Home / সবিশেষ / আমাদের রূপকথারা আর বই পড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া

আমাদের রূপকথারা আর বই পড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া

Bipasha-Chakrabortyপড়তে শেখার পর থেকেই আমি ছিলাম সর্বভুক পাঠক। শুধু কি বই? ছেঁড়া কাগজ, পুরনো পত্রিকা পাতা, কাগজের ঠোঙ্গা যেখানে যা মুদ্রিত বর্ণমালা পেতাম পড়তাম। বই পড়ার জন্য রীতিমতো সংগ্রহ অভিযান চালাতাম । বন্ধু বান্ধব প্রতিবেশি সবার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে, ধার করে, বই বিনিময় করে পড়তাম। আমার সরকারী চাকরিজীবী মা বাবার পক্ষে ঘন ঘন নতুন বই কেনাটা ছিল বিলাসিতার সামিল। তবুও আমাকে কিনে দেয়া হতো প্রায়ই। বোধ হয়, বই ছাড়া অন্য কিছু বেশি চাইতাম না বলেই। ছোটবেলায় বই পড়া নিয়ে সমস্যাটা প্রায়ই হতো। বিভিন্ন ধরণের ভাল ভাল বই আমার হাতে আসত। বড়গল্প উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ। পড়তে পড়তে প্রায়ই আটকে যেতাম। কিছু কিছু শব্দ বাক্য আমার আমার অনভিজ্ঞ মস্তিস্ক বুঝতে পারত না। পরে বুঝেছি এর বেশিরভাগ বইই আমার বয়সের জন্য নয়।
এ সমস্যার সমাধান একদিন হঠাৎ করেই হয়ে গেল। স্কুলে একদিন একদল তরুণ তরুণী আসল। ক্লাস টিচার ওদের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। ওরা ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ থেকে এসেছে। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে ওরা আমাদের একটি করে বই পড়তে দিবে। সপ্তাহ শেষে পঠিত বইটি ফেরত দিয়ে আরেকটি নতুন বই নিতে পারব। পড়তে পারার সক্ষমতা অনুযায়ী একেক ক্লাসের বাচ্চাদের বইয়ের পৃথক তালিকাও ওরা ঠিক করে এনেছে।
এর জন্য আমাদের নাম মাত্র চাঁদা দিয়ে সদস্য কার্ড করে নিতে হবে। আর বইটি যত্ন করে পড়ে, অক্ষত অবস্থায় ফেরত দিতে হবে। আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে লাগলাম। এরকম কান্ডও হয় নাকি! প্রতি সপ্তায় একটি করে নতুন বই। এর সাথে যেন আর কোন সুখের তুলনা চলে না। তাও স্কুলের কার্যক্রমের অংশ। বাসা থেকে বকুনির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
পরের দু’তিনদিন টিফিনের টাকা জমিয়ে কার্ড করলাম। এখন থেকে বই পাব। আমার হাত পা কাঁপছিল, যখন প্রথম বইটি হাতে পেলাম। ওটা ছিল রূপকথার বই। এর আগেও আমি রূপকথার বই পড়েছি। কিন্তু এই বইটি সম্পূর্ণ আলাদা। স্বচ্ছ প্লাস্টিক দিয়ে বাঁধাই করা বইয়ের পুরো কাভার। বইটির প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠা, মুদ্রণ, ছবি- সবই কি সুন্দর, মসৃন । কেমন এক অভিজাত্যের ছোঁয়া বইটি জুড়ে । আর গল্পগুলিও চমৎকার। এর মাঝে একটি গল্প পেলাম রবীঠাকুরের লেখা। আমি তো অবাক! ততদিনে রবীঠাকুরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছি ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতা আর বিশেষ করে জাতীয় সঙ্গীতের জন্য। শুনেছি উনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কবি। বড়দের জন্যও অনেক লিখেছেন। বড়দের হাতেই রবী’র বই বেশি দেখা যেত। আমি নেড়ে চেড়ে দেখতাম ঠিকই কিন্তু পড়তে কষ্ট হতো। অথচ রূপকথার বইতে রবীঠাকুরের এই লেখাটি পড়তে আমার মোটেও কষ্ট হলো না। সেই বইতে আরো গল্প ছিল। কি অসাধারন সেসব গল্প। কি চমৎকার সাবলীল তার বর্ণনা। খুব সম্ভবত সেগুলির লেখক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, দক্ষিনারঞ্জন মিত্র মজুমদার,অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জসীমউদ্দিন প্রমুখ।
আজ থেকে বহু বহু বছর আগে হয়তো কোন এক চাঁদনি রাতে,কোন এক দিদিমা তাঁর নাতি-নাতনিকে কোলের কাছে শুইয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে বলেতেন সেই গল্পগুলি । সুয়োরানী-দুয়োরানী, ডালিমকুমার, সাতভাই চম্পা, পাতালপুরী, রাক্ষস-ক্ষোকস, দৈত্য-দানো, রাজকন্যা-রাজপুত্র, ঘুটেকুড়ানী, ব্যঙ্গ-রাজপুত্র, আঙ্গুর পরী, ডালিম পরী, নীলকমল,লালকমল আরো কত কি! সেই নাতি-নাতনীরা একসময় নিজেরাই হয়ে গেল বাবা-মা, দাদু বা দিদা । সেই গল্পগুলি তারা বললেন তাদের ছেলে-মেয়ে, নাতী-পুতিদের।
তারপর ধীরে ধীরে সেই গল্প ছড়িয়ে পড়লো মুখে মুখে- এক গল্প থেকে তৈরি হলো আরেক গল্প। কলাবতী রাজকন্যা হলো কেশবতীকন্যা, দুধের পাহাড় হয়ে গেল ক্ষীরের সাগর। এভাবেই বেঁচে থাকে দেশে দেশে উপকথা রূপকথারা। আমাদের বাংলাদেশেও তাই হয়েছে। তবে,সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বেড়ে গেল হরেক রকম কাজের চাপ। পড়াশুনার ভারে ছেলেমেয়েদেরো সময় রইল দিদিমা ঠাকুমার কাছে সেসব গল্প শোনার। তাই বলে কি রুপকথারা হারিয়ে যাবে? মুখে মুখে যেমন অনেক গল্প বেঁচে ছিল, তেমনি হয়তো হারিয়ে গিয়েছিল কিছু। তাই এদের বেঁচে থাকাটা খুব দরকারী হয়ে পড়ল। আর এই দরকারী কাজটি যিনি প্রথম করেছিলেন তাঁর নাম দক্ষিনারঞ্জন মিত্র মজুমদার(১৮৭৭-১৯৫৬)। শিশুসাহিত্যিক এবং লোককথা সংগ্রাহক। বাংলাদেশের যাবতীয় লোককথাকে তিনি সংগ্রহ করলেন।বাংলার অনাবিল সুন্দর রূপকথাকে বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে চিরদিনের জন্য ঠাঁই করে দিলেন ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদাদার ঝুলি, দাদামশায়ের থলে আর ঠানদিদির থলে’তে।
সেই গল্পগুলি ছোটদের জন্য হলেও পড়তে ভাল লাগে বয়সী মানুষের। ঐ যে বললাম, রবীঠাকুরের লেখাটি পড়তে আমার একটুও কষ্ট হয়নি, কারন তিনি ছোটদের উপযোগী করে সহজ সাবলীল ভাষায় লিখেছিলেন। ঠিক তেমনি ছিল অন্য গল্পগুলিও। রূপকথার গল্পগুলিকে ছোটদের উপযোগী করে সহজ সাবলীল ভাষায় লিপিবদ্ধ করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটিও করেছিলেন দক্ষিনারঞ্জন মিত্র মজুমদার। তাঁর লেখায় ছেদ-যতি চিহ্ন ও ভাষার ব্যবহার এমন যে,সেগুলো পড়তে গিয়ে মনে হবে সেই হাজার বছর আগের ঠাকুমা দিদিমা’রাই সেসব বলছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখার এই বিশেষ ধরণ নিয়ে প্রশংসা করেছেন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ সংকলনের ভূমিকায়। এই গল্পগুলি যুগের পর যুগ ধরে আমাদের ছেলেমেয়েদের মানসিক গঠন ও কল্পনা শক্তি বৃদ্ধিতে অবদান রেখে যাচ্ছে। এমনকি আজকের কার্টুন নেটওয়ার্ক , ভিডিও গেমস, এনিমেশন ফ্লিম, ইন্টারনেট আর স্মার্ট ফোনের যুগেও এর আবেদন হারায় নি মোটেও।
সেই রূপকথার বইটি পড়ার পরের কয়েক সপ্তাহ জুড়ে আরো বেশ কটি বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এর মাঝে ছোটদের উপযোগী বিদেশি সাহিত্যের বইও ছিল। স্বপ্নের ঘোরে যেন কাটতে লাগল দিনগুলি। আচ্ছন্ন হয়ে একের পর এক বই পড়ছিলাম আর ফেরত দিচ্ছিলাম। একদিন বিশ্বসাহিত্যের ছেলেমেয়েদের কাছে শুনি এবার আর কোন নতুন বই দেয়া হবে না। বরং এতদিন যেগুলি পড়েছি তার উপর একটি লিখিত পরীক্ষা নেয়া হবে। আমার মাথায় হাত। একে তো নতুন বই আর পাব না তারওপর পরীক্ষা। এমনিতেই আমি স্কুলের পড়া দিনের পর দিন মুখস্ত করেও ঠিকমতো পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারি না। গল্পের বইগুলিতো পড়েছি মাত্র একবার। সেগুলো সব ফেরত দেয়াও হয়ে গেছে। এখন কি হবে? এসব ভাবতে ভাবতে পরীক্ষার দিন চলে এল। আমার সাথে পরীক্ষায় বসল ক্লাসের ফার্স্ট সেকেন্ড গার্ল ছাড়াও আরো মেধাবীরা। ওরাও বাসায় গল্পের বই নিয়ে যেত। আমি আরো টেনশনে পরে গেলাম। যাই হোক প্রশ্নপত্র এলো। অন্যদের সাথে আমিও পরীক্ষা দিলাম। এরপর অনেকদিন বিশ্বসাহিত্যের ছেলেমেয়েদের পাত্তা নেই। পরীক্ষায় কি দিলাম তার কিছু জানা হলো না। এদিকে ফাইনাল পরীক্ষা কাছে চলে আসল। আমিও অন্যদের মতো সব ভুলে পড়ার বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। এরই মাঝে একদিন স্কুল ছুটির আগে ক্লাস টিচার ঘোষণা দিয়ে গেলেন, আগামীকাল স্কুলে ছোটখাট একটা অনুষ্ঠানে সেই বই পড়া প্রতিযোগিতার পরীক্ষায় বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। বিজয়িদের জন্য বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রদত্ত সার্টিফিকেট ছাড়াও পুরস্কার হিসেবে রয়েছে বই। আর যে প্রথম হবে তার জন্য রয়েছে একগাদা বই। কিন্তু এবার আর আমার মাঝে কোন আগ্রহ উত্তেজনা তৈরি হলো না। আমি কি আর বিজয়ীদের মাঝে আসব। স্কুলের পরীক্ষায় যারা ভাল ফল করে তারাও তো অংশগ্রহণ করেছিল। আর ওরাই যে পুরষ্কাকারের সেই মজার মজার বইগুলি পাবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তাই ওরা বিজয়ী হচ্ছে, এটা ধরে নিয়ে আমি নিঃসন্দেহে বাড়ী ফিরে গেলাম।
পরদিন সব ক্লাস শেষে প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতিতে স্কুলে ছোট একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন হলো। বিজয়ীদের নাম পেছন থেকে ঘোষণা শুরু হলো। পঞ্চম চতুর্থ তৃতীয় দ্বিতীয় ঘোষণা হয়ে গেল। আমি তো নিশ্চিন্তে আছি আমার নাম আসার আর কোন প্রশ্নই নেই। তাই খানিকটা অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ অস্পষ্টভাবে, মনে হয় অনেক দূর থেকে আমার নামটি কানে এল। বলা হচ্ছে , বই পড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে ‘বিপাশা চক্রবর্তী’।