Home / সবিশেষ / বাবার বই পড়া দেখে মুলত বই পড়তে উদ্বুদ্ধ হই-দীপংকর গৌতম

বাবার বই পড়া দেখে মুলত বই পড়তে উদ্বুদ্ধ হই-দীপংকর গৌতম

16216013_10210478394389846_কবি-প্রাবন্ধিক-গবেষক দীপংকর গৌতম-এর সাথে আসছে বইমেলাসহ সাহিত্য-বইপত্র লেখালেখী নিয়ে কথা হয় বইনিউজ সম্পাদক রবীন আহসানের ।


বাবার বই পড়া দেখে মুলত বই পড়তে উদ্বুদ্ধ হই-দীপংকর গৌতম

বইনিউজ : কতদিন ধরে বই পড়া? কত দিন ধরে লেখা?
দীপংকর গৌতম : বইপড়া কবে থেকে শুরু হয়, তাতো বলতে পারছিনা। লেখা শুরু করার আগে হাতেখড়ি হয়। বইপড়া শুরুর আগে এমনকিছু হয় কি? আসলে পাঠ শুরু হয় প্রথমে প্রকৃতির পাঠশালা থেকে। ঘুঘু, ফিঙে, লাল চিলসহ নানা প্রজাতির পাখি,বনবিড়াল,কুকুর বেড়ালসহ নানা প্রজাতির পশু, পুকুরে দুন্তর সাতার, দেৌড়ঝাপ, মা-দাদী-দাদী, নানা-নানীর কাছে শোনা গল্প এগুলোর মধ্য দিয়েই পড়া শুরু। বলা যায় প্রকৃতির মধ্য থেকে পাঠ নেয়া শুরু।  আসলে জগতে প্রকৃতিই বোধ করি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ,সেরা আশ্রয়। এখান থেকেই ভুমষ্টি হওয়ার পর থেকে সবাই পাঠ নেই। প্রকৃতি ও বই সমগোত্রীয় । একটি প্রান রক্ষার পরিস্থিতি তৈরি। আরেকটি মানবিকতা বৃদ্ধি করে -সভ্যতার কারিগর তৈরি করে। তবে বাবার বই পড়া দেখে মুলত বই পড়তে উদ্বুদ্ধ হই। বাবা বাম রাজনীতি করতেন,ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও। তিনি রাত জেগে বই পড়তে পড়তে ঘুমাতেন। বাবার কাছে ঘুমানোর কারনে বাবা সকালে উঠে যাওয়ার পর ওই বইগুলো হয়ে উঠতো আমার নাড়াচাড়ার বিষয়। এক সময় ওভাবেই শুরু। স্কুল জীবন থেকেই লেখা। কলেজের দেয়াল পত্রিকা সাহস’ সম্পাদনার মধ্য দিয়ে লেখা ছাপা শুরু। গোপালগঞ্জ থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্র’ পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা কবিতা দেখি।

বইনিউজ : সামনে বইমেলা। নতুন বই পাঠকরা পাবেন কি? আগামী কবিতা গ্রন্থ সম্পর্কে বলুন।
দীপংকর গৌতম : বইমেলায় অনার্য থেকে একটা বই আসছে। শ্রাবণ থেকে একটি নিরীক্ষা গ্রন্থ আসার সম্ভাবনা আছে। আগামী কবিতার বই, পরাজিত পাখির পালক আসবে শীঘ্রই।

বইনিউজ : নিজের বই ও লেখালেখিতে কতটা আনন্দ-বেদনা কাজ করে নিজের ভেতরে বিস্তারিত বলবেন কী?
দীপংকর গৌতম : লেখা জীবনের এটা আহরিত রূপ, এর মধ্যে, আনন্দ-বেদনা,দুঃখ সবই আছে।  লেখালেখি দার্শনিক ভিত্তিতে নির্মিত বিশ্বাসের নান্দনিক প্রকাশ। এর মধ্যে আনন্দ -বেদনা আাছে কিনা জানিনা। তবে প্রকাশের পর সৃষ্টির আনন্দ এটা থাকে

বইনিউজ : বছর জুড়ে কেমন সব কবিতা লিখলেন?
দীপংকর গৌতম : শুধুতো কবিতা লেখিনা। অনেক মাধ্যমেই লেখি। আসলে কিছু কথা যা না বললেই নয়। মানুষের কাছে সেসব কথা বলে যেতে চাই। সে জন্য মাধ্যম খুঁজি।কীভাবে বলবো বা নিজেকে প্রকাশ করবো? যখোন যে মাধ্যম হাতের কাছে পাই। সে মাধ্যমে লিখি।বছরের প্রায়দিন কিছুনা কিছু লিখি লিখতেই হয়। কারন লিখে খাই- এর চেয়ে নির্জলা সত্য আর নেই। এরমধ্যে অনেক ধরনের লেখার সঙ্গে আমার প্রথম পক্ষপাত কবিতা লিখেছি অনেক।

বইনিউজ : সারা বছর কী কী বই পড়লেন? কেমন লাগলো? ভালোলাগাটা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করলে জানতে পারব।
দীপংকর গৌতম : দার্শনিক ভিত্তি থেকে অনন্ত প্রেমি বস্তুটা হলো বই। প্রকৃতি ও বই সমাজের দুই সেবাইত। এদের সেবা না থাকরে মনুষ্যসমাজ হুমকির মুখে পড়তো। সারা বছর বই পড়েছি। বইতো সারা বছর পড়ি। বই না পড়রে মারা যাবো।আসলে একান্ত ভালোলাগা হলো বই। তবে আমাদের দেশে অনেক বই লেখা হচ্ছে -হবে যার কাজে লাগা বইয়ের সংখ্যা হাতে গোনা। বইয়ের ভাঁজ খুলে খুলে আনন্দ পাওয়ার বইয়ের সংখ্যা খুব কম। তবে এক্ষত্রে লেখকদের দোষ আমি দেইনা। কাটরন সবাই সিরায়াস হয়ে লেখেন বলে আমার বিশ্বাস। ভালো কারো লাগে কারো লাগেনা। ভালো লাগাটাও আপেক্ষিক। তবে নতুন করে বছরের শেষে পড়া চারটা বাংলাদেশের বই ভালো লেগেছে। হায়দার আকবর খান রনোর সাহিত্যে প্রগতির ধারা, কমরেড জসীম মন্ডলের জীবনের রেলগাড়ি , হরিপদ দত্তের মোহাজের, কুলদা রায়ের বৃষ্টি চিহ্নিত জল। আর সব বইয়ের কথা বলছি না।

বইনিউজ : আপনার কবিতা ওপর কোনও কবির প্রভাব থাকলে তা নিয়ে আপনার নিজের মধ্যে বোঝাপড়া বলুন।
দীপংকর গৌতম : বস্তুবাদকে যারা সমর্থন করেন তারা সবাই জানেন হুট করে কোন বিষয়ের শুরু হয়না। লেখা লিখরেই কোথাও না কোথাআরো মত মনে হতে পারে। তবে লেখা কাউকে অনুসরন করল্কোরো মত হয়ে ওঠে বলে আমার মনে হয়না। টিএস এলিয়দের দ্য কাইট কবিতার অনুকরনে জীবনানন্দ দাশ হায় চিল লিখেছিলো -আমার তা মনে হয়না। বা সুধীন্দ্রনাথ শার্ল বোদলেরের কবিতা অনুকরন করে লিখেছেন,  কিংবা রবীন্দ্রনাথ স্কটিশ বা আইরিশ লোকগীতি অনুকরন করে গান লিখেছেন আমার কোন সময় তা মনে হয়না। বিশ্বের লেখকদের যে আন্ত সংযোগ তা সমুদ্রের মতো প্রবহমান।ভাষা বা সীমানা দিয়ে তাকে নির্নয় করা যায়না। একজন লেখক, শিল্পী, গায়ক সবাই সংবেদনশীল মানুষ ভিয়েত নামের মাইলাই, কাম্পুচিয়া বা বাংলাদেশের চুকনগর বা তারাকান্দরের গনহত্যার খবরে একই রকম মুষরে পড়বেন। আমাদের মুক্তি যুদ্ধের পক্ষে এ্যালেন গিন্সবাগের কবিতা বা ডিলানদের গান তার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। ফুল,পাখি নদী, সমুদ্র, মা-সুন্দর,নির্যাতন সারা বিশ্বের মানুষের মতো সব লেখক শিল্পীদের মধ্যে অনুরণন ঘটায় । অনুসরনীয় বিষয়টি আমার কাছে ও রকম মনে হয়নি।

বইনিউজ : লেখালেখি নিয়ে আপনার চিন্তাটা জানাবেন?
দীপংকর গৌতম : বিশ্বের না খাওয়া, শ্রমিক নিপীড়িত স্বাধীনতাকামী মুক্ত মানুষের সমতার সমাজ নির্মানে পক্ষে। তাই লেখায় এ বিষয়গুলো প্রকাশ করতে চাই।

বইনিউজ : বই পড়া ও কবিতা লেখা নিয়ে পাঠক ও নতুন প্রজন্মের কবিদের প্রতি আপনার  কোন পরামর্শ?
দীপংকর গৌতম : পরামর্শ দিয়ে বই পড়ানো যায়না। মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তির মধ্যে এটা একটি। পারিবারিক পরিবেশে সন্তানদের বই পড়তে আকৃষ্ট করা উচিত্। একজন মুক্ত,আলোকিত মানুষ গড়তে যে কয়টি কাজ করা জরুরি তার মধ্যে প্রধান হলো বই পড়া, বইপড়া এবং বইপড়া।

বইনিউজ : বইমেলা, বই প্রকাশ, প্রকাশ মাধ্যম ইত্যাদি নিয়ে আপনার কোন কথা বলার থাকলে জানতে আগ্রহী।
দীপংকর গৌতম : বইমেলা যেমন হওয়া উচিত্ তেমন এখানে হয়না। মেলা কনসেপ্টটাই লুঙ্গি,শাড়ির দোকানের মতো না। বা নিরাপত্তাকর্মীদের স্তরে স্তরে নিরাপত্তা না। মেলার এলাকা লেখকের জবাইখানা হবে-আর কেউ জানবে না এমনও না। এটা প্রকাশকদের উপর ছেড়ে দিলে কিভাবে মেলা হবে সেটা তারা ভালো বুঝতো, মেলা নিয়ে রাজনীতি হতোনা। ভালো চলতো। এর চেয়ে বেশী কিছু না।
এখানে বই প্রকাশ হয়না। বই প্রকাশ করে। মানে টাকা আছে তাই টাকা দিয়ে বই ছাপে। আবার কিছু প্রকাশনী আছে কাজীর গরু। গননায় আছে কাজে নেই। এরা বইমেলার মৌসুমে সক্রিয় হয়। টাকা নিয়ে বই ছাপে। নামীদামীরা যে এ তালিকায় নেই তা কিন্তু নয়। এসব বহুমুখী অনৈতিকা বইমেলাকে ইন্ডাস্ট্রি হতে দেয়নি। টাকার কাছে গুরুত্ব পায়নি নৈতিকতা। তাই লেখক-প্রকাশকরা একে অপরের বন্ধু হওয়ার কথা থাকলে ও এখনো এরা দু পক্ষই অভিযুক্ত। একদল বলে টাকা নিয়ে বই ছেপেছে ১০০ কপি। দাম নিয়েছে ১০০০ কপির। আরেক দল বলে বই চলেছে ১০০০ কপি এরা বলে ৫০- এই যে অবিশ্বাস, এটা নৈতিকতার সংকট। ইন্ডাস্টিয়াল ডেভেলপমেন্টের ভেতরে পুস্তক ব্যবসা গড়ে ওঠেনি। ফলে লেখক প্রকাশক সবাই মুনাফা খোঁজে ।শিল্প ছাড়া মুনাফা পাবে কোথায়? বুজোয়া একটি কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়।