Home / সবিশেষ / প্রেম, ভালোবাসা ও রফিক আজাদ-সাইফ বরকতুল্লাহ

প্রেম, ভালোবাসা ও রফিক আজাদ-সাইফ বরকতুল্লাহ

20প্রেম, ভালোবাসা ও রফিক আজাদ-সাইফ বরকতুল্লাহ

 

যদি ভালোবাসা পাই আবার শুধরে নেবো
জীবনের ভুলগুলি;
যদি ভালোবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘ পথে
তুলে নেবো ঝোলাঝুলি
যদি ভালোবাসা পাই শীতের রাতের শেষে
মখমল দিন পাবো
যদি ভালোবাসা পাই পাহাড় ডিঙ্গাবো আর
সমুদ্র সাঁতরাবো …
[ সূত্র : প্রেমের কবিতা, রফিক আজাদ]

মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও প্রেমের কবি তিনি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ `অসম্ভবের পায়ে`। এ গ্রন্থে `হে দরোজা` কবিতায় তিনি লিখেছেন :
সন্ধ্যে থেকে যোজন-যোজন দূরে যখন ছিলাম
দেখেছি তোমার ঠোঁটে বা মনে উৎসবের আলো;
দ্রুত কাছে এসে দেখি : ঠা ঠা হাসে অন্ধকার! আর
`প্রবেশ নিষেধ` বলে জ্বলে এক রক্তচক্ষু-বালক!

রফিক আজাদের কবিতায় প্রেম, নারী ও প্রকৃতির রূপায়ণ যেন এক নতুন পৃথিবী। তাঁর `চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া` কাব্যগ্রন্থ (১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ) পাঠ করলে তারই প্রতিচ্ছবি যেন আমাদের চোখে ভেসে ওঠে। তাঁর প্রেমের কবিতার মধ্যে নারী প্রেমের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। এ গ্রন্থে ‘কবির অভিধান’ কবিতায় তিনি লিখেছেন :
আমার কাছে তো তুমি এক মূর্তিমান অভিধান :
খুচরো অথবা খুব দরকারি ভারি শব্দাবলী
টেবিলে ঈষৎ ঝুঁকে নিষ্ঠাভরে যে রকমভাবে
দেখে নিতে হয়, প্রয়োজনে তোমাকে তেমনি পড়ি।

রফিক আজাদ। একাধারে কবি ও মুক্তিযোদ্ধা। টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার জাহিদগঞ্জের এক অভিজাত পরিবারে ১৯৪৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম জীবন। রফিক আজাদের বাবা সেলিম উদ্দিন খান ছিলেন সমাজসেবক এবং মা রাবেয়া খান গৃহিণী। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কবি এক ধরনের স্বপ্নাচ্ছন্ন অনুভূতিলোক সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণা যা তাঁর স্বপ্নের নারীর ভেতরে দেখতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর স্বপ্নের জগৎ স্মৃতিঘন চিত্রপট সমর্পিত হতে চায় বারবার। অপার বেদনা তাঁকে গ্রাস করে। অন্তরঙ্গ আশ্চর্য জীবনধারা অভিন্ন সত্তায় রূপান্তরিত করেছে। পঞ্চাশের পর বাংলা কবিতার জমিতে যে তুমুল আধুনিকতার বীজ বপনের যাত্রা শুরু হয়েছিল রফিক আজাদ সে সময়কার প্রধান কবিতা নির্মাতা।

যেমনটি সরকার মাসুদ তাঁর ‘কবি রফিক আজাদ’ নিবন্ধে লিখেছেন, বাংলাদেশের আধুনিক কবিতায় রফিক আজাদ একটি অবশ্য উচ্চার্য নাম। পঞ্চাশের প্রজন্ম স্মরণীয় হয়ে আছে বাংলাদেশের কবিতাকে আধুনিক করে তোলার সৃজনশীল প্রয়াসের জন্য। রফিক আজাদের বেলায় আমরা কী দেখি? দেখি রোমান্টিক ও অ্যান্টি-রোমান্টিক মনোভঙ্গির অদৃষ্টপূর্ব সংমিশ্রণ। কখনো কখনো পয়ারের আশ্রয় নিলেও অক্ষরবৃত্তের হিসাবি মাত্রায় শব্দ ও পঙ্তি মেলালেও আমার মনে হয়েছে, বিশুদ্ধ গদ্যের বহুমাত্রিক আলোছায়ায় তার কবিতা স্ফূর্তি অর্জন করেছে সবচেয়ে বেশি। কয়েকটি উদাহরণ দেব :

সমুদ্র অনেক দূরে, নগরের ধারে-কাছে নেই;
চারপাশে অগভীর অস্বচ্ছ মলিন জলরাশি।
রক্ত-পুঁজে মাখামাখি আমাদের ভালোবাসাবাসি;
এখন পাবো না আর সুস্থতার আকাঙ্ক্ষার খেই।
(নগর ধ্বংসের আগে)

ভালোবেসে এক ফ্রগম্যান চোখের গভীর জলে
লাফ দিয়ে পড়ে; বিন্যস্ত বাগানে কেউ
শতায়ু বৃক্ষের গায়ে ছুরির ফলায়
দীর্ঘসূত্রী হাহাকার রেখে যেতে চায়।
(সুন্দরের দিকে চোখ রেখে)

‘আমার কবি রফিক আজাদ নিবন্ধে’ জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন লিখেছেন, তখন সারাদিন লিখি, সন্ধ্যায় গিয়ে রফিক আজাদের সঙ্গে আড্ডা দেই। এ সময় রফিক ভাইয়ের কবিতার বই বেরুলো। বইয়ের নাম ‘প্রিয় শাড়িগুলো’। বইটা আমাকে উৎসর্গ করলেন। বইয়ের একটা কবিতার নাম ‘জ্যোৎস্নাকে আমার চাই’। জ্যোৎস্না আমার স্ত্রীর নাম। হাসতে হাসতে রফিক ভাইকে বললাম, আমার জ্যোৎস্নাকে তুমি চাও?
রফিক ভাই বললেন, আরে না বেটা, আমি যে জ্যোৎস্নাকে চাই তাকে একজীবনে পাওয়া যায় না। তার জন্য বহুজীবন অপেক্ষা করতে হয়!

রফিক ভাইয়ের সঙ্গে এদিক-ওদিক সাহিত্য সম্মেলনে যাই। যশোর না খুলনায় যেন প্রবন্ধ সাহিত্যের আলোচনা সভার সভাপতির হঠাৎ শখ হলো ঢাকা থেকে আগত কবি এবং ঔপন্যাসিকের চেহারা দেখবেন। তিনি এই দু’জনকে কখনও দেখেননি। আমার হাত ধরে মঞ্চে উঠলেন রফিক আজাদ। বললেন, সভাপতি সাহেব, আমাদের চেহারা দেখে আপনার ভালো লাগবে না। আমরা লিখি ভালো কিন্তু চেহারা জলদস্যুদের মতো। ভদ্রলোক হতভম্ব। এসব করে আমাদের দিন যায়। রফিক আজাদের দুটো বই সম্পাদনা করলাম আমি। ‘বাছাই কবিতা’ এবং ‘প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা’। ততদিনে রফিক ভাই তার জীবন বদলে ফেলেছেন। হঠাৎ হঠাৎ তাকে কেমন অন্যমনস্ক এবং বিষণ্ন হতে দেখি। এমন মন খারাপ করা একেকটা কবিতা লেখেন, বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে বালক পড়েছে ভুল বই পড়েনি ব্যাকরণ, পড়েনি মূল বই। এসব কবিতা পড়ে আমার বুক হু হু করে, ইচ্ছা করে রফিক আজাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। তার হাতটি ধরে বলি, প্রিয় বালক রফিক আজাদ, আমি এখনও সেই আগের মতোই তোমার অনুরাগী।

সাইফ বরকতুল্লাহ : সাহিত‌্যিক ও সাংবাদিক