Home / সবিশেষ / বিব্রত ময়ূর পাণ্ডুলিপি থেকে পাঁচটি কবিতা

বিব্রত ময়ূর পাণ্ডুলিপি থেকে পাঁচটি কবিতা

kobeta

বিব্রত ময়ূর পাণ্ডুলিপি থেকে পাঁচটি কবিতা

নাচ

‘এ তবে ময়ূর! আমি অন্ধভাবে ভেবেছি অপ্সরা!’

—এরা যদি উড়ে আসে অভ্রময় সুস্বাদু পালকে
অথবা ঝড়ের সাথে যদি আসে পঙ্খিরাজ ঘোড়া
সবাই দেখেছে যাকে—জন্মান্ধ শাদ্দাদের চোখে।

সেসব ময়ূর আর ঘোড়াগুলি কোন পৃথিবীর,
মাংসময় ছুটে গিয়ে ভেঙে দেয় কেমন প্রাচীর,
আহির ভাঁয়রো গায় ভোরবেলা—অস্থিচেরা রাতে
পঙ্খিরাজ ঘোড়া, নাকি ময়ূরেরা স্নান করে
আমাদের ঘামের প্রপাতে?

পরম্পরা

মাছের লেজের ঢঙে, মাছির ডানার ঢঙে জেগে উঠতেন আমার বাবা। তারপর ছুটতেন বাজারে। রাতে যখন ফিরে আসতেন মাছ ও মাছির গন্ধ নিয়ে, আমি ভাবতাম, আহা, একদা কি চন্দনের ঘ্রাণ নিয়ে আসতে পারেন না? তখন মোটেই জানা ছিল না, সেসব নিয়ম অনেক আগে উঠে গেছে, আজকাল শুধু মৃত্যু এই গন্ধ নিয়ে আসে)? আজ রাতে যখন বাবার শরীর ভর্তি চন্দনের ঘ্রাণ, ভাবছি, মাছ ও মাছির গন্ধ আরও বেশি ভালো ছিল!

২.
আমি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, ফিস চাইতে গেলে বাবা আমার দিকে ম্রিয়মান ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিলেন, যেন তার মনে পড়ে গেছে গত রাতের কথা, যখন আমি মোমের আলোয় চেঁচিয়ে পড়ছিলাম, ‘ফিস মানে মাছ, ফিস মানে মাছ…।’
তিনি মাছ কুটছিলেন। সেই মুহূর্তে আমার দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফলে তাঁর একটি আঙুল ছিন্ন হয়ে যায়। যেহেতু ফিস দেওয়া হচ্ছেই না, কিছু অ্যাডভেঞ্চার করা যাক ভেবে আমি সেই আঙুল রঙিন পেপারে মুড়ে স্কুলে জমা দিয়ে দিলাম।…এইভাবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দশ ক্লাসে দশটি আঙুল জমা পড়ে স্কুলে! স্কুল ছাড়ার আগে ফিজিক্স-টিচার দেখলাম শল্যচিকিৎসকের ভূমিকায় নেমে গিয়ে কাগজে মুড়িয়ে রাখা পুরাতন দশটি আঙুল আমার দুহাতে লাগিয়ে দিলেন। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমার সন্তানকে বিশ ক্লাস পড়াতে পারব। সেও নিশ্চয়ই তার সন্তানকে পড়াবে ত্রিশ-ত্রিশটি ক্লাস…
দর্জি

…তারপর তিনিও জানলেন সেলাই মেশিনের বেদনা।

—আমাদের পরিধেয় জামায় লেগে আছে সতের হাজার তেরটি
রেশমের বিদীর্ণ খোলস আর তিনজন দর্জির দীর্ঘশ্বাস।

কে না জানে, রেশমের প্রতিটি উড়াল আর দর্জির আলাদা আলাদা
সেলাইগুলির উহ্য গল্প থাকে—
প্রতিটি ফোঁড় বলে দেয়, তারা কেমন আছে।

সন্ধ্যা

এখনো সন্ধ্যা হলে খুব পাই টের
জিরাফের ভাষা শুধু একা জিরাফের

গাথা

পৃথিবীতে ঘুরছিল হাজার হাজার রাজহাঁস…

অকস্মাৎ উড়ে এসে পৃথিবীর অন্তিম ময়ূর
সাদাটে পেখম নিয়ে তাদের সম্মুখে বসে পড়ে।
প্রথমে হাজার হাঁস ঢেকে দিলো তার কেকারব;
ঠুকরে অহমরূপ তার সাদা পেখমসমূহ
তুলে নিলো। অতঃপর পাখনায় মেঘের মিনার
ঢেকে দিলো; গর্জনও। ফলত এই উপলক্ষহীন
আবহাওয়া আটকাল ময়ূরের তুমুল নৃত্য।
চর্চাহীন মজবুত নখ দিয়ে আজকাল সাপ
অদরকারী নির্মোক ঘষে ঘষে তুলে নেয় রাতে।

…ক্রমশ নিজেকে ভাবে রাজহাঁস, সাদাটে ময়ূর।

আমি জানি, পৃথিবীর অজস্র অঞ্চল জুড়ে ডাকে
হাঁসের চেহারা নিয়ে শতশত ময়ূর—বিব্রত।
তুমুল হর্ষের মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে যাবে, যদি
তোমাদের কানে আসে কখনো করুণ সেই ডাক।
————–

বিব্রত ময়ূর
রাসেল রায়হান
প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন
প্রচ্ছদ মাশুক হেলাল
মূল্য ১২০ টাকা

বিব্রত ময়ূর পাণ্ডুলিপিটি ক্লিন্টন বি সিলি এবং প্রথমা প্রকাশনী প্রবর্তিত জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার অর্জন করে।