Home / সবিশেষ / কালপুরুষ । পর্ব -২ । সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ

কালপুরুষ । পর্ব -২ । সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ

porbo-2

 

প্রিয় পাঠক কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হক-এর বই-সাহিত্য নিয়ে
বইনিউজের জন্য ধারাবাহিক লিখছেন সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ। আজ প্রকশিত হলো পর্ব ২। প্রতি মঙ্গলবার এই কলাম প্রকাশিত হয় চোখ রাখুন বইনিউজে।

প্রকৃতপক্ষে লেখার টেবিলে নিমগ্ন ও ধ্যানস্থ হওয়া ব্যতীত আর কোনো দর্শন থাকতে পারে না। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এক সাংঘাতিক তাড়নায় কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। শামিল আছেন তিনি, সময়ের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক প্রাণান্তকর দৌড়। সময়ের চেয়ে অগ্রসর যিনি, তার বিরুদ্ধে আক্রমণ হানা দেয় পেছন থেকে। তবু ভাটির দেশের মানুষটাকে উজানে চলতে হয় অবিরত।
গল্প-প্রবন্ধ, আমরা ভুলে যেতে পারি না; এ এক নতুন সংযোজন, নববিন্যাসে নিরীক্ষাধর্মী প্রকাশ।—প্রবন্ধের মধ্যে গল্পকে তিনি উজাড় করে দিয়েছেন।
লিটল ম্যাগাজিন করি যখন, এগিয়ে রাখতে চাচ্ছি তার যাবতীয় দ্যুতিময় পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে : শিল্পের পরীক্ষাগারে তিনি নিজেকে মুখরিত রেখেছেন। এই প্রবণতা তার সম্বল নয়, কিন্তু তাকে উপলক্ষ করে অবিরাম যখন ঘটে যেতে থাকে এবং যাবতীয় ধরনের কোলাহলের মধ্যে লেখকমাত্র আরাধ্য যে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর নির্মাণ এবং এই গড়ফব-কে সুস্থাপিত করা জরুরি,—সেক্ষেত্রে নিরীক্ষার বিকল্প কোনো আয়োজন বিকল্প হয় না বলেই তিনি নিয়ত নিবৃত্ত রেখেছেন পরীক্ষাধর্মী কুশলতায় এবং বারবার নিজস্ব কণ্ঠস্বর পাল্টে পাল্টে অমৃত হয়েছেন তিনি এবং মহাকাল অভিমুখী সৃষ্টিমুখর প্যাসেঞ্জার তিনি।
স্বাতন্ত্র্য নিয়ে পৃথক এক কণ্ঠস্বর বারবার ধারণ করে, নানা মাত্রায় বিভিন্ন মাধ্যমে যোজনা ও সংশ্লেষণের ভিতর দিয়ে আমরা একের পর এক রচনায় প্রকাশিত—ক্রমে বিকশিত হতে দেখি অনন্য হতে অনবদ্য সৃজন এবং পাঠকের সঙ্গে শিল্প সংযোগ ঘটে চলেই চলেছে।
এই যে ক্রিয়াপদ চলেই চলেছে’ এমন নতুন প্রকার উদ্ভাবনা তার ভাবনায়, লেখায় দুর্লক্ষণীয় নয় বলেই প্রভাব এমনই ব্যাপক মুখ নিয়ে হাজির হলো যে, সঠিকভাবে উপর্যুক্ত বাক্যটি সমাপ্ত করতে অর্থটা বুঝিয়ে দিতে, নিজের মধ্যে এই ক্রিয়াকর্মটির ভিত্তিকে শক্ত করতে শরণাপন্ন হতে হচ্ছে তার নির্বাচিত এই ক্রিয়াপদের ব্যবহারিক সৌন্দর্যে ও তীব্র চলনে।
আসমানদারি আর জমিনদারি সৈয়দ হকের একেবারে নিজস্ব।
অনুল্লেখ রাখি যদি, আলাদা করে চিনে নিতে কষ্ট হয় না, একবার হলে সৈয়দ শামসুল হকের নামটি আমাদের চিন্তায় আসবে যখন তিনি নামাঙ্কন করে যান সৃষ্টির, তার একেকটির রচনা। নাম অনুল্লেখ সত্ত্বেও লেখকের অস্তিত্ব আমরা অনুভব করি নামকরণের অস্তিনাস্তিতে।
সৈয়দ হক কৃত কতকটা নামজারি দেখে নেয়া যাক; সত্যতা মিলবে।
যে কাব্যগ্রন্থগুলো সৈয়দ শামসুল হকের, অনবরত প্রকাশ হয়ে চলছে আজও—তুলে দিলাম কতিপয় নামপট—
একদা এক রাজ্যে বিরতিহীন উৎসব
প্রতিধ্বনিগণ অপর পুরুষ
নিজস্ব বিষয় পরানের গহীন ভিতর
এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি বেজান শহরের জন্য কোরাস
রজ্জুপথে চলেছি অগ্নি ও জলের কবিতা
আমি জন্মগ্রহণ করিনি নাভিমূলে ভস্মাধার
এইভাবে অজস্র দৃষ্টান্তে বলতে পারি কুশলী ও চৌকস, আধুনিক ও পরাবস্তু—এমনকি রক্ত উচ্চারিত নামকরণেই পরিচয় জানিয়েছেন আমাদের। ভাবা যায় আত্মার মৃত্যু ও কবি যা দেখেছে; মহিলাকে শিল্পীর উত্তর; কি মুহূর্ত; আসন্ন অরণ্যদেশ, না নির্বোধ, না মহাপুরুষ,; অন্তহীন বর্তুলের গান; বলতে পারা যায়; আর এস ভি পি; জীবনের বাসে আমি উঠে যাব; একটি লোকের কথা বলি; শব্দেরই শরীরে আছে; নাভিমূলে নামে পদ্যপরি; করোটির নারীগন্ধে; এখনো বাংলার বুকে; অবিরল ঝরে পড়ে বাংলার অক্ষর; ফিরে এসো বাংলাদেশে; এক অপেক্ষার ধ্বনি; দেখতে আসেন মহিলা এক; নদীর ঘাটে ছিল অন্ধকার; চোখ দেখছে; অথবা দেখেছো; অন্তহীন সাদার ভেতরে; এ আমার নিজস্ব নিকট; একদা একটি দেশ ছিল; যতদিন না লেখা হয় ইতিহাসের নতুন এক পাতা; পরাণের গহীন ভিতর; কাঁদছিল, কেউ কাঁদছিল। এইভাবে কবিতার নাম—তাই সৈয়দ হকেরই নাম হয়ে যেতে থাকবে। ইঙ্গিত রাখলাম আমি কারণ বিস্তারিত আপনাদের জানা কীভাবে কবিতার নামের মধ্য দিয়ে কবির অবস্থান, জ্ঞান-ধর্ম, অভিজ্ঞান প্রতিফলিত হয়ে সৈয়দ হকে ও তার কবিতার শরীরে ও শিরোস্ত্রাণে। কবিতাগুলি, সৈয়দ হকের অপর নাম হয়ে বাঁচবে এবং জাগাবে। বৃষ্টির জলনূপুর, জলতরঙ্গ বাজনা শুনবার মতো করে শব্দ শুনতে শিক্ষাকালীন আমাকে শোনানো আমার উচ্চারিত তার ব্যাপক কবিতা, বাণী, শব্দ, বাক্যের গঠন ধারাপাত শিক্ষার মতো আজও মর্মমূলে যে গাঁথা হয়ে আছে—তা মান্য করতে অনুৎসাহ বোধ করি না, এখন।
মোহর মেরে দিয়েছেন এই তিনি, সৈয়দ শামসুল হক নাম তার। সংগীতের ভেতরে গতি কিংবা গতিময় গীত পেয়েছিলাম—এই গতি, পিচ্ছিলতা নয় বরং—
তাই সে উদ্যমী নয়, যখন উদ্যম;
তাই সে বিনষ্ট নয়, যখন বিনাশ;
তাই সে নির্মিত নয়, যখন নির্মাণ;
তাই সে খণ্ডিত নয়, যখন ভাঙ্গন;
তাই সে ফাল্গুন নয়, যখন সাক্ষাত;
তাই সে সংসারী নয়, যখন সংসার;
তাই সে সন্ন্যাসী নয়, যখন শ্মশান।
আবারো পড়ি :
কেবলি উদ্যম আর কেবলি বিনাশ;
কেবলি ভাঙ্গন আর কেবলি নির্মাণ;
কেবলি বিদায় আর কেবলি সাক্ষাত;
কেবলি শ্মশান আর কেবলি সংসার।
কখনো কবিকে—অপর পুরুষের এই কবিতা বারংবার কেন যেন সাক্ষী দেয়, এ যেন সব্যসাচী এই লেখকের নিজেকে নিয়ে রচিত মানবিক এক মেনিফেস্টো। মেনিফেস্টো হয়ে ওঠে এই কারণে যে, নিজেকে ব্যাখ্যা করার জন্য যে কোনো সৃজনশীল মানবের পক্ষে আর কোনো ইশতেহার বিকল্প হতে পারে না যখন নারী ও পুরুষের যৌথ আবেগ এক মানবিক সমাজের জন্য উন্মুখ।
www.facebook/WreazWritings
syedreazurrashid@gmail.com