Home / সবিশেষ / মুক্তিযুদ্ধের কবিতা -দীপংকর গৌতম

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা -দীপংকর গৌতম

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা
দীপংকর গৌতম
(ঊৎসর্গ: শহীদ লেবু-কমলেশ বিষ্ণু-মানিককে)

২৫ মার্চ ১৯৭১

ভগ্ন শরীরে, নাগরিক কুকুরের
ডাকে চড়ে মধ্য রাত আসে, আসে নারকীয় গর্জন
তারস্বরে অসভ্যের মতো চিৎকার করতে করতে আসে
বর্বর ট্যাংক, রিকয়েললেস রাইফেলের গুলি ঘাতক হয়ে
ছুটে যায় , চলে যায় নিরুদ্দেশে। বিদীর্ন করে মানবিক
পাজর, মস্তিস্ক এলোপাথারি । নিরুপদ্রব,ঘুমন্ত মানুষ
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার রক্তে ভেসে যায়,
বছানা আঙিনা, ড্রেন সব শেষে বাংলাদেশ।
বর্বর সেনাদের গুলিতে মাতৃপ্রসবের যাতনা ওঠে
চিৎকার জšে§র চিৎকার, রক্তের নহরে
প্রসবিনী মায়ের কোলে লুটোপুটি খায়
বাংলাদেশ-আমার বাংলাদেশ।

 

স্বাধীনতা

তোমার স্বাধীনতা যখোন গল্প হয়
তোমার ইতিহাস যখোন শাসকের ইচ্ছায় রচিত হয়
তোমার দেশে যখোন জাতীয়তাবাদের
ধোঁয়ার পরাজিত শত্র“র অস্পষ্ট মুখচ্ছবি
বিম্বিত হয়-
ক্ষমতার আশে পাশে ময়ুরপুচ্ছ কাকের সারি বাড়ে
তখনও মুক্তির প্রহর শেষ হয় না
স্বাধীনতা আর মুক্তি একসঙ্গে আসে না।
মুক্তির জোয়ার
ধমনীতে বয়ে চলে মধুমতি বুড়িগঙ্গা
যুদ্ধদিন আসে, মার্চের শিরায় টান লাগে
গ্রাম -শহর সবখানে ঘাতকের উল­ম্ফন।
যারা যাওয়ার তারা চলে গেছে।
পাহাড় ভাঙা হাতুড়ি হাত কেটেছে তাদের নয় মাস
এর মধ্যে আমার পিতা-মাতা-স্বজন -প্রতিবেশীর
পাজরে গড়ে উঠেছে শহীদ মিনার
বীরের যুদ্ধের স্মৃতি আমাদের জলজমা গলিতে রক্তের
নহন খেলে,আমি সেই রক্তের উত্তরাধিকার
নয় মাসের আতংকিত প্রহরে যে শিশু জš§ নিয়েছে
এখন তার কাধে পঞ্চাশ বছরের দায়
আর তাকে গল্প বানিও না
৩০ লক্ষ শহীদ কষ্ট পাবে
২ লক্ষ নির্যাতিত মায়েরা আবারও–

 

আঁধার ছেঁড়া চাঁদ

যে দিন কমলেশ নিহত হলো, যেদিন লেবু, বিষ্ণুপদ
মানিককে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মর্ষকামী সৈন্যদের মতো নির্মমভাবে হ্যা করা হলো-এই মরা চেপড়া শহরে সেদিন থেকে আর চাঁদ ওঠেনি
সেই কালিমা লিপ্ত অন্ধকার সময় বার বার আমাদের উঠোনে আসে
তাদের মুখ পাণ্ডুর বিবর্ন ঘৃনার আগুনে দগ্ধ
গভীর রাতে তারা ঘুরে বেড়ায়
মামলার নথিতে আমাদের আঙুলের ছাপদেখে হাসে,
অবলীলায় হাসে
আহা কি শিরদাঁড়া তোদের
পিতৃব্যের হত্যার যারা শোধ নিতে পারেনা
তারা বীরের সন্তান হওয়ার অযোগ্য।
আমার শহরে রাত হয়, কাল হয়,সন্ধ্যায় আজান,উলুধ্বনি ভেসে ওঠে
তার মধ্যে শিরাদাড়া টান করে
ফিরে আসে সেই পাথর সময়ের অনড় অন্ধকার।বার বার ফিরে আসে মোষের মতে জেঁকে বসে আমাদের উঠোনে বারান্দায়। আর মণনের শৈলীতে। ধূপের মতো বুকের ভেতরে জ্বলে
আমি সে দহনে দাহ্য হই। আবার জেগে উঠি।

 

গণহত্যার ইস্তেহার

যে রাতটা ক্লান্তি নিয়ে ফিরে এসেছিলো ,
যে রাতে আমি তুলো কাগজে জল রঙে
মিহিন সেলাইয়ের মতো লিখেছিলাম
আমার অপাপবিদ্ধ জীবনে সংগ্রামমূখর ক্লান্ত দিনের
আদর্শলিপি। আমার প্রপিতামহীর একাদশীর শেষে
বিষন্ন রেখার মতো জেগে থাকা করপুট,
আর জল ধোয়া অরগান্ডি শাড়ির মতো
কোঁচকানো চামড়ায় ভর করে আসলো
ঘুমের বিশদ পাণ্ডুলিপি
রাখালিয়া বাঁশীর মতো সরল,
অলস পলির মায়ায় ঢাকা পেলব
নিস্প্রভ বাতির মুগ্ধতা জড়ানো কোমল,
কপিলার তিলের মতো আদুরে
সরব ঘুমের সে পা পাণ্ডুলিপি আসতে আসতে
নয় মাস, ততোদিনে যারা ঘুমিয়েছে,তাদের টেনে হিড়ে ব্যারাকে নিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়েছিলো, রাস্তায় মাঠে ,ঘাটে সব খানে গুলি ফুটিয়ে ঘুম পাড়ানো হচ্ছিলো। হিংসার ঘৃন্য আগুনে পুড়েছিলো চারদিক। স্মৃতি হাতড়াতে কিংবা একগ্লাস জলের পিয়াস,প্রিয় সন্তান বা বৃক্ষগুল্মের এই সবুজ জনপদকে যারা দেখতে চেয়েছে একবার তাদের চোখ কাটা চামচ বা বেওনেট দিয়ে তুলে ফেলা হয়েছিলো। একজনের চোখের পাশবিক আগুনে পুড়ছিলো অযুত প্রান। আমি সেই ঘুমদিনের উত্রাধিকার নিয়ে বলতে এসেছি, বিচার চাইতে এসেছি তাদের যারা আমাদের প্রানের গহীনে পুঁতে দিয়েছে অযুত নারকীয় হত্যাকান্ড। মানুষের স্বাভাকি ঘুম কেড়ে তার স্বপ্ন সাম্য লুট করে যারা তৈরী করতে চেয়েছিলো ঘুমের পাণ্ডুলি আমি তাকে গণহত্যার ইস্তেহার নাম দিয়ে দিচ্ছি।