Home / সবিশেষ / এই সময়ের কবিতা ■ পারভেজ চৌধুরী

এই সময়ের কবিতা ■ পারভেজ চৌধুরী

pc1এই সময়ের কবিতা ■ পারভেজ চৌধুরী

হেসে উঠে উদবিগ্ন আকাশ

এক অদ্ভূত কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে বাংলাদেশ
ভেসে যাচ্ছে বিষাক্ত চোরাস্রোতে,
রোদহীন, জমে থাকা উদ্বিগ্ন আকাশ
হেসে উঠে সিরিয়ার আলেপ্পোতে ।
কেও নেই, হাহাকার, চুপচাপ সব । ভাবুক
সময়কে পেটায় নিঃশব্দের চাবুক ।
দম নেই, আলো কম
আলো চাই আরও
জেঁকে বসে অন্ধকার
মাটিচাপা, গাঢ়।

 

রাষ্ট্র, কথা বলো

রাষ্ট্র, কথা বলো । তুমি এখন কাঠগড়ায়
হে নিখুঁত বন্দুকবাজ
এত রক্তপাত, অন্ধকার কে ছড়ায়?
কাকে গুলি করে মারো?
যে তোমার তাতিয়ে দেয়া গল্প বলে দেবে,
যে চিনিয়ে দেবে তোমার জুড়ে দেয়া নগ্ন হাত?
মানুষ জ্বলতে জ্বলতে অবিশ্বাসী হয়ে গেছে
ক্রমশই ধোঁয়াশা হয়ে আসছে, স্বদেশ ।
মনে রেখ,
ধর্মকে বহন করা পতাকা আমার হবেনা কোনদিন ।
রাষ্ট্র, কথা বলো । তুমি এখন কাঠগড়ায়
আমাদের দুঃস্বপ্নগুলো বড়োবেশী বিভীষিকাময়
অন্ধকারের খাঁচা থেকে বেরিয়ে গেছে সেই জন্তুগুলো
পাতাল থেকে উঠে আসা অনিঃশেষ আশার গান
থেমে গেছে সবার ।
রাষ্ট্র তুমি কথা বলো
কথা তোমাকে বলতেই হবে …

 

এ আমার বাংলাদেশ

রক্তেরঞ্জিত দেহটা উপুর হয়ে পরে থাকা
এ তুমি নও নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে
এ আমার দেশ । অপরুপ, ভয়ংকর সমগ্র বাংলাদেশ ।
প্রশ্নবিদ্ধ, নিরুত্তর শ্যামলভূমি,
ভরে গেছে বিষাক্ত জঞ্জালে
চারপাশ শূন্যতার আলিঙ্গন
তছনছ যাপিতজীবন
এ যেন হাহাকার করা বন্দী নিবাস ।
বাদুড়ঝোলা বুদ্ধিজীবীরা এখন নির্বিবাদী বেহেলাবাদক
মানুষেরা হয়ে গেছে এক একটা সাদা কংকাল
মৃত পুলিশের আর্ত হুংকারে ছেয়ে গেছে আকাশ-বাতাস,
হাতকাটা রাষ্ট্রের বোবাকান্নায় বিপন্ন সব ।
ধেয়ে আসছে অন্ধকার
শোকে মুহ্যমান কালো অক্ষরে ছাপা বইয়ের মত ।
প্রতিরাত, সকাল বিকাল সন্ধে
রক্তেরঞ্জিত দেহটা উপুর হয়ে পরে থাকা
এ তুমি নও সুহাসিনী মিতু
এ আমার দেশ । ভয়াল, আক্রান্ত সমগ্র বাংলাদেশ ।

 

তুমি

তোমার কাছে থাকবো বলে কোথাও যাওয়া হলোনা আমার
রুপালী চাঁদ, নীলজলের হাতছানি
সবকিছু বাদ দিয়ে
পাহাড়চূড়ার সন্যাসীর মত রয়ে গেলাম ।
ব্যাংকে টাকা জমা রাখার মত
দেহ মন সব তোমার কাছেই ছিলো।
আমি তো কখনই ছিলাম না প্রেমহীন ঘ্রাণময় গোলাপ
কি দিয়ে লুকাই বলো আমার ক্ষত ?
লোকশ্রুত অবিশ্বাসী আমি
অনেক তো পুড়েছি স্বদেশের রোদে
ততটাই ভিজেছি নিরুপদ্রব জলে ।
এই যে আমার নিরিবিলি অন্তরঙ্গ !
মসৃন জীবনের ধারাজল
কোথায় এসে থেমে গেল সব ?
ঘিরে আছে লোবাণের ঘ্রাণ
ইদুরের মত মৃত্যু
অন্ধকারে বন্ধ দরোজা ।

 

কোন দিকে যাবে স্বদেশ ?

বেদনাবিহ্বল বৃক্ষেরা জন্মান্ধের মত
কেবলই হাতড়িয়ে বেড়ায়
কোথাও কেউ নেই
জ্বলজ্বলে হাহাকার
দীর্ঘশ্বাস আর দীর্ঘশ্বাস ।
আনলায় ঝুলিয়ে রাখা শার্টের মত
নতজানু হয়ে আাছে সব ।
গা ঝাড়া দিয়ে উঠার কারোর কোন লক্ষণ নেই
বহতা নদী জমতে জমতে বরফ হয়ে গেছে
পূর্ণবার চাষাবাদ হবেনা জয়শ্রী জীবনের ।
বেঁচে থাকা মানুষেরা কি জেগে আছো,
নাকি জীবন্মৃত ?
কোন দিকে যাবে, হে স্বদেশ ?
কোন পথে যাবে?

 

হিমঘর, ঘুমঘর

প্রিয় স্বদেশ হিমঘর হয়ে আছে
প্রিয় স্বদেশ ঘুমঘর হয়ে গেছে
চারিদিকে নিরুত্তাপ, চুপচাপ, স্থব্ধতা ।
আকাশ ভালো নেই
ভালো নেই পাহাড়,নদী, জল
কলবল করা সোনালী মাছ ।
আমার মন ভালো নেই।
মানুষেরা গম্বুজের মত উপুর হয়ে আছে
প্রতিবাদহীন, প্রতিরোধহীন
ভেবে নেয় তার বসবাস সমতলে
কিংবা বৃষ্টিময় মেঘের ভেতর ।
মানুষেরা ভালো নেই
মন খুলে নিতে পারেনা শিউলির ঘ্রাণ,
কান পেতে বৃষ্টির শব্দ ।
ভয়ংকর দরোজা খোলা স্বদেশের
ভরে গেছে বিষাক্ত বাতাসে ।
আকাশ ভালো নেই
ভালো নেই পাহাড়,নদী, জল
কলবল করা সোনালী মাছ ।
আমার মন ভালো নেই।

 

নিরুত্তাপ ফেরারী

হে আমার সোনালী বাতাস, সুনিপুন হাহাকার
তুমি ফেরারী হও
এই অন্ধকারের দেশে আমি এক মৃত মানুষ
কবর থেকে তুলে আনা লাশের মত জবুথবু ।
স্বদেশের জল, স্বদেশের পূর্ণিমায় স্নাত
প্রতিবাদ, প্রতিরোধহীন মানুষেরা যেন অচীন বৃক্ষের বন ।
দায়হীন পাথরের মত বাতাসের সাথে হেলেদুলে করে
সময় ফুরানোর খেলা ।
অন্ধকারের জাগ্রত ঘাসে ভরে গেছে সরিসৃপ ।
নিরুত্তাপ, নিঃস্তেজ হয়ে গেছে সব শিশুর শিশ্নের মতো ।
এই অরক্ষিত পলল ভূমিকে ভাগার বানানো হলে
কারো কিছু যায় আসেনা ।
বিষন্নতায় ভারী হয়ে আসা বাতাসে সবাই নাগরদোলা চড়ে
সবাই সবার ছায়ার সাথে রাজনীতি খেলতে খেলতে
দর্শকভরা মাঠের খেলোয়াড় হয়ে গেছে …

 

চন্দনার জন্যে কবিতা

চন্দনা,
তোমাকে নিয়ে আর স্বপ্ন দেখা হলোনা
নিরাশ্রয়ী কবির শেষ হলো সব
প্রসন্ন ভোর,
পাখির কলরব।
চারপাশে শুধু সর্বভূক অন্ধকার
আর
বরফের মত জমাট বেধেঁ থাকা
স্থব্ধ অশ্রুপাত
অনির্মান রাত ,
মেঘে ঢাকা আকাশ । স্বেচ্ছাচারী জল
অর্নগল
হানা দেয় মগজের কোষে ।
রাষ্ট্র ! সেতো কেবলই স্বাপদ পোষে ।
চন্দনা,
তোমাকে নিয়ে আর স্বপ্ন দেখা হলোনা
বিষন্ন ভরা কবির নেই কোন সংঘ
লুকিয়ে থাকাই তার
প্রধান অনুষঙ্গ।

 

আমাকে বাঁচাও

মেঘ পোড়া ধোঁয়া নাকে এসে লাগে বেশ
কোথায় যাবো বলো ?
আমি ক্রিতদাস, আমি ক্রিতদাস
ঘরহীন এক মানুষ।
আতংকিত মাছের মতো কেবলই সাঁতার কাটি
সারাক্ষণ তাড়া করে স্বাপদ সরিসৃপ।
আমাকে বাঁচাও হে পৃথুলা পৃথিবী
আমাকে বাঁচাও হে যাযাবর ধুলোবালী
তৃণ লতা উদ্ভিদ আমাকে বাঁচাও।
আমাদের জীবন! সে তো খামে না ভরা চিঠি
জলে ভাসা কালিতে লেখা এক সাদা কাগজ
বিস্তৃর্ণ বসবাস … মৃত্যু উপত্যকায় ।

 

ও মাতৃভূমি, ও মৃত্যুভূমি

আমি কখনই আমার মাতৃভূমিকে মৃত্যুভূমি ভাবিনা ।
ভাবতেও চাইনা ।
এই রক্তজ ভূমির প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে আমার নিঃশ্বাস
প্রিয় স্বদেশে আমার আকাশ
আমি তার নির্ভার, ডানামেলা পাখি,
ভুলতে যেয়ে আরো ভালোবেসে ফেলি তাঁকে।
দিনযাপনের হিসেব নিকেষ এই মাটিতে
আমি কখনই আমার মাতৃভূমিকে মৃত্যুভূমি ভাবিনা ।
খুন হয়ে যাওয়া বন্ধুর মুখ
তাকিয়ে থাকা নিস্তেজ চোখ,
ক্ষত বিক্ষত চিত্রল স্মৃতির ত্রস্ত জনপদ
হারিয়ে যায় স্ব-কাল, বারবার
চারদিকে জ্বলে ওঠা চকচকে অন্ধকার,
কালোহাত,
রক্তপাত,
ধর্মের দূরারোগ্য বির্দীণ বাতাস
সপাং সপাং চাপাতির কোপ মগজে বিধে …
তবুও
আমি কখনই আমার মাতৃভূমিকে মৃত্যুভূমি ভাবিনা,
ভাবতেও চাইনা ।

 

সুধাংশু, চল পালাই

চল সুধাংশু পালাই
পড়ে থাক বাস্তুভিটা, স্মৃতির কড়িকাঠ
মুখরিত সবুজ,
লতাগুল্ম
বাশঝাড়
কলকল করা অরুণিতার হাসি।
পাগলামী নয় বন্ধু, পালাই এক্ষুণি
শিরশির করা ঘাড়ের দিব্যি তোকে
স্বপ্নময় হাত থেকে খসে পড়া আঙ্গুলের দোহায়
অতশত ভাবার কি আছে?
চল পালাই …
তুইতো জানিস, টগবগ করা দেহটা
হিসেব করা চাপাঁতির কোপে
রাস্তায় পরে থাকবে একদিন নিথর হয়ে
রক্তাক্ত
ক্ষত-বিক্ষত
ঘিরে ধরবে চারপাশ ব্যর্থ পুলিশ, ছকবাঁধা অনুসন্ধানী সাংবাদিক
হাহাকার ছেয়ে যাবে আকাশ বাতাস
শিশিরের মত রক্ত জমে জমে রাজপথের কংক্রিট হয়ে যাবে
অনুভবে অনুড়নে
ছেড়াখোঁড়া…
সময় নেই বন্ধু
সুধাংশু, চল পালাই …