Home / সবিশেষ / দীপংকর গৌতম-এর একগুচ্ছ কবিতা

দীপংকর গৌতম-এর একগুচ্ছ কবিতা

দীপংকর গৌতম-এর একগুচ্ছ কবিতা

রাত্রি নীল

রাত্রি নীল অপেক্ষা করো, আর একটু পরে মানুষ ঘুমিয়ে যাবে ।
ক্যাসিওপিয়া নক্ষত্রটা হেলে যাবে দক্ষিণ শিয়রে।
পাতাদের ঘরে শোক।
ঝরে যাবে সব।
যাওয়ার আগে তারা বৃক্ষদের সঙ্গে এক মৌন মিছিলে অংশ নেবে।
তারা এখন ঝরে যাবে আর শোকে লীন।
প্রত্যেকটি রাত বড় যন্ত্রণা মূখর, বড় বিদায়ী।
প্রহর বদলায় পাতা ঝরে যায়।
কি রিক্ততা বুকে নিয়ে বেচে থাকে বৃক্ষরা।
জন্মের প্রতি আজন্ম আত্মশ্লাঘায় পাতারাও।
জোয়ার নেমে যাবে ভাটায়। পাতা বদলাবে, বদলাবে বৃক্ষের ভাষা।
তবু তুমি বদলাবে না। শুধু তুমি–

 

অপেক্ষা এগিয়ে চললো

অপেক্ষা দীর্ঘ পা তুলে এগিয়ে চললো, তুমি এলে না। প্রকৃতিতে যত শব্দ আছে তোমার পায়ের শব্দ মনে হয়। যত সুঘ্রান তোমার চুলের গন্ধ মনে হয়। যত সুন্দর দৃশ্য সব তোমার অবয়ব মনে হয়।
যত দৃশ্য দেখি, যত সুঘ্রাণ পাই, যত শব্দ শুনি-তুমি আসছো মনে হয়। সচকিত হই শব্দ গন্ধ দৃশ্যে তবু তুমি আসছো না।
অমলের মতো প্রতীক্ষা আর শেষ হয় না। কোনকালে কি এই প্রতীক্ষা শেষ হবে না?

 

তার লাশ

তার লাশ পড়েছিলো বিছানায়। পুরানো হয়ে যাওয়া লাশটিতে পিপড়া বাসা বেধেছিলো। সেই চোখ যে চোখ দিয়ে সে স্বপ্ন দেখতো, ভালোবাসা, কল্পনা সব করতো । সে চোখে পিপড়ারা গর্ত খুড়েছিলো। যে হাত দিয়ে সে প্রিয়তমার কপোল ছুঁয়েছিলো নীল হয়ে ছিলো সে হাতটি। সাপেকাটা লক্ষীন্দরের হাতটা নাকি এমনই ছিলো।
সুরতহাল রিপোর্টে তেমন কছিুই পাআ যায়নি। শুধু জানা গেছে মানুষটি ভালোবেসেছিলো।

 

 তুমি বোঝনি

তুমি বোঝনি
তোমার বোঝা সত্যি হলে
এতটুকু সময়ের নিরবতায় পৃথিবীর সব প্রজাপতির ডানা পুড়ে যেতো
আমি কবিতার টিপ পড়িয়ে দিতামি তোমার প্রশস্ত ললাটে
যেই ছায়া মাথার উপর মেঘেরে মতো, আকাশের মতো ছায়াবৃক্ষ হয় সেই মেঘ অচেনা হলে
পৃথিবী পাল্টে যেতে থাকে, মিছিলে শার্টেঙর আস্তিন ছেড়া যুবকের মতো এলোমেলো হয়ে যায়
সে আর আকাশ দেখেনা, ছায়া দেখেনা, বৃক্ষ দেখেনা
পাখির কুজন তার কাছে অচেনা হয়ে যায়।
ক্ষুধার্ত কাকেরা ডাকে।
দৃশ্যের পর দৃশ্য হারিযে যায়।
ডানাহীন প্রজাপতিগুলো
পথের কিনারে পড়ে থাকে
হায় নিঃসঙ্গতা
চাঁদের মতো
বৃক্ষের মতো
একলা পাখির মতো বেঁচে থাকো কষ্টেরা
সব সুখ আসবেনা, এখন অন্ধকার
বেঁচে থাকো কষ্টেরা প্রিয় দুধভাত আমার

নদী কিনেছিলাম

 

তোমার জন্য একটা নদী কিনেছিলাম কবে
তুমি আমার ভেতরটাকে লুট করেছো সবে
পাহাড় কিনে নদী কিনে সমুদ্দরে যাই
সেথায় দেখি বিশাল হাটে নেইকো আমার ঠাঁই
সমুদ্র কে বুকটা তুলে যেই দেখাতে গেছি
বললো সাগর সূর্য নামুক আমি তোমার আছি
হাটের ভিড়ে আমি একা সাগর নিয়ে ফিরি
তাকিয়ে দেখি পথের পাশে ব্যর্থ সুখের সারি।

অভিমানের রাফখাতা

তোমার সমস্ত অভিমান ঘিরে থাকে সরালি,বালিহাসের ডাক।
তোমাকে যেসব কষ্ট কুড়ে খায় আমি সেইসব কষ্টের প্রপঞ্চ
সে আমি জানি বলেই-আজ বসে আছ রাইনের পারে।
গ্রীষ্মর পদধ্বনি শুনতে পায়।
চান্নি পসর রাতে আমার বাঁশি তোমার সঙ্গ চায়।
আমি গহীন রাতে স্নান ঘরে যদি দেখি
তোমার লাল ব্রাটা শরীর এলিয়ে দিয়েছে ঝুলনায়।
তোমার প্রিয় শাবানের বাক্সে কোন হাতের ছোঁয়া।
ট্যাপের জলে জমে থাকা তোমার মুখ।
বলো তোমাকে ছাড়া কোথায় যাই।
তোমার অভিমানগুলো
দখিনা বাতাসে ছেড়া চিলেকাটা ঘুড়ি হোক।
দূরে যাক।ধুয়ে যাক

 

 যেমন করে কেমন আছি

এখন আমার রাত্রি সারস মেলবে ডানা।এখন আমার ফুলগুলো সব ফুটতে যাবে অন্য কোথাও।এখন আমার রাত বসে রয় দিনটা ঘুমায়।যীশুর ক্রুশের যন্ত্রনাটা শরীর জুড়ে। পেরেকগুলো ফুটছে শুধু যন্ত্রনা ধুপ।
এখন আমার অনেক সময় কথা বলে।এখন আমার রাত কাটেনা।দিন কাটেনা।সকাল দুপুর যায় গড়িয়ে কোন অজানায়। এখন আমার আকাশগুলো অন্য কোথাও বেড়িয়ে বেড়ায়। চাঁদগুলো সব জোছনাগুলো ভান করে সব ছুটে পালায় -কোন জানালায় কেউ কি জানে?
ঘাড়ার হ্রেসা ডাকগুলো খুব কানে বাজে।নিজের ছায়া চিনতে গিয়ে ভুল হয়ে যায়। ফুলের মধ্যে বুকের ভেতর ভুল মানুষের আনাগোনায় সব ভুলে যাই।বুকের ভেতর সূর্য কাঁপে তোমার জন্যে। বাতাসগুলো মাতাল হাওয়ায় স্বপ্ন গড়ে- স্বপ্ন ভাঙ্গে,স্বপ্ন গড়ে। দিনগুলো সব যায় চলে যায় ,বিপ্রতীপে।
এমনি করে দিন কেটে যায়,রাত কেটে যায়।দিন চলে না,রাত চলে না। যেমন করে কেমন আছি কেউ জানে না। কেউ জানে না।

 

যীশু হাঁটে, গাড়ি হাটে না

ভর দুপুরে পীচ গলা রাস্তায় যীশু হেঁটে যায়, বাস হাঁটে না। দূরন্ত দূর্নীবার বাজার অর্থনীতি, গণতন্ত্র, ওভার ব্রিজ, এমন কি ফাই ওভার- ঠাস বুনোটে ছাঁচের মধ্যে যেন আটকে আছে শহর। যীশু হাঁটে, গাড়ি হাঁটে না।

অফিস থেকে উপাসনালয় সব আজ যেন শূণ্য। এমন কি পল্টন মাঠে শাহাবাগেও কোনো মানুষ নেই। কোনোখান থেকে রিক্সায় পর্যন্ত কেউ আসতে পারছে না। সুপ্রিয় সার্জেন্ট, আজ থেকে আপনাদের ছুটি। সকাল থেকে রাত, দিনের পর দিন। জ্যামে আটকানো গাড়ি ছাঁচ বন্দি- স্থির হয়ে আছে। যীশু হাঁটে- হেঁটে যায়।

পাখি, বৃক্ষ, নদীদের খবর নেই। বৃক্ষের সঙ্গে পাখির দেখা নেই। মিডিয়ার দরজায় ঝুলছে তালা। গ্রাম থেকে খবর এসেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের মেলা বসেছে। কৃষক, কুলি, কামিন, ক্ষেতের মজুর, জেলে যাঁরা- তাঁরা যথাযথ বেকার। শহুরে সিটিং সার্ভিসে এসে তাঁরাও আটকে গেছে। এই হা-ভাতের দেশে এতো গাড়ি দেখে সবার চোখ ছানাবড়া। গাড়িতে গাড়িতে সব পথে আর ঠাঁই নেই। ঠাঁইহীন শহরে ছাঁচে ভরা জ্যামে থমকে আছে রাজধানী। রাজা এর খবর রাখেন না। আটকে আছে এ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতালের অক্সিজেনের গাড়ি। মৃত্যু যন্ত্রণা কাতর মানুষের দূর্ভোগ- সব আটকে আছে। এই অচলায়তন থেকে এ শহরকে মুক্ত করবে কে?

মাঝে মধ্যে ড্যান্ডির পলিথিন ফোলায় পথ শিশুরা। ওরা ছাড়া এ শহরে আর কেউ নেই- কোথাও কেউ নেই। হাঁটতে হাঁটতে ছিন্নমূল পথশিশুরাই কিভাবে যেন যীশু হয়ে যায়। তাহলে ওরাই কি এ শহরের ত্রাতা ? রাজপথ বন্ধ। চোখের চতুষ্কোণ ঘেরা যবের ক্ষেতের মতো গাড়ি আর গাড়ি। সব থমকে আছে এ শহরে। শুধু যীশু হাঁটে, গাড়ি হাঁটে না।

 

রাত্রি পুরাণ

বহুকাল ব্যাপি যারা রাত্রি সহচর
তাদের জন্য পোড়ে বিনিদ্র প্রহর,
তাদের জন্য মেঘ কলাবতি নারী
কাব্যের সূতো বোনা কস্তাপেড়ে শাড়ি।

বিজোড়ে বিজোড় মেলে বজ্র ঝড়ে পড়ে
চমকায় ষোড়শীর তিলের উপরে।
শীতলক্ষ্যা নদী কাঁপে দোলে মধুমতি
ব্রহ্মপুত্র নদে কাঁদে কোন সতী ?

রাত্রি মোম রাত্রি একা রাত্রির কপোলে
মিলন মৈথুন রাতে কৌমার্য জ্বলে।
চোখ দু’টো গুহা যেন অগ্নিদাহে দলে
আঁধারে আঁধার মিলে পুড়ছে যুগলে।

এই নীশি কাব্যে ভরে কার মন
বুঝেছিল রাধিকা আর সুক্ষ্ণ বাৎসায়ন।