Home / সবিশেষ / কবি আমিনুল ইসলামের কবিতার ঘরবাড়ি-মতিন বৈরাগী

কবি আমিনুল ইসলামের কবিতার ঘরবাড়ি-মতিন বৈরাগী

Aminul-Islam

 

কবি আমিনুল ইসলামের কবিতার ঘরবাড়ি
মতিন বৈরাগী

গোড়াতেই একটা কথা বলে নেই যে কবি আমিনুল ইসলাম -এর কাব্য নিয়ে ইতোপূর্বে আমার মুগ্ধতার কথা ভিন্ন প্রবন্ধে আলোকিত করেছি। যদিও তা ছিল ‘জোছনার রাত বেদনার বেহালা’ কাব্য প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ এবং ‘কবিতাবাংলা’-এর সে সময়ের কার্যক্রমের একটি চলমান অংশ। সেও তো প্রায় দুবছর হয়ে গেছে বলেই মনে হয় কিংবা হতে পারে তারও বেশি। আজও যে তার বিশাল কাব্যক্রমের সংঘবদ্ধরূপ ‘কবিতাসমগ্র’ তাঁর ক্ষেত্রে যে তাঁর কবিতাগুলোয় আমার প্রিয়তা তা ভিন্নরূপ লাভ করবে তেমন নয়, এ কেবল বাড়তি কিছু কথা বলা, যা সেখানে বলা হয়নি বা নতুন প্রেক্ষিতের প্রয়োজনীয় কিছু শব্দ বাক্যের সংযোজন। কারণ ইতোমধ্যে তাঁর আরো কিছু কাব্য প্রকাশিত হয়েছে। সমগ্রে রয়েছে ১০ কাব্য আর আমি মাত্র দুচারটি কবিতা তা থেকে তার কৃতি ও নির্মাণ কর্মপ্রসংগে একটা পাঠচিত্র তৈরি করছি নানা প্রসঙ্গ সাঁতরিয়ে।
কবি আমিনুল ইসলাম কবিতায় তরুণ নয়, যেমন অনেকখানি তরুণ তিনি তাঁর কাব্য যাত্রায়। দশক হিসেবে গত শতকের ৯০র দশকের কবি তিনি। সময় কালের দিক থেকে অন্যদের থেকে একটু দৈর্ঘ্যে কম কিন্তু বয়সের ও অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে তিনি অনেক বয়স্কদের থেকে একটু বেশিই অগ্রসরমান। চাকরির সুবাদে তিনি ঘুরেছেন নিজ দেশ, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, দেখেছেন মানুষ উপর ও নিচ, নিজ দেশবাসীর মুখ, পরিচিত হয়েছেন সমাজের নানা শ্রেণি পেশার মানুষের সংগে, তাদের আচার ব্যবহারের সংগে, তাদের প্রিয়তা অপ্রিয়তার সংগে, তাদের জীবনপ্রণালীর সংগে আবার দূর দেশ দেখেছেন একজন অনুসন্ধানী মানুষের মতো, তাদের জীবনপ্রণালী বোধ ও উপলব্ধিকে তিনি নিজের উপলব্ধির মধ্যে টেনে প্রকাশও করতে চেয়েছেন কবিতায়। আমিনুল ইসলাম আমার প্রিয়, প্রিয় তার কবিতা প্রসংগে তাই এই বাড়তি আয়োজন।

শুরুতেই আর একটা কথা বলে রাখি; মানুষ কখন কিভাবে কারও প্রতি অনুরক্ত হয়, কখন সেই মানুষটি হয়ে ওঠে প্রিয় তার স্বভার ও চলন সহ–কখন যে মনে হয় মানুষটি একজন ভালোমানুষ, তা নির্ণয় ব্যক্তির পক্ষে অনেক সময়ই তার কারণ উহ্য রয়ে যায়। একটা আবেগী বিবেচনা হয়ত এ ক্ষেত্রে কাজ করে, যার যুক্তি আছে আর বিযুক্তির ধার-ধারগুলো চকচকে। তাই আমিনুল ইসলামের প্রতি আমার যে অনুরাগ, সে ব্যক্তিও যেমন আবার তার কাব্যও তেমন। যদিও কবি আমিনুল ইসলাম-এর সব কবিতা আমার প্রিয় নয়, সব বক্তব্যও আমি অন্ধচিত্তে গ্রহণ করি না, যদিও তার কবিতায় সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ, পারিপার্শ্বিকতা, কাঙ্ক্ষা, একটা গতিশীল ধারণার মধ্য থেকে উৎসারিত, তবু মনে হয় আমিনুল ইসলাম প্রস্তুতি পর্ব থেকে উত্থান পর্ব অতিক্রম করে উপনীত হয়েছেন সংহতি পর্বে অর্থাৎ কবিতার সিংহ দরজায়, [যাকে ‘ইলিয়ট’ বলেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সময়। যে সময়ে এজন কবি তার তিনপর্বকে একটা সংহতি দেন আবেগ ও অভিজ্ঞতার] এখন প্রবেশ। এই পর্বে নিশ্চয়ই তিনি তার অভিজ্ঞতা তার সৌন্দর্যবোধ তার প্রিয়তাকে দেবেন সংহত রূপ, দেবেন মেদহীনতার মসৃণ আভরণ, দেবেন বুক চিরে ওঠা এক আকুতি যা পাঠককে নতুনে উপনীত করবে এবং পাঠক তার প্রিয়তার মধ্যে ডুবতে ডুবতে তুলে নেবে নানা অলঙ্কার আসলের। নয় এমন যে ইতোমধ্যে তিনি তার দক্ষতা, নির্মাণ কুশলতা, বিষয় ও রূপের আনুপাতিক সুষমা দিতে পিছিয়ে গেছেন, তবু শিল্পের সুনীতিতে যে আরো দূর বিস্তার রয়েছে আরও গভীর যাত্রার অজস্র সংকেত তার সবটুকুর সেতু এখনও পার-চেষ্টায় রত তিনি। মনকে আপ্লুত করার নানা পদ্ধতির নির্মাণ রয়েছে তার কবিতায়, এবং কথাকে ভাবনাকে বিষয়থেকে স্বতন্ত্র করে আবার বিষয়ে যুক্ত করার নির্মাণ রয়েছে । তিনি গতানুগতিক নন, এবং ৪০,৫০,৬০ এর কন্ঠ ধারণ করে বসেও থাকেননি। তাঁর প্রতিটি কাব্যে অন্য উত্তরণের একটা লম্বা সাঁতার আমরা লক্ষ করতে পারি। তিনি বিষয়কে রূপে প্রত্যাবর্তন করার ক্ষেত্রে অনেক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন নিজের মতো করে বলন ভঙিতে এটাই একজন সৃজনশীল মানুষের বড় কৃতিত্ব। তবে এও সত্য ঐতিহ্যকে সরিয়ে দিয়ে জগাখিঁচুড়িও করেন নি। আবার সমাজমানসের ঐক্যের মূল সূত্রাবলীকে আগ্রাহ্যও করেননি। তিনি রীতিকে ভেঙেছেন সেইটুকু যেইটুকু ভাঙলে মূল চাতাল অক্ষত থাকে এবং নতুনের পশরা সাজানোর ক্ষেত্রে যেনো কোনোরূপ ভঙ্গুরতা প্রত্যয়ী না হয়। আসলে সকল কবিকেই এই মূল সুরকে ধরতে হয়, যারা তা ধরতে পারে না তারা থাকে পিছিয়ে বা নতুন করতে গিয়ে ভাসিয়ে রাখে পুরানোর দাগরাজি। ঐতিহ্য তো আর কিছু নয় সে হলো সমাজ জীবনে যা লোকে স্বভাবতই করে থাকে, সে হলো রীতি আর তাকে যখন বিশ্লিষ্ট করে ঔচিত্যের দাবিকে খাড়া করা হয় তখন তার নাম হয় নীতি এবং ব্যক্তিগত ও যৌথ ব্যবহারে এই রীতি এবং নীতির যেটুকু আপনা হতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে সেই টুকুকে বলা হয় ঐতিহ্য। ঐতিহ্য, যা মানুষ ধারণ করে বহন করে, বৃহৎ সমাজের মানুষের ব্যবহারের পদ্ধতি, ভাবনার দিকচিহ্নগুলো নানা বিনিময়ের মধ্যদিয়ে নিজঘরে স্থাপন করে যাকে বলি কমিউনিকেশন। সে কারণে ঐতিহ্য স্থবির তখনই যখন তাকে নানা সৃষ্টির বৈশিষ্টের সংগে সাজুয্যপূর্ণ করা হয় না, কেবল হুবহু টায় টায় ব্যবহার করেন প্রাচীন পন্থিরা। আধুনিক আধুনিক বলে চিৎকার তাদের সার ভেতরে বহমান সেই অচল অনড় এক ধ্যান যাতে মোহ আছে পরিশ্লিষ্ট ভাবনার আনন্দ নেই, গতানুগতিকতা আছে নতুন নেই। আমিনুল ইসলাম সম্ভবত অনেক আগেই সেই বিধিবদ্ধ আবর্তকে কাটিয়ে নতুনে উপনীত হতে পেরেছেন। এ জন্যই তিনি আমার প্রিয়। তার কবিতায় বাংলার মাটি ও মানুষের স্বাদ মেলে।

কবিতা মূলত এমন একটা শিল্পমাধ্যম–রূপের, যাকে স্থাপন থেকে প্রতিস্থাপন কালে বিষয়য়ের মূল গলে গেলেও তার নির্যাস থেকে প্রস্তুত হয় এমন এক রসায়ন যার মধ্যে বিষয়ের গোপন গুণাগুণ সরল কিম্বা জটিল আকারের হলেও থাকতে হয়, থাকতে হয় এর উদ্দেশ্য । কারণ জগতে কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীন নয়। কোনো কিছুই কেবল অলীক ভাবনাও নয়। যা কিছু মনে হয় উদ্দেশ্যহীন তারও একটা উদ্দেশ্য থাকেই, সে কবি সচেতন হয়ে উপলব্ধি করুন বা অসচেতনতায় ভেসে ভেসে রঙধনু আঁকুন। আসলে যতরকম মত ও মতের সমাহার তা মানুষের, আর একারণে এক কবি থেকে আরেক কবির দূরত্ব কাছেরও নয় আবার দূরেরও নয়। গোত্রচিহ্ন থাকে একইভাবে আলাদা আলাদা ভাগে। তাই দেখি আমিনুল ইসলাম যা বলেন তা বলেছেন অন্যকেউ তারও আগে, বা বলবেন আরো কেউ তার পরে। কারণ জগতে যে বস্তুসমূহ আছে,তাই আছে বা রয়েছে তার বিবর্তন আছে রূপান্তর আছে, কিন্তু নতুন কিছু নেই। তাই আছের সংসারে এতো কিছুর পরও অভাবের অভাবও আছে। আর মানুষ তা পুরণ করে বস্তুর নবতর মাত্রা দিয়ে। আমিনুল ইসলাম তেমন করেই সংবিধিবদ্ধ নিয়মকে অস্বীকার না করে, হাওয়ায় না ভেসে, কেবল কবিতার জন্য কবিতা, এই মতে সীমাবদ্ধ হননি। তিনি কবিতাকে করেছেন প্রয়োজনীয় হাতিয়ার চিনিয়ে দিতে জানিয়ে দিতে অবহিত হতে যে পানি কেবল পানি না, সে রূপান্তরের অক্সিজেন ও হাউড্রেজেন-এর মৌল, সে বাষ্প হয়, সে জমাট বাঁধে, বরফকুচি হয়, সে হাওয়ায় ভাসে, সে শীতল করে ধরিত্রিমাতার খরদাহতাপ। তেমনি সমাজ রাষ্ট্র মানুষের, একান্ত দর্শন জীবনও তার। মানুষ সে সমাজের মানুষ যার ঊষ আছে এবং মানুষ বললেই এই দুইসত্য যুগপতভাবে উদীয়মান হয় আমাদের মনে, এমনি তাঁর কবিতাগুলোর বহুমাত্রিকতা আমাদেরকে নানা ভাবে ভাবালেও একটি সত্যে উপনীত করে তা মানুষ, এই হলো মানুষের দর্শন সত্য কেবল মানুষের জন্য । কারণ মানুষ আকস্মিক নয়, দীর্ঘপথ পরিক্রমায় সে বহন করছে তার স্মৃতি, শ্রুতি তার অনুভুতি ও অনুভবের বিস্তার। এ যেন মাটির স্তরের মতো, প্রত্যেকটি স্তর যেমন আলাদা সময় ও কালের কথা বলে আবার প্রত্যেকটি স্তরে মিশে রয়েছে কালের ধারাবাহিকতা যা দিয়ে আমরা আমাদের সময় কালে দাঁড়িয়ে দেখে নিতে পারি অতিক্রান্ত সময়ের মানুষগুলো, বিশ্বাসের বৃত্তান্তগুলো, অগ্রগতি ও স্বভাবের নিয়মগুলো কর্ম ও বসবাসের প্রাচুর্যগুলো । জানতে পারি মানুষের অতীত ইতিহাস এবং দেহমন ও রূপান্তর। অবস্থার ফেরে অনেক কিছুর বদল যেমন স্তরগুলো বাতলায় তেমনি মানুষ যে ভাবনা, রুচি, অভ্যেস এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তার কৃৎকৌশল তার মনধারায় বহন করে এগিয়ে চলছে তার প্রতিফলন রয়েছে আমাদের দেহকান্ডে। উভচর জীবনের অনেক লুপ্ত চিহ্ন বর্তমান রয়েছে যদিও তা বেখেয়ালের, প্রয়োজন নেই তাই সে সব আমরা আমলে নেই না, তেমনি আজিকার চলার গতিতে তার উপস্থিতি থাকলেও তা অনুধাবন ক্রিয়ায় দৃষ্টিগ্রাহ্যও হয় না। তাই বলে তা নেই, তাতো নয- আছে, তেমনি আমিনুল ইসলামের কবিতায় আমরা সেই চিহ্নগুলো শনাক্ত করতে পারি, এবং দেখতে পাই যা সে লিখছে আর যে সব ঠুনকো বিষয়কে বিষয় করে বিষয়ের গৌরবে উচ্চকিত করেছে তা সবই মানুষের। অর্থাৎ মানুষ লগ্নতা তার কবিতায় মূল প্রতিপাদ্য।
‘‘ অথচ তোমার জন্য বসে থাকি অজুহাতের স্টেশনে-
ইচ্ছাকৃত ফেল করে আহ্নিকগতির ট্রেন!
তুমি আসতে চেয়েছো অথবা চাও-এর বেশি কোনে কিছুই তো ঘটেনি;
তোমার আসতে চাওয়াটা কেন এতো ব্যঞ্জনা রচে আমার
এলোমেলো ভাবনায়-আমি সেও বুঝি না! তুমি যদি বা আসোই—
সেও তো নিজ কক্ষপথে ফিরে যাবার জন্যই আসবে-
এতোটুকুও রয়ে যাবে না-
রেখে যাওয়ার মতো কিছুই আনবে না সাথে,-
তোমার জন্য কেন এই অদ্ভুত অপেক্ষা ‘’
(মহাবিশ্ব)
[কবিতাটি নিবেদিত পৃথিবীর রঙের এক মানবীকে] পৃথিবীর রঙ কী, দৃশ্যগোচর যে রঙে আমরা পৃথিবী দেখি তাই? যেমন বিজ্ঞান বলে পৃথিবীর রঙ নীল, কেউ বলে লাল, কেউ বলে ধুসরও; বলতে পারে যার যার দৃষ্টির গ্রাহ্যতা থেকে। যে রঙেই আমি তারে রাঙাই সেই-ই হবে তার রঙ। কবিতা একইভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্যসীমার মধ্যে পারঙ্গমতায় নানারূপ আনন্দকে ধারণ করে যার প্রচল ব্যাখ্যা পাঠকের মনের ক্রিয়ায়, ব্যাকরণে নয়। যেমন পৃথিবী আমার মানসপ্রিয়া ধরিত্রি মাতার দুহিতা, সে আসবে, কেমন করে আসবে তাতো জানি না, আমি তো বসেই আছি তার স্টেশনে, যেমন করে এসেছিল প্রথম মানবী প্রাচীন গ্রন্থ বলে; ‘লিলিথ’ সে আদমকে অস্বীকার করেছিল, পুরুষ কর্তৃত্ব স্বীকার করেনি, কারণ দুজনই ছিল মাটির সৃষ্টি। সে কামপ্রাবল্যকালে পুরুষের নিচে থাকতে চায়নি। তাই আদম ব্যর্থ হয়েছিল এবং ঈশ্বর পরে ‘ইভকে’আদমের পাঁজর থেকে তৈরি করলেন যাতে সে অধীন হয়, সে সব তর্ক গ্রহণে কবিতার কাজ কী? এই প্রশ্ন যে কেউ করতেই পারেন, আমিও করি কিন্তু যদি ভাবি কবিতা যখন তৈরি হয়ে যায় কোনো বিষয় থেকে তখন বিষয়টি আর সেই বিষয় থাকে না, তার একমুখীনতা বহুমুখে প্রসারিত হয়, এক গতি থেকে বহুত্বের গতিপ্রবণতা সৃষ্টি করে, এক অবয়ব থেকে নানা অবয়ব সে লাভ করে। সে কারণে প্রকৃত ‘লিলিথ’ আর প্রকৃত ‘হাওয়ার’ মধ্যের বহুত্বের ভাষণ আমরা দেখতে পাই। তবে কি ‘লিলিথ’ ‘ইভ’-এর ভার্সন, আর কবি তার মানসজগৎকে দেখছেন জগতের রঙে যার ফিরে যাওয়া ফিরে চাওয়া আসা ও যাওয়া একটা গতির ভেতরে নিরাসক্ত ও নৈর্ব্যক্তিক। আর প্রেমিক-এর মতো তার যত আকুতি এই পৃথিবীরংয়ের মানসকন্যার কাছে, নিবেদন ‘হে পৃথিবী, হে আমার ডাঙা ও জলের সবখানি ভালোবাসা, আমাকে ধরে রাখো-বাড়িয়ে দিয়ে তোমার অভিকর্ষীয় টান’ এই ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ম ও রীতি যে যার পথে ধাবমান একটা রীতির মধ্যে কবি তার মানসপ্রিয়াকে তাই স্মরণ করাতে গিয়ে একজন রহস্যপ্রিয় ভাবুক হয়ে উঠলেন পলকেই, পাঠককে নাড়িয়ে দিতে চাইলেন আরেক ভাবনায়, যে কবিতাটি প্রেমের, কবিতাটি প্রিয়ার আগমন ও নিস্ক্রান্তির; পৃথিবীর আহ্নিকগতি ও বার্ষিকগতির ধারায়– দুই মাত্রা থেকে দুই দিকে মুখ করে থাকা এটাই এই কবির গুণ। এই কবি যা দেখেন যা বিধৃত করেন তার মধ্যে এই যে রহস্যময়তা বিস্ময়বোধক চিহ্ন দিয়ে উহ্য রেখে গেছেন।

কবি আমিনুল ইসলামের কবিতায় আমিনুল ইসলামের কবিতায় কিছু কবিতা পোষ্টমডার্ন নিয়মরীতির আঁচ দেখা যায়। এই কবিতাগুলো আজ আর নতুন কিছু নয়, তবু আমাদের বাংলা সাহিত্যে এর উপস্থিতি এখনও প্রবল নয়। এর যুক্তিগুলো থাকে ভাঙা, অর্থাৎ লজিক নির্মিত নয় । সে বিষয়ে আমি আগের প্রবন্ধে আলোচনা করেছি যা পুস্তকবদ্ধ হয়েছে, সে কারণে এখানে আর উল্লেখ করছি না। শুধু মাত্র তাই নয় প্রায় সকল পশ্চিমা কাব্য-আন্দোলনের তত্ত্বের কিছু কিছু প্রয়োগ চেষ্টিত হয়েছে তার কোনো না কোনো কবিতায়। রয়েছে অতিবাস্তবতারও ছাপ। তিনি একটা সম-মাত্রিকতায় দেশজ লোকজ ভাষাকে ভাষাভঙিকে আত্মীকরণের মধ্যদিয়ে নিজ ঐতিহ্যে সাঙ্গীকরণ করেছেন নিজের মতো। বাস্তবে তাই করতে হয়। যে দৃশ্য বা দৃশ্যমানতা পশ্চিমের সেই ঘটনা এখানের বিষয় হতে পারে, কিন্তু দুটো স্বাদে ভিন্নতা থাকে, আমিনুল ইসলাম সেটুকু চিত্রিত করেছেন সেই ভাবেই । শীতের ফসল শীতেই ফলে গরম কালে তা করতে গেলে গ্রীনহাউজ লাগে, তারপরও তার আমেজ ঠিক থাকে না, তেমনি কবি তার বহু কবিতায় স্টাইলকে আধুনিক উত্তরাধুনিক কাব্যপ্রয়াশে মুর্ত করলেও তার স্বাদটি তিনি বাংলা কবিতার মধ্যেই প্রথিত করতে চেয়েছেন। কবি হিসেবে এই দক্ষতা কাঁচা হাতের নয়, একেবারে হিসেবী। কড়ায় গণ্ডায় শোধবোদ তুল্য ।
‘‘ নারদ বাতাস বহে–মালির হাতের ছোঁয়ায় ‘না করে
তৃষিত বাগান
ঘরে ফেলে মালি-ঘর কই? দ্বারেই বিস্ময়-
পুরাতন চাঁদ–মুখ ফিরিয়ে সে হয়েছে আঁধার!
নারদ বাতাস বহে–নিউপার্কে সমুদ্রসৈকতে
প্রেমিকার ঠোঁট হতে খসে পড়ে প্রেমিকের ঠোঁট ”
(‘নারদ বাতাস’)

বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার দোলাচালে কবিতাটি নির্মিত একটি ছোট কবিতা বিষয় ও নির্মাণে দেশজকলা রূপ-মাধুরীতে বাঙালিয়ানা, পরিমিতিতে মাপা ‘নারদ বাতাস বহে’ বাতাস কেমন আর নারদই বা কে? যাকে অনেক চেনেন না চেনার কোনো কারণ নেই, আর্যমিথে তিনি মানব যোগতপ যোগ্যতা ও ধূর্তামি বলে তিনি স্বর্গের দেবতার মর্যাদায় মহর্ষী নারদ তার বহুগুণ, নিদানে বিধানে, দ্বন্দ্বে সংঘাতে সে এমন এক ত্রাস যে দেবতাকুল তাকে অগ্রাহ্য করতে পারে না, নানা ছলচাতুরী একে ওর বিরুদ্ধে লাগান, ঝগড়া উপভোগে পারঙ্গম এবং মীমাংসার পুরোহিত। তেমনি বাতাস ‘নারদ’ সে কেমন করে হয়? হয়, কারণ এখানে বাতাস মনে পরিস্থিতি যা দখল করে রেখেছে মানুষের সহজ হৃদয়বৃত্তি, যা প্রতারিত হচ্ছে, বিভ্রান্ত হচ্ছে ঠকছে, ঠকাচ্ছে। আর মানববাগান তৃষিত, তার জল মেলে না, খাদ্য মেলে না, তার নিস্তার মেলে না, সে খোঁজে রাষ্ট্র প্রশান্তির নিরাপত্তার, বিকাশের। কিন্তু সেই নিস্তার তার নেই, আর যখন সে মুখ ফিরায় তখন দেখে সম্ভবনা আঁধার হয়ে গেছে লুকিয়েছে প্রত্যাশা। এমনি এক চিরন্তন তৃষ্ণা থেকে যাচ্ছে মানুষের। তার ঘর নেই আশা ও আশ্বাস নেই। আর প্রেমিকের ঠোট খসে পড়ছে প্রেমালিঙ্গন হতে, অর্থাৎ নিভৃতি থেকে, নিরাপত্তা থেকে, একান্ত নিজের সময় থেকে। এই কবিতায় কয়টা বিস্ময়সূচকচিহ্ন রয়েছে এবং কয়টা [-] রয়েছে যেগুলো যুক্তিকে নতুন যুক্তি দিতে চাইছে, প্রযুক্তিতে কেবলই চিহ্নমাত্র যা ভাঙনের তীরে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে যুক্তি, চলমান সভ্যতা। সে নারদ বাতাস সন্ত্রস্ত করছে জীবন ও প্রণালী।
ছোট্ট চার পঙক্তির একটি কবিতায় আমরা কবির অন্তর বেদনা থেকে উদ্ভূত ঘৃণা, বিরক্তি, অসহিষ্ণুতা যা তিনি নিপুণ এঁকেছেন তার সন্ধান পাই এভাবে “গুলিতে মরেছে বাঘ, সিংহ লুপ্তনাম/হরিণেরা দৃশ্যচ্যুত যেহেতু হালাল/পোষ মেনে ঐরাবত শেখে ভুল কাম/বাঘছাল পরে হাসে বাঘের দালাল’ (ক্ষমতার দৃশ্যপট/জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার) মনে হয় এর পুরোপুরি ব্যাখ্যা কোনো প্রয়োজন নেই, কেবলমাত্র শিরোনামটাই যদি এর ব্যাখ্যা হয়, তাহলেও পাঠক তার কল্পনা থেকে আন্দাজ করতে পারবেন কিরকম ব্যঙ্গ বিদ্রুপ রয়েছে তাঁর এই কবিতায়, কিন্তু অতিরঞ্জন নেই। শিল্পের শৃঙ্খলা কবিতাটিকে চমৎকৃত করেছে, এবং পরিমিতি একদম মাপা ‘বাঘছাল পড়ে হাসে বাঘের দালাল’ যা আমরা বেশ কয়েকবার দেখছি। জীবনানন্দ দাশ তাঁর জীবনকালে কোনো রাজনীতির প্রত্যক্ষ কর্মী বা অনুসরণকারী ছিলেন বলে জানা যায় না, তবু তাঁর কবিতায় রাজনীতি অর্থাৎ কী হতে পারতো কী হওয়া উচিৎ কী তার প্রার্থনা তা উপলব্ধি করা যায়। ‘ইতিহাস অর্ধসত্যে কামাচ্ছান্ন এখনো কালের কিনারায়;/তবুও মানুষ এই জীবনকে ভালোবাসে; মানুষের মন /জানে জীবনের মানে’ এখানেই কবির স্বচ্ছতা। জীবন সত্যে উপস্থিত থাকা। কবির অনেক কবিতায় সে সত্য প্রতিভাত হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম কবি, তার চিন্তা ও কল্পনা দূরগামী মিতভাষণে কখনও কখনও হয়ে ওঠে বহুতর বিস্তার। প্রদীপের নিচে: ‘একটি অন্তর্বর্র্তীকালীন রিপোর্ট’ কবিতা টি যে কেউ পাঠ করলে সহজ গমনে স্বচ্ছন্দ পাবেন। যা নিত্য চতুরপার্শিক চাতুরীপূর্ণ এবং চলমান ছলনাময় ও যাতনাক্লিষ্ট। কিভাবে এক গতানুগতিকতায় সমাজ আবদ্ধ হয়ে আছে, কি ভাবে মেধার অপচয় হচ্ছে কিভাবে রাষ্ট্র মানবীয় না হয়ে হয়ে আছে অধিনীয় নানা ব্যঙ্গ বিদ্রুপের মধ্যে এই সব বিধৃত হয়েছে কাব্যে। “উঠুন ! জি স্যার, বসুন! জি স্যার। হাঁটুন ! জি স্যার। দৌড়ান! জি স্যার ” প্রত্যেকটিতে রয়েছে বিস্ময় চিহ্ন, মানে সিস্টেম কিভাবে প্রতিভাকে পঙ্গু করে, কিভাবে রাষ্ট্রীয় কূপমণ্ডূকতা ব্যক্তিস্বাধীনতাকে হরণ করে, সেই কেরাণী গল্পের মতো কিভাবে ব্যক্তিজ্ঞানকে পদদলিত করে কূপমণ্ডূকতা তার চমৎকার উপস্থাপনা রয়েছে সারা কবিতার শরীরে। আর যে প্রদীপ অন্ধকার বিদূরিত করে তার নিচেই জমে উঠছে কালের মহান্ধকার। তাই শেষ উচ্চারণ ‘দুর্বলের ঘাড়ে পা রেখে /দাঁড়িয়ে আছে তন্ত্র;/তার দুটি হাত-অয়লী এন্ড ইনভিজিবল/একটি হাত ছুঁয়ে আছে দেবতার পা,/অন্যটি দৈত্যের’ কি চমৎকার উপমা। এই উপমা গতানুগতিক নয়, নতুন নির্মাণ।
আমিনুল ইসলাম প্রথাবদ্ধ কবি নন একেবারে। প্রথার বিরুদ্ধও নন তিনি। তাঁর কবিতায় ছন্দ-প্রয়াস নেই বললেই চলে। আবার অনুসন্ধানী চোখে দেখলে দেখা যাবে ছন্দ জড়িয়ে রয়েছে তার ভাষ্যগুলোতে। তিনি তার কবিতার জন্য একটা ছন্দ তৈরি করে নিতে পেরেছেন,যাতে টেক্সট এবং সাবটেক্সটগুলোর পরম্পরা থাকে। এতে কখনও স্বরবৃত্তের কখনও অক্ষরবৃত্তের কখনও মাত্রাবৃত্তের একটা আমেজ পাওয়া যায় যা সকল মিলে একটা নিজস্বগড়ন তৈরি করেছে। আমি নিজেও তার পক্ষের। প্রচলিত ছন্দ হচ্ছে আবদ্ধ মানসিকতার বিস্তার। প্রচলিত ছন্দ আধুনিকতাকে গতিহীন করে। প্রাচীন কালের মানুষ ছন্দদ্বারা মোহগ্রস্ত করার কাজটি করত। [ তন্ত্রে মন্ত্রে ফ্যাটিজমে,] আজ আর কবিতায় মোহগ্রস্ত করার কোনো অযুহাত কুলায় না। আজ কবিতা পুরানোর কতকিছুর বদল ঘটাবে তার চেষ্টা লক্ষণীয়। কারণ পাঠকের রুচি অভ্যেস চেনা জগতের মধ্যে নেই। বিপুল বদল ঘটেছে। নতুন বিজ্ঞান তাদেরকে ফেলেছে গতির মধ্যে।কিন্তু মনটি পড়ে রয়েছে যাদের পুরানে তারা এসব গ্রহণের জন্য এখনও এখোনকার হয়ে উঠতে পারেননি। আয়েশ করে বিছানায় শুয়ে হুকো সাজিয়ে ছন্দ পড়ার সময় আর নেই। পশ্চিম শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে একাজটি করেছে বহু আগে। তাদের রেনেসাঁ তৈরি করেছে শিল্পবিপ্লব যা সামন্তীয় সমাজ থেকে অনেক বেশি প্রগতিশীল। আর আমাদের রেনাসাঁ উপনিবেশিক শক্তির সাথে আঁতাত করে মিলে চলবার প্রয়োজনে নির্মিত। ফলে বুর্জোয়া বিপ্লব মানে ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকেছে অবহেলিত। হেলেনিক যুগে যা ছিল এলিজাবেথীয় যুগের পেত্রাকান সনেট কেউ লেখে না,সনেটই লেখে না নতুনরাও, তবু কেউ কেউ কৃতিত্ব জাহিরের জন্য একাজটি করে। অথবা করে পুরানো মানসিকতার তাড়নায়। ভিক্টোরিয়ান যুগের সমাপ্তি ঘটেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কবিতার ক্ষেত্রটিই ফেলেছে একেবারে পাল্টে। আজ কবিতা ঐতিহ্যকে ভাঙতে চাইছে নতুন ঐতিহ্যের জন্য। এলিয়ট বলেছিলেন ‘ঐতিহ্যের নবায়ন’। চাঁদমামার গল্প আজ আর না, রাজকুমারও ঘোড়া দাবড়ায় না। আর রজকন্যাও সোনারকাঠি রূপারকাঠি দ্বারা আটকে থাকে না। আজকের রাজকন্যারা আধুনিক। কাব্যের পঙক্তিও তাই গেছে বদলে। কবিতা এখন আর প্লেটোনিক সৌন্দর্যের বাহন নয়, এখন সে টগবগে ঘোড়া। বর্ণনার মেদ কত কমান যায়, উপমার ভার কত হাল্কা করা যায়, কত নিটোল ভাবে একটি পঙক্তি সকল সরলতা নিয়ে মনোজগতে পৌঁছাতে পারে, তার কাজ দেখি নানা কবিতায়। ‘মানুষ কি মরে’ এই জিজ্ঞাসা নির্ধারিত একটি বিষয়কে ভাঙে, কারণ মানুষ মরে এই সত্য প্রকৃতিগত, কিন্তু মানুষ যে মরে না এই সত্য ইতিহাসের। আমিনুল ইসলামের কবিতায় তার উপস্থিতি রয়েছে। কমে গেছে, বাড়তি উপমার ভার অপসারিত হচ্ছে অলঙ্ককারের বাহুল্য। দিতে চাইছে পাঠককে একটা মেসেজের আনন্দ। ইনফরমেশন যা আগামীর সব চাইতে মূল্যবান বিষয় হয়ে উঠবে। এবং সমাজ দুই শ্রেনিতে স্পষ্টাপষ্টি ভাগ হয়ে যাবে। একদল মানুষ শ্রম বিক্রি করবে, আরেকদল শুধু কিনে সম্পদের পাহাড় গড়বে। আমিনুল ইসলাম তার কবিতায় সেসব সত্য নানা দৃষ্টির দিকবলয় থেকে প্রতিফলিত করেছেন: নতুন রূপের। [আবার কবিতা যে কেবল সত্যই বলে তাও না তবে সত্যের বসবাস আছে তার মধ্য] তাই কবিতা বুদ্ধির, প্রজ্ঞার আর হিসেবী নির্মাণের এর দ্যুতি এর অন্তরস্থিত ভাষায়, টেক্সটগুলো বিন্যাসে এবং পরম্পরায়। প্রস্তুতি পর্বে যদিও বিশৃংখলা লক্ষণীয়, কিন্তু তা প্রতিটি বাকবদলে আমরা লক্ষ করি নতুন কিছু । প্রস্তুতি পর্বে এমনই হয় মাঝ পথে উত্থান ও শেষ পর্বে সংহতি। লোকজ বিষয় আশয় এখন ইতিহাসের উপাদান, একদিন এই সভ্যতাও ইতিহাসের উপাদানই হবে, হয়ে যাবে সেই কালের লোকজ। গবেষণায় লাগবে। আর কবি ব্যবহার করবেন নতুন ও পুরাতনের ব্যবধান চিহ্নিত করবার জন্য। কোন সমাজ তার অতীতকে মাথায় তুলে হাঁটে না, কোনো পথিকও না, সে নদী পার হলে নৌকা কাঁধে গন্তব্যে পৌঁছায় না, অতীতকে জেনে রাখা দরকার, নতুন অভিজ্ঞতার ভুলগুলো শুধরে নেয়ার জন্য। কাব্যক্ষেত্রে কেউ কেউ প্রচলিত ছন্দকেই কবিতা বোঝে যেমন একদল মানুষ পুরাতন হাওড়া ব্রিজকেই শ্রেষ্ঠ টেকনোলজি ভাবে, [সেটা সে কালের] এরা গতাযুর আয়ু ধরে বিরাজ করছে মানসিকতায়, এরা ঐতিহ্যকে ঐতিহ্যের মধ্যে রেখে হামামদিস্তা দিয়ে কুটছে, তাতে তাদের কবিতায় নতুন নেই আছে যা তা বাষ্পীয় আর দুর্বল শব্দমালার মিলের ঝঙ্কার। মিলকেই এরা কবিতা ভাবে, মূলত সে কাল আমরা অতিক্রম করে এসেছি। নব্যধারায় এখন কবিতা চিন্তারমতো বিপুল শাখা-প্রশাখায় প্রসারী, তা ফাটকা বাজারের চিন্তা নয়, তাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্থিতি আছে, ঐতিহ্যের পরম্পরা আছে। সে কারণে নন্দনতত্ত্বে একটা স্থির তত্ত্ব রয়েছে যে ‘একজন কবির নিজস্ব ভয়েস থাকতে হবে’ এই নিজস্ব ভয়েস নিজের মতো বটে কিন্তু ভাষার মসৃণতার জন্য তাকে তৈরি করতে হবে নিজস্ব রঁদা ছেনি হাতুড়ি বাটালী দিয়ে। আর সে কাজের জন্য শব্দের পেলবতা তৈরিতে যে ছন্দময়তার আমেজ দিতে হয়, তা হবে একজন কবির নিজস্ব ভাষা নিজস্ব ‘স্টাইল’ যাকে আমরা ‘শৈলী’ বলি। প্রচলিত বিষয়গুলো থেকে মানবসভ্যতা বিযুক্ত হচ্ছে, যাচ্ছে নতুনে। যুক্ত করছে নতুন। নতুন কে যেমন রোখা যাবে না, তেমনি হাল না ধরে পুরানো গঙ্গা ভেবে নৌকাও স্রোতে ছেড়ে দেয়া যাবেনা, নিয়ন্ত্রণ তার সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই হতে হবে। প্রত্যেক কবি তার সমকালের কবিতাই লিখবেন, সে কাল বদলের মধ্য দিয়ে এগুবে সম্মুখে, কেউ তার অতীত আর আগামী নিয়ে লিখতে পারে না কারণ বস্তুর আগামী বিকাশ তার জ্ঞতিতে নেই, এই রূপান্তরক্রিয়া অনুধাবনের শক্তি কল্পনায় থাকে বলেই কবি আগামীর। এজন্য একদিকে যেমন সামাজিক কাঠামো বদলাতে থাকবে, অন্যদিকে লেখক শিল্পীরা আরো নতুনের স্বপ্ন দেখাবেন সমাজকে, পুরানো পোষাকটা বদলে নতুন পোষাকটা গায়ে চড়িয়ে। নতুন তাকে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, প্রচলিত ছন্দে নয়, অভ্যেস বদল করে পাঠককে এগুতে হবে স্বচ্ছন্দের ভাষায়, নিজেকে স্থানান্তরের, তবে তিনি কবিতার স্বাদ নিতে পারবেন এবং কবিও হয়ে উঠবেন আপন স্বভাবের নতুন বুননের নকশিকাঁথার কারিগর। নইলে তো সবাইকে ফিরতে হবে চর্যার যুগে। তেমন অনেকেই আছেন।[ মানুষটি এই কালের মনটি সেই দুসমন্ত আর শকুন্তলার] অনেক বিজ্ঞদেরও দেখি মাথা ঝুকিয়ে রয়েছেন প্রচলিত অক্ষরবৃত্ত, না হয় মাত্রাবৃত্ত, না হয় স্বরবৃত্তের বৃত্তান্তে। আহা, এ হলো ব্যকরণ, এর বিনাশ নেই, কী যে কি কার হয়ে গেছে, সাদা যে শাদা হয়েছে এবং অসংখ্য পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে যে ব্যাকরণ নির্মিত হচ্ছে তা মান্য করার তাগিদ থাকলেও প্রচলিত ছন্দই হবে কবিতার বাহন। ছন্দও যে নতুন রূপ ও নতুন দ্যুতি পাবে ভালো গদ্যেও যে এক প্রবল ছন্দ রয়েছে সে কথা ভাবতে পারছেন না। আবার ঘুরিয়েও তারা বলেন: কবি ছন্দ জানলেই ছন্দ ভাঙতে পারেন। তা হলে কবি আমিনুল ছন্দ তৈরি করেননি এবং লেখেননি এ কথা আমি বলি কি করে? এ হলো এক তামাশা। যে রকম তামাশা, সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিন্নস্ত রয়েছে। যেমন ‘অসৎরাই কেবল উপদেশ দেয়’।
তা হলে ছন্দমিলে কবিতা লিখতে হবে, এটা জরুরী নয়, জরুরী ছন্দ তৈরি করতে হবে। নারীর শরীরে সৌন্দর্য কোনো মাত্রা বৃত্ত অক্ষর বৃত্ত বা স্বরবৃত্তের নয় তার দেহপল্লবের। মাত্রা তার গঠনে কেবল নারীর মতই। কবিতার ছন্দ কবিতার শরীরমাফিক। সম্ভবত আমিনুল তা মানেন এবং আমিও–এই মানাই আধুনিকতা। শান্তির কবিতা যাত্রা কবিতার উৎকর্ষতা অর্জনে কোনো সহায়ক নয়। ভালো কবিতা লেখার জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন চর্চার, যৌথ এবং একক। অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষণ অনুভব ও বিস্তার এই হলো শর্ত । সেটা কেবল কবিতা চর্চার জন্যই নয়, দরকার সমাজ রাষ্ট্র অর্থনীতি ইত্যাদিকে জানা, নতুন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো। কবিতা ‘শান্তির কথাই বলে, শান্তির প্রত্যাশা করে, সত্যের বিবৃতি দেয়, সত্যকে নাড়ায় শান্তির জন্যই। যখন কবিতায় জোর কমে যায় তখনই শুরু হয় নানা বাহানা।’ কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার গোপন পরিকল্পনা।
আমিনুল ইসলাম তেমন বাহানা তার কবিতায় উন্মোচিত করেননি বরং বাহানাগুলোকে প্রকাশ্য করে দিয়েছেন তার নানা কবিতায়। ‘ হাতগুলো নিম্ন বেতনভুক;/হাতগুলো হাড্ডিসার/হাতগুলো ক্ষয়-সহিষ্ণু সড়ক;/হাতগুলো স্লোগান ভুলে যাওয়া মিছিল’ তখন শান্তির উদ্ধারকারী পদযাত্রা কী একটা ভণিতার মতো মনে হয় না? এমনটি নন কবি, তোয়াক্কাও করেননি তার অবস্থান, যে অবস্থান থেকে নিচে তাকানোর নয় বরং নিচকে শাসনে শোসনে বন্ধনে মতলবে আকটকে দেয়াই কাজ। এখানেই কবি আমিনুলের স্বাতন্ত্র্য।
আমার পূর্বের প্রবন্ধ থেকে পুনরাবৃত্তি করে বলি, ‘একটা অদ্ভুত সম্মোহন আছে,তার কবিতায়, আছে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ, সমকালকালীনতা, রাজনীতি,সমাজ-দর্শন। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতা একটু বেশী মনোযোগ দাবী করবে, তা যতোই হোক, তাঁর অধিকাংশ কবিতায় কবিতাপ্রেমীরা যদি একটু মনোযোগ দেয় পাঠে, তা হলে কিছু বাড়তি বিষয়-আশয় পেয়ে যাবেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। যদিও প্রকৃত শিল্পের কখনো কোনো ব্যাখ্যা হয় না, যা কিছু বলা হয়, তা পাঠকের মুগ্ধতার অভিব্যক্তি মাত্র। নিরেট ছন্দ প্রয়াস কবি আমিনুল ইসলামের কাব্যচেষ্টায় খুব বেশী পরিলক্ষিত নয়, তবে দোলায়মান ছন্দে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য এবং প্রতিটি কবিতায় একটা বহমান লিরিক রয়েছে যা বাড়তি কাব্যগুণই বলা যায়। সেটাই তার সাফল্য।’

আর তাই বলেন ‘ বৃষ্টির নুপুর শুনে যে নদী নেচে ওঠে আপনার নিঃসঙ্গ অন্তরে/আর বলে ও আকাশ, চাওতো সিন্ধুমুখি পানিপথে সাথি হয়ে যাও/আমি তার কাছে সঁপেছিলাম আমার যাবতীয় জলশূন্য দিন। /আমার মতো আরো কি কেউ–যখন কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার ডাক দেয়–/দরখাস্ত জমা দিয়েছিল গোপনে গোপনে!
-এমনি সুন্দর সুন্দর অর্থময় বহুমাত্রিক দ্যোতনার কবি আমিনুল ইসলাম যার বয়ানে রয়েছে সামগ্রিক এক ভাবনা পজিটিভিজমের দিকের।
—————————-০০—————-