। সমাজ থেকে সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্রের নানা ব্যাখ্যা হতে পারে এবং হবে। রাষ্ট্রীকরণ, বিরাষ্ট্রীকরণ, যৌথকরণ, ব্যক্তিগত মালিকানা- তার পরিমাণ ও সীমা, নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, নিয়ন্ত্রিত বাজার ইত্যাদি। দেশ ও কাল নির্বিশেষে এর কোনো অপরিবর্তনীয় সংজ্ঞা বা ধার্যকৃত চরিত্র থাকতে পারে না। কিন্তু কাল থেকে কালে আর দেশ থেকে কালে আর দেশ থেকে দেশে এসব সমস্যা ও তার বিভিন্ন সমাধান প্রচেষ্টা ‘সমাজতন্ত্রের’ অনিবার্যতাকে নাকচ করতে পারে না।

প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিত এ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘মানুষের রাষ্ট্রের আসল বৈশিষ্ট্য এই যে, মানুষের রাষ্ট্র হচ্ছে মানুষের সমবায়ে সংগঠিত একটি সংস্থা।’ এই সমবায় ব্যবস্থা চার হাজার বছর পূর্বে কিরূপ ছিল তার গবেষণা মার্কস-এঙ্গেলসও শেষ করেননি। তাঁরা বলেছেন, ‘মানুষের ইতিহাস যতটুকু আমরা জেনেছি, ‘তার লিখিত ইতিহাস, তাতে অনুমান করি ‘আদিতে’ মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবেই সমবায়গত জীবন-যাপন করতে হয়েছে। সেটা কোনো আদর্শ অবস্থা নয়। তা ভেঙে গেছে। কিন্তু মূল যেটা অর্থাৎ মানুষের সমাজ, তার ক্রমান্বয়ে অধিক পরিমাণে সমবায়ী হওয়ার লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া ছাড়া উপায়ন্তর নেই।’ সে কারণেই তাঁরা বলেছেন, মানুষের শেষহীন অভিযাত্রায় মানুষকে ক্রমধিক পরিমাণে সমবায়ী সমাজ তৈরি করতে হবে। এই স্বপ্ন মানুষকে দেখতে হবে। এই স্বপ্নই তার চালিকাশক্তি। এই অভিযাত্রায় তার হাজার উঠতি-পড়তি, অগ্রগমন-পশ্চাৎহটা ঘটবে। তবু মানুষ এগিয়ে যাবে।

সাম্যবাদের দৃষ্টান্তের জন্য আমাদের দূর ভবিষ্যতের অপেক্ষা করতে হয় না। গরিব-ধনী প্রত্যেকটি পরিবারই সাম্যবাদী নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত পরিবার। ছোট-বড়, মা-বাবা, ভাই-বোন, অক্ষম-সক্ষম সকলকে নিয়ে যে পরিবার সে পরিবারের নীতি হচ্ছে From each according to his capacity, to each according to his necessityÑপ্রত্যেকের নিকট থেকে তার ক্ষমতা গ্রহণ এবং প্রত্যেককে তার প্রয়োজনমতো প্রদান।

মার্কস এঙ্গেলস স্বপ্ন দেখেছিলেন : পারিবারিক এই সাম্যবাদী নীতি একদিন সমগ্র মানব সমাজে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়বে। সমগ্র মানব সমাজই একটি পরিবারে পরিণত হবে, যে মানুষ্য পরিবারের পরিচালনার স্বাভাবিক নীতি হবে : প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী।

আজ পরিবারের মধ্যে যে নীতি সার্বজনীনভাবে স্বাভাবিককালে গৃহীত কিন্তু মানুষ্য সমাজের বিকাশের অসম্পূর্ণতার কারণে যে নীতি অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত, সে নীতি মনুষ্য সমাজের সম্পদ ও শক্তির বিপুল বিকাশে সেদিন পরিবারের ন্যায়ই সার্বজনীনভাবে স্বাভাবিক বলে গৃহীত হবে। এর চাইতে মহৎ স্বপ্ন আর কি হতে পারে! মার্কস-এঙ্গেলস আমাদের এই স্বপ্নের যুক্তিকে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ করেছেন। মার্কস এবং এঙ্গেলস-এর নিকট আমরা তাই ঋণী।

মানুষের ভবিষ্যতের সেই দিন কবে? মার্কস যদি সেই দিন সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন, আর সে ভবিষ্যদ্বাণী যদি বাস্তবে সত্য না হয়েও থাকে, তবু মনুষ্য সমাজের সামনে যে স্বপ্নকে তাঁরা তুলে ধরেছেন, সে স্বপ্নের মৃত্যু নেই। স্বপ্নের সেই দিন কবে? আমি বলব ‘ত্রিশ হাজার বছর’ পরে মানুষের জীবনে সেই দিন প্রায় আসন্ন হয়ে আসবে যেদিন মানুষের সমাজ আজকের চাইতে অধিকতরভাবে বুঝতে সক্ষম হবে যে, সাম্যবাদের কোনো বিকল্প নেই। আদিম সাম্যবাদ যদি প্রাকৃতিকভাবে অচেতন এবং বাধ্যতামূলক ছিল তো ভবিষ্যতের সাম্যবাদ হবে মানুষের যৌথ এবং সচেতন স্বেচ্ছামূলক জীবনাচরণেরই প্রকাশ। এ হচ্ছে দূরের কথা। দূরদৃষ্টির কথা। নিকটে অবশ্য অনেক দ্বন্দ্ব, অনেক ব্যাখ্যা, অনেক রাশিয়ার পতন-উত্থান অনেক রিগান-বুশের যাওয়া এবং আসা, অনেক হ্যাঁ এবং না। জোয়ার এবং ভাটা। এই দ্বন্দ্ব, উত্থান ও পতন, হ্যাঁ ও না’র বৈচিত্র্যও সমাজের দ্বন্দ্বমূলক রূপান্তরের তত্তে¡র সভ্যতারই সাক্ষ্য বহন করে, তার শূন্যতার নয়।

সমাজের দ্ব›দ্বমূলক রূপান্তরের তত্ত¡কে যারা আজ মিথ্যা বলে নাকচ করার চেষ্টা করছে, তারা তাদের সেই চেষ্টার মাধ্যমেই দ্বন্দ্বমূলক রূপান্তরের তত্ত¡কেই সত্য বলে প্রমাণিত করেছে। মার্কসবাদ বলে যদি কিছু থাকে তবে মার্কসবাদে বিরুদ্ধতাও মার্কসবাদের অঙ্গিভ‚ত। পক্ষ-বিপক্ষের মধ্য দিয়েই মার্কসবাদ বিকশিত হয়ে এসেছে।

মার্কসবাদের পক্ষ-বিপক্ষের দ্ব›দ্ব বর্তমানে যেরূপ দেশে দেশে ব্যাপ্ত ও বিস্তারিত ইতিহাসে এমনটি আর কখনো হয়নি। সেদিক থেকে বর্তমানের বিশ্বব্যাপী এই তাত্তি¡ক দ্ব›দ্ব মার্কসবাদের সরলতারই পরিচায়ক। দুর্বলতার নয়।

আজকের পৃথিবী ক্ষুদ্র বটে। আবার বিচিত্ররূপে বৃহৎও বটে। রাশিয়ার ব্যাপার যেমন রাশিয়ার ব্যাপার, তেমনি আমাদেরও ব্যাপার। আমেরিকার যেমন আমেরিকার ব্যাপার, তেমনি আমাদেরও ব্যাপার এবং বাংলাদেশের ব্যাপার যেমন বাংলাদেশের তেমনি পৃথিবীর। আবার এও সত্য যে, রাশিয়ার ব্যাপার আমাদের হলেও, রাশিয়ার কোনো সরকার বা ব্যবস্থা ডুবলে বা আদর্শগতভাবে ব্যর্থ হলে আমাদেরও ডুবতে হবে কিংবা আদর্শগতভাবে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হতে হবে, এমন কোনো স্বত:সিদ্ধ কথা নেই।

স্ট্যালিন ব্যক্তি হিসেবে ভালো কি মন্দ, হৃদয়হীন কিংবা হৃদয়বান, ইতিহাসের সামগ্রিক বিচারে সেটি বড় কথা নয়। মানুষ মাত্রই ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ দিয়ে তৈরি। যারা মৃত স্ট্যালিনকে এক কবর থেকে আর এক কবরে সমধিস্থ করাকেই তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, চিন্তা-ভাবনার একমাত্র নিয়ামক করে তোলে, তারাই স্ট্যালিনকে অতি মানুষে পর্যবসিত করে। তারা শক্তিকে অনস্বীকার্য করে তোলে। লেনিনের গলায় যারা দড়ি লাগিয়ে টানে তারাও লেনিনের শক্তিকে স্বীকারই করে। অস্বীকার নয়। টেলিভিশনের ছবিটি আমি বিপরীতভাবে দেখেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, লেনিন তার ধ্বংসকারীর গলায় দড়ি লাগিয়ে টানছে।

রাশিয়ার সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের বর্বরতাকে যারা ‘জনতার’ রোষ বলে আখ্যায়িত করছে, তারা একথা বিস্মৃত হয় যে, মহত্তে¡র বিরুদ্ধে বর্বরের বর্বরতা মহত্তে¡র মহত্ত¡ এবং বৃহত্ত¡কে হ্রস্ব করতে পারে না। নিজের হ্রস্বতাই কেবল সে প্রকট করতে পারে। তাই লেনিনকে যারা টেনে নামায় তাদের মুখে জ্ঞানের কোনো কথা কিংবা মনুষ্য জীবনের মহৎ ভবিষ্যতের কোনো কথা উচ্চারিত হয় না। এটাই স্বাভাবিক।

 

মেয়েটি কাঁদছে

২৯-০৯-১৯৭৪

 

ছোট্ট মেয়ে। সাত-আট বছরের। মেয়েটি কাঁদছে। বায়তুল মোকাররমের সামনে আলগা দোকান পসারের মাঝখানে ইফতারির পূর্বক্ষণটাতে। আমার চোখে কান্নারত মেয়েটির দৃশ্য এখনো ভাসছে। আমি গিয়েছিলাম টুকিটাকি কিনতে। মেয়েটি কেনো কাঁদছে? আজকাল কার কান্নার দিকে কে খেয়াল করে? তবু দেখলাম, কয়েকটি লোক এর সামনে কিছু পয়সা ফেলে দিল। আমার কানে গেল, কে যেন বলছে, বাবা মরে গেছে। কিভাবে মরে গেছে এ প্রশ্ন খোঁজ করিনি। কিন্তু যেটা স্বাভাবিক, নিশ্চয়ই তাই ঘটেছে। মেয়েটির বাবা কিংবা কোনো আপনজন, যার উপর ও নির্ভর করতো, সে মারা গেছে। এ এখানকার একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি আজকাল আর তেমন রাস্তা হাঁটিনে। হাঁটলে মৃতপ্রায় আর মৃত মানুষের সাক্ষাতের তেমন অভাব ঘটে না। মরে গেছে। কাপড় ঢাকা দিয়ে পয়সা চাচ্ছে কাফনের। কিংবা পয়সা চাওয়ার দরজা থেকে দরজায় যেয়ে ধাক্কা মারে : “মাগো দুটো ভাত দ্যান। মাগো একটা রুটি দ্যান।” কে দেয়? যে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের দরজায় বেয়ে আঘাত হানছে তার ক’জনার দান করার ক্ষমতা আছে? কতজনকে তুমি দান করবে? তবু সেই অভাবী মানুষেরা মেয়েটিকে পয়সা দিচ্ছে। কেউ দশ পয়সা। কেউ বিশ পয়সা। কে এক ভদ্রলোক একটি আধুলি দিলেন ওর সামনে। কিন্তু মেয়েটি নির্বিকার। ওর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। নাক মুখ ভিজে গেছে। মেয়েটি একটি পয়সাও হাতে ধরছে না। যে দশ পয়সাটা ওর ভাঁজ করা হাঁটুর ওপরে পড়েছে সে দশ পয়সাটাও ও সরিয়ে রাখলো না; যে আধুলিটা সামনে পড়ে আছে সেটিও সে হাতে তুলে নিল না। এরূপ সাধারণতঃ হয় না। এরূপ সাধারণতঃ দেখা যায় না, এই নির্বিকারত্ব, এমনি ভ্রক্ষেপহীনতা। করুণায় হাতে ছুঁড়ে দেওয়া দশ পয়সা বিশ পয়সার ওপর একটি বিত্তহীন শিশুর, একটি ক্রন্দনরতা দুঃখী মুখ…

মেয়েটি কাঁদছে। শব্দহীন। কম্পনহীন। ছবিটি আমার চোখে এখনো ভাসছে।…

 

 (১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় সরদার ফজলুল করিমের লেখা)

 

sordar-8

সরদার ফজলুল করিম -এর বই

১.    করিম সরদার ফজলুল, অনুদিত, ১৯৮৫, এঙ্গেলস-এর এ্যান্টি ডুরিং, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
২.     করিম সরদার ফজলুল, ২০০০, অনুদিত, রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা-১১০০।
৩.     করিম সরদার ফজলুল, অনুদিত, ১৯৮৩, এ্যারিস্টটল-এর পলিটিক্স, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা-১১০০।
৪.     করিম সরদার ফজলুল, অনুদিত, ১৯৭৪ প্লেটোর রিপাবলিক, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা-১১০০।
৫.     করিম সরদার ফজলুল, অনুদিত, প্লেটোর সংলাপ, ১৯৭৩, বাংলা একাডেমি
৬.     করিম সরদার ফজলুল, অনুদিত, ২০০৬, আমি রুশো বলছি : দি কনফেশান্স, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৭.     করিম সরদার ফজলুল, আমি সরদার বলছি, ২০১৩, অন্বেষা প্রকাশন, ঢাকা।
৮.     করিম সরদার ফজলুল, সেই সে কাল: কিছু স্মৃতি কিছু কথা, ২০০২, প্যাপিরাস, ঢাকা।
৯.     করিম সরদার ফজলুল, গল্পের গল্প, ১৯৭৩ বাংলা একাডেমি; ঢাকা।
১০.     করিম সরদার ফজলুল, চল্লিশের দশকের ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৩ এবং     কথাপ্রকাশ, ১৯৮৪।
১১.    করিম সরদার ফজলুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ : আলাপচারিতায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, ১৯৯৩, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
১২.     করিম সরদার ফজলুল, অনশনে আত্মদান, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
১৩.     করিম সরদার ফজলুল, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, ২০১১, কথাপ্রকাশ, ঢাকা।
১৪.     করিম সরদার ফজলুল, আমি মানুষ, ২০০৮, কথাপ্রকাশ, ঢাকা।
১৫.     করিম সরদার ফজলুল, নানাকথা ও নানাকথার পরের কথা, ২০০৪ প্যাপিরাস, ঢাকা।
১৬.     করিম সরদার ফজলুল, দর্শনকোষ, ১৯৭৩, বাংলা একাডেমি; ঢাকা।
১৭.    সরদার ফজলুল করিম : দিনলিপি, মার্জিয়া লিপি সম্পাদিত, ২০১৪, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
১৮.   মার্জিয়া লিপি, সরদার ফজলুল করিম জীবনীগ্রন্থ  ২০১৭, গদ্যপদ্য, কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, কাটাবন, ঢাকা- ১২০৫