Home / সবিশেষ / বই পড়ার টুকরো স্মৃতি – ১২

বই পড়ার টুকরো স্মৃতি – ১২

Mostaque-Ahmed
কক্সবাজারের উপহার

আমার চাকুরিজীবনের প্রায় দু বছর সময় কেটেছে কক্সবাজারের একটি স্বাস্থ্য কর্মসুচিতে। সেই সুবাদে সমুদ্রশহরের কবিদের সাথে আমার সখ্যতা। প্রথম পরিচয় ঘটে স্বরূপ সুপান্থের সাথে, পরিচয় করিয়ে দেন আমার বন্ধু তখনকার কক্সবাজার বেতারের পরিচালক গল্পকার খোকন কায়সার। সপ্তাহান্তে ঢায়া পরিবারের কাছে যেতাম, কখনো ঢাকা সফরটা পাক্ষিক হয়ে গেলে সপ্তাহান্তে স্বরূপের বাসায় অস্থায়ী ডেরা বাঁধতাম। ওর বাসার মূল আকর্ষণ ছিল মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বই, বই আর বই; খাটপালঙ্ক ছিল না। সেই আছাদমেঝে পাঠাগারের অনেক বই কীট হয়ে দংশন করেছি কিন্তু সে কথা আজ নয়; আজ বলব কক্সবাজারের কবিকুলের কাছ থেকে পাওয়া কবিতার বিয়ের ফিরিস্তি।
প্রথম সপ্তাহেই একদিন ঝাউতলার পালের দোকানে আলাপ হয়ে গেল মানিক বৈরাগী আর সিরাজুল হক সিরাজের সাথে। আড্ডা স্থানান্তর করার জন্যে কিংবা আমার লেপ-তোশক কেনার জন্যে আমরা হাঁটছিলাম হোটেল প্যানোয়া কিংবা বড়বাজারের পথে। তাঁদের সাথে আলাপে জানিয়েছিলাম একদা আশির দশকে অমিত চৌধুরীর ‘মুল্যায়ন’ পত্রিকায় আমি কবিতা পাঠিয়েছিলাম আর কলেজের সাহিত্য সাংস্কৃতিক সপ্তাহে আমি আর নাসরিন আপা যেবার প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ নীলকণ্ঠ’ আবৃত্তি করে রানার্স আপ হয়েছিলাম সেবার তিতাস আর দিশা আপা অমিত চৌধুরীর ‘চোখ রেখেছি তোমার চোখে’ আবৃত্তি করে মাত করে দিয়েছিলেন! পথেই কস্তুরি হোটেলের সামনে অমিত চৌধুরী, রুহুল কাদের বাবুল, কালাম আজাদ আর অকালপ্রয়াত মাসউদ শাফির সাথে দেখা। অমিত চৌধুরী চলতি সংখ্যা মূল্যায়ন দিলেন আর উপহার দিলেন কিছুদিন আগে প্রকাশিত হওয়া কবিতার বই ‘ ধোঁকাবাজ ধোঁকারাজ’। চোখ রেখেছির সেই রোমান্টিক কবি তখন বেশ পোড় খাওয়া ( অবশ্য তিনি আশৈশব পোড় খাওয়া, বুকে একটা পোড়া দাগ রয়ে গেছে আজও) , গ্রন্থের নামকরণে ভিলেনের দৌরাত্ম থেকেই তা বিলক্ষণ টের পাওয়া যায়। অমিতদা আমকে এতটাই স্নেহের বাধনে বেঁধে ফেওললেন যে পরবর্তী সংখ্যা মূল্যায়ন থেকে সম্পাদনা পরিষদে আমার নাম ছাপ্তে শুরু করলেন, আমিও কিছু গদ্য লিখেছি সেই সুবাদে।
মানিক বৈরাগী আরেক সংগ্রামী কবি। প্রেম ও দ্রোহের যুগলবন্দী ‘গহীনে দ্রোহ নীল’ মাত্র বেরিয়েছে, তার একটা কপি পেলাম। মানিক তার পরবর্তী কাব্যটি রচনা করেছিলেন দারুন অসুস্থতা আর অনটনের ভেতরে; সেই ‘শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্ত করেছি’ কুরিয়ারে পাঠাতে ভোলেননি আমাকে।
আপাদমস্তক কবি ও গীতিকার সিরাজুল হক সিরাজের প্রথম কাব্য ‘রূপচাঁদা কঙ্কাল’ পড়া হয়ে গেছিল সেই আছাদমেঝে পাঠাগারেই। আমি কক্সবাজারে থাকার সময় দেখেছি সুগন্ধা পয়েন্টের সৈকতে ছাতার নিচে বসে ‘বোঁয়াড়ি’ কাব্যের ঘসামাজা করতে। বই বের হলে উফার দিয়েছিলেন। এই কাব্যের পরে এল ‘ঘিলাফুল’ , দুটোতেই আঞ্চলিক ভাষার শব্দ আর মান ভাষার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন সুন্দরভাবে।
কুতুবদিয়া থেকে আড্ডায় আসতেন খালেদ মাহবুব মোর্শেদ আর মহেশখালি থেকে নিলয় রফিক। খালেদ একজন শক্তিমান কবি। তার ‘সম্পন্ন সাম্পানে’র ফ্ল্যাপ লিখেছিলাম, সে কারণেই বইটা পাওনা হলেও পরের বই ‘মহাপ্লাবনের পলি’ পাঠিয়েছিলেন নিস্বার্থভাবে। খালদের বাড়ি কুতুবদিয়া আর চাকুরি করেন মহেশখালি; দ্বীপ-দ্বীপান্তরের কবি বলা যায়!
নিলয় রফিকের কবিতা সারাদেশের নানা কাগজে ছাপা হয়। তিনি যতদিনে বই করেছেন আমি ঢাকায় থিতু হয়েছি। আমাকে ডাকযোগে পাঠিয়েছিলেন ‘ বিশুদ্ধ বিষাদে ভাসি আমি রাজহাঁস’।
কালাম আজাদ সর্বকনিষ্ঠ ছিল, ‘জলের বোতামে’র পাণ্ডুলিপি আজও বই আকারে বের হয়নি, কিন্তু ইতোমধ্যে তার দু দুটি গবেষণাগ্রন্থ ( কক্সবাজারে ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে) বেরিয়েছে এবং যথসময়ে পেয়েছি তার হাত থেকে।
কক্সবাজারের ঢাকানিবাসী কবি আসিফ নূরের সাথে একদিন মানিকের আর্ডসের অফিসে কথাবার্তা হল। ঝোলা থেকে বের করে দিলেন লাল রঙের বই ‘ শরবিদ্ধ শরের শহর’।
কক্সবাজারের চত্তগ্রামনিবাসী কবি ভাগ্যধন বড়ুয়ার সাথে চট্টগ্রামের বাতিঘরে দেখা হল যখন মাত্রই তার ‘অপর পৃষ্ঠার বৃত্তান্ত’ বেরিয়ে গেছে এবং গরম পিঠার মত নাকি বিক্রিও হচ্ছে। আমরা এক চায়ের টঙে বসে মজা করে মোড়ক উন্মোচনের ফটোসেসন করলাম তার কাব্যের!
আলী প্রয়াস একজন শ্রমশীল সাহিত্যিক। তার দীর্ঘ কবিতার সংকলন জলপাহাড়ের ভূগোল ছাড়াও প্রথম কাব্য ‘ নুড়িপাথরের ঘ্রানে’ও দীর্ঘ কবিতার বীজ ছিল। কবিতায় ধারণ করেছেন সমদ্র পাহাড় নিসর্গের চালচিত্র।
মনির ইউসুফ ঢাকাবাসী। তার কোনো বই আমাকে উপহার দেননি, তবে ‘কবিতার রাজপথ’ তার ঝোলার ভেতরেই থাকে, দেখা হলেই পেয়ে যাই চলতি সংখ্যা।
স্বরূপ সুপান্থ বই করলেন অনেক পরে। এ বছর বইমেলা থেকে তার কাব্য ‘ জলকামানের বই’ হাতে পেয়ে যা লিখেছিলাম তা উদ্ধৃত করে শেষ করছিঃ
জলোচ্ছ্বাসের পরদিন সকালবেলা, সমুদ্ররাক্ষুসী তখন শান্ত হয়ে গেছে।
বাবার হাত ধরে কিশোরটি সেই মৃত সৈকতে যুঝতে শুরু করল অপার শান্ত জলের মুখোমুখি।
সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সেদিন সে কিছু কথা বলেছিল।
তরুণ কবির মুখ থেকে এই গল্প শুনছিলাম আর নিশ্চিত হয়েছিলাম এই তার কবি হয়ে উঠবার গল্প।
সমুদ্রকে সেদিন যা যা বলেছিল আর বলতে শুরু করেছিল তা একদিন মলাটবদ্ধ হবে তা অবশ্যম্ভাবী ছিল।

যে সমুদ্রের মধ্যে দৌড়াতে চেয়েছিল আশৈশব, বইমেলায় তাকে আমি উড়তে দেখছিলাম আর আমি তালই মেলাতে পারছিলাম না। এই উড়ানরহস্য বুঝতে হলে জলকামানের বইটা পড়ে দেখতে হবে আপনাকে।
মস্তকারণ্যে এক রোসাঙ্গের ঘোড়া সঙ্গী করে, তারপর তার পর্যটন বিস্তৃত হল লেমুঝিরি পাড়া , হাড্ডি কোম্পানির গলি হয়ে ফলমণ্ডি রোড, তারপর ওই যে দেখা যাচ্ছে জিইসির মোড়!
বইমেলার সীমিত আলাপে তাকে ধরাই যাচ্ছিল না।
কেননা আপাতচঞ্চল, ডানাঅলা কবিকে ধরা শক্ত। অথচ জলকামানের বই হল স্তিতধী বয়ানগুচ্ছ।
এবার তাকে ধরতে হবে!