Home / আজকের লেখক / ইমদাদুল হক মিলন – তারুণ্য স্পর্ধিত স্মার্ট লেখকের প্রতিচ্ছবি

ইমদাদুল হক মিলন – তারুণ্য স্পর্ধিত স্মার্ট লেখকের প্রতিচ্ছবি

imdadul-haque-milon-2ইমদাদুল হক মিলন – তারুণ্য স্পর্ধিত স্মার্ট লেখকের প্রতিচ্ছবি

লুৎফর রহমান রিটন

লেখক ইমদাদুল হক মিলনের যাত্রা শুরু শিশুসাহিত্যের হাত ধরে। ‘বন্ধু’ নামের একটি ছোটদের উপযোগী গল্প দিয়েই আজকের মহাবিখ্যাত কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের দীর্ঘ অভিযাত্রার সূচনা ঘটেছিলো। তাঁর হাতে ছিলো একটি সোনার কলম। সেই সোনার কলম দিয়ে এরপর অবিরাম লিখে গেছেন মিলন। চেহারা পোশাক আর চালচলনের মতোই তাঁর স্মার্ট গদ্যভঙ্গিটি শিগগিরই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তরুণ বয়েসে সেই যে জনপ্রিয় হয়েছেন, আজও সেই জনপ্রিয়তাকে ধরে রেখেছেন তিনি। তাঁর বেশিরভাগ লেখাই বড়দের উপযোগী। কিন্তু শিশুসাহিত্য দিয়ে যাঁর লেখালেখির সূচনা, ছোটদের তিনি উপেক্ষা করবেন কী ভাবে! না, ছোটদের তিনি মোটেও উপেক্ষা করেননি। ছোটদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি একের পর এক বই লিখেছেন তাদের জন্যে। সেই তালিকাটা মোটেও ছোট নয়। চিতারহস্য, রাত বারোটা, ভূতের নাম রমাকান্ত কামার, ভূতগুলো খুব দুষ্টু ছিলো, ভূতের নাম হাবা গঙ্গারাম কিংবা ডাকাতরাও মানুষ—এরকম বেশ কিছু বইয়ের নাম স্মৃতি থেকে উদ্ধার করতে পারি। ‘ডাকাতরাও মানুষ’ উপন্যাসটি আমার সম্পাদিত ‘ছোটদের কাগজ’-এ ছাপা হয়েছিলো ১৯৯৭ সালে।

ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে আমার অনেক মিল খুঁজে পাই আমি। প্রায় একই সময়ে লেখালেখির শুরু আমাদের। আমার প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিলো ১৯৭২ সালে, দৈনিক ইত্তেফাকের ছোটদের পাতা কচি-কাঁচার আসরে। ছেপেছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। ইমদাদুল হক মিলনের প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিলো ১৯৭৩ সালে, দৈনিক পূর্বেদেশের ছোটদের পাতা চাঁদের হাটে। ছেপেছিলেন রফিকুল হক দাদুভাই। আমাদের নামের ব্যাপারেও মিল রয়েছে। আমরা দু’জনেই নামের সঙ্গে ডাকনাম ব্যবহার করি।


মূল নামের সঙ্গে ডাক নাম বা নিক নেম থাকলে আফলাতুন ভাই সেই লেখকের কোনো লেখা ছাপতেন না। দৈনিক বাংলা পত্রিকাটির ছোটদের পাতা ‘সাতভাই চম্পা’র সম্পাদক ছিলেন আফলাতুন নামের এক সাংবাদিক সাহিত্যিক। সত্তরের দশকে ‘সাতভাই চম্পা’ এবং আফলাতুনের সঙ্গে আমার বিপুল সখ্য গড়ে ওঠে। আফলাতুন ভাই আমার একটি ছড়া তাঁর সম্পাদিত পাতায় ছাপলেন শুধু লুৎফর রহমান নামে। নামের রিটন অংশটাকে বলপেনের লাল কালিতে ঘ্যাচাং করে দিলেন পরম তৃপ্তি আর চরম নিষ্ঠুরতায়। ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর, এবং সংবাদের খেলাঘরসহ দেশের বিভিন্ন দৈনিক সাপ্তাহিক মাসিক পত্রিকায় তখন আমি ধুমসে লিখে যাচ্ছি। আর কোনো সম্পাদক আপত্তি করেন নি রিটন নিয়ে। একমাত্র সম্পাদক আফলাতুন–যিনি লেখকের নামের সঙ্গে ডাক নাম ছাপবেন না বলে কঠিন এবং অবাস্তব একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকলেন তাঁর দফতরে। নামের সঙ্গে ডাকনামটি যুক্ত আছে বলে তখনকার উঠতি তরুণ লেখক ইমদাদুল হক মিলনের কোনো লেখাও তিনি ছাপতেন না। আফলাতুন ভাইয়ের নিষ্ঠুরতার বলি ‘রিটন’কে অতঃপর আমি পুনর্জন্ম দিয়েছিলাম ‘রিটন রহমান’ নামে। এই নামে আমার প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছিলো তখন দৈনিক বাংলার সাতভাই চম্পায়।

আমি যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়টায় ছোটদের সেরা পাতা ছিলো সাতভাই চম্পা। মেক আপ গেট আপের দিক থেকে ওই পাতার ধারে কাছেও ছিলো না আর কোনো পাতা। ব্রডশিটের দুই পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হতো সাত ভাই চম্পা। শাদাকালোয় ওরকম ঝকমকে আধুনিক রুচিস্নিগ্ধ পাতা আর দ্বিতীয়টি ছিলো না। রিটন রহমান নামে আবির্ভূত হবার আগে আফলাতুন ভাইয়ের সঙ্গে প্রচুর তর্ক করেছি। আমাদের কথা কাটাকাটি বা ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমি তখনকার তরুণ কিন্তু খ্যাতি অর্জন করা লেখক ইমদাদুল হক মিলনের প্রসঙ্গটি তুলেছিলাম। আফলাতুন ভাই বীরদর্পে বলেছিলেন–‘যতদিন পর্যন্ত সে তার ডাকনামটি ছেঁটে না ফেলবে ততদিন আমি তার লেখা ছাপব না। ডাক নাম ব্যবহার করে গাড়লরা।’

এই ঘটনার অনেক বছর পর ঢাকা প্রেসক্লাবে চায়ের টেবিলে মুখোমুখি বসে আমি আর আফলাতুন ভাই গল্প করছিলাম। সাতভাই চম্পার তখন করুণ অবস্থা। দৈনিক বাংলা কর্তৃপক্ষ দুই পৃষ্ঠা থেকে এক পৃষ্ঠা এবং এক পৃষ্ঠা থেকে অর্ধ পৃষ্ঠা জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছে তখন সাতভাই চম্পাকে। যে কোনো দিন বন্ধ হয়ে যাবে এককালে ছোটদের বিখ্যাত পাতাটি। আফলাতুন ভাই দুঃখ করে সেই কাহিনিই বলছিলেন আমাকে।
খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আফলাতুন ভাইকে আমি বলেছিলাম–আপনার দীর্ঘ জীবনে সম্পাদক হিশেবে আপনার ব্যর্থতা কি জানেন আফলাতুন ভাই?
–কী?
–আপনি আপনার সম্পাদকজীবনে দু’জন পাঠকপ্রিয় লেখকের একটি লেখাও ছাপেননি বা ছাপাতে পারেননি।
–কোন দু’জনের কথা বলছো?
–ইমদাদুল হক মিলন আর লুৎফর রহমান রিটন।
–কী বলছো এসব? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? মিলনের কোনো লেখা আমি ছাপিনি সত্যি কিন্তু তোমার তো অসংখ্য লেখা ছেপেছি আমি সাতভাই চম্পায়, প্রায় প্রতি সপ্তাহে!
–হ্যাঁ আপনি রিটন রহমানের লেখা ছেপেছেন নিয়মিত কিন্তু লুৎফর রহমান রিটনের একটিও নয়।
–কী আবোল তাবোল বকছো? তুমি কি রিটন রহমান নও!
–না। আমি রিটন রহমান নই। আমি লুৎফর রহমান রিটন। সতেরটি বই বেরিয়েছে (তখনকার হিশেব অনুযায়ী) লুৎফর রহমান রিটনের, অথচ সমসাময়িককালের একজন তুখোড় সম্পাদক হওয়া সত্বেও লুৎফর রহমান রিটনের একটি লেখাও আপনি ছাপেননি ডাক নামের কারণে।
–হ্যাঁ, ডাক নামের কারণে। ডাক নাম আমি ছাপি না।
–তাতে সেই লেখকের কিছুই আসে যায় না। আপনি আমার লেখা ছাপেননি। আপনি মিলনের লেখাও ছাপেননি। অথচ চল্লিশটা বই বেরিয়ে গেছে তাঁর। মিলন একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক। এবং মিলন প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন ইমদাদুল হক মিলন নামেই। আপনি আপনার জীবদ্দশাতেই দেখতে পাচ্ছেন ডাকনামটা সঙ্গে রেখেই মিলন-রিটনরা মর্যাদা পাচ্ছে। লেখক হিশেবে মিলনের সমান প্রতিষ্ঠা আপনি পাননি, এমনকি আপনার নামটি খুবই ব্যতিক্রমী ‘আফলাতুন’ হওয়া সত্বেও।

আমার কথার কোনো জবাব দিতে পারেননি আফলাতুন ভাই। বিপন্ন ও বিষণ্ণ মানুষটাকে দেখে সেদিন আমার খুবই মায়া হচ্ছিলো। ভেতরে ভেতরে খুবই বিব্রত বোধ করছিলাম আমিও, অনেকগুলো অপ্রিয় ও কড়া কথা তাঁকে শুনিয়ে ফেলেছি বলে। কারণ আমার লেখালেখির জীবনে শ্রেষ্ঠ সম্পাদক হিশেবে আমি মূল্যায়ন করি এই প্রাজ্ঞ এবং ধীমান ব্যক্তিত্ব আফলাতুনকেই।

imdadul-haque-milon-6

 ১৯৯৪ সালে আমাদের আজিমপুরের বাসায় নদীর জন্মদিনের ঘরোয়া আনন্দ আয়োজনে ইমদাদুল হক মিলন, আমীরুল ইসলাম, ধ্রুব এষ, ও গোলাম মোর্তোজা।

বেশ কিছুক্ষণ নিরব থেকে অবশেষে আফলাতুন ভাই খুবই বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেছিলেন–মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক। তোমার যুক্তিটা মেনে নিলাম। মিলনকে তো এই মুহূর্তে পাচ্ছি না আমি। তুমি বরং এক কাজ করো। আগামীকাল দুপুরের মধ্যে একটা ছড়া নিয়ে আসো তো দৈনিক বাংলায়। পাতাটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটাই শেষ সংখ্যা কী না জানি না। অন্তত একটা লেখা ছাপা হোক তোমার, আমার সম্পাদিত পাতায়, এবং তোমার নিজের নামে।

হ্যাঁ, দু’দিন পরেই সাতভাই চম্পায় ছাপা হয়েছিলো আমার ছড়াটি। এবং সেটা লুৎফর রহমান রিটন নামেই। সম্ভবতঃ সাতভাই চম্পার ওটাই ছিলো আফলাতুনের সম্পাদনায় প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যা। ডাকনামসহ ইমদাদুল হক মিলনের একটি লেখাও ছাপতে আগ্রহী ছিলেন আফলাতুন ভাই। এই ঘটনাটি ইমদাদুল হক মিলনকে বলা হয়নি। বলা উচিৎ ছিলো আমার। বললে আফলাতুন ভাইয়ের ব্যাপারে মিলনের অভিমান বা ক্ষোভটুকুর হয়তো অবসান ঘটতো। আমি জানি আফলাতুন ভাইয়ের ওপর প্রচণ্ড রাগ বা ক্ষোভ ছিলো ইমদাদুল হক মিলনের। একটি রচনায় তিনি আফলাতুন ভাইয়ের নাম নিয়ে কঠিন বিদ্রুপ করেছিলেন পুরনো ঢাকার বিখ্যাত মিষ্টি ‘আফলাতুন’-এর সঙ্গে মিলিয়ে–একটা হালুয়া টাইপের মিষ্টির নামে একজন মানুষের নাম হয় কী করে!


আমার সঙ্গে ইমদাদুল হক মিলনের বয়েসের ব্যবধান পাঁচ/ছয় বছরের। এই অল্প পার্থক্য সত্বেও মিলন আমার মহা অগ্রজের আসনে অধিষ্ঠিত। তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। তাঁকে আমি আপনি সম্বোধন করি। তিনি আমাকে সম্বোধন করেন তুমি। এই তুমি আপনির ব্যাপারটি আসলে খুবই খুচরো। কারণ আমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসি। শ্রদ্ধা করি পরস্পরের মেধাকে। লেখালেখির মাধ্যমটি ভিন্ন হলেও আমাদের দু’জনের মিল রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। মিল সম্ভবত আমাদের চেহারাতেও। মিল আমাদের পোশাক আশাকে। চাল চলনেও। আমাদের চেহারাসুরৎ মোটেও লেখকসুলভ নয়। কেমন গুণ্ডা গুণ্ডা লাগে।

অনেক বছর আগে, নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা চারটি ঝলমলে তরুণী একবার বাংলা একাডেমীর বইমেলায় উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে আমাকে বলেছিলো–‘আপনি আমাদের ভীষণ প্রিয়। আপনার ‘দুঃখ-কষ্ট’ আমাদের খুব ভালো লেগেছে। অটোগ্রাফ প্লিজ।’ ওই চারজন আমাকে মিলন ঠাউরেছে বুঝতে পেরেও নিরুত্তর আমি হাসিমুখে অটোগ্রাফ দিয়েছি ওদের ডায়রিতে। স্বাক্ষরের জায়গায় ইমদাদুল হক মিলনের নামটি না লিখে যখন লুৎফর রহমান রিটন লেখা হলো তখন লজ্জা মেশানো হাসিতে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিলো ওরা–‘য়ে মা, আপনাদের দু’জনার চেহারায় এত্তো মিল!’

একবার দু’বার এমনটি ঘটেছিলো মিলনের বেলাতেও। মিলনই আমাকে বলেছিলেন—এক সন্ধ্যায় রোকেয়া হলের কিংবা শামসুন্নাহার হলের মিলনায়তনে নবীন বরণ অনুষ্ঠানে মিলনকে ঢুকতে দেখে উপস্থাপক মেয়েটা নাকি ঘোষণা করেছিলো আমার নামটি!

এরপর দিন গড়িয়েছে।

মিলনের কপাল সম্প্রসারিত হয়েছে। মাথায় মৃদু টাকের আবির্ভাব ঘটেছে। তাছাড়া তাঁর ঠোঁট থেকে গুম্ফজোড়া উধাও হওয়াতেও বেঁচে গেছি আমি। এক পর্যায়ে আমার লম্বা চুলও খাটো হয়েছে। মাথায় টাকের আগমনীবার্তা অস্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে।(কিন্তু আমার হালুম মার্কা গুম্ফজোড়া টিকে আছে!) আমাদের দু’জনার চেহারার সাদৃশ্য বা সামঞ্জস্য আর নেই। কেউ আর আমাকে মিলন ভেবে আমার কাছে অটোগ্রাফ চাইতে আসে না এখন!


এই লেখাতেই বলেছি আমরা পস্পপর পরস্পরকে ভালোবাসি। একটা নমুনা দিই।

‘টেলিভিশন’ নামের একটা মাসিক পত্রিকা ছিলো। ১৯৯৩-এর সেপ্টেম্বরে ওরা একটি অভিনব নিলামের আয়োজন করেছিলো। নিলামের আইটেম হিশেবে ওরা হাজির করেছিলো ‘তারকাদের ব্যবহার করা বস্তু-সামগ্রী’। তারকাদের মধ্যে অভিনয়শিল্পী ও নাট্যকাররাও ছিলেন। শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত চত্বরের সেই অনুষ্ঠানে শেষ বিকেলে হাজির হয়েছি যখন তখন নিলামে তোলা হয়েছে লেখক-টিভি নাট্যকার ইমদাদুল হক মিলনের একটি কলমকে। ঘোষক জানাচ্ছিলেন—এই কলম দিয়েই মিলন লিখেছেন তাঁর পাঠকপ্রিয় উপন্যাস ‘ভালোবাসার সুখদুঃখ’। দেখলাম খুবই অল্প দামে উদ্যোক্তারা বিক্রি করে দিচ্ছেন ইমদাদুল হক মিলনের কলমটি। এতো অল্প দাম যে সেটা রীতিমতো অসম্মানজনক। দামটা উল্লেখ করে ঘোষক ‘এক লক্ষ এক, এক লক্ষ দুই, এক লক্ষ তিন টাইপের একটা অতিক্ষুদ্র সংখ্যা ঘোষণা করছিলেন। তিনি তিন উচ্চারণ করার আগে কেউ দাম না বাড়ালে বস্তুটি সেই ক্রেতার মালিকানায় চলে যাবে। ঘোষক দুই গোণার পরেই সহসা ভিড়ের মধ্য থেকে হাত তুলে আমি কলমটির দাম খানিকটা চড়িয়ে দিলাম। যে ভদ্রলোক কলমটির মালিক হতে যাচ্ছিলেন তিনি খানিকটা হতভম্ব। কারণ লেখক বা নাট্যকারের কলম কিনতে আগ্রহী লোকের সংখ্যা অতি নগন্যই ছিলো সেই নিলাম অনুষ্ঠানে। আমার দাম বাড়ানোর কারণে সেই ভদ্রলোক একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও সেটা সামলে নিয়ে তিনি আরো দশ টাকা বাড়ালেন। আমি বাড়ালাম পঞ্চাশ টাকা। তিনি আরো দশ বাড়ালেন। আমি বাড়ালাম একশো টাকা। আমার মাথায় কী যে চাপলো তখন! আমি ওখানে দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম–এরপরও কেউ যদি আর দশ টাকা বাড়ায় তো আমি বাড়াবো পাঁচশো। এবং এভাবে বাড়াতেই থাকবো। এক পর্যায়ে উৎসাহী জনতাকে(!) পরাজিত করে আমিই বিজয়ী হলাম। ঘোষক মহা আনন্দে আমার বলা দামটি তিনবার উচ্চারণ করলেন। সে কী বিপুল করতালি উপস্থিত দর্শকদের!

সেই অনুষ্ঠানটির বিশেষ বিশেষ অংশ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করছিলেন চলচ্চিত্র সাংবাদিক শামীম আলম দীপেন। আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো–কেনো আমি মিলনের কলমটি অপেক্ষাকৃত বেশি দামে কিনে নিয়েছি। আমি তখন বলেছিলাম–ইমদাদুল হক মিলনের মতো একজন লেখকের কলমের দাম এতো কম কম হবে কেনো? এটা তো সেই লেখকের প্রতি রীতিমতো অসম্মান। আমি লেখক ইকদাদুল হক মিলনকে সম্মান জানাতেই কলমটি সামান্য বেশি দামে কিনে নিয়েছি। যদিও এই কলম দিয়ে আমি লিখবো না কিছুই। এটা লেখক মিলন ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা।

দীপেনকে সাক্ষাৎকার দেবার পরে সেই ভদ্রলোককে অনেক খুঁজেছি আমি। আমার ইচ্ছে ছিলো কলমটি আমি তাঁকে উপহার দেবো। টাকার অংকে তিনি আমার সঙ্গে সেই সময়টায় পেরে ওঠেননি কিন্তু তিনিও যে মিলনকে ভালোবাসেন সেটা তো প্রমাণিত কারণ তিনি ছাড়া আর কেউ তো কোনো দাম হাঁকায়নি! কিন্তু সেই ভদ্রলোককে পাইনি বলে মিলনের কলমটি তাঁকে উপহার দেয়া হলো না।

আসাদুজ্জামান রিপন সম্পাদিত সেই টেলিভিশন পত্রিকাটির অক্টোবর সংখ্যায় পাঠকের চিঠি বিভাগে একটি চিঠি ছাপা হয়েছিলো। অনুজপ্রতীম এক চলচ্চিত্র সাংবাদিক সেই সংখ্যাটা আমার জন্যে নিয়ে এসেছিলেন। ‘মিলনের কলম’ শিরোনামে চিঠিটা ছিলো এমন–‘টেলিভিশন পত্রিকাকে ধন্যবাদ যে, তারা তারকাদের ব্যবহৃত দ্রব্যাদির অভিনব একটি নিলামের আয়োজন করেছেন। আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সারাদিন ধরে নিলামস্থলে ঘুরে বেরিয়েছি। আমার প্রিয় অনেক তারকাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। টেলিভিশন পত্রিকা এই সুযোগ করে দেয়ার জন্য চিরকালই আমার প্রিয় পত্রিকা হয়ে থাকবে। তবে একটা ব্যাপারে আমি খুব দুঃখ পেয়েছি তা হলো ইমদাদুল হক মিলনের কলম। গত ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বেরিয়েছে ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’। উপন্যাসটি ইতোমধ্যেই তৈরি করেছে জনপ্রিয়তার এক নতুন রেকর্ড। যে কলমটি দিয়ে তিনি এই উপন্যাস লিখেছিলেন সেই কলমটিই নিলামে তুলেছিল টেলিভিশন পত্রিকা। কলমটি আমি কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমার চেয়ে অনেক বেশি দাম তুলে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন তা কিনে নিয়েছেন। আমার পকেটে খুব বেশি টাকা ছিল না। থাকলে রিটন সাহেবের দ্বিগুণ দাম দিয়ে আমি ওই কলমটি কিনে নিতাম…নাজমুল আলম, মিরপুর ঢাকা।’


ইমদাদুল হক মিলনও যে আমাকে ভালোবাসেন তার একটা নমুনাও দেয়া যাক এবার।

‘আমাদের ময়না পাখিগুলো’ নামে মিলনের একটি বই বেরিয়েছিলো ২০১০ সালে, সময় প্রকাশন থেকে। বইমেলায় সময়ের স্টল থেকে এক কপি বই তুলে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন মিলন ভাই। বলেছিলেন–উৎসর্গের পাতাটা দেখো। আমি দেখলাম উৎসর্গপত্রে মিলন লিখেছেন–‘লুৎফর রহমান রিটন বাংলা ছড়াসাহিত্যের মহারাজ।’
আমি সঙ্গে সঙ্গে সেই পাতায় তাঁর একটি অটোগ্রাফ নিয়ে নিলাম। এবং সেই কারণে বইটা অমূল্য হয়ে গেলো মুহূর্তেই! অতঃপর বইটা আমার সঙ্গে কানাডাও চলে এসেছে।
এই লেখাটি লিখতে লিখতে বুক সেলফ্‌ থেকে ‘আমাদের ময়না পাখিগুলো’কে লেখার টেবিলে নিয়ে এলাম।
স্মৃতির এলবামে মিলন ভাইয়ের কতো কতো ছবি যে দীপ্তি ছড়াচ্ছে!

অটোয়া ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫