Home / সবিশেষ / তপন রায়চৌধুরীর ‘রোমন্থন আথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’ হেনরী স্বপন-৩

তপন রায়চৌধুরীর ‘রোমন্থন আথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’ হেনরী স্বপন-৩

Henry-Sawpon
তপন রায়চৌধুরীর লেখা প্রথম পড়ি দেশ পত্রিকায়। ১৯৯২ সালের সারদীয়া দেশ-এ প্রকাশিত ‘রোমন্থন আথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ পড়েই লেখার বিষয়বস্তু আমার অন্তরে দাগ কেটে রয়। বলাই বাহুল্য, পত্রিকায় প্রকাশিত খণ্ড খণ্ড লেখার আঙ্গিক কিছুটাতো সংক্ষিপ্ত ছিলই। কিন্তু ‘রোমন্থন আথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’ যখন বই হয়ে হয়ে বেরুল, তখন আমি এই বইয়ের প্রত্যেক অংশ পড়েছি ঘোর আঞ্চলিকতার টানে এবং বইরশাইল্ল্যা ভাষা ও জেলার ইতিবৃত্ত জানার বোঝার আনন্দে। যদিও বলা হয়, এতে স্মৃতিধর্মী কিছু নেই, আথবা আছে। কিছুটা সমাজচিত্রের ডকুমেন্টরিও বটে, তাই তো লেখক নিজেই বলছেন,…‌‌‘রচনাটি আত্মচরিত না এ কথাটা ভাল করে বোঝাবার জন্য শিরোনামায় পরচরিত কথাটা ব্যবহার করলাম’…

তাহলে এই গ্রন্থের পর্বে পর্বে কি রচিত হয়েছে? এতে রয়েছে তিরিশ ও চল্লিশ দশকের বরিশাল জেলার নানা ঘটনার গালগল্প, এ অঞ্চলের ‘দেবগন্ধর্ববিনিন্দিত’ ভাষার কৌতুকবোধ এবং আরো আছে কিছু আঞ্চলিক ছড়া-গান ও শব্দমাধুর্যের স্বকীয়তা। যদিও হাস্যরসে উজ্জ্বল এই গ্রন্থটিকে কেবল এ্যাডভেঞ্চারের বিবেচনায় হালকাভাবেও এর পাঠ নেয়া যায়। কিন্তু এরকম বিস্ময়কর বই বাংলা সাহিত্যে অনেকটাই দুর্লভ। কেননা, বইটিতে বরিশালের তৎকালীন সমাজ জীবনের নানা বিপর্যয় ও উল্লেখযোগ্য বহু ঘটনার বিবরণও রয়েছে। সাতচল্লিশের দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- এইসব জাতীয় সংঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎপর্ময় হয়ে ওঠে বলেই, এই বইটি পাঠের অনন্য আনন্দ আজও আমার কাছে, এ্কটি ক্লাসিক গ্রন্থের অভিধায় শ্রেষ্ঠ হয়ে আছে। অবশ্য সেই শেষ্ঠ গদ্যভাষার একটু অংশ পাঠ করে নেয়া যাক…
Tapan-Roy-Chowdhury‘খিলাফত আন্দোলনের অন্যতম নায়ক, দেওবন্দ থেকে পাশ করা আলিম, স্থানীয় এক মৌলবী সাহেব দেশ তথা খলিফাভক্তির দায়ে দীর্ঘদিন জেল খেটে কারামুক্ত হওয়ার পর রাজা বাহাদুরের হাবেলীতে বরিশালের টাউন হলে সাম্প্রদায়িক প্রীতি প্রচার করে এক বক্তৃতা করলেন: “উফারে নীল আসমান, নীচে সবুজ ঘাস, ইয়ার নীচে (অর্থাৎ আসমান এবং ঘাস উভয়েরই নীচে) হিন্দু-মোছলমান দুই ভাই। দোনোতে কোনও ফারাক নাই, দোনোতে কোনও কাজিয়া নাই। হারামজাদা ফিরিঙ্গী আইয়া দোনোর ভিতর ফাসাদ বাধাইছে। ভাই সকল, শয়তানের ফান্দে পা দিয়া আখের খুয়াইবেন না, আল্লার এই না-লায়েক বান্দার এই আরজি।…‘রাম-রহিম না জুদা কর ভাই’ গান দিয়ে সভা শেষ হল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মৌলবী সাহেব বক্তৃতা মঞ্চ থেকে নেমে তার পাদুকাজোড়া আর খুঁজে পান না। তখন তার উত্তেজিত স্বগতোক্তি: “জোতাজোড়া কই গ্যালো? লালা লাজপত রায় আইলেন, লালা মহাত্মা গান্ধী আইলেন, লালা দেশবন্ধু আইলেন- ক্যারও ত জোতা হরাইল না। হুধা (শুধু) আমারই জোতা হারাইলে ক্যান? লইলে কেডা, লইলে কেডা? হেঁদু হালায়ই নেছে।” (শহর বইরশাল…পৃ: ৭৬)

Tapan-Roy-Chowdhury

এ-ভাবেই ইতিহাসবিদ, গবেষক-পণ্ডিত লেখক তপন রায়চৌধুরীর লেখার পটভূমি-মাতৃভূমি উভয়ই একক, যে জেলার নাম স্থানীয় উচ্চারণে…বইরশাল- বলে উল্লেখিত হয়। এ জন্য, লেখক নিজেকে বইরশাইল্ল্যা বাঙালি ভাবতেই গর্ববোধ করেছেন। তাই, তার অধিকাংশ লেখায়ই হিন্দু-মুসলমান, বাবু-ব্রাক্ষ্মণ এবং বঞ্চিত মানুষের মুখের বুলি, যাকে আমরা শিল্পের জগতে এনে আঞ্চলিক ভাষা বলে থাকি, তিনি সেই ভাষার দ্বিধাহীন শ্লীল-অশ্লীলতা মুক্ত দৈনন্দিনতার বিবরণ লিখেছেন। বাক্যের প্রাণশক্তিতে ভাষাগত দুর্বোধ্যতার মতোই অবিকল কিছু কৌতুকের-গল্পের অনবদ্যতায় সাহিথ্যের বিচারে বইটি আশ্চ রকম সার্থক। তাই, লেখকের এই পরচরিতচর্চায়-বইরশাইল্ল্যা সংস্কৃতির সমস্ত রকম আইডেন্টিটি ফুটে উঠেছে…।