Home / সবিশেষ / মতিন বৈরাগীর চাবি-চিত্র-মুহম্মদ নূরুল হুদা

মতিন বৈরাগীর চাবি-চিত্র-মুহম্মদ নূরুল হুদা

mmm3

মতিন বৈরাগীর চাবি-চিত্র

মুহম্মদ নূরুল হুদা

পাঁচদশকেরও বেশি সময় ধরে কবিতা লিখছেন মতিন বৈরাগী। তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা
তেরোটির মতো। গড়ে চার বছরে একটি বই। তারপর আছে নির্বাচিত কবিতা, শ্রেষ্ঠ
কবিতা,   কাব্যসমগ্র,   সিলেক্টেড   পোয়েমস   ইত্যাদি।   বোঝা   যায়,   অতিপ্রজ   নন
তিনি, নন স্বল্পপ্রজও।  তবে মিতপ্রজ। সেইসঙ্গে কবিতায় তিনি কাব্যিক পরিশীলনকে
নিজের মতো করে প্রয়োগ করতে সচেষ্ট।   শুরুতেই বলে রাখি, এই মিতপ্রজতার অন্যনাম
হতে পারে কাব্যিক ভারসাম্য। একজন পরিশীলিত কবির জন্যে আত্মবিচারের এটিই এক
বড় বাটখারা। মনে হয়,   মতিন বৈরাগী কবি হিসেবে শুরু থেকেই এই বাটখারাটাকে
সঙ্গী করে রেখেছেন।  ফলে যত গর্জন তত বর্ষণ নেই,কিন্তু আছে এমন সব ফলন, যা যে
কোনো কবির জীবনে শ্লাঘার বিষয়। খুব কম পরিণত কবিই এই অর্জনে সমৃদ্ধ।
মিতব্যয়িতা আদপেই সহজ কাজ নয়। বরং এটি শ্রমসাধ্য, পাঠসাধ্য, সংযমসাধ্য ও
সবশেষে   সৃষ্টিসাধ্য   একটি   প্রকল্প।   সহজ   পথে   সহজ   বোধে   সহজ   উচ্চারণে  কবিতা
আউড়াতে   চান   তিনি,   কিন্তু   তাতে   যুক্ত   করতে   চান  নিজের   মতো  অন্যরকম   কাব্যিক
রহস্যময়তা শৈলী ও বাণীর ভিন্নতা। অথচ এই কাজটিও অনায়াসসাধ্য নয়।
এর একটি কারণ বোধ করি এই যে, শুরু থেকেই গণমানুষের সামষ্টিক মুক্তির কথা বলেছেন
যে কবি, তার কথায় তো রোমাণ্টিকতা থাকলেও বক্তব্যের দ্বিচারিতা প্রর্থিত নয়। অথচ
কবি হিসেবে প্রায় প্রতিটি কবিতায় এই কাজটিও করেছেন তিনি।   এটি কবি
হিসেবে তাঁর শক্তিমত্তা, আবার মানবমুক্তির সাধক হিসেবে তাঁর ঊনতা বলেও চিহ্নিত
করা যায়। কেননা মুক্তিসাধককে বাণীর ঋজুতা ও অর্থের একলব্যতার সাধনা করতে হয়।
তিনি তা করেছেন,  কিন্তু একই সঙ্গে দর্শনঋদ্ধ সংশয়ী দৃষ্টিভঙ্গিকেও মান্য করেছেন।
এই   বিরোধাভাসকে   আশ্রয়   করেই   তিনি   এগিয়ে   গেছেন   দ্বান্দিক  পদক্ষেপে।   এই
বিরোধাভাস চিরকালীন নন্দনাশ্রয়ী কবিতারও এক অতিচেনা হাঁটাপথ। তাইতো তিনি
নির্দ্বিধায় বলেন,

‘জীবনের একদিকে আলোকের প্রহ্লাদ অন্যে বেদনা-অর্বুদ
হাঁটতে হাঁটতে পথ খাটো হয় রূপান্তরিত প্রজ্ঞায়।’

পথ  হাঁটাই  আসল  কথা   নয়,  বরং   পথ  ফুরোলে  প্রজ্ঞার  সঞ্চয়ই  আসল   প্রাপ্তি।  আবার
মানুষের   বেদনাকেই   আসল   প্রেরণা   বা   তাড়না   ভাবতে   চেয়েছেন   তিনি,   আশ্রয়
খুঁজেছেন দুঃখবাদীদের কাছে। কবিতার শেষাংশে তাঁর উপলব্ধি-

‘বুদ্ধ জরথুস্ত্র আর মুসা নির্ঘুম, কণ্ঠমগ্ন এক সুর
দুঃখ গলে যাক জ্ঞানে জাগরণে আলোর-উদ্ভাস
দুঃখই জ্ঞান, আলোকের দিকে।’

এ   যেন   বৌদ্ধদর্শনের   চার   মহত্তম   সত্যের   পুনরাবৃত্তি।   নির্বাণের   পথযাত্রায়
আলোকায়নই মোক্ষ। তার জন্যে জানা চাই দুঃখের স্বরূপ, উৎস, নিবারণ ও তা বাস্ত-
বায়নের পদ্ধতি। বোঝা যায়, বাণীকে দর্শনঋদ্ধ করা ও রহস্যময় উচ্চারণে কবিতা করে
তোলার সাধনা করেছেন তিনি। ‘রূপান্তরিত প্রজ্ঞা‘ শীর্ষক অন্য এক সাম্প্রতিক
কবিতায় গদ্যবয়ানে তিনি লিখেছেন,

‘দেখো কী লেখা আছে ওখানে। অক্ষর যা গঠন করেছে শব্দ ভাষার রূপান্তর। …
তুমি হাত বুলাও স্পর্শ করো, দেখবে পাথর গলান তাপ
যুক্তি অচল আর নান্দনিকতার মিছিলগুলো ভাঙে তীব্র তমোহর  …
আর সবকিছু খুলে গেল অরব রজনী – নন্দিত ভাষার মোহন মিছিল
কাব্যের জোনাকি আলোয়,তুমি পেলে শব্দ – শব্দই ঈশ্বর -’

এই উদ্ধৃতিতে ‘যুক্তি অচল’ কথাটি প্রণিধানযোগ্য। কেননা একজন যুক্তিবাদী ও
বস্তুবাদী কবি একই সঙ্গে ভিন্নমেরুতে অবস্থান নিতে পারেন না। পারেন কেবল, তিনি
যদি কবিতার বহুখ্যাত বৈশিষ্ট্য অ্যামবিগুইটি বা অর্থ-কুয়াশা দ্বারা আক্রান্ত হন।
মতিন বৈরাগীর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে বলে মনে হয়। বলা বাহুল্য, এই পঙক্তিগুলো তাঁর
পরিণত-পর্বের কবিতা থেকে গৃহীত।

এবার ফেরা যাক তাঁর শুরুর পর্বের কবিতার দিকে। জীবনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কাছের
মানুষ পাশের বাড়ি’-র ‘রৌদ্রের তরবারি’ শীর্ষক এক বাণীপ্রধান, অথচ উৎপ্রেক্ষাময়
কবিতায় তিনি ঘোষণা করছেন,

‘একটি দীর্ঘতম যুদ্ধ আমার চেতনায়
তীব্র হয় প্রচন্ড হয় সূর্যের সারথি হয় কাল নিশি ভেদ করে
প্রস্তর চূর্ণ হয়
কিংখাপে ঝলসে ওঠে রৌদ্রের তরবারি
একটি যুদ্ধ আমার চেতনায়
যুদ্ধই বদলায় যুদ্ধই চূড়ান্ত যুদ্ধই ফয়সালা।

কিংবা দু-পঙক্তির সেই অনড় প্রত্যয়

আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান সেই মানুষ
যার হারাবার আছে কেবল শৃঙ্খল . ..’
আশ্চর্য   হয়ে   লক্ষ্য   করি,   স্পষ্ট   উচ্চারণ   সত্বেও   প্রার্থিত   কাব্যিক   দ্বান্দিদ্বকতা   ও
জীবনান্দীয় পরাবাস্তবতা তাঁকে আক্রান্ত করেছে সেই অমিত যৌবনেই  ‘বাতাসের
ভেতরে জাগে আরেক বাতাস / কোথাও কি প্রাণ আছে? / ওই দেখো নড়ে চড়ে ঘাস’ ।

দৈবচয়নের   নিয়মে   এবার   আমরা   চলে   যাচ্ছি   তার   মধ্য-পর্যায়ের   কিছু   নমুনা-
কবিতার দিকে। সপ্তম কাব্যগ্রন্থ  ‘অন্ধকারে চন্দ্রালোকে‘।  শিরোনামেও সেই পূর্বাপর
কাব্য-কুহক। অর্থাৎ বয়স বাড়লেও কাব্যপ্রবণানতা ও মনোগঠন আনুপূর্বিক সাম্য
বজায় রেখে চলেছে। ‘ইতহাসের পরিণতি‘ নিয়ে তিনি লিখছেন,

‘ধ্বংস হয়ে গেছে কত পরাক্রমশীলী সম্রাট.. .
অথচ টিকে আছে সেই নিপীড়িতরা
তারা বাড়ছে যুথবদ্ধ হচ্ছে  লড়ছে জিতছে হারছে
ছড়িয়ে পড়ছে রোদের মতন
কিন্তু অত্যাচারী দোর্রদণ্ড সম্রাট! আজ আর নেই
তাঁর প্রাসাদ মহল আজ আর নেই
তাঁর ক্ষমতা দম্ভ আজ আর নেই
তার কবরগৃহ মিশে গেছে মানুষের রুদ্ররোষে -’

কিংবা

‘নিশ্চয়ই সমস্ত অসুন্দরের ভিতর একদিন সুন্দর জেগে উঠবে …
হৃদয়ে হৃদয়ে ফুটবে কুসুম ¯িœগ্ধ সৌরভময়
মানুষই আনবে তার নিজের বিজয় -’

কোনো   ধরা-বাঁধা   প্রথাগত   ছন্দে   নয়,   বরং   অক্ষরবৃত্তীয়   গদ্যমুক্তকে   দ্ব›দ্বাশ্রয়ী
নাটকীয় বয়ানে নিজের যুক্তিকে শাণিত করা বা ব্যঞ্জনাকে বহু-অর্থে পরিব্যাপ্ত করাই
তাঁর   ভেতরপ্রবণতা   বলে   মনে   হয়।   জোড়া-পঙক্তির   কবিতার   পাশাপাশি ‘অস্থিরতার
দিনলিপি‘-র মতো সুদীর্ঘ কবিতাও তিনি লিখেছেন এই স্পন্দিত বয়ানেই। শব্দচিত্রে
সচেতন,   নতুন  চিত্রকল্পে   উৎসাহী,    ইতিহাসের   অনিবার্যত   অগ্রগমনে   গণমানুষের
মুক্তিতে   আস্থাশীল,   আলঙ্কারিক  বৈচিত্র্যায়নে    শ্রমশীল   কিংবা   নিজস্ব   বাকপ্রতিমা
তৈরিতে অঙ্গীকৃত এই কবির কাব্যসাধনায় একধরনের নিমগ্ন নিবেদন অনুরণিত, যা
তাঁকে একটি নিজস্ব বাকভঙ্গি অর্জনের প্রণোদনা দেয়।   মার্ক্স-লেনিন-মাওসেতুং
থেকে বুদ্ধ-কনফুসিয়স-জরথুস্ত্র হয়ে জগতের তাবৎ মৌলিক চিন্তা তাকে প্রধাবিত
করে। কিন্তু তিনি তাঁর উক্তি, যুক্তি ও মীমাংসা নির্মাণ করেন অধীত জ্ঞানের সঙ্গে
নিজের অভিজ্ঞতার দ্বাদ্বক সংঘর্ষের পরিণতি ঘটিয়ে। এখানেই তাঁর অনন্যতা। দর্শনের
স্থিতিস্থাপকতা   ও   বাণীর   অনির্বচনীয়তা   তার   গন্তব্যের   দিকে   নিয়ে   যায়।     এই
কাব্যযাত্রায় কখনো কখনো তাঁর চিত্রকল্পগুলোও অসম্ভব সংবেদনশীল হয়ে দাঁড়ায়। আসলে
ব্যতিক্রমী   চিত্রকল্পই   তাঁর  কবিতার   সোনালি  চাবি।  তেমন   একটি  চাবি-চিত্র দিয়ে
আপাতত সমাপ্তি টানছি এই সংক্ষিপ্ত কথকতার-

স্বপ্নগুলো ইতিহাসে পরিত্যক্ত নগরীরর মতো নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে
সব দিকে বামন বামন দিন
আর বৃক্ষেরা হেঁটে চলে যাচ্ছে দূরগন্তব্যে
তুমি হয়ে যাচ্ছ মধ্যরাত
আর কবির কান্নাগুলেি শুকিয়ে শুকিয়ে হয়ে যাচ্ছে
ইতিহাসের ফুলস্টপ …’

না, ইতিহাসের কোনো ফুলস্টপ নেই। নেই কবিতারও। কবি মতিন বৈরাগীও তাঁর রূপান্তরিত
কাব্যপ্রজ্ঞায় তৈরি চলেছেন এ-রকম নানামাত্রিক চিত্র-গল্প। তার উৎসভূমি মানুষকবির
ট্র্যাজিক চিত্ত।
০৪.১১.২০১৬