Home / সবিশেষ / শিল্পী বর্মণ-এর একগুচ্ছ নতুন কবিতা

শিল্পী বর্মণ-এর একগুচ্ছ নতুন কবিতা

শিল্পী বর্মণ-এর একগুচ্ছ নতুন কবিতা

 

শ্রাবণ প্রেম

অপেক্ষার পালা শেষে
তোমার খবর আসে।
প্রতিবারই মনে হয়
কিছু কথা থাকে বাকি,
আজ যখন ফোন বাজল
তখন কালো মেঘে বৃষ্টি,
শ্রাবণ সব মেঘ বুঝি ঝরেছিল!
কিছু থাকেনি কি বাকি!
আকাশের বুকে ভাসি,
হৃদয়ের তারে বাঁধি
আমার না বলা কথার মত।।

 

স্বাধীন স্বদেশ

পচিঁশে মার্চ ৭১,
আকাশে ঘনায় মেঘ
ট্যাঙ্কের ঘর্ঘর প্রকম্পিত গর্জনে,
বুড়িগঙ্গায় এলো রক্তের জোয়ার।
দু:স্বপ্নের কাক ডাকা ভোর আসে-
চারিদিকে সুনসান নি:স্তব্ধ বাড়ি,
ছেলেরা আগেই গা ঢাকা দিয়েছে,
ও কার লাশ! জানাজাহীন কবর হয়
ও কার শব! মন্ত্রহীন কবর দেয়,
গনকবরে মূর্ত অসাম্প্রদায়িকতার স্তম্ভ।
সাড়ে সাতকোটী হৃদয়ের আমন্ত্রন
স্বাধীনতা তুমি কি আসবেনা!
পাক-হানাদারের রাইফেল
মুক্তিপ্রেমীর উদোম বুকে,
গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-নগরে
পাকিস্তানি শকুনের শ্যেণ দৃষ্টি,
বসন্তের ঝরা পাতার মতো কুঁড়িয়ে নেয়-
বুদ্ধিজীবি,মা-বোন আর দামাল ছেলে,
চালায় বর্বর ক্ষুধিত ভোগ অত্যাচার।
আসে মৃত্যু সখ্যতার ডাক-
‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’
ধমনীর রক্তে মুক্তির জোয়ার আসে
কালরাত্রির বুক চিঁড়ে সূর্যের হাতছানি।
গ্রামে- গঞ্জে, শহরের অলিতে গলিতে, পিচের রাস্তায়
শেষ সম্বলটুকু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সাতকোটী বাঙালী
স্বাধীনতা- কোন গল্প নয় –
দীর্ঘ নয় মাসে জন্মনেয়া স্বাধীন স্বদেশ।

মধ্যরাতের চাঁদ

রুগ্ন শহরে এক টুকরো চাঁদ আর মধ্যরাত
গোলক ধাঁধাঁর মতো সারাদিন কাজহীন
ঘুরে বেড়ানো জীবন বিমুখ মানুষটি,
আজো ঈর্ষা করে সমর্পিত হৃদয় ।
বিকুত মানুষেরা নক্ষত্র গনিকার চোখে বর্বর উল্লাস নয়
বোধহীন বিস্ময় আনন্দে মেতে ওঠে।
আর লেবাসে মোড়ানো মাছির মতো শতচোখময়
নির্জীব আপময় জনতা বিবেকী ফুল ফোটায়।।

 

ঘুমের পাণ্ডলিপি

কাল সারারাত ঘুমের পাণ্ডলিপি
পুড়েছিল জ্বলে থাকা চোখের শিখায়,
জেগেছিল রক্তের ভিতর প্রেমিকের আদর,
পুরোনো হাতড়ে ফেরা স্মৃতিরা জেগেছিল
ইচ্ছেরা মাথাকুটে মরেছিল সর্বনাশা শূন্যতায়,
জেগেছিল রুপালী চাঁদ শুয়ো পোকার ডাকে।
অস্তিত্বের ভাঁজে দুলেছিল সংশয়ের ছায়া
রাত পুড়েছিল নিজেই নিজের অন্ধকারে।

তোমার প্রতিকৃতি

বাবার কাছে ছেলে বেলায়
তোমার গল্প শুনে শুনে
খুব সাধ ছিল একদিন
আমার আঁকায় ফুটে উঠবে তুমি,
আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিব।
আঁকার কম্পিটিশনে তখন
আমার নিত্য আসা যাওয়া।
আঁকায় পূর্ব নির্ধারিত বিষয় থাকত
আমি কখনো আঁকা শিখিনি,
তাই যা আঁকতে বলা হত
স্বভাবত তা আঁকতে পারতাম না।
ইচ্ছেখুশী আঁকতাম-শহীদ মিনার,
প্রভাতফেরী, রাজপথ-মিছিল,
নদীর বুকে পালতোলা নৌকা
আকাশে উড়ে চলা গাঙচিল,
সবুজ মাঠ কিংবা সাদা কাঁশবন
মুক্তিযুদ্ধ আর লাল সবুজের পতাকা,
কাচা হাতে যেমন আঁকা হয় আরকি!
আমি কখনো শান্তনা পুরুস্কারও পাইনি
তবু আমি তোমার প্রতিকৃতি আঁকতে চেয়েছিলাম।
এরপরে অনেকদিন কেটে গেছে,
আমিও বড় হয়েছি-
আজ সকালে আমার ১০ বছরের ছেলে জানাল
সে বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকতে চায়?
আমার ছেলেবেলা আত্মজের হাত ধরে দাঁড়িয়ে।
আমি তাকে নিয়ে শহীদ মিনার ফুল দিই
হাঁটি পদ্মা মেঘনা যমুনার কুলেকুলে
নদীতে পালতোলা নৌকা দেখি দুজনে
সবুজের সমারোহে প্রানভরে শ্বাস নিই।
লাল সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে
অবাক করে আমার ছেলে বলে ওঠে
এই দেখো মা শেখ মুজিবর রহমান।
আমি মুহুর্তে টের পাই-
ছেলেবেলায় আমার কাঁচা হাতে আঁকা
নদী, রাজপথ-শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধ-মিছিল
সব মিলেমিশে মুজিবের অবয়ব হয়ে যায়।।

 

ফুল পারিষদ

চারিদিকে গুচ্ছ গুচ্ছ বৃন্তচ্যুত ফুল,
মাঠে ময়দানে, চায়ের টেবিলে
আলোচনা সমালোচনা-স্মৃতিতে
স্বদেশ তোমার জন্মদিন।
স্মৃতির মিনারে ফুল পারিষদ
সভা আহ্বান করেছে।
ভয় পাবার কোন কারণ নেই
ওদের প্রান নেই, নেই কোন শক্তি,
আছে শুধু যন্ত্রনা আর
অবিশ্বাসের তীব্র অভিমান-
কারণ ওরা মৃত,বৃন্তচ্যুত ফুল।
সভা শুরু হল-
গোলাপ জানাল: এ মাসের অপরাধ
গত মাসকে ছাড়িয়ে গেছে।
মজার ব্যাপার হল এটা জ্যামেতিক
হারে বাড়ছে।
রজনীগন্ধ্যা বলল: এই মুহূর্তে একটি
সদ্য অঙ্কুর কে ডাষ্টবিনে ফেলা হল।
বকুল বেলী সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল ব্রাভো!
হাসনাহেনা সংগোপনে জানাল-
ছোট্ট ছোট্ট কুড়িঁগুলোকে
ভালোবাসার তীব্র কামনায় তুলে,
পাপড়ি ছিঁড়ে,ধূলায় লুটিয়ে
সেকি উল্লাস উন্মদনা মানবের।
তারপর, বৃন্তথেকে ঝরেপড়া
কুসুমের অগাধ যত্নে মানবতা
জল ছিঁটায়,
সমাজ সজতনে ফুলদানিতে সাজায়।
গুচ্ছ গুচ্ছ ছিঁড়ে নেয়া কুসুম কুঁড়িতে
সমাজ-দেশ সেজে উঠছে।
তীব্র যন্ত্রনা থেকে ওরা মুক্ত
ওরা যে মৃত বৃন্তচ্যুত ভুল
সভা আজকের মতো শেষ ।

সারারাত হকার্স মার্কেটের মতো
আমায় ঘেটে চলা তোমার হাত-
আমার মুখ,ললাট চিবুক পদ্ম পেষন,
আর তোমার কপোট হৃদয়
অনন্ত তৃপ্তি খুঁজে ফেরা।
অন্ধকার ঘরে আলো জ্বলেনা
ভালোবাসাহীন ঘৃনা জ্বলে
ফুলের অরন্যে ডুবতে গিয়ে
ফিরে আসি কাঁটার আঘাতে।

৮.রাত কিছু বাকি
নিদ্রাহীন রাতঘুম
রাত্রির ডানায় বীভৎস চিৎকার
গোপন ঘটনা পোড়ায় মন,
বস্ত্রহীন রমনী, রক্তাক্ত শিশুর শব
গোগ্রাসে গিলছে সমাজ।
সঞ্চয়ী মানুষ তবু
পিপড়েঁর মত বাধেঁ ঘর,
স্বপ্ন দেখে,ফন্দি ফিকির করে
দিন শেষে ঢলে পড়ে ঘুমে-মৈথুনে।