Home / সবিশেষ / সাযযাদ ভাই । নাহিদ আহসান

সাযযাদ ভাই । নাহিদ আহসান

naheed ahsanসাযযাদ ভাই । নাহিদ আহসান

আমি,মনিজা ও সাযযাদ ভাই ছিলাম অসমবয়সী বন্ধু। মনিজা আমার সমবয়সী ছিল। কিন্তু আমরা একসাথে হলেই বলতাম , সাযযাদ ভাইয়ের সাথে দেখা করবা? কখনও কখনও কবি সেঁজুতি বড়ুয়ার সাথেও
তার বাসায় যেতাম ।
সাযযাদ ভাই ,ভাবী – তাদের মেয়ে টুপুর ও ছেলে টোটেন এর সাথে দেখা হত। বলতেন , ‘ মেয়ের নামটি রাখা হয়েছে বৃষ্টির শব্দ থেকে আর ছেলের নামে আছে মিশরের সেই সম্রাট টুটেন খামেনের স্মৃতি।’
আমরা আড্ডা দিতাম। ভাবী চা নাস্তা নিয়ে এসে আমাদের সাথে যোগ দিতেন । কি মধুর ছিল সেইসব দিন।

আমি তাকে কবিতা দেখাতাম । তিনি সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা বলতেন। কিছু কিছু শব্দ তিনি পরিবর্তন করতে বলতেন। যে সেব শব্দের কথা উল্লেখ করতেন , পরে আমি চিন্তা করে দেখতাম, সেগুলো আসলে সেই কবিতার জন্য অমোঘ ছিল ।
তাঁর রচিত প্রথম দিককার গল্প গুলো বেশ জটিল। সেগুলো পড়ে আমার মনে হত তার প্রবণতা আসলে জটিলতার দিকে। কিন্তু তিনি সাধনা করে সরল লেখনী আয়ত্ত্ব করেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন ,`The great art lies in hiding art.”
তার কবিতা পড়তে গেলে মনে হবে, এতো বাতাসের মত সহজ , কিছুই না।ওই কিছুইনা আয়ত্ত্ব করতেই সাধনার প্রয়োজন হয় যা আসলে অনেককিছু।

তার বাসায় অনেকগুলো স্টীল আলমারি ভর্তি শুধু বই ছিল। চোর ডাকাত আসলে তারা নিশ্চই তালা ভেঙ্গে অবাক হয়ে যেত ।
ক্যাজুয়ালি ক্লাসি এর অনুবাদ হচ্ছে “ যথেচ্ছ ধ্রপদ” তিনিই বলেছিলেন।এই নামে তার বই আছে । এই প্রবণতা তিনি তার জীবন ও সাহিত্যে ‍চর্চা করতেন। আমরাও এই জীবন দর্শনের ব্যর্থ অনুসারী।

তার লাভ ষ্টোরী এর অনুবাদ পড়ে আমি হতবাক হয়েছিলাম। তার কাছে বই নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করাতে, তিনি তার স্বভাবসুলভ প্রাণ খোলা হাসি হেসেছিলেন।

তার বাসায় আমরা প্রথম লাভ স্টোরী ছবিটা দেখি। আমার এখন ভাবতে অবাক লাগে , তিনি যে আমাদের বয়সে অনেক বড় ছিলেন তা শিল্প,সাহিত্য বা সিনেমা নিয়ে কথা বলার সময় কখনও মনে হয়নি ।

আমার জীবনে যখন বড় কোন ঘটনা ঘটে ,তখন আমি হতভম্ব হয়ে চুপ হয়ে যাই । আমি তখন ইংরেজী কবিতা লিখতাম এবং সবার বিদ্রুপ হজম করতাম। “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান।”
সেসময় মানব জমিনে দেখলাম , সাযযাদ ভাই আমার ইংরেজী কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। দুটো পাশাপাশি ছাপা হয়েছে । জীবনেএত অাজগুবি ঘটনাও ঘটে ! এমনিতে তো তিনি কবিতা দেখাতে গেলে কত দোষ ধরতেন!
আরেকটি অজব ঘটনা ঘটল পরে। মনিজাকে একজন কবিতার বই উৎসর্গ করেলেন। তিনি ছিলেন সাযযাদ ভাইয়ের স্নেহভাজন। মানুষের জীবনে এমন সময় থাকে, বিশেষ করে মেয়েদের, কেউ তার প্রেমে পড়লে সে ভীষণ রেগে যায়। মনিজাও ক্ষেপে গিয়েছিল।

পরের বছর সেই ভাবের পাগল আমাকেও বই উৎসর্গ করলেন। সাযযাদ ভাই এই নিয়ে প্রায়ই মুখ গম্ভীর করে বলতেন,‘ প্রথমবার মনিজাকে ,তারপর তোমাকে ,ব্যাপার কি ?’
আমরা আর কি বলব তাকে ? হাসব না কাঁদব? অবশ্য সাযযাদ ভাইয়ের মুখ গম্ভীর রাখার প্রচেষ্টায় আমার হাসি পেত।
পরে অবশ্য আমি প্রেমিকার দৃষ্টিতে নয় ,সমালোচকের দৃষ্টিতে কবিতাগুলো পড়ে দেখলাম ,ভদ্রলোক যখেষ্ট ভাল লেখেন। তবে আমাদের একেবারে দেবী বানিয়ে ছেড়েছেন। এটা অবশ্য তার সমস্যা নয়, পৃথিবীর তাবদ কবির প্রেমের কবিতার সমস্যা।

সাযযাদ ভাই ক্ষেপানোর জন্য কিনা জানি না , প্রায়ই বলতেন,তার সেই স্নেহভাজন খুব ভাল চাকরি পেয়েছেন। বেতন বেড়েছে। প্রায়শই গম্ভীর মুখে বলতেন দেখে আমি তার উদ্দেশ্য বুঝতাম না। উনি কি আশা করতেন আমাদের মধ্যে কেউ একজন তার বেতন বাড়ার সংবাদে প্রলুদ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করব !
এমনই ছিলেন সাযযাদ ভাই । কখনও অভিভাবক ,কখনও বন্ধু।
মনিজার যখন বিয়ে ঠিক হল ,তখন মনিজার মা তার কাছে ফোন করে পাত্র সম্বন্ধে খোজঁ নিতে বললেন। আমাদের বাসায় এসে একদিন তিনি আমার আব্বা আম্মার সাথে দেখা করে গিয়েছিলেন।

তার কবিতার বই , ‘এই যে আমি’ র প্রকাশনা উৎসবের দায়িত্ব বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে আমাকে দেয়া হল। শামসুর রাহমান ছিলেন প্রধান অতিথি।তিনি সাযযাদ কাদিরের কবিতার ‍সমৃদ্ধ বাকঁগুলো নিয়ে আলোচনা করলেন। সবাইকে মনে হল স্বতস্ফর্ত। আলোচকরা প্রাণ খুলে কথা বলছিলেন। জোর করে নয়।

সাযযাদ ভাই খুব রোমান্টিক ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল সমুদ্রের পাশে কোন এক বাড়িতে থাকবেন। খোলা জানালা দিয়ে ঢেউয়ের শব্দ আসবে। তিনি সেই শব্দ শুনতে শুনতে বই হাতে ঘুমিয়ে পড়বেন।

রাজনীতি,শিল্প ,সাহিত্য,চলচ্ছিত্র সব বিষয়ে তিনি ছিলেন চলমান তথ্য ভান্ডার। আমাকে উপহার দিয়েছিলেন চলচিচত্রের বিশ্বকোষ।

একটা কারণে তার সাথে আমার ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়। তাই অনেকদিন দেখা করিনি যদিও তিনি আসতে বলতেন অন্যদের মাধ্যমে। আমরা মানুষের স্নেহ ,ভালবাসাকে খুব মামুলি মনে করি। মনে করি চিরদিনই সব এমনি থাকবে। তাই দেখা করার প্রয়োজন বোধ করিনি।

আজকে যখন তার বাসায় যাচ্ছিলাম ভাবীর সাথে দেখা করব বলে, চোখ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ হীন জল ঝরছিল ।
আমি আমার মস্তিষ্ককে বললাম , ‘এতদিন তুমি আমাকে বুঝিয়েছ ,আমি তার উপর রাগ , তার সাথে দেখা করার প্রয়োজন নেই। এখন যখন দেখা করার উপায় নেই , সিগন্যাল পাঠাচ্ছ, তার প্রতি আমার মমতার কমতি নেই। এই হঠকারিতার কারণ কি ? তাহলে কাকে আমরা বিশ্বাস করব?’

তার বাসার গার্ড বললেন যে সবাই টাঙ্গাইলে চলে গেছেন। সেখানে তার কবর হয়েছে। মৃত্যু সব কিছুর উপর জয়ী হয় । রাগ, হিংসা, বিদ্বেষ , প্রতিদ্বন্দীতা, ভুল বোঝাবুঝি – সব কিছুর উপরে সে তার বাকাঁ হাসি হেসে চলে যায়। সাযযাদ ভাই আপনিই জয়ী হলেন ।

কোথায় যেন পড়লাম ,তিনি কোন রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার পাননি। এটা শুনে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল। তিনি কবিতা লিখতেন শিল্পকে ভালবেসে । পুনরাবৃত্তি করতেন না। পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন ভাষা ও ভাবনা নিয়ে। অবিরল কবিতা, দিবস ভিত্তিক কবিতা ,রার্ষ্ট্রীয় কবিতা তিনি লিখতেন না।

কোন একদিন নিশ্চই তার কবরে যাব টাঙ্গাইলে। যদিও জানি সেখানে ঘাস ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

আমার কবরে এলোমেলো ঘাসের দল
বাতাসে দোল খাবে কোন একদিন
সেইদিন তুমি এস
তুমি এসি দেখ সেই ঘাস

আসলে সেখানে ঘাসেরাই আছে
প্রবল অস্তিত্বমান ঘাস ।