Home / সবিশেষ / ফকির ইলিয়াস-এর পাঁচটি কবিতা

ফকির ইলিয়াস-এর পাঁচটি কবিতা

kobeta-123

ফকির ইলিয়াস-এর পাঁচটি কবিতা

এ শহরে এখন বৃষ্টি নামে না

যে নদী আমার চোখের দিকে তাকাতে পারে না-
সে আমার প্রেমিকা নয়।
যে মেঘ আমার মাথার উপর দাঁড়াতে পারে না,
তাকে আমি বলি না স্থাবর চাঁদোয়া
বরং যে বৃষ্টি একদা আমাকে ভিজিয়ে,
আনন্দে হেসেছিল, আমি তাকেই দিতে চাই
প্রেমমালা। তালা খুলে দেখাতে চাই আরাধ্য সিন্দুক

অনেকগুলো বরফকুচি জমে আছে কথা হয়ে,
অনেকগুলো নি:শ্বাস উড়ে গেছে বাষ্প হয়ে
এমন বোধসঞ্চয় আমি তাকেই দেখাতে চাই,
যেজন কেবলই ভুলে থাকতে পারে।
যে শহরে বৃষ্টি নামে না- সে শহরে দু:খপরীরা
শুধুই শোনায় শুকনো পাতার গল্প,
যে শহরে ঝড়-ঝাপ্টা নামে না, সে শহরের শিশুরা
হতে পারে না সাহসী।
আমি তোমার কন্ঠেই শুনতে চাই তেমন বাদল দিনের গান।

——————————-
নদীশাসন বিষয়ক

জীবনের গল্প লিখতে পুনরায় খুলে বসি খাতা।
গতরাতে শব্দটি নিয়ে ভেবেছি বেশ। ‘নদীশাসন’-
একধরনের পেশীবাজীর ঝলক আছে শব্দটিতে,
রাষ্ট্রশাসকের কথা শুনতে শুনতে, মনে হয়েছে
একদিন যে নদী মানুষকে শাসন করতো-
আজ সেই নদীই শাসিত হবে মানুষের হাতে,
আর মানুষ নদীতেই মিশিয়ে দেবে সকল অর্জিত বিনয়

তারপর দখলের মন্ত্র ভুলে জড়িয়ে ধরবে সেই নদীবাহু
ভালোবাসবে ঢেউ- ভালোবাসবে পলি

আবার আমরা আনন্দে আত্মহারা হতে হতে
বলবো-
তুমি খুব সুখে থাকো পদ্মা, তুমি খুব ভালো থেকো
তোমার বুকেই বড় হোক
আমাদের সবক’টি রুপোলী ইলিশ!
————————————

রক্তমেঘতন্ত্রী বৃষ্টিলোকালয়

ফিরে এলো না অনেকেই। অনেকগুলো ঘর, পুরুষশূন্য
থেকে গেল। অনেকগুলো সংসার থেকে চিরতরে,
হারিয়ে গেল নারীর শাড়ীর আঁচল। কোর্তাবিহীন শিশু-
মা মা বলে কাঁদলো ডিসেম্বরের তীব্র শীতে। কেউ,
শুনতে চাইলো না সেই ডাক। ধীরে ধীরে পশ্চিমা ট্যাংকগুলো,
অতিক্রম করলো আমাদের গ্রামের পথ।

আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থোকা থোকা
রক্তমেঘ দেখলাম। সুরমা নদীর শান্ত জলে,
শবগুচ্ছ দেখে বুঝলাম- এই মাটি আরও বহুকাল
খুব নীরবেই সইবে গণহত্যার লাল দাগ।

লোকালয়ে ফিরে এলেন না অনেক সূর্যসন্তান।
দল বেধে, অনেকগুলো পাখি বেদনার অশ্রু ঝরালো,
জি সি দেব – মুনীর চৌধুরীদের নামে।

ভাঁজ করা একটি পতাকা হাতে, যে মা সারারাত
পাহারারত ছিলেন-
তিনি তা তুলে দিতে চাইলেন, তাঁর যুদ্ধাহত সন্তানের হাতে।

———————————-
ছায়াগুলো সাজানো ছিল

নাটকের যবনিকা এলে বদলে যায় পর্দার রঙ। যারা
অভিনয় করেছিল, তারা পোশাক পাল্টে মিশে যায় জনস্রোতে।
হাততালি দিতে দিতে যারা উপভোগ করেছিল দৃশ্যাবলি-
তারাও ভুলে যায় বিগত সংলাপ।

নাটকটি মূলত সাজানো ছিল, বলতে বলতে নাট্যকার
হাত দেন পরবর্তী পরিচ্ছেদ পরিকল্পনায়। বোকা মাটির ঘ্রাণ
বুকে নিয়ে পাখিরা সেরে নিতে চায়
দেশান্তরের শেষপর্ব।

আমি তাকিয়ে থাকি। অনেক কিছু জানি- তবু বলতে
পারি না। অনেক কিছু দেখি- তবু বিশ্বাস করতে পারি না।
নীল সীমান্তসনদের লোভে যারা বিক্রি করে দেয়
আমার স্বদেশ,
দেশান্তরের হীন আশায় যারা তৈরি করে নাটকের
দৃশ্যান্তর, আজ তারাই বড় দেশ প্রেমিক!
আজ তাদের জন্যই হাত বাড়িয়ে থাকে রক্ষক প্রভু !

তারপর…..
আরও কোনো নাটকের জন্ম দেয়া যায় কী না-
তা ভেবে দেখতে পুনরায় নির্দেশ দেন
মহাসম্রাট প্রযোজক !

—————————-
নদী তুমি, বৃষ্টি তুমি

সকল তৃষ্ণাগুলো কন্ঠে নিয়ে ছুটে আসি তোমার কাছে।
নদী তুমি, বৃষ্টি তুমি- সুরেলা টলমলো জল। পানের
অধিকার নিয়ে দুহাত ডুবাই। তুলে আনি অমৃত অম্বর।
পান করি প্রেমগন্ধী ভোরের কুসুম-পাপড়ি ও প্রণয়-
তারপর ছড়িয়ে দিতে থাকি যে তারাগুচ্ছ, তা ছুঁয়ে দেয়
তোমার চিবুক,বাহু,ভ্রূ-কাজলের ঘন ওই রেখা ও রহস্য।

আমি জলের বিধানে আটকা পড়ে আছি বহুকাল,বন্দী আছি
এমন এক ছায়াডোরে, যাকে আমি মায়া বলি না। বলি-
ঘোর, বলি- মোহ। বলি- পাখির পালকের ওম। যে ছবি
আমাকে পেছনে ফেলে চলে গেছে সমুদ্র বরাবর, আমি কেবল
তাকেই উৎসর্গ করেছি তোমার চুলের ঢেউ,তোমার মেঘবন্দনা।