Home / সবিশেষ / রুমী আহমেদ-এর একগুচ্ছ কবিতা

রুমী আহমেদ-এর একগুচ্ছ কবিতা

রুমী আহমেদ-এর একগুচ্ছ কবিতা

 


ভালো না বাসলে বোঝা যায় না

সমুদ্র স্বীকৃতি না দেয়া অবধি
বুকে পলি, ছটফটাচ্ছে নদী।
মিলে গেলেই তো নোনতা!
তখন কে লিখবে খেয়া পারাপারের কথা?
এই যে মাঝি, পাঁচ টাকা নিয়ে দু’টাকা
ফেরত দেয়, কে লিখবে তার সততার কথা?
তোমরা সব রাঘববোয়াল
জলে ডোবো না, ডাঙ্গায় মরো না __
দমবন্ধ লাগে না?

জানো তো, হাঁসুলি বাঁকের অনেক কথাই ফাঁকি।
ওখানে দিন বদলের গান হলেও রাত বদলায় না।
ওদিকে, বুকের যন্ত্রনায় বাড়তে থাকে নদীর বিপদসীমা।
ভোরের ঠোঁটে অনুমতি, চুম্বনে পেরুতে হবে মোহনা।
ও রজতরেখা, বিক্ষত মেয়ে,
সমস্ত অপেক্ষা রাত্রি দিয়ে বোনা।

ভালো না বাসলে বোঝা যায় না।

________________

২.
দুঃখের কোন ঋণ থাকে না

 

জমিতে না দিয়ে যে কৃষক নিজেই খেয়ে নিলেন কীটনাশক, মূলত তিনি কারো কাছেই ঋণী নন। দুঃখের কোন ঋণ থাকে না।
উজানে অভয়, নদীর কাছে সন্তরণ শিখে নেয়া যে নারীটি নিজেকেই শোনাচ্ছিলেন__
অবলা হলে সহজ হতো গলায় দড়ি দেয়া;
তিনিও কারো কাছে ঋণী নন। যন্ত্রণার কোন ঋণ থাকে না।

আমরা সেই স্রোতের পাশে দিনের পর দিন রেখে এসেছি নির্লিপ্ততা।

যখন ব্যক্তিগত মেঘলা দিনে দীঘল কালো চুলের মতো খুলে দিয়েছি বিষণ্ণতা, ঠিক তখনই সিঁদুর রঙা বিকেল এসে দেখিয়েছিল ভালোবেসে, এই শহরের করতলে টলমলাচ্ছে আলো। গলে পড়ছে আলো, গলে পড়ছে সময়, যেন সালভাদর দালির ক্যানভাসের মতো…

অসীমের একমাত্র জেগে থাকা, কুরেকুরে সময় খাচ্ছে যাকে__হৃদয়। আগুনের মত, বুকে যা পড়ে ঝলসে ওঠে! অথচ সবকিছু খুইয়ে ফেলেও মুহূর্তেই বানিয়ে নিতে পারে নিজস্ব এক খোয়াই!

বিপর্যয়, তোমাকে দেখব না বলে নদীর সঙ্গে পাল্টে নিয়েছি জীবন। রোদ্দুর যাকে স্নান করাবে সাবানে তার কী প্রয়োজন!

শুধু মানুষ হিশেবে কিছু দুঃখ রয়ে যায়।

দুঃখের কোন ঋণ থাকে না।


অরুন্ধতী চোখ

অরুন্ধতী চোখ
এইসব বৃষ্টিজলে ভিজুক
ঝরো ঝরো অক্ষরে
মেঘমল্লার বিসারী সুরে
ভেসে যাক আত্মবিলাপ
শহরের, হৃদয়ের__
উৎসব খোয়ানো দিনে
রেখে গেছে কেউ বহনের দায়।
অরুন্ধতী চোখ
সমস্ত জলের মুক্তি লিখে রেখো পিপাসায়__

______________________


সমস্তটাই সহ্য তোমার

আজকাল প্রায়ই এমন হয়,
প্রিয় কোন মুখশ্রী মনে পড়ে না আর।
আতঙ্ক জেঁকে বসে;
এভাবেই কি একদিন নিঃস্ব হয় মানুষ?

ক্ষত কামড়ে বাঁচিয়ে রেখেছি নিজেকে।
মোহিত মৌমাছিকে বলেছি,
যত পারো হুল ফোটাও মণিতে।
শিকড়কে বলেছি, অন্ধকারের মতোই
মুখস্থ করো আমাকে।
জলকে বলো না, মাটিকে বলো না,
ফুলের সন্তান ফুল, এমনকি গাছকেও বলো না কিছু।

অতলগামী খাদ, মৃত্যু অনুবাদ, তুমি তো জানোই,
ক্ষমার পাশেই কিভাবে দাঁড়িয়ে থাকে তীব্ররাগ।
আঘাতের সামান্য দূরেই দাঁড়িয়ে থাকে আদর।
তবু কাছাকাছি গেলেই দিগন্ত খেয়ে ফেলে সব
রঙিন প্রজাপতি, সম্ভাবনার সমস্ত অক্ষর।

অন্ধকার, ক্ষোভ, ক্ষত জানতে চেয়েছিল সময়;
সময় তখন নির্দ্বিধায় মৃত বালিহাঁস কামড়ে কামড়ে খায়!
বলেছি, দাঁতে দাঁত চেপে অতিক্রম করে যাও__
সমস্তটাই সহ্য তোমার!

ক্ষমা, রাগ, অভিশাপ,
সকলেই সমান দূরত্বে__
বলেই কবি ঝাঁপ দেয়, ঝাঁপিয়ে পড়ে_
শব্দের শরীর আক্রান্ত হয়ে ওঠে!

______________________


আয়ু, তুমি লেখো

শিয়ালকাঁটা ফুল, রজতরেখা নদী
ভিজছে বলে দুঃখিত;
ঘুমিয়ে পড়ত যদি?
জাগ্রত এই স্রোতের কাছে শিখি।
অনাগ্রহের নাম রেখেছি ঋষি।
কোনটি যে অভাব, কোনটি সৌখিনতা
আয়ুর কাছে হাত পেতেছি, স্পর্শকাতরতা
আয়ু, তুমি লেখো__

এইসব উস্কানিমূলক বৃষ্টি

এইসব উস্কানিমূলক বৃষ্টি, বাতাস আর মেঘের
জানলার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়া রোদ, হৃদয়ের
সেইসব সীমানায় হাতুড়ি আঘাত হানে, যেখানে
ঘুমিয়ে থাকে বেদনার খনি, গাঢ় বিষাদে অভিমানে।
যেখানে শিমুলের ঘ্রাণ, নিগড়ের প্রাণ, আঁচলের পলাশ,
মহুয়ার গান, সন্ধ্যা বাগান, বাতাসের গায়ে গায়ে
বৃষ্টির জল হয়ে, আকাশের টান ভুলে, না পাওয়া
আকাশ হয়ে, আলোর মতন খসে পড়া তারা আর
নিভে যাওয়া রঙ বুকে নেমে আসে, বুকের প্রভাবে…


পারো যদি জলরঙে আঁকো

নটেগাছটি মুড়িয়ে গেলেও অনেকখানি কথা থাকে।
যেমন করে জড়িয়ে থাকে,
অনেকখানি কথার পরেও প্রবণতা।

এমন এমন বিকেল থাকে,
যাদের গায়ে লিখতে পারি একটা জীবন।
এক বিকেলের শরীরজুড়ে লিখতে পারি এক-জীবনী,
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ কখন শরীরখানিই মন হয়ে যায়।

ঠিক তখনই মনে পড়ে,
আলোর খবর সবার আগেই
অন্ধকারই জানতে পারে। কেমন করে?

ভাবতে ভাবতে চমকে উঠি,
কেমন করে পুরনো মুখ,
কেমন করে পুরনো ঠোঁট
আদর পেলে নতুন হয়ে ওঠে!

আর তখনই বুঝতে পারি,
এসব ঘটে আচম্বিতে, দুঃখ দিতে।
আদর-পাতি খুচরো স্মৃতি।
দুঃখ কেবল বিস্তারিত। সবার চেয়েই বিশ্বস্ত।

এমন কি ভালোবাসার চেয়েও দুঃখ অনেক বেশি বিশ্বস্ত!

না মানলে, জলরঙে আঁকো!

 


তুমি তো সঙ্গেই আছো; অথচ দেখো

তুমি তো সঙ্গেই আছো; অথচ দেখো,
এই মাঝরাত্তিরেও তোমাকেই বসে বসে ভাবছি!
আর ভাবছি, এইটুকুন রহস্য অবশিষ্ট আছে বলেই হয়তো বেঁচে থাকাটা এখনও রোমাঞ্চকর।
দৃশ্যত যতো সাহসী ভাবি না কেন, কার্যত আমরা ভীতু।
এতো ভীতু যে, চিৎকার করে কষ্ট দূরে থাক,
স্পষ্ট করে ভালোবাসার কথাও বলতে পারি না আজকাল!
আমরা সাঁকোর ওপারে একটা ভোরবেলার স্বপ্নকে রেখে,
এপারে না-ফুরানো একটা ভয় নিয়ে অপেক্ষা করি প্রতিনিয়ত!
ভালোবেসে সাঁকো কাছে ঘনিয়ে এলে,
সাঁকোতে পা দিতে গিয়ে বলি, তুমি ফিরে যাও।
তোমাকে চাই না আমার।
ভালোবাসাকে বলি, তুমি ফিরে যাও, তোমাকে চাই না আমার।
আদতে আমরা ভীতু।
এতো ভীতু যে, ভালো বাসতেও ভয় করে আজকাল!

 


এ জীবন সমুদ্রের মত গাঢ়

মাঝেমাঝে মনে হয়, ফিরে আসা তরঙ্গের
প্রতিটি ক্ষত আমার চেনা। যেন আঙ্গুলের
মত জানাশোনা, তবু তাক করিনি কখনো
বলিনি, দেখো, কত কিছু ফেলে গেছো জমানো।

তুমি চাইলে নিতে পারো আরও
এ জীবন সমুদ্রের মত গাঢ়
ঢেউ আসে, ঢেউ যায় জোয়ার-ভাটায়
বালিতে রেখে যাওয়া ক্ষত, আর পাথর রোদে ঝলসায়

 

তুমি চাইলে স্নান করে নিতে পারো আরও অনেকবার
শুধু মনে রেখো, একই জলে স্নান হয় না দু’বার

ভাবছো একই জীবন, একই আখ্যান,
একই সমুদ্র, একই তো অবগাহন
কিন্তু না, মুহূর্ত পাল্টালেই আর
আগের মতন থাকি না আমরা

চুম্বনের আগে এবং পরে একই রকম থাকে না মানুষ

 

১০
মেয়েটা সাঁতার শিখতে চেয়েছিল।

হঠাত ঘুম ভাঙলে, অনেকদিনের
পুরনো বারান্দাটাকেও নতুন মনে হয়।
ভোরের দিকে।
বুকে চিনচিনে একটা পেইন শুরু হলো।
হার্টের উপরের অংশে একটা ছিদ্র আছে।
নাইন এমএম। জন্ম থেকেই।
ওতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি অনেকটাই।
আমি নিশ্চিত জানি, পেইনটা ওর জন্য নয়। বোধহয় গ্যাস্ট্রিক। অথচ মনে মনে কেবল
ওই নাইন এমএমই খচখচ করছে!

বালিশে হেলান দিয়ে বসবার চেষ্টা করলাম। মেয়ের দিকে তাকালাম। ঘুমাচ্ছে।
ঘুমন্ত মুখের সৌন্দর্য এক অপার্থিব বিষয়।
আমার হঠাতই মনে পড়লো,
একবার কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে
মেয়েটা সাঁতার শিখতে চেয়েছিল।

সুইমিংপুলে নামতে নামতে মেয়েকে
সেদিন বলেছিলাম, সোনা মা আমার,
এসো, আগে তোমাকে ডুব দেয়া শিখাই।
ভেসে থাকার মতোই ডুবে থাকতে
পারাটাও কিন্তু জরুরি বিষয়।

মেয়ে ডুব দেয়া শিখেছিল।

ব্যথাটা কমছে না। নাইন এমএম এর জায়গায় এখন খচখচ করছে গোটা একটা জীবন। জীবনের উথাল পাথাল সমস্ত ঢেউ।

আর তখনই আমার মনে হলো,
ডুবতে শেখাটা আসলে অতোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ডুবানোর জন্য আমাদের চারপাশের
সবকিছুই এগিয়ে আসে পরম আগ্রহে।
কিন্তু ভেসে থাকতে হয় নিজস্ব শক্তিতে, একা একা।

ভেসে থাকাটাই শেখা হলো না মেয়েটার।

মেয়েটা সাঁতার শিখতে চেয়েছিল।