Home / সবিশেষ / পাঁচটি কবিতা-মাজহার সরকার

পাঁচটি কবিতা-মাজহার সরকার

kobeta-2016

পাঁচটি কবিতা-মাজহার সরকার

 উৎসবের কিছুই দেখছি না

এই প্রাপ্তির দিনেও কোন অভিনন্দনের ভাষা খুঁজে পাই না। কী আশ্চর্য, আয়নার উল্টোদিকে চলে যাচ্ছি কোথায়? আমি এই ধাতুর জন্য বুকের ডিমের এতিম চাঁদনি খুলে বসে আছি। এমন যৌথ দুঃখে আজ সারারাত মদ আর গিটার বাজিয়ে কাটাবো, গলায় গলা ধরে কাঁদবো, কান্নার সঙ্গে বুকের গরম রক্ত যেন ছিটকে আসে। এই বিষফলটা আমাকে ডাকছে। কালো চিকন ভ্রমরটা এসেছে। এখন এই ভোরের হাওয়ায় আমি কিছুক্ষণ নাচতে চাই। খট খট করে বলয়ের হাড় তুলে শেষবারের মতো পৃথিবীর ভোরবেলাকে শুভেচ্ছা জানাতে চাই। এখন এই নিঃশ্বাসের আগুন দিয়ে একটা ছায়াপথ তৈরি করবো। এমনই করে হয়তো একদিন বুকের উল্টোপিঠে সূর্য উদিত হবে। আমি এখন সবাইকে উপেক্ষা করে যাবো। এই প্রাপ্তির দিনেও আমি উৎসবের কিছুই দেখছি না। আসলে আজ আমাদের পকেটভরা রাজার মুখ।

 বন্ধ্যা পুরুষের হাতে

আমি আর কোনদিন সুন্দর হতে পারবো না। আমার সমস্ত সৌন্দর্য্য খুলে ফেলে রেখে একা হেঁটে যাবো সূর্যরেখা বরাবর। পাঁচজন চাকু হাতে ঘিরে ধরবে, তারপর রক্তাক্ত হাতে দ্রুত অন্ধকার রাস্তায় পালিয়ে যাবে। আমি আর কোনদিন জীবিত দেখাবো না। রাতের ময়লা চেটে চেটে হেঁটে আসবো ঘরের দিকে। গলির মোড়ে কুকুর হয়ে কাদঁবো সারা রাত। বেড়ালের হাসি হয়ে ঝুলে থাকবো দাঁতে। বাদুড় বনে উল্টো ঝুলে থাকবো, হাসপাতালের পুঁজলাগা তুলা টেনে মাখবো জিহ্বায়। কেচোঁর মতো দুই দিকে খাবো, দুই দিকেই বমি করবো। ঈসার মতো পাখিদের সাথে কথা বলবো একদিন। পালকের টোকায় বিকট পাথর দু’ভাগ করে দেবো। নদী তল দিয়ে দৌড়ে যাবো। এদোঁ পুকুরে নোংরা শৈবাল হয়ে পচে থাকবো বার মাস। আমি আর কখনও ভালো হবো না। পাঁচ জন খুনীর সাথে গলাগলি করে পলাতক মুহূর্ত হয়ে থাকবো তোমাদের টাইম লাইনে। কিশোরীর ন্যাপকিনে তুমুল রক্তস্রাব হয়ে নামবো পৃথিবীতে, চুমু হয়ে ঠোঁট কাঁপাবো প্রেমিকের। আর কোন উদয় উৎসবের অপেক্ষায় আমি সারোগেট বাবা হবো। টাকা বানাবো, বন্ধ্যা পুরুষের হাতে সমস্ত সৌন্দর্য্য তুলে দিয়ে আমি একা হেঁটে যাবো প্রেমিকার ঠোঁট বরাবর।

লোফার’স

তোমার শেষ অহংকারটুকু কণ্ঠ থেকে ছিঁড়ে
উল্লাস করতে করতে পালিয়ে যাবে দুর্বৃত্তরা
পুরো দেশ বীর্য, প্লাসেন্টা, মিউকাসে ভরে যাবে
কিশোরীরা বছর বছর জন্ম দেবে সন্তান
শিশ্নোদরপরায়ন যুবকেরা বারবার তোমার
কাছে এসে পিতৃত্ব চাইবে, প্রেমিকা!
তোমাকে ঘিরে ফেলবে কবিতাবিমুখ পুরুষেরা
আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসবে, পোড়ামাংস খাবে
হাত টেনে নোংরা বিছানার দিকে নিয়ে যাবে।
পরীক্ষা পাশের সনদে ভরে যাবে হাত,
সাফল্যে কৃতিত্বে তোমার গলায় ভরে যাবে নানা রঙের ধাতব মেডেল
তুমুল করতালিতে বধির হবে কান
প্রশংসায় ফুটবে ডুমুরের ফুল
তুমি একবার নগ্ন হলে পৃথিবীতে শীতের ভয় থাকে না।

 ক্ষুধার্ত জনসভার দিকে

দেয়ালে ঠেসান দিয়ে রাখা রাইফেল
ক্ষুধার্তের স্ফীত ধমনীতে এই লিপি বিলি হয়ে গেছে
এতো দুঃখ এতো বিকলাঙ্গ ভিড় চতুর্দিকে
এক ললিত শোক তাকে নগরের কোল থেকে
ছিঁড়ে আনে কোটি অন্তর্গত কান্নায়
লাল হৃদপিণ্ডধারী মানুষেরা দাঁড়ায় বুকের রক্তে ভিজে
হে মানুষ, তোমাদের লাল রুটির থালা হাতে
নবান্নের ভাতের মাড়ে অশ্রু আর রক্তের আস্বাদ
শরীর থেকে ছিঁড়ে দিলাম একটি সবুজ অভিলাষ
আজ এই জনসভায় মৃত্যুর মহিমা
তোমরা যতই বলো দুঃখ ক্ষুধা এইসব কিছু না
এই নিয়ে তুমি আর কখনো ভেবো না
তার চেয়ে তুমি বরং ঘুমিয়ে পড়ো
জনসভায় কাউকে ডেকো না,
আমি তো দেখি এই প্রগাঢ় ক্ষুধার পেটে একটুকুও আলো নেই।

এখানে রাখো পা

আমাকে টেনে নাও শহরের কিনারে, যেখানে সূর্য এসে অস্ত যাবে আমার শরীরের ওপর। আমাকে ফিরিয়ে নাও রক্ত ঋতু আর ফসলে। পোষা কুকুরটাকে ফেলে আমাকে টেনে নাও নাভীর ওপর, আমি আরও ভালো খেলবো এই মৌসুমে। মাটির গ্লোবে পড়ন্ত রোদের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসবে দুধেল বাঘিনী। এখানে রাখো পা, এখানে জায়গা নাও। মাটিতে লুটানো ধূলোর মতো প্রার্থনায় জেগে উঠে ছড়িয়ে দাও। অন্ধকারে নত পোষাকে মেঝে চেটে চেটে মৃত্যুর খোঁজে সূর্যপাতে খুলে ফেলো ফাল্গুনের খিল। ও আঁধার, বুকের কুসুম থেকে পান করে যাও মধু। ক্ষুধার চন্দনে আরও ঢেউ দাও। থেমো না, থেমো না, নীলিমার শাহানা থেকে ছিঁড়ে আনো অবিনাশ গ্রহের কামিনী। প্রার্থিত সূর্যের বিজনে আনো নন্দিত প্রতিশোধ। এইখানে আজ লজ্জা ঢেকে রেখে, বহুকাল গোপন প্রত্যাশার ভেতর নিষাদের নির্মোকে বাঁচাও।