Home / সবিশেষ / দীপংকর গৌতম-এর পাঁচটি কবিতা

দীপংকর গৌতম-এর পাঁচটি কবিতা

tania-noor

দীপংকর গৌতম-এর পাঁচটি কবিতা

স্বাধীনতা বলতে বেদনাহত মুখটাকেই বুঝি
(প্রিয় মানুষ নুজহাত চৌধুরীকে)

যে বুকের জমিনে তুমি ঘুম যেতে
সে বুকটা ছিলো বাঙলাদেশের। সোদা মাটির গন্ধমাখা ছিলো সেই বুকে
অযুত পাখি, নদীর কলতান সোনা যেত সেই বুকে।
দুস্তর পদ্মায় যে মাঝি দাড় টেনে গাইতো
গান সুর সুধায় ক্লান্তি দূর করে নতুন উদ্যমে চালাতে বৈঠা
ওই বুকে সেই সুর ছিলো, ছিলো ঘুঘু- ফিঙের ডাক
তাঁত কলের শব্দ ছিলো, রাখালিয়া বাজাতো বিশদ ওই বুকে-
ছোট মেয়েটি সুর শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেত
আবার ঘুম ভাঙতো সুরের কলরোলে
একদিন দানবের উমত্ত উল্লাসে প্রকম্পিত হলো বস্তুপাড়া-
উজাড় হলো রাখাল রাজার রাজত্ব।
হিংসার আগুনে ছিন্ন ভিন্ন করা হলো
পাখ-পাখালির সুর ও মাটির সুবাসে ভরা
সেই বুক আমার বাংলাদেশের বুক।
মেয়েটি ঘুমের আস্তিন
বেওনেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে বিক্ষত করেছে
ভয়ানক বর্বর দজ্জালেরা।
সেই থেকে মেয়েটি আর ঘুমায়না
রাত এলেই তার ডুকরে ওঠা কান্না
আমাকে বিবর্ন করে।
আমার স্বাধীনতা , আমার পতাকা বলতে
আমি ওর বেদনার্ত শোকাহত মুখটাকে বুঝি

 শ্রমজীবী মানুষের বৈশাখ হারিয়ে যায়

চৈত্রের ঢাকের শব্দে
শিম‍ুলের বুক ফেটে উড়ে যায় ষোড়শী তুলো
কোথায় যায়?
কার গন্তব্য কোথায়, কে জানে? জানেনা কেউ-
একবার বৃষ্টি জেনেছিল।
বৃষ্টির সঙ্গে কবে পরিচয় মেঘের . পাখির –সমুদ্রের
সে খবর জানতে গেলে বৃষ্টি বললো-
বৃষ্টির প্রথম ফোটা কবে সাগরে পড়েছিলো-
সে কথা কে মনে রাখে?
এমন মনে রাখা দিন-আসেনা,
আকবর বাদশা আসে দিনের উপর নিজের চিহ্ন আঁকে-
এই সব খোড়াখুড়িতে শেষ হয়ে আসে বেলা
আসে চৈত্রের দিন-
আসে বয়সের সূতো ধরে হাঁক দেয় নবীন মাঝি-
জলে ফেলে দেন, ওটা মরা,
গন্ধ হয়ে গেছে নিগজর গতরে চিমটি কাটি আছিতো?
দিন যায়, দিন আসে বছর বছর শুধু চেয়ে থাকা-
কবে চড়ক ঘুরবে? চড়ক দিন ফুরিয়ে যায়-
অষ্টকের দল পট-লয়ে বসে থাকে
বাসুর ক্রন্দনে ভাঙে পাট চালানের ঘুম।
বৈশাখী গান বাজে
শ্রমজীবী মানুষের বৈশাখ হারিয়ে যায়-ঘামের স্রোতে

গর্ভবতী মেঘের জন্য

পান, তামাক খেয়ে যেও মেঘ
আমাদের ঘরে অনেক অসুখ-বিসুখ
আপ্যায়নের সুযোগ একদম নেই-
আমরা বড় অসহায় সময় কাটাচ্ছি।
আমাদের সময় গিলে খায় হন্তারক কাল
কারা যেন আমাদের পাখিদের নিষেধ করেছে গাইতে
ঋতু বৈচিত্র চুরি হয়ে গেছে
শরতের জল ভরা মেঘের দিকে
তাকিয়ে থাকি শুকনো চোখে।
মেঘ আসে, মেঘ যায়-
মেঘেদের ভেতরেও খুঁজি আততায়ী যাও
মেঘ কোন যক্ষ নিশ্চয়ই প্রতীক্ষায়-
যেমন প্রতীক্ষা আমার শরতের গর্ভবতী মেঘ
যাও মেঘ সেই যক্ষের কাছে
যে তোমার প্রতীক্ষা করে জলভরা চোখে

আগুনমুখার ছেলে

বুকের মধ্যে অগ্নিকুন্ড জ্বলে
নেভেনা তা জ্বলে শুধুই জ্বলে।
আগুনমুখার ছেলে দেখে সাদা বুটের ছায়া
দেশটা জ্বলে বুকের ভেতর কোন জীবনের মায়া।
মায়াকাটে ছায়া কাটে বর্গীরা দেয় হানা
ধনুক ধরে বীরেরা সব ছিলায় মারে টানা।
আগুনমুখার ছেলে দেখে ঘাস, শস্য পোড়ে
স্বদেশ প্রেমের খড়গ তখন হাতের মধ্যে ঘোরে।
আক্রমণে আক্রমণে বেনিয়া যায় টলে
আগুনমুখার ছেলের গলায় ফাঁসির রজ্জু ঝোলে।
সেই ছেলেটা বীর ক্ষুদিরাম
আগুনমুখার ছেলে
এখনও এই বুকের মধ্যে তপ্ত আগুন জ্বালে।

হাড় ও খুলির বৃত্তান্ত

সময় কেমন কাটে?
রক্ত বেরোয়? নাকি দহনে শুষে যায় তাও।
প্রজাপতি প্রানী না পতঙ্গ? এ হিসেব কষতে গিয়ে
হাড় ও খুলির গল্প শুনি।
খুলির গুলি যেগুলো এ ফোড় ওফোঁড় হয়নি
সেগুলোতে ব্যথা হয়।
হাড়েও নিয়ম মোতাবেক কোপ না পড়ায়
ব্যাথা। সন্তান- স্বজনের কষ্টে মিলিত ব্যথা বাড়ছেই।
চুকনগর, তারাকান্দর, জল্লাদখানা-সারা বাংলাদেশ
বধ্যভূমি থেকে শহীদেরা উঠে আসতে চায়।
ঘাতক-দালালদের সংখ্যা বাড়ছে । উত্কট গন্ধ টেকা দায় হচ্ছে বধ্যভুমি- গনকবরে।
হাড় ও খুলির গল্প শুনতে শুনতে দিন কাটে,রাত কাটে ।  রক্ত বেরোয় না।
কষ্টে রক্ত শুষে যায়…