Home / সবিশেষ / ৫টি কবিতা-ফেরদৌস আরা রুমী

৫টি কবিতা-ফেরদৌস আরা রুমী

৫টি কবিতা-ফেরদৌস আরা রুমী

নিশিডাক

একটা একটা করে হাজারটা জোছনা চলে যায়।

পুরোনো ঘর জলে কাঁদায় একাকার।
উঠানটায় ছলকে ছলকে পড়ে জোছনা
তবু মাটির দেয়ালটাকে বড্ড বিবর্ণ দেখায়!
মনে হয় একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে
দেয়াল!

এত আলোতে এত কালো কেন
গাছ পাতা মাটি?

বাইরে থাকতে মন সায় দেয় না আর
বিবর্ণ বিষন্ন সব
তবু শরীরটা টলে না
নিশি পাওয়ার মতো পড়ে থাকে
ঠাঁয়।

কার বাড়ি জোছনা আসে
কার বাড়ি জোছনা যায়?

 

২১ মে, ২০১৭।

 

পত্র ১

প্রিয় ‘ক’
তোমায় কখনো মন খুলিয়া বলা হয়নি
ভালোবাসার কথাখানি
উঠান ছাপাইয়া কত জোছনা চলিয়া গিয়াছে
বরাবরই ভাবিয়াছি এই পূর্ণিমায় ঠিক বলিব
কিন্তু কিভাবে বলিব তাহা ভাবিয়া ভাবিয়া কোন কুল-কিনারা করিতে না পারিয়া
এবারও না বলা থাকিয়া গেল কথাখানি।
নিজেরে বালিকা সাজাইয়াও ভাবিয়াছি
খলবল করিয়া এবার ঠিক বলিবই
দুই বিনুনী গাঁথিয়াছি পর্যন্ত পূর্ণ বালিকা ভাব আনিবো বলিয়া
সম্মুখে গেলে তোমার- রাজ্যের আড়ষ্ঠতা কোথা যে থেকে পাইয়া বসে
বালিকা বেশও কাজে লাগিল না।
মনে মনে তোমায় বাঁশিওয়ালা সাজাইয়াছি কত!
আর সেই বাঁশির সুরে পাগলীনি হইয়াছি আমি
ভাবিয়াছি পাগলীনি হইয়া এইবার হরবড় করিয়া সব বলিয়া দেই
যেই বলিব বলিয়া হা করিয়াছি মুখখানা
দড়াম শব্দে ঘুম গেল ভাঙ্গিয়া
কথাখানাও কোথায় মিলাইয়া গেল!
একবার ভাবিয়াছি খোলা কোন প্রান্তরে তোমায় ভুলাইয়া ভালাইয়া নিয়া যাই
কেহ থাকিবে না আশেপাশে
কথাখানি ঠিক বলিতে পারিবো এ্রইবার
এবারও গোল বাধিয়া গেল
কি দিয়া ভুলাইবো তাহা শত চিন্তা করিয়াও তাহা বাহির করিতে পারিলাম না।
মনের কথাটি মনের মধ্যেই মাথা খুঁটিয়া মরিলো
কথাখানি আর বলিতে পারিবো না ইহা বুঝিয়া লইলাম।
ইতি, ‘খ’

৭ জুন, ২০১৭।

 

‘না’

এই জীবনে অনেকগুলো ‘না’ থেকে গেল আমার-
বর্ষায় বৃষ্টি ধোয়া লাল টুকটুকে কৃষ্ণচূড়াকে আদর করা হলো না আর,
আজ দেখলাম আমারই পানে চেয়ে অথচ;
চাহনিতে তার আকুতি নেই কোন?
বলছে দূরে যাও সরে যাও।
দেয়াল বেয়ে যে বাগানবিলাসটা রোজ বেড়ে উঠেছে
আকাশ ছোঁবে বলে
সেই দেয়ালটা আর টপকানো গেল না।
তোর সাথে এক দুপুর শুধু গল্পে কাটাবো বলে
কতবার দিনক্ষণ ঠিক করলাম (!)
দুপুর চলে গেল আরেক বাড়ি
তোর সাথে এক দুপুর গল্প বাকি পড়ে থাকলো।
এখনো বৃষ্টির দিনে বেলকনির মেঝে ধুয়ে নেমে যায় জলের ধারা
সবুজ গাছগুলোকে স্নান করিয়ে
আরো সবুজ করে যায়
সকাল দুপুর বিকেল গড়ায়।
রাতগুলোতেও আসে অনেক শব্দের ঝংকার নিয়ে
মাঝরাত্তিরকে মনে হয় সন্ধ্যেরাত
শুধু বৃষ্টিতে ধোয়া হলো না আমাদের।
উঠানটায় চিহ্ন রেখে গেলে জোছনায়
আর কি ফিরে পাওয়া যায়
চিহ্ন আমাদের?
জল কাদায় একাকার তারওপর!
অনেকগুলো ‘না’ থেকে গেল আমার-
অনেক গোপনে পুষে রাখা তোর কাছে নীল শাড়ীর বায়নাটাও করা হলো না এক জীবনে।

১৬ জুন, ২০১৭।

একটি প্রেমের কবিতা

এমন একটা কৈশোর প্রেম ছিল আমাদের
পাড়া কাঁপিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়ে
পাড়াসুদ্ধ লোকের হাড় জুড়িয়ে
তবে শান্তি!
দুপুরের ভাতঘুমে টিনের চা্লে দড়াম শব্দ
গেরস্ত বাড়ির বউয়ের লাঠি নিয়ে তাড়া-
বড়ই গাছে ঢিল মারলো কে রে?
কৈশর প্রেম কি অতক্ষণ ওখানে বসে আছে!?
তিন বাড়ির উঠান পেরিয়ে চার বাড়ির উঠোনে হানা
আহ! বাতাসীর মায়ের আমের আচার (!)
হাত চাটতে চাটতে হাতসুদ্ধ খেয়ে ফেলা বাকি।
বাতাসীর মায়ের নাক ডাকার শব্দ ভেসে আসে
বেড়ার ঘর থেকে
আর তিন বছরের বাতাসী
ভাতঘুম বাদ দিয়ে মায়ের বুক থেকে চুপি চুপি উঠে এসে
মাটির দাওয়ায় রান্নাবাটি খেলে।
মন্দিরের পাশের পুকুরটা ফুলে ফুলে ভরে ছিল পদ্ম
স্কুল থেকে ফেরার সময়ে দেখেছি
আজকের দুপুরটা তার জন্যে।
ইচ্ছামত পদ্ম তুলে ফ্রকের কোচড় ভরে
তবে বাড়ি।
না, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি না
সাপের মতো বাক ঘুরে বিকেলের ট্রেনটা যাবে যে
হাত নেড়ে নেড়ে সবার সঙ্গে হাসি হাসি মুখ করে
টা টা বাই বাই করবে কে?
ওরাও অমন করে হাসে কেন? ওরাও কি আমাদের রোজ দেখে?
প্রতিদিন না নতুন নতুন মানুষ যায়!
তারপর মাঠের মধ্যিখান দিয়ে ছুটতে ছুটতে বাড়ি
পদ্ম মরে গেছে সেই কখন
পথের পাশে ফেলে কোচড়টা ঝেরে নেই।
আচ্ছা, সারাটা সময় তুই আমার পিছু পিছু থাকতি কেন?
কত বকতাম, মারতাম, তবু…
এখন তোকে আর খুঁজে পাই না।
নাকি খুঁজি না।

৯ জুলাই, ২০১৭।

বিকাল বেলা

কতবার বলেছি বিকাল বেলায়
‘বিকাল বেলার’ গল্প বল
কেন এখন এমন গল্প তোমার-
‘ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার
সবটুকু আলো গিলছো পড়ে পড়ে?

অন্ধকার না অাঁধার কোনটা বেশি ঝাঁজালো
সেই তর্ক নয়।

বলছিতো, জানো না
কতটা রোদ্দুর গায়ে মাখলে আমার গল্প হয়।
ডানা ঝাপটানো পাখির পড়ে থাকা পালক আর
ধোঁয়া উঠা কাপে
গরম মসলার ঝাঁজালো ঘ্রানে
আমার বিকাল আসে
বিকাল যায়।

জানো না-
চায়ের পানি কতটা তাতালে
ধোঁয়া ওঠা বুদবুদ কতটা ছড়ালে
চায়ের গল্প হয়?
অসমাপ্ত গল্পগুলো আবার ডানা মেলে
চুমুকে চুমুকে হাঁটতে থাকে
গন্তব্যে!

এসময় অমন অন্ধকার অাঁধার বিচ্ছিরি তর্ক জুড়ে দিয়ে গল্পগুলো কেড়ে নিও না।

 

১৬ জুলাই, ২০১৭।