Home / সবিশেষ / আনা ফ্রাঙ্কের গোপন আস্তানায়-ফারুক মঈনউদ্দীন (শেষ পর্ব)

আনা ফ্রাঙ্কের গোপন আস্তানায়-ফারুক মঈনউদ্দীন (শেষ পর্ব)

দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় একটি বাড়ির গোপন অংশে লুকিয়ে থাকা এক কিশোরীর বন্দী জীবনের দীর্ঘশ্বাস ও যন্ত্রণার দিনলিপি ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’ নামের যে বিখ্যাত গ্রন্থটি সারা বিশ্বে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল সেটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে আনার বাবা অটো ফ্রাঙ্কের উদ্যোগে। ডাচ ভাষায় প্রকাশিত বইটির নাম ছিল হেৎ আখতারহাউস, যার বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায় ‘গোপন বর্ধিতাংশ’ (সিক্রেট অ্যানেক্স)। ১৯৫২ সালে দ্য ডায়েরি অভ অ্যা ইয়ং গার্ল নামে এটির ইংরেজি সংস্করণ বের হলে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে আনা ফ্রাঙ্কের নাম। সারা পৃথিবীতে এযাবৎ মোট ৬৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে বইটি, বিক্রি হয়েছে প্রায় তিন কোটি কপির ওপর। তবে প্রথম দিকে যে সংস্করণগুলো সর্বত্র পাওয়া যেত সেগুলো কিছুটা পরিমার্জিত, কারণ বয়ঃসন্ধির আনা খুব খোলামেলাভাবে এমন কিছু বিষয় লিখেছিলেন, যেগুলো অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের জন্য উপযোগী নয়। মূল বইটি প্রকাশের আগে অটো ফ্রাঙ্ক যথেষ্ট পরিমার্জনা করেছিলেন। কারণ আনার প্রথম ঋতুমতী হবার কথা, জননেন্দ্রিয় নিয়ে মেয়ের ভাবনা ও বিস্ময়, সমকামী মনোভাবের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত কিংবা মায়ের সাথে আনার মনোমালিন্য- এ-জাতীয় বিষয়গুলো পিতা হিসেবে প্রকাশিত হতে দিতে চাননি তিনি। এ বিষয়গুলো ছাড়াও আরো বহু অজানা তথ্যের সন্নিবেশ ঘটেছে ‘আনা ফ্রাঙ্কের গোপন আস্তানায়’। বইনিউজ ৪ কিস্তিতে ধারাবাহিক প্রকাশ করছে খ্যাতিমান লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন-এর তথ্য সমৃদ্ধ এই নিবন্ধ -সম্পাদক

 

ana-frank--644x362

আনা ফ্রাঙ্কের গোপন আস্তানায়
ফারুক মঈনউদ্দীন

মুক্তি পাওয়ার পর অটো ফ্রাঙ্ক তাঁর মেয়েদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে সম্ভাব্য সবকিছু করেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে শুরু করে ক্যাম্প থেকে ফিরে আসা লোকজনের কাছ থেকে সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা- কোনো কিছুই বাকি রাখেননি তিনি। বোনের কাছে এক চিঠিতে তিনি লিখেন, ‘এডিথকে হারাবার পর আমি ভাবতে পারছি না আমার বাচ্চাদের ছাড়া আমি কীভাবে থাকব . . . ওদের সম্পর্কে লেখা যে কী কষ্টের! আমি এখনো আশা করে বসে আছি এবং অপেক্ষা, অপেক্ষা এবং অপেক্ষা।’ জার্মানির যে ক্যাম্পে আনা আর মারগট মারা যান, সেটি মিত্রবাহিনী মুক্ত করে তাঁদের মৃত্যুর এক মাস পর এপ্রিল মাসে। প্রায় ছয় মাসের প্রায় পাগল করা দুঃসহ কষ্টের পর তিনি মেয়েদের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন জুলাই মাসে সে ক্যাম্প থেকে মুক্তি পাওয়া পরিচিতদের কাছ থেকে।
আনার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মিপ জিস অটো ফ্রাঙ্কের কাছে তাঁর মেয়ের ডায়েরিটা তুলে দেন। এত দিন মিপের আশা ছিল যে আনা বেঁচে ফিরে আসবেন, তাই আনার লেখাগুলো সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।
ফ্রাঙ্কদের গোপন আস্তানায় হানা দেওয়ার ঘটনাটির পেছনের কারণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে বহু গবেষণা এবং জল্পনা-কল্পনা হয়েছে, কিন্তু কার বিশ্বাসঘাতকতায় জার্মানরা এই আস্তানার হদিস পায়, সেটি আজ অবধি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি। অনুমাননির্ভর বহু ধারণা প্রচলিত আছে। তেমনই সন্দেহভাজন একজন, প্রতিষ্ঠানটির গুদাম ম্যানেজার উইলেম ভ্যন মারেন। গোপন আস্তানার বাসিন্দারা তাকে বিশ্বাস করতেন না। বাড়িটিতে আসা-যাওয়া করা মানুষজন সম্পর্কে তার কৌতূহল ছিল প্রবল। একবার এক কর্মচারীকে সে জিজ্ঞেস করেছিল যে এই অফিসে ফ্রাঙ্ক নামে কখনো কেউ ছিল কি না। অটো ফ্রাঙ্কের জীবনীকার ক্যারল অ্যানের সন্দেহ ছিল টনি আহলার নামের নেদারল্যান্ডের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এক সদস্যের প্রতি। আনার ডায়েরিতে ১৯৪৪-এর এপ্রিলের একদিনের বর্ণনায় জানা যায়, বাড়িটিতে এক রাতে চুরির চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সে রাতে এলাকার রাতের চৌকিদার এবং এক পুলিশ সরেজমিন দেখতে এসে দরজা আড়াল করা বুকশেলফটার সামনে পর্যন্ত এসে ঘুরে গিয়েছিল। ওরা কিছু আঁচ করতে পেরেছিল কি না জানা যায়নি। আবার অনেকের ধারণা, কেউই গোপনে পুলিশকে জানায়নি। অফিস সময়ের পরও বাড়িটিতে মানুষের বসবাসের কোনো লক্ষণ, রাতের নীরবতার মধ্যে টয়লেটের ফ্লাশ টানার শব্দ এসব হয়তো কারো নজরে এসেছিল। যুদ্ধের পর সন্দেহভাজন সংবাদদাতাকে চিহ্নিত করতে অনেককেই জেরা করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো সূত্র বের করা যায়নি।

unnamedএই বুক শেলফের পেছনেই ছিল গোপন আস্তানায় ওঠার সিঁড়ি

ঘটনার ৭০ বছরের বেশি সময় পর সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকের নতুন নাম উঠে আসে, যা আগে কখনোই ধারণা করা হয়নি। ফ্রাঙ্ক পরিবারের আরেক সাহায্যকারিণী ছিলেন বেপ ভুসকাইল। তিনি মারা যান ১৯৮৩ সালে। ২০১৫ সালে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র ইউপ ফন ভেইক এবং সাংবাদিক জেরুন দে ব্রুন যৌথভাবে বেপ-এর একটা জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বইতে তাঁরা বিভিন্নজনের সাথে কথা বলে আবিষ্কার করেন যে বেপ ভুসকাইলের ছোট বোন নেলি ভুসকাইল গেস্টাপো বাহিনীর কাছে ফ্রাঙ্ক পরিবারের গোপন আস্তানার অবস্থান প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। এই পরিবারে কেবল বেপ এবং তাঁর বাবা যোহান ভুসকাইলই ফ্রাঙ্ক পরিবারের গোপন আস্তানার কথা জানতেন। বইটির লেখকদ্বয় প্রমাণ হাজির করেন যে ব্যাপারটা নেলিও জানতেন। গোপন আস্তানায় ঢোকার মুখে যে বুকশেলফটি বসানো হয়েছিল, সেটি তৈরি করে দিয়েছিলেন যোহান। বেপ ও তাঁদের বাবা যে ইহুদিদের সাহায্য করতেন, সেটি পছন্দ করতেন না নেলি। তিনি নাকি একবার তাঁর বোন এবং বাবার সাথে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে বলেছিলেন, ‘যাও তাহলে, তোমার ইহুদিদের কাছেই যাও।’ ১৯৪৪-এর ৪ অগাস্ট সকালে নেলি যে গেস্টাপো বাহিনীর অফিসে ফোন করেছিলেন, সে তথ্য উঠে এসেছে তাঁর আরেক বোন ডিনির স্মৃতিনির্ভর ভাষ্যে। যে গেস্টাপো অফিসার সকালে ফোন পেয়ে ফ্রাঙ্কদের বাড়িতে অভিযানে যান, তিনিও পরে তাঁর জবানবন্দিতে বলেছিলেন যে সেই সকালে যে ফোনটি তিনি পেয়েছিলেন, সেটির কণ্ঠ ছিল এক তরুণীর। নেলি যে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত নাজি বাহিনীর সহায়তাকারী ছিলেন, সেটিও অনেকের জানা ছিল। নিজের মাসি সম্পর্কে ইউপ ফন ভেইক লেখেন, ‘সন্দেহভাজনদের দীর্ঘ তালিকায় নেলির নামটা ঢোকানো খুব দুঃখজনক কিন্তু অনিবার্য সিদ্ধান্ত ছিল।’ তবে গবেষণালব্ধ সর্বশেষ (২০১৬) তথ্যে বলা হচ্ছে, কারো বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ধরা পড়েনি সিক্রেট অ্যানেক্সের বাসিন্দারা। রেশন কার্ডের জালিয়াতি ধরার জন্য কিছু বাড়িতে অভিযানের অংশ হিসেবে ২৬৩ নম্বর প্রিন্সেনখ্রাখতের বাড়িটিতে পুলিশ তল্লাশি চালানোর সময় তাঁদের অবস্থান ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। মিপ গিসের সাক্ষাৎকারেও জানা যায় যে, বাড়িটিতে ৮ জন আত্মগোপনকারীকে পাওয়া যাবে, এটি জার্মান পুলিশের ধারণা ছিল না। সে কারণে সবাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য খবর দিয়ে বড় একটা গাড়ি আনাতে হয়েছিল।
অন্য দর্শনার্থীদের সাথে আনা ফ্রাঙ্কের বাড়ির ঘরগুলোর অনুজ্জ্বল আলোয় ঘুরে ঘুরে দেখে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিলাম, দুটো তলা মিলিয়ে ৫০০ বর্গফুটের এমন গোপন আস্তানায় কোনো শব্দ না করে এমনভাবে আটজন মানুষ কীভাবে দুটো বছর পার করেছিলেন! বাড়িটির বিষণ্নতার আবহ কিংবা তার বাসিন্দাদের শব্দহীনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টার প্রতি অবচেতনে সম্মান দেখাতেই বোধ করি নিজের অজান্তে সবাই প্রায় ফিসফিস করে কথা বলে। আমি ঢালু ছাদের চিলেকোঠায় উঠে ছাদের সাথে লাগানো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি কীভাবে আনা কিংবা পিটার বা অন্যরা কখনো এখানে উঠে বাইরের একচিলতে আকাশ বা পাশের বাড়িটির অংশ দেখতে পেতেন। ওপরের ঘরগুলো প্রায় শূন্য, তবু বাড়ির এই অংশ জুড়ে আটটি জীবনের ছোঁয়া যেন লেগে আছে তার দেয়ালে, দরজায়, জানালার ঢাকা দেওয়ার কাচের গায়ে।
আনাদের বাড়িটিকে জাদুঘরে পরিণত করা হয় ১৯৬০ সালে। তারপর ১৯৯৯ সালে পাশের বাড়িটিকেও এটির অংশ করে নেওয়া হয়। জাদুঘরে সংরক্ষণ করা আছে আনার বিখ্যাত ডায়েরিটা ছাড়াও সে সময় তাঁদের কিছু ছবি, চিঠি, আনার ডায়েরি অবলম্বনে তৈরি সিনেমা ও নাটকের পোস্টার, আনার বোন মারগটের বাস টিকিট-এসব। নতুন অংশে রয়েছে বুকশপ, ক্যাফে, মিলনায়তন এবং বাড়িটির অন্যান্য নিদর্শন নিয়ে অস্থায়ী প্রদর্শনীর ঘর। নিচতলার প্রশস্ত স্যুভেনির শপ থেকে কিনলাম বাড়িটির নিখুঁত নকশার একটা পাজল গেম, যাতে কার্ডবোর্ডের টুকরো সাজিয়ে মডেলের মতো পুরো বাড়িটা খাড়া করা যায়। নম্বর দেওয়া টুকরোগুলোকে ছবিতে দেখানো নকশার সাথে মিলিয়ে বাড়িটা তৈরি করতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে আমার আর আমার কন্যার তিন দিন লেগেছিল।
আনা ফ্রাঙ্কের মৃত্যুর এত বছর পরও তাঁকে নিয়ে মানুষের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। সেটি বোঝা যায় বাড়িটির সামনে সারা দিন লেগে থাকা দর্শনার্থীদের বিশাল সারি দেখে। মাসে প্রায় এক লক্ষ দর্শনার্থী বাড়িটি দেখতে যায়। মাত্র সেদিন (নভেম্বর ২০১৬) আনা ফ্রাঙ্কের হাতে লেখা একটা কবিতা নিলামে বিক্রি হয়েছে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ইউরোতে (১ লক্ষ ৪৮ হাজার ডলার), যদিও ন্যূনতম মূল্য ছিল ৩০ হাজার ইউরো। এর আগে ১৯৮৮ সালে আনা এবং তাঁর বোন মারগট এবং তাঁদের আমেরিকান পত্রমিতাদের মধ্যে লেখা চিঠির একটা সিরিজ ১ লক্ষ ৬৫ হাজার ডলারে নিলামে বিক্রি হয়েছিল। একই বছর কয়েক মাস আগে গ্রিম ভাইদের লেখা রূপকথার ১৯২৫ সালের একটা সংস্করণের প্রচ্ছদের ওপর আনা ও মারগটের নাম লেখা ছিল বলে বইটা নিউ ইয়র্কের নিলামে সর্বোচ্চ ডাক উঠেছিল ৫০ হাজার ডলার।
স্যুভেনির শপ থেকে বাড়িটা থেকে বের হয়ে এলে ওয়েস্টার কের্ক বা পশ্চিম গির্জার চত্বর। আনাদের বাড়ি থেকে এটির ঘণ্টা শোনা যেত বেশ জোরে। আনা তাঁর ডায়েরিতে লেখেন, ‘আমি ছাড়া বাবা, মা আর মারগট কেউ এখনো পৌনে এক ঘণ্টা পরপর ওয়েস্টার টাওয়ারের ঘড়িটার বাজনাতে অভ্যস্ত হতে পারেনি। আমি প্রথম থেকেই এটা পছন্দ করেছিলাম; শব্দটা এত আশ্বস্তকারী, বিশেষ করে রাতের বেলায়।’ ১৯৪৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে অস্ত্র কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নাৎসি বাহিনী গির্জার ঘণ্টাটা খুলে নিয়ে যায়। অন্যান্য গির্জার বড় বড় ঘণ্টাগুলোও একই কারণে খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আনা একদিন লিখেছিলেন, ‘আমরা সবাই গত সপ্তাহ ধরে কিছুটা বিভ্রান্ত, কারণ আমাদের প্রিয় ওয়েস্টার টাওয়ারের ঘণ্টাটা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যুদ্ধের কাজে গলিয়ে ফেলার জন্য, তাই দিন বা রাতের সঠিক সময়ের আন্দাজ করা যাচ্ছে না। আমি এখনো আশা করে আছি যে তারা টিন, তামা বা অন্য কিছু দিয়ে একটা বিকল্প ব্যবস্থা করবে, যাতে এলাকার লোকজন ঘড়িটার কথা মনে রাখে।
পুরনো গির্জার চত্বর ধরে হেঁটে গেলে চোখে পড়ে ভূমি থেকে এক হাঁটু উচ্চতায় গোলাপি গ্রানাইটের ত্রিকোনাকার একটা বেদির কিনারায় বসে দু-একজন অলস আড্ডা দিচ্ছে। তিন কোনা বেদিটাকে দর্শনার্থীদের বসার জায়গার মতো মনে হলেও এটি যে একটা ভাস্কর্যের অংশ সেটি কোনোভাবেই মনে হয় না। কিছুদূর এগিয়ে গেলে দেখা যায় একই রকম আরেকটা ত্রিভুজ ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে ভূমির সমতলে। সেখান থেকে গোলাপি ইটের রেখায় দৃষ্টি অনুসরণ করলে তৃতীয় আরেকটি ত্রিভুজের দেখা মেলে কাইজারখ্রাখত-এর পানির ওপর জেটি বা পাটাতনের মতো। এটির মুখে সাইনবোর্ডে বড় হরফে লেখা ‘হোমোমনুমেন্ট,’ তার নিচে ঘোষণাবার্তাতে লেখা, সমকামিতার কারণে যে সকল নারী-পুরুষ নিগৃহীত এবং নির্যাতিত হয়েছে, এটি তাদের স্মরণ করে এবং ‘অবমাননা, বৈষম্য এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম’কে সমর্থন করে।
গোলাপি ইটের রেখা দিয়ে তৈরি একটা বিশাল ত্রিভুজের ভেতর তিন কোনায় তিনটা ত্রিভুজ নিয়ে এই ভাস্কর্য। নাৎসি বাহিনীর বিভিন্ন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো বন্দীদের মধ্যে হাজার দশেক সমকামীর স্মৃতির উদ্দেশে অদ্ভুত এই ভাস্কর্যটি তৈরি হয়েছে ১৯৮৭ সালে। খালের ওপর বেদিটির ওপর কে বা কারা যেন ফুলের তোড়া রেখে গেছে। তিনটার মধ্যে যেটা ভূমির সমতলে ওটার তিন বাহু বরাবর ইংরেজি হরফে অজানা ভাষায় শিলালিপি খোদাই করা। পরে জেনেছি এটি ওলন্দাজ ইহুদি কবি জ্যাকব ইজরায়েল হানের একটা কবিতার পংক্তি, যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘বন্ধুত্বের জন্য এমন অসীম ক্ষুধা।’ সমকামী এই কবির ইহুদিবিরোধী অবস্থানের জন্য ১৯২৪ সালে জেরুজালেমে ইজরাইলি আধা সামরিক বাহিনী ‘হাগানাহ’র গুপ্তঘাতকেরা তাঁকে খুন করে।
ভাস্কর্যটির এই জ্যামিতিক চেহারার কারণও বেশ চমকপ্রদ। নাৎসি বাহিনী ইহুদি ছাড়া আর যাদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠায়, তাদের মধ্যে ছিল সমকামী, কমিউনিস্ট এবং অন্য রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরা। জাতিগতভাবে যাদের নিকৃষ্ট মনে করা হতো তাদেরও আটক করা হয়, যেমন জিপসি, কৃষ্ণাঙ্গ, পোল বা সার্বরা। এক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬৩ হাজার সমকামীকে অভিযুক্ত করে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল। জার্মান সমকামীদের ওপর নাৎসি বাহিনীর খাপ্পা হওয়ার কারণ ছিল যে তাদের অস্বাভাবিক স্বভাবের কারণে জার্মান জনসংখ্যা বৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা। বিভিন্ন শ্রেণির কয়েদিদের আলাদা করে চেনার জন্য তাদের পোশাকের ওপর বিভিন্ন চিহ্নের ব্যাজ সেলাই করে দেওয়া হতো। যেমন সমকামীদের পোশাকের ওপর গোলাপি ত্রিভুজ, কমিউনিস্ট এবং অন্য রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য লাল ত্রিভুজ এবং জার্মান অপরাধীদের জন্য ছিল সবুজ ত্রিভুজ। ইহুদিদের পোশাকের ওপর থাকত দুটো হলুদ ত্রিভুজ দিয়ে তৈরি তারার চিহ্ন। মূলত জার্মানরা ইউরোপ দখল করার পর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ছাড়াও সর্বত্র ইহুদিদের জন্য এই হলুদ তারার ব্যাজ পরা বাধ্যতামূলক ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনীর পরাজয় ঘটার পর বিভিন্ন শিবিরে আটক সব বন্দীদের ছেড়ে দেওয়া হলেও গোলাপি ত্রিভুজের ব্যাজ লাগানো বন্দীদের পশ্চিম জার্মানিতে আবার জেলে পাঠানো হয়েছিল।
কিছুক্ষণ আগে দেখে এলাম পুরানো গির্জা চত্বরে (আউডিকের্কসপ্লেইন) দাঁড় করানো আছে সংক্ষিপ্ত পোশাকের এক বারাঙ্গনার ভাস্কর্য, অথচ শালীন পোশাক না পরলে মেয়েদের গির্জায় ঢুকতেই দেওয়া হয় না। এখন দেখছি আরেক গির্জার (ওয়েস্টারকের্ক) সামনে তৈরি হয়েছে সমকামীদের স্মরণে অভিনব এক ভাস্কর্য, ‘হোমোমনুমেন্ট’ বা সমকামী স্মৃতিস্তম্ভ। এ-জাতীয় বিষয়গুলোকেই এঁরা বলেন সহনশীলতা। ওলন্দাজরা যখন ভারত এবং বাংলায় তাদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে (১৬১৫-১৭৯৫) চুটিয়ে ব্যবসা করে ইংরেজদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখনো তাদের মধ্যে এমন ‘সহনশীলতা’র নজির ছিল কি না কে জানে। আমস্টারডামের এই সহনশীলতার জন্যই বুঝি এখানে দলে দলে ছুটে আসে পর্যটকেরা!