Home / সবিশেষ / গ্রাফিত্তি ১৯৭১ । সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ-এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব-১

গ্রাফিত্তি ১৯৭১ । সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ-এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব-১

 

syedreazurrashid

গ্রাফিত্তি ১৯৭১ ।

সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ-এর ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব-১

বৃষ্টির উচ্ছ্বাস অতিক্রান্ত;
সময় এখন আক্রান্ত – বারুদ ও সীসায় জর্জর প্রহর হানা দেয়; অগ্নি ঝরো ঝরো জর্জরিত প্রহর।
বৃষ্টি ছিল না সেদিন। শুধু ছিল আকাশ। আগুনের আঁচ লাগছে আকাশে – আগুনের আঁচে তাপে ভরে গেছে আকাশের শরীর।
শরীর এখানে শূন্যতা ;আকাশ এক নীরবতার নাম। শূন্যতা ও নীরবতার সখ্যতা থমকে আছে। চমকে উঠেছে বারুদ ভরা রাতে।
নানা প্রকাশ, অস্ত্রের গর্জনে ও যান্ত্রিক চাকার ঘর্ষণে; সাড়ম্বরে চলেছে মৃত্যুর উদযাপন।
তখন নদীকে চেনা হয়। নদীতে নৌকাযাত্রা আশ্রয় দেখায়। নদীর ওপারকে দেখা হয়। নদীতে জেগে ওঠা চরাচর নিরাপদ হয়ে ওঠে।
যশোহর রোড দেখা হয়। মানুষের পালিয়ে যাওয়া, ফেরারী হওয়ার কালবেলা প্রখর হয়ে উঠেছে।
পিছিয়ে চলা পরাজয় নয়, বরং সেখানে শক্তির সঞ্চয়, মনে হয়, মনে করিয়ে দেয় বিধাতা পুরুষ।
অশ্রুর ফোঁটার মতো রক্তের ফোঁটা বৃক্ষকে উজ্জীবিত করে, সবুজ রং ও ফসলের মাঠকে সজীব ও ফলনশীল করে তোলে, অঙ্কুরিত করে বীজকে। সবুজের শ্যামল রূপে, বীজাধারে, প্রাকৃতজনে স্বপ্ন আঁকা হয় -স্বপ্নের ভেতর গ্রোথিত থাকে সাহস ও বজ্র, তাড়না ও লক্ষ্য, শপথ ও লড়াই, কবিতা ও সংগীত।

দুই.
শহরের বুকে ট্যাঙ্ক নামলে, কামানের নল হতে বারুদ বৃষ্টি হলে, রাইফেল-মেশিনগান অনবরত ঠা ঠা ঠা ঠা শব্দ করে গেলে মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে অজস্র জীবন ফুঁসে ওঠে। মৃত্যুর সঙ্গে গলাগলি তবুও মাথা নুয়ে বাঁচা নয়,  বুক চিতিয়ে, জোরালো কণ্ঠে; তাই তো, মানুষের হাতে উঠে আসে রাইফেল, মুঠোয় থরথর করে গ্রেনেড, কাঁধে তুলে নেয় অস্ত্রের ঝংকার।
অতপর মানুষ পেয়েছিল নদী; জলের ছল ছল শব্দ; নদীতে ভেসে চলা নৌকোয় বৈঠা তুলে নিল মাঝি -বদর বদর করে নৌকা ভাসিয়ে দিল  বিরুদ্ধ স্রোতে শোণিতে লুকানো শক্তি বিচ্ছুরিত হয়।
অগ্নিকান্ত অশ্বের মতো বেগবান যেন স্রোতে ভাসা তীব্র গতির নৌকা; নৌকা রূপান্তরিত হয়ে কখনো অশ্বের মতো -দুলদুল ঘোড়াটি -আকাশময় দৌড়ায় অথবা শক্তি ধারণ করে – বদলে যায় – পরিণত হয় সেই জলযানে যা নদীর প্রবাহ ফুঁড়ে তেড়ে ছুঁটে যায় নদীর কিনারা ভাঙতে – ভাঙ্গাগড়া করতে নৌকার গায়ে যে চোখ আঁকা থাকে তা কখনো সজল, কখনো অগ্নিজল। বিস্তীর্ণ পটভূমি নদী ও নৌকা, বৈঠা ও মানুষের অন্ধকারের ভেতরে আরো গাঢ় হয়।

তিন.
ছলাৎ ছলাৎ করছে।
বৈঠার ছপ্ ছপ্ শব্দ নিরালা জগতে অবিরাম বাজছে।
মানুষের স্বর নাই। ভয়াল সময় রুদ্ধ করে রেখেছে মানুষের কণ্ঠ।
শিশুটিও কেঁদে ওঠে না। মায়ের কোলে মৃতের মতো শিশুটি।
স্রোতময়, নদীর ডাক কান্নার মতো শোনা যেতে থাকে। শোনা যায়, কান পাতলে নদীর তীর থেকে এই ডাক গর্ভিনী শাবকের আর্তরব যেন।

চার.
মেঘ ও নদীর মধ্যে আড়ি তাই বৃষ্টি নামে না বলে নদী হয় না স্ফীত।
নদী অন্ধকারের ও আলোর বিন্যাসে শুয়ে থাকে। মনে হবে, শুয়ে আছে অন্ধকার। তাকিয়ে দেখা যাবে, ভেসে চলা আলো লহরী। দিনে-রাতে রূপ বদল করা নদী এই বাংলায় প্রবাহিত; তড়িৎ চলাচল সেখানে। কিন্তু নদীর জাদু লুকানো থাকে। নদী জানে, কালো নাগিনী ফুঁসে ওঠে যেমন – তেমনি জানে, ছোবল দিতে; ক্রদ্ধ গর্জনে কেঁপে ওঠে নদীতে শত্রুর দল। গর্জনে কম্পমান হয়, সমীরণ কিংবা বসুন্ধরা … নদীর কাছে জাদু আছে।

পাঁচ.
নদী আশ্লেষে তুলে নেয় কেয়াপাতার নৌকা। আবার কারিগর বানায় যে নৌকা তাও ভেসে চলে নদীর শাদা-কালো-নীল পানিতে। নদীও রং বদলায় এবং রচনা করে নানা আশ্রয়। নারী-নৌকা-জেলে-মাঝির প্রাণ ছড়ানো থাকে নদীতে।

ছয়.
নদীতে ভাসছে মুজিবরের নৌকা। অশ্রু ফোঁটা জমা হলে নদীও সিক্ত হয়; রক্ত ফোঁটা নদীকে করে তোলে দ্রুত সঞ্চারী।
নদী বুক পেতে দিয়েছে মুজিবরের নৌকার জন্য। নদী বুকে জড়িয়ে রেখেছে নৌকা; নৌকা দু’হাত বাড়িয়ে তুলে নিল, ছাত্রযুবাকে। কলম ছেড়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে যে- তাকে।
নৌকা বুকে তুলে নিল নারীকে; কন্যা-বধু-জননীর অশ্রুপাত পতাকার অঙ্গীকার।
লাঙল ফেলে চাষী, কোদাল ছেড়ে মজুর সব এসে একত্র হবার জায়গা করে নিল নদীতে ভাসমান নৌকায়।
ছিন্নমূল মানুষ, সর্বস্ব খুইয়ে, প্রিয় মানুষ হারিয়ে, অশ্রু ও রক্তে ভাসতে ভাসতে ভিড় করলো নৌকায়, এই নদীবুকে
জোয়ান-মরদ শরীর পেশীকে পাথর বানিয়ে অস্ত্র কাঁধে নৌকায় করে চললো। চোখে আগুন, বুকে উত্তাপ, কণ্ঠে তাদের উচ্চারিত জয় বাংলার ধ্বনি দুর্গত স্বদেশকে ভয় তাড়িয়ে জেগে উঠবার জন্য এক অভিজ্ঞান।
নূহের নৌকা যেন নিষ্ঠুর আঘাতকে প্রত্যাঘাত করে করে নতুন এক মানচিত্র গড়তে মুজিবরের নৌকা অজস্র নৌকাময় হয়ে ছড়িয়ে পড়লো আনাচে-কানাচে নদীময় বাংলায়।
নদী যেখানে, নৌকা সেখানে।
মুজিব বাইয়া যাওরে বাংলার দরিয়ায়।
নৌকা চালায় গোপালগঞ্জের মাঝি।
হাল ধরেছে মুজিবর। ঝড় তুফানের ভেতর দিয়ে চলে নৌকা।

সাত.
২৫শে মার্চ। ২৫/৩/১৯৭১-এ পাঞ্জাবীরা উদযাপন করেছিল ২৪ বৎসরের মধ্যে তাদের শ্রেষ্ঠ দিন।
আক্রান্ত শহর এক শব্দের জগৎ। গোলাবারুদদের শব্দমুখর রাজত্বে মানুষ মুখ থুবড়ে পড়লো। আকাশে অজস্র তারাবাতি উজ্জ্বল আলোয় খুঁজে দিচ্ছে মানুষ।
মানুষের বজ্রমুষ্ঠিতে ধরা পতাকা ও যা-কিছু আছে তাই দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডের বিরুদ্ধে  মিলিটারী বাহিনী। অস্ত্রসস্ত্র, আক্রমণ, আর্তনাদ, শ্লোগান-ট্রাকের ঘরঘর আওয়াজ-আগুন-মৃত্যু-ক্রন্দন… একে একে যোগফলে নরমাংসের গন্ধ বিকট হযে ওঠে।
রক্তময় বাঘনখ উপড়ে ফেলছে  হৃৎপিন্ড ও চোখ; খুবলে নিচ্ছে মাংস; হাড়হাড্ডি আলাদা করছে।
গলিত মাংস ও রক্তের গন্ধে আকাশে শুধু শকুন আর শকুন। শকুন আচ্ছন্ন আকাশ আড়াল করেছিল সূর্যকে , আলোক রশ্মিকে  দেখে শুনে কেঁপে ওঠে রক্ত মাংসের মানুষ।
খুনীর সঙ্গে শকুনের দেখা হলো ভাগাড়ে। জঘন্য মিতালী শকুন আর পাকসেনানির।
প্রকৃতি কেঁপে উঠছে।
নদী অশান্ত হয়ে ওঠে; সগর্জনে বলছে যেন, প্রতিশোধ নিও, প্রতিশোধ নিও।
স্পর্ধিত নদী নক্ষত্রের যৌবন চেনে। যৌবন খুঁজে পায় বাংলার দামাল কামালদের মধ্যে।

আট.
ইয়াহিয়া নামটার মধ্যে বোঝা যায় পূর্ব পুরুষের পরিচয়। তার বদনখানি ছিল জানোয়ারের মত। জানোয়ার বলা হলে, মানুষ খুঁজে নেবে ইয়াহিয়ার মুখ।
মানুষ হত্যার উৎসব দেখার জন্য ভূট্টো রইল। ইয়াহিয়া চললো।
খই ফোটার মত গুলির শব্দ। ট্রেসারগান থেকে আগুনের উদ্ভাস। নেপথ্যে মানুষের আজাহারি। জ্বলন্ত, ফুটন্ত, অগ্নিকান্ত শহর ছাড়তে ছাড়তে যেন রক্তপানে মাতাল সে রোমাঞ্চিত ও উষ্ণ হয়ে ওঠে।
মানুষ খুনের ফরমানে স্বাক্ষর করে অফুরন্ত পারিমাণে মদ্যপানের পর একটু-আধটু মুত্রাবেগ অনুভব করলো সে।
সুরেলা নূরজাহান তার কণ্ঠে কর্কশ হয়ে উঠল।
বাঙালি রমনীরা উপগত হওয়ার জন্য উত্তম। আরো উত্তম হিন্দু নারীরা।
গর্ভপাত্র পূর্ণ করে দিতে হবে পাক মর্দদের বীজে। এইভাবে বেজন্মা নারীদের গর্ভ প্রক্ষ্যালন করা হবে।
নারীর প্রতি টান অনুভব করলো। এদিক ওদিক তাকালো ইয়াহিয়া। কাটা শিশ্ন ছটফট করে উঠলো।
কনভয় তাকে নিয়ে ছুটে চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে। রক্তক্ষুধার সঙ্গে কামক্ষুধা তাকে, তার চেহারা আরও হিংস্র করে, ক্ষুধিত আত্মা তার আজরাইলের রূপ ধারণ করলে লুকিং গ্লাসে প্রেসিডেন্টে চেহারা মোবারক দেখে গাড়িচালক আঁতকে উঠলে গাড়ির চাকায় মৃদু ঘর্ষণ হয়।
এরোপ্লেনে ওঠার আগে তাকে বিদায় জানাতে অনুগত ফৌজি কর্তারা ঠাহর করতে নাকি প্রশ্রাবের গন্ধ না মদের গন্ধ ভুরভুর করছে ইয়াহিয়া খানের গতর জুড়ে।

নয়.
ইয়াহিয়া যায়। থাকে লার্কানার নবাব ভূট্টো। খুশির শেষ নাই তার।
বাঙালদের রক্তে স্নান হওয়া তাকে পবিত্র করবে। তার ছিল আকণ্ঠ পিপাসা। রক্তপিপাসা তাকে মৃত্যু উৎসবের মধ্যে সতেজ রাখে রাতের মধ্যসময়ে।
ঘুম নয়, রক্তরাঙা এই শহরের শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের জন্য উন্মুখ শরীর তার।
এক ধরনের সুখানুভূতি শরীর মন জুড়ে খেলা করে। বাইরে বারুদ ফাটার শব্দ – এবং শব্দের ভিতরে কেঁপে কেঁপে ওঠা আর্তনাদ, মানুষের কান্না তাকে জোয়ানি ফিরিয়ে দেয়। রক্তের উন্মাদনায় সৈন্যদল যেমন তুঙ্গে চলে গেছে, ভূট্টোর নবাবি রক্তের ভিতরেও তেমনি এক উচ্ছ্বাস আছাড় খাচ্ছে।
রুদ্ধশ্বাসে প্রেমিকের পাক ওয়াতানের প্রতি ভালোবাসায় তার কলেবরে আয়তন বৃদ্ধি পায়। শান্তি এখন তার পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়েছে। সে মারলো এক লাথি। যায় না দেখা লাথিমারা। এখানে তার একান্ত ব্যক্তিগত উপভোগ। এই রাত্রি তার জীবনে সেরা উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
হাক্কু হাক্কু করতে-করতে প্রহর শেষে রক্তাক্ত ভোর দেখে সে যারপর নাই পুলকিত চিত্তে মাটি ছাড়লো, আকাশে উড়লো, চললো পাকিস্তান। প্লেনের জানালা দিয়ে চোখে পড়লো জ্বলন্ত শহরের কালো কুন্ডলি পাকানো ধূয়া লনবরত উদগীরণ হচ্ছে।
নিজের জায়গা পাকিস্তানে পৌঁছে, এরোপ্লেন থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে সহাস্যে ঘোষণা দিল, ইনশল্ল­াহ, পাকিস্তান ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
আকাশে-বাতাসে তারপর বুঝিবা কত না আনন্দ।
ফাদারে পাকিস্তান জিন্নাহ একদা যে স্বপ্নের হাত ধরে অগ্রসর হয়েছিল, টুকরা টুকরা হতে দেয় নাই সেই স্বপ্নকে, – ভাবতে পুলকিত বোধ করে সে। সে-ও একদিন নির্ঘাৎ কায়েদে পাকিস্তান হবে।
ইয়াহিয়া এক উত্তম ইডিয়ট; বেকুবটার কাঁধে বন্দুক রেখে ফায়ারিং করতে পেরেছে বলে নিজেকে তারিফ করলো সে। আর যাই হোক, যায় যদি ভেঙে তো যাক না ভেঙে – তাকে মাদার পাকিস্তান ফাকিং করার, খানখান করার দায় নিতে হবে না।
এবার তা’হলে নুসরাতের প্রতি ফরজ আদায় করা যাক। শরীরটা এলিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত ভুট্টো নিজের প্রতি ঘোষণা দিল।

দশ.
টিক্কার নামটা টিক্কা খান কে রেখেছিল তা টিক্কা জানেনা।
আড়ালে আবডালে মানুষজন তাকে কসাই উপাধি দিয়েছে।
বেলুচিস্তানের কসাই হিসাবে গণ্য হয়ে নিজের ভেতরে শ্লাঘা অনুভব করে। কিড়মিড় করছে দাঁত। এখন সকলকে মাদারচোদ মনে হচ্ছে তার। নতুন করে ভাবলো, এইবার বাঙালদের পাকজমিন হতে নিশ্চিহ্ন করার পরে কি নামে ডাকবে তাকে এইসব আকেলমন্দরা।
ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল সব। পাক ওয়াতানের প্রতি গভীর রাগে অনুরাগে ঘোষণা দিয়েছিল আমি মানুষ চাই না, মাটি চাই। নীতি হিসেবে টিক্কা খানের কাছে পোড়া মাটির নীতির তুলনা হয় না।
বাংলা সবুজ শ্যামলকে লাল রক্তে রাঙিয়ে দিতে হবে। সাদা কাগজে ফরমান লিখলো।
ইয়াহিয়া খান নির্দেশ দিয়ে গেছে, প্রত্যেক সৈন্যকে বাধ্যতামূলক ১০০০ বাঙালি হত্যা করতে হবে। ১৬-৪০ বৎসরের কোন বাঙালি পুরুষ আস্ত থাকবে না।
অতএব লেফট-রাইট-লেফট করতে করতে মৃত্যুখচিত কুচকাওয়াজ। পোড়ে ঘর, মরে মানুষ।

এগারো.
এই সেই রক্তাপ্লুত সময় – তাজা বুলেট ছিন্নভিন্ন হৃদয় বিদীর্ণ করছে – মানুষের আর্তচিৎকার ও লেলিহান আগুনের গনগনে শব্দে স্তব্ধ হয়ে আছে নদীর ­কলরোল। শ্রবণে, অনুভবে তখন শোনা হলো এক সু-সংবাদ –

এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা।
আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।

টিক্কাখান মুজিবরের কণ্ঠস্বর চিনতে পেরেছিল।
ইতো:মধ্যে উন্মাদনা মেলেছে ডানা। আত্মা দখল করে নিয়েছে অন্ধকার।
জীবনের ঠাঁই মিলে না গোরস্থানে- মৃত জীবন ও কানা অন্ধকার গোরস্থান। ক্রমে বিস্তারিত হতে থাকে।

বারো.
এবং
যেহেতু তাহাদের অঙ্গীকার পালন না করিবার বদলে
এবং সেই সময়ে তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিদের সহিত আলোচনায় রত থাকিয়াও, পাকিস্তানের কর্তৃক একটি অনৈতিক ও বিশ্বাসহন্তা যুদ্ধ ঘোষণা করে
এবং যেহেতু এহেন বিশ্বাসহন্তা আচরণের ঘটনায় ও পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণের অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের বৈধ অধিকার পূরণের জন্য ঢাকায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার একটি যথোচিত ঘোষণা দেন ।
এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখন্ডতা রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন,
এবং যেহেতু নৃশংস ও অসভ্য যুদ্ধাচরণ দ্বারা পাকিস্তান কর্তৃপ বহু সংখ্যক গণহত্যা ও নজীরবিহীন যন্ত্রণাদায়ক নিপীড়নের কার্যসমূহ করিয়াছে
এবং অন্যদের মধ্যে বেসামরিক ও নিরস্ত্র বাংলাদেশের জনগণের উপর এখনও করিতেছে
এবং যেহেতু পাকিস্তান সরকার একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়া গণহত্যা করিয়া
এবং অন্য নিপীড়নমূলক পদক্ষেপসমূহ দ্বারা বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষে সম্মিলিত হওয়া ও একটি সংবিধান প্রণয়ন করা এবং নিজেদেরকে একটি সরকার প্রদান করা অসম্ভব করিয়া ফেলিয়াছে,
ঘোষণা দিতেছি এবং প্রতিষ্ঠা করিতেছি যে, বাংলাদেশ হইবে সার্বভৌম জনগণের প্রজাতন্ত্র এবং এতদ দ্বারা ইত:পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাকে নিশ্চিত করিতেছি,
এবং … …
আমরা আরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি, স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হইতে কার্যকর হইয়াছে বলিয়া বিবেচিত হইবে।
এবার –
ধিকি ধিকি জ্বলন্ত আগুন
অগ্ন্যুৎপাতের অপেক্ষমান ফেরিঅলার দল বেরিয়ে এলো
হে প্রভু, দেখ তুমি আমাদের কল্যাণী মাতাদের সম্মুখে, শিশু আরো কত অযুত প্রাণ হারায়?
সেনাদের বাহিনী, গৌরব যা করে শিশু হত্যাকাণ্ডে
কত বাবা দু:খে রয়?
কত ছেলে নিরাশ্রয়?
কত মেয়ে উপবাসী?
কত শিশু বেদনায়
কত মা বৃষ্টিতে
কত ভাই দু:খে শেষ
কত শিশু নিরাশ্রয়

চৌদ্দ.
মুজিবুর আগে অনেকবার জেল দেখেছেন। তিনি, মাঝিহীন রেখে শত অযুত নিযুত হাতে বৈঠা তুলে নৌকা চালু করে দিলেন; নদী বুকে- নদী এখন শান্ত – বাংলার খাল বিল ছড়িয়ে আছে এক নিম্নভূমিতে – তিনি বৈঠার মাঝিদের কণ্ঠে তুলে দিলেন বজ্রপাত, শরীরে সঞ্চার করলেন বিদ্যুৎ – দেখিয়ে দিলেন দিশা, অনিবার্য আঘাতে উড়িয়ে দিতে শত্রুর আস্তানা।
বর্ষাকাল আসন্ন। পোয়াতি মেঘ আকাশ জুড়ে সঞ্চরনশীল হবে। আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি দাপার এই নিম্নভূমি; খাল-বিল-নদী-নালা ফুঁসে উঠবে বর্ষায় ও প্লাবণে। স্ফীত গর্ভের নদীময় জলের বানভাসি খোট্টার দেশে হয় নাই, তাই নদী ও জলের রুদ্র রুপ যখন বেদিশা করে ফেলবে তখনই মোক্ষম আঘাত – জলকে অবলম্বন জলের পাহাড় তুলে ডুবিয়ে মারবে যত আছে পশ্চিমা পশু। নারী ভোগে, আবালবণিতা খুনের মধ্য দিয়ে সৈনিকের মেজাজে যখন গ্রাস করবে ভোগের মহুয়া রস – তখনই নৌকার বৈঠা রাইফেলের নল হয়ে বারুদ শিখায় জ্বালিয়ে দেবে ঘাতকের অস্তিত্ব।

চলবে…………