Home / সবিশেষ / দীপনের মৃত্যুর সেই ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা-নাজমুল আহসান

দীপনের মৃত্যুর সেই ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা-নাজমুল আহসান

ahsan

দীপনের মৃত্যুর সেই ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা
নাজমুল আহসান, সভাপতি, আজিজ সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী ও মালিক সমিতি

দীপনের সাথে আমার পরিচয় আজিজ সুপার মার্কেটেই। আজ থেকে ২৫ বছর আগে দীপন আজিজের দোতলায় আসে প্রকাশক হিসবে। এমনিতে আজিজে তখন বইয়ের দোকান থাকলেও পাঠক সমাবেশের বিজুর পর আজিজে দীপনই ছিল দ্বিতীয় প্রকাশক। এই আজিজে দীপনের সাথে আমার অফুরান স্মৃতি রয়েছে। একুশের বইমেলা থেকে শুরু করে নানান আন্দোলন, নির্বাচন, আড্ডাবাজি, সব জায়গাতে দীপনকে সবসময়ই আমাদের পাশে পেয়েছি একজন শক্তিশালী সঙ্গী হিসেবে। সমিতি অফিসের বাইরে তৃতীয় তলায় দীপনের অফিসটিই ছিল আমাদের অঘোষিত আড্ডার জায়গা। সেখানে প্রকাশক, ব্যবসায়ী, সমিতি সদস্য সবারই ছিল অবারিত দ্বার। একসাথে বসে কাজের পাশাপাশি সেখানে নানান বিষয়ে আমাদের আড্ডা হতো, চলতো তর্ক-বিতর্কও। সবচেয়ে বেশী আড্ডা জমতো বইমেলার আগে। কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে সারারাত আমরা আড্ডা দিয়ে পার করে দিয়েছি, সময়ের খেয়াল থাকতো না। আর সেই অফিসেই যে দীপনকে এমনভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে তা আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।
দীপন আমাদের মার্কেটের যুগ্ম সম্পাদক ছিল। দীপন কখনো নির্বাচনে আগ্রহী ছিল না, তবে সংগঠনে না থাকলেও নানান সময়ে আমাদের পাশে তাকে পেয়েছি। এর ফলে অনেকটা জোর করেই আমরা দীপনকে নির্বাচনে দাঁড় করাই। সেই নির্বাচনে দীপন ব্যপকভাবে জয়লাভ করে। কমিটিতে পদ নেওয়ার পর থেকেই কীভাবে এই মার্কেটকে সুন্দর করা যায় তা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দীপন আজ আমাদের মাঝে নেই, তার অনুপস্থিতিতে আমাদের কর্মকান্ড অনেকখানিই ঝিম ধরে গেছে। দীপনের মৃত্যুর পর আমাদের আড্ডাও বন্ধ হয়ে গেছে। দীপন নেই, আমাদের কোন আড্ডাই এখন আর জমে না। দীপনের সাথে প্রায় দুপুরেই আমি একসাথে খেতাম। আমাদের বেশীরভাগ খাওয়া-দাওয়াই হতো অন্তরে রেস্তোরায়। দীপন প্রচন্ড ভোজনরসিক ছিল। খাওয়ার ব্যাপারে তার কখনো না ছিল না। দীপনের মৃত্যুর ৩-৪ দিন আগেও আমার অন্তরে বসে একসাথে খাওয়া-দাওয়া করেছি। তবে যেদিন তার মৃত্যু হয় সেদিন কেন যে ওকে ডাকা হলো না, আজও সেই আফসোস আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।
সেদিন দীপন একাই অন্তরে খেয়ে তার অফিসে গিয়ে বসে। দুপুর থেকে দীপনের বাবা, স্ত্রী সবাই তাকে খুঁজছিল। কিন্তু দীপনকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে দীপনের বাবা প্রফেসর আবুল কাশেম ফজলুল হক স্যারসহ আমরা যখন তার অফিসের এক কর্মচারী আলাউদ্দিনের মাধ্যমে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকি, তখন পুরো মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। মেঝেতে দীপন সেজদার ভঙ্গীতে মতো বসে ছিল। সারা মেঝেতে রক্ত জমে চপচপ করছে। সাথে সাথে পুলিশসহ আমরা তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাই, তবে দীপনকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। দীপনের মৃত্যুর সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। দীপন মরে গেছে, তবে দীপনের মৃত্যুর সেই ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা।
দীপন ছিল আমাদের অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। সে একদিকে যেমন পরোপকারী ছিল তেমনি কোথাও কোন প্রকার ঝামেলা-গন্ডগোল দেখলে সে সবসময়ই তা সমাধানের চেষ্টা করতো। কোন সমস্যাই সে জিইয়ে রাখতো না। এছাড়াও দীপন অত্যন্ত ধার্মিক ছিল। নিয়মিত রোজা রাখতো, নামায পড়তো। প্রতি রোজার মাসে ইফাতারিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে নানান রকমের ইফতারি নিয়ে আসতো, এবং কখনো একা খেতো না। সবাইকে নিয়ে মিলেমিশেই সবসময় ইফতার করত। তাকে হত্যার পর জঙ্গীরা বলেছে যে দীপন নাস্তিক ছিল, কিন্তু কথাটি চরম মিথ্যা। দীপনের সাথে মার্কেটের ব্যবসায়ী থেকে কর্মচারী সবার সাথে তার সম্পর্ক ছিল চমৎকার।
দীপনের মৃত্যুর পর  তিনদিন আমরা মার্কেট বন্ধ রেখেছি। পুরো মার্কেট কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছি। এরপর দীপনের স্মরণে মিলাদ মাহফিল করেছি। দীপনের স্মৃতিতে আমরা আজিজের একটি প্যাসেজ দীপন কর্ণার নামকরণ করেছি। এছাড়াও তৃতীয় তলায়  দীপনের স্মরণে আমরা সেখানে একটি ম্যূরালও করার পরিকল্পনা করেছি। খুব শীঘ্রই আমরা ম্যূরালটির কাজ শুরু করছি এবং আশা করছি আগামী ছয়মাসের মধ্যেই আমরা তার কাজ সমাপ্ত করতে পারব।
দীপনের মৃত্যুর ক্ষত দীপনের পরিবার, বন্ধুবান্ধবসহ আমার মতো আরো অনেকেই বয়ে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যে আমাদের মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর একজন। দীপনের মৃত্যুর সময় আলমগীর দেশের বাইরে ছিল। তার সাথে দীপনের ঘনিষ্ঠতা ছিল সবচেয়ে বেশী। দীপনের মৃত্যুর পর দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত যতবারই আলমগীরের সাথে আমার কথা হয়েছে তখনই আলমগীরের কান্নার শব্দ শুনেছি আমি। আলমগীর আজিজের উপরেই থাকতো। দীপনের সাথে তার দেখাসাক্ষাৎ যেমন বেশী হতো, তেমনি দুজনের মধ্যে হৃদ্যতাও ছিল প্রচুর। দুজনেই মার্কেটের উন্নয়নের চেষ্টা করতেন। কীভাবে সমিতিকে এগিয়ে নেওয়া যায় সে বিষয়ে আলাপ আলোচনা করতেন।
খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি দীপনের আরো একটি শখ ছিল, তা হলো ঘুরে বেড়ানোর। দীপনের সাথে আমার কখনো কোথাও ঘোরা হয়নি, আর কখনো হবেও না। তবে কামনা করি দীপন এখন যেখানে আছে সেখানে সে যেন ভালো থাকে, শান্তিতে থাকে।