Home / সবিশেষ / সহিস পরাস্ত অথবা // সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ।

সহিস পরাস্ত অথবা // সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ।

moinul-ahsan-saber

 

সহিস পরাস্ত অথবা // সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ।

পরাস্ত সহিস: মঈনুল আহসান সাবের
প্রকাশক:পূর্বা
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
প্রকাশকাল : জানুয়ারি ১৯৮২
মূল্য : ১২ টাকা।।

উত্তাপ সন্তপ্ত এই অপরাহ্ণে হাতে পঁয়ত্রিশ বছর আগে প্রকাশিত বইটি আজও কীটদষ্ট হয় নি।
বইটি মঈনুল আহসান সাবেরের।নাম, পরাস্ত সহিস।বের করেছিল মগবাজার থেকে পূর্বা।মাসুক হেলালের আঁকা কভার।
সাবেরের ছোটগল্পের সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮২ এর জানুয়ারিতে। তার পিতা আহসান হাবিবকে করা হয়েছিল উৎসর্গ।
গল্পগুলোর রচনাকাল ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০। ৭০এর লেখক সমাজ তাদের লেখকজীবনের সূচনায় মোকাবেলা করেছিল অস্হির ও রক্তপ্লুত সময়, আলো -আঁধারির অমিমাংসা।
সে সময় বাঙালির জাতীয়জীবন, উত্থানপতন বন্ধুর সময় সেই হানাদেশজুড়ে বিরাজিত।
সেই সময় মিডিয়া এখনকার মত তখন ছিল না।আশা ছিল, ভাষা ছিল না।আর এখন তো মিডিয়ার উর্দ্ধপতন। সিনে কাগজগুলো ছিল আশায় বসতি।ফলে যা হবার তা এই যে, গল্প জমলো অর্ধউলঙ্গ, কোমর বাঁকানো নারীদের গা ঘেষে সেইসব ফিল্মি কাগজে।দৈনিক কাগজগুলো ভারাক্রান্ত মনে সাহিত্য ছাপতো।
তবু তো সাহিত্য, সেখানে গল্প শব্দ গুনে লেখা য় ছাপানোপযোগী স্বল্প পরিসরে সাশ্রয়ী ছিল।
একটা বাজার দরকার ছিল।চাহিদা অনুযায়ী যোগানদাতাদের কোলাহল ছিল।তা থেকে আলাদা স্বর ছাকনিতে আলাদা করে যাদের খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, অন্যতম ছিলেন তিনি।
গড্ডলিকায় ভাসবার দিন তাদের মধ্যে তখনও দেখা যায় নাই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী গল্প একটা আকার ধারন করতে, বিকশিত হতে পরের দশক পর্যন্ত অপেক্ষার স্রোত চালিত হবার আগে কারো কারো তাদের লেখা, বলা যেতে পারে, পরের দশকের লেখককূলের কলমের ডগায় বেয়নেট ধারনের মৌসুম শুরুর পূর্ব কালীন ঘষামাজা করার, শান দেয়ার অগ্রীম শব্দ বাজিয়েছিল।
মঈনুল আহসান সাবের নিজস্ব মাত্রা নিয়ে ছিলেন; না অগ্নিকান্ড না আঙুলের ফাকে ব্লেড নিয়ে নৃত্য।
পরাস্ত সহিস বলে দিয়েছিল ঘোড়ায় আসীন দুরন্ত সময়কে লাগাম টানার শুরুশেষের প্রতীক।
পরাস্ত সহিস নামের বইটিতে এই নামে কোনও গল্প না থাকলেও শীর্ষ নাম হয়ে জাঁকিয়ে বসে আছে এখানে বিন্যস্ত সাতখানা গল্পের অন্তরা ও মুখরায়, অন্তঃশীল বিচরণে।
গল্পের ভাষায় অনুধাবন হয় তখনও গতি পায় নি সময়।
ক্ষুরটা ছিল মুস্তফা আনোয়ারের হাতে। ক্ষত সারানোর ও ব্যান্ডেজ লাগানোর কোমলতা ছিল হন্তারক থেকে মুখোশ কিংবা দুইবোন থেকে জীবনযাপন–গল্পের গাঁটছড়ায়।
এখনকার মত স্টোরির বদলে ইনফরমেশন বলা ও কাঠামোগত অধিকার না থাকলেও—– সূত্রপাত না থাকাটা মনে করিয়ে দেয় ইনফরমেশন তৈরি হচ্ছিল, সেই এক দাহকালে।
তারপরেও পুষ্পের হাসির মত ঠিক যেন দেখা মিলল গড়ে ওঠা মধ্যবিত্তকে নিয়ে, মধ্যবিত্তের জন্য, মধ্যবিত্তের লেখা ;কাহিনীর বুনন ভাষাকে বগলদাবা করেছিল।
তাদের হাতে কাহিনীর গাছপালা বৃদ্ধি ও নাটকীয়তা, ক্ষয় দেখানোর চেয়ে ভয় পাওয়া, মন্হরতা ও আকাশ দেখার মুহূর্ত….ভাবীকালের জন্য সারিন্দা বাজিয়ে নতুপথ অনুসন্ধানের জমিন অবশিষ্ট রেখেছিল।গল্প তখন সংজ্ঞাধীন ছিল বলেই সংজ্ঞাহীনরূপ দাখিল থেকে নতুন সংজ্ঞা তৈরির পাটাতন পায়ের নিচে আগ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
লেখার খেলা জানতেন বলেই খেলাটাকে লেখায় পরিণত করেছিলেন।
প্রতিজন লেখকের সূচনাকাল ও প্রদোষকাল থাকে, লেখকের জন্ম হয় তার ভাষায়।সৈয়দ হকের ভাষ্য মতে লেখকের দ্বিতীয় জন্ম।
সাহিত্যের বাল্যকাল, প্রদোষকাল কাল থাকে মানুষের জীবনের মত।তাই বলে কোনও লেখকের এমনকি সাবেরের গল্প যা সন্নিবিশিত এখানে এবং পাঠ করেছি প্রস্তুতি পর্বে তাকে ছেলেখেলা বলে উড়িয়ে দিতে অনিচ্ছুক।
তবে লিখনে যাই-ই ঘটুক না কেন চিন্তা পদ্ধতির ছাপ প্রতিভাত করতে স ক্ষ ম তেমন তুল্য দৃষ্টান্ত দেখি না।
কে না জানে অনুভবের রং পাল্টাতেও পারে অথবা অন্যমনস্কতা থাকে।
তিনি গা বাঁচিয়েছেন তবে সরলীকরণ অবিচার হবে এইজন্য যে তিনি ৭০দশকের মূল চারিত্র্য যা সাহিত্যজগৎ এর অধঃপাতের জন্য দায়ী সেই শনিরেখা ধরে চলাচল না করাদের মধ্যে অন্যতম সুশান্ত মজুমদার,সৈয়দ কামরুল হাসান, নকিব ফিরোজ, মন্জু সরকার, আবু সাঈদ জুবেরী প্রমুখের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে সদা দাবীদার করা না গেলেও যাদের হাত দিয়ে অবাণিজ্যিক ধারায় মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্প রচনাকারীদের নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠল সেখানে নিঃসন্দেহে তাকে রাখা যায়।সুশান্ত মজুমদারও থাকেন।
সাবের তার কৃতিতে পিতৃনাম বহন করেছেন, বলতে চাই।সাহিত্যের মুনাফা উপযোগিতাকে বলবৎ রাখেন নি সাহিত্যে।জনপ্রিয়ধারার সাহিত্য চর্চার দূরবর্তী অবস্হান তিনি মনস্হ করেছেন। বাণিজ্যধারা থেকে দূরত্বের কারণে তাকে দেখি নি সমসাময়িক কারোকারো মত শ্রীমতী মার্কা কাগজে গল্পগাছা ফেঁদে ও নারী ও ফাঁদ ধর্মী লেখাটেখা টেকাটুকা কামানোর মধ্য দিয়ে কামনার উত্থানে।
তিনি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক লেখা পাঠকের সামনে রেখেছিলেন। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকাল লেখায় উপজীব্য না হলে স্বাধীনতা সূত্রে যুদ্ধাক্রান্ত স্বদেশে বিরাজমান নৈরাজ্য অবলোকিত হয়েছিল।তবে সত্য যে, নিঃসঙ্গ ছিলেন না তিনি আবার আবার নারীপুরুষের সম্পর্কের দেহসর্বস্ব নির্ভরতায় তাকে বগলের নিচে রাখা ক্রাচ বানিয়ে হাটেন নি —–দরিয়ায় মাছ থাকার মত ঐ জগতে টাকার খলবলানি ছিল বলেই নিজেকে সে পথে বিস্তার করেন নাই।
৭০এর লেখকলের, একেকজনের সৃজনসূচনা দশকটির নানা পর্যায়ে।শেষ দিকে তার সূচনা ও এখন পর্যন্ত লিখে যেতে যেতে টপকে গেছেন তার দশকের অনেককে।আগের জন পিছনে, আর অনুসরনকারী তার কৃতিগুণে, শক্তি উপাচারে অগ্রবর্তী —–এ হচ্ছে হামেশাই খেলা থেকে লেখা এবং সত্য বটে তার জন্য।
সত্তর দশকের সব লেখকের গল্পে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে তবে কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা অর্জন করেনি।মনে করতে পারব, ৭০এর লেখকদের গল্প সংকলনটিকে।সুশান্ত মজুমদার করেছিলেন সম্পাদনা।বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলনটির ভূমিকায় বলা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে যে দশকে সেই দশকের লেখকদের লেখা নিয়ে নির্মিত সংকলনটিতে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বাদ রাখা হয়েছিলা।দুর্বল গল্প স্হান দেয়া যৌক্তক মনে হয় নি।ব্যতিক্রম তাতে সাবেরের “ভুল বিকাশ”নামের গল্পটির ভূক্তি।গল্পে উপস্হাপিত হয় নি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ বরং, মুক্তিযুদ্ধোত্তর নৈরাজ্যকর দশাপ্রাপ্তি ছিল উপজীব্য।
তাহলে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্প হিসেবে ধর্তব্যে পড়ে সাবেরেরর কোন কোন গল্প তা এভাবে বুঝে নেয়া যেতে পারে।
প্রেক্ষিত নতুন হলে বা যে কোনও পরিবর্তন আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা থেকে শিল্পে যে নব আঙ্গিক উপলক্ষ হতে পারত সেই খামতির কারণে দিগন্ত প্রসারিত হতে পারে নি।মুক্তিযুদ্ধের মত সৃষ্টিশীল হতে পারে নি এই নিয়ে গল্প।মুক্তিযুদ্ধে আমরা আঙ্গিকগত রুপান্তর প্রত্যক্ষ করি।নির্বাচন থেকে অসহযোগ আন্দোলন, গণহত্যা থেকে সশস্ত্র যুদ্ধ —-বৈপ্লবিক রুপান্তর মিছিল থেকে গেরিলার পদধ্বনিতে—–কাস্তেহাতুড়ির বদলে থ্রী নট থ্রী রাইফেল—-বাউল গান আমার সোনার বাংলা থেকে মন্ত্রসাধনে অমা আমি নয়ন জলে ভাসি।
সুতরাং সেই এক আঙ্গিক দরকার যা মুক্তিযুদ্ধের বিশালত্ব ধারণক্ষ ম।দিগন্তও আদিগন্ত মগ্ন হবে।
সাবেরের লেখকমানসের আশ্রয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ।তাই আগ্নেয় উপল ক্ষে নাটকীয়তার বদলে ভরসাস্হল রাজনীতি।লেখকের কমিটমেন্ট এখানেই।কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ প্রভাব ফেলে স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ উপলব্ধ হয়, বাস্তবতার প্রহরে, কথা সাহিত্যে।
৭০এর লেখকদের মধ্যে হুমায়ুন আহমেদ একজন।তিনি লেখাকে সাধারণ পাঠস্তরে আনতে সুস্বাদু আয়োজন করলেও কহে না প্রকাশ।
৬০বছরের জয়ন্তীতে লেখকের সাহিত্যবাল্যবেলার এই গ্রণ্হটি প্রত্নতাত্ত্বিক মনে হলে গ্রণ্হ নামকরণে অন্য উৎসারণ পরিলক্ষিত হয়।পরাস্ত সহিস তিনি নন।এক অশ্বারোহী সে— যে মান্দার বনে একদা অশ্বচালনা করেছিল , নতুনের খোঁজ পড়েছিল:উপন্যাসের প্রথম জমানার পদচিহ্ন রাখছিল—-উত্তরসূরি হয়ে ওঠেন।
ঘোড়ার জিনে চেপে মাঠ ভাঙে যে মানুষ, মঈনুল আহসান সাবের,তাকে নিয়ে ছুটন্ত ঘোড়াকে লাগাম পড়াতে না পারে পুরানো সহিস, পরাস্ত সহিসকে হারিয়ে সেই এক ঘোড়সওয়ার তিনি।