Home / সবিশেষ / প্রিয় কবি রফিক আজাদ, দেহ বিয়োগে গ্রথিত হলো নতুন শিকড় – মিলটন রহমান

প্রিয় কবি রফিক আজাদ, দেহ বিয়োগে গ্রথিত হলো নতুন শিকড় – মিলটন রহমান

11 মিলটন রহমান

কেবল দেহ বিয়োগ করে তিনি আরো বেশি শিকড় প্রোথিত করেছেন পাঠক এবং সর্বোপরি সাধারণের মধ্যে। তিনি সাধারণ মানুষের ভাষার কবি। তাই প্রথম গ্রন্থ অসম্ভবের পায়ে প্রকাশের মাধ্যমেই পাঠক প্রিয় হয়ে ওঠেন। আর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সীমাবন্ধ জলে সীমিত সবুজে‘ তিনি প্রকাশিত হন ভিন্ন মাত্রায়। প্রথম কাব্যে তিনি অসম্ভবের পায়ে দাঁড়িয়ে জয় করেছিলেন প্রেম। আর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে হয়ে ওঠেন দ্রোহী। বলে ওঠেন নিরন্ন মানুষের কথা। উচ্চারণ করেন, ‘ভাত দে হারামজাদা‘। কোন ভয় কিংবা দ্বিধা কাটিয়ে কবি রফিক আজাদ তখন অবিচল।
আশির শেষ সময়ে রফিক আজাদ আমার প্রিয় কবি’র তালিকায় দেখা দিলেন। শুধু প্রিয় নয় রফিক আজাদ আমাকে নেশায় আসক্ত করে রাখতেন। সম্ভবত আমি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাসিন্দা বলে এমনটি হয়েছিলো। তা না হলে ‘ভাত দে হারামজাদা‘ পাঠোত্তর আমি প্রথম আন্দোলনের অস্ত্র হয়ে উঠি। পথে-প্রান্তরে, মাঠে-ঘাটে, অনুষ্ঠান মঞ্চ, বন্ধুদের আড্ডায় এই কবিতাই আওড়েছি অসংখ্যবার। কলেজে প্রথম বর্ষে এই কবিতা আবৃত্তি করে পুরস্কারও জিতে নিই। সে সময় আমার মনে হতো কবি রফিক আজাদ ভুভুক্ষু শ্রেনীর প্রতিভু। এমন দুর্ভিক্ষ সময়ের ভেতর দিয়ে চলেছেন তিনি, তাঁর পক্ষে এমন দাবি করা ছাড়া আর কোন পথ ছিলো না। কবিতাটি যখন কোন মঞ্চে পাঠ করতাম, তপ্ত হয়ে উঠতো দু‘চোখ। শিরা-উপশিরায় তেঁতে উঠতো রক্ত।
‘যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবি,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কান্ড ঘটে যাবে;
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন-কানুন –
সম্মুখে যা-কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে;
থাকবে না কিছু বাকি – চলে যাবে হা-ভাতের গ্রাসে।‘
কি বজ্র হুশিয়ারী! ক্ষুধার্তের কাছে সব কিছুই তুচ্ছ। রাষ্ট্র এমনকি ভৌগলিক মানচিত্র সব কিছুই একজন ক্ষুধার্তের কাছে আহার হয়ে ওঠে। এই কবিতা পাঠ করতে করতে মনে হতো শোষিতের দাবি আদায়ে এর চেয়ে আর বড় হাতিয়ার কি হতে পারে? কবি যখন বলেন-
‘অবশেষে যথাক্রমে খাবো : গাছাপালা, নদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জ ফুটপাত, নর্দমান জলের প্রপাত,
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী,
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি –
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।
ভাত দে হারামজাদা, তা-না হলে মানচিত্র খাবো।‘

আমি যে সমাজে বেড়ে উঠেছি সেখানে এই কবিতার আবেদন চিরকালীন। আমার মত বন্ধুরা অনেকেই একমাত্র এই কবিতাটির জন্যই কবি রফিক আজাদকে প্রিয় কবি হিসেবে গ্রহণ করেছে। কারণ তখন আমরা অনেকেই সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের ‘হে মহাজীবন’ আক্রান্ত।
‘হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের করা হাতুড়িকে আজ হানো।
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।

এর পর প্রিয় কবি রফিক আজাদ যেনো আরো শানিত অস্ত্র হাতে তুলে দিলেন। তাই মাঠে ময়দানে আন্দোলনে এরচেয়ে বড় কোন ব্রক্ষ্মাস্ত্র আমাদের প্রয়োজন ছিলো না। আমার লেখালেখির হাতেখড়ি তারও কয়েক বছর আগে থেকে। কোথাও কোন মৌলিক লেখা প্রকাশিত হয়েছিলো কিনা মনে পড়ছে না। তবে রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, জীবনানন্দ থেকে সুকান্ত-শামসুর রাহমান-রফিক আজাদ, এঁদের পাঠের মধ্য দিয়ে লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠার কসরত শুরু করি। সেই সূচনার সময়ে আমি একটি মৌলিক সংকট আবিস্কার করি। বুঝতে পারি যত বেশি পাঠ করি, আমি তত বেশি ভীত হয়ে উঠি। প্রিয় কবিদের কেবল পাঠ করতে ইচ্ছে করে, তাঁদের দেখতে ইচ্ছে করে না। তাঁদের সম্মুখে যেতে ইচ্ছে করে না। একি ভয়, নাকি ঈর্ষাকাতরতা আমি এখনো বুঝতে পারি না। যখনি আমি প্রিয় কবি বা লেখকদের কাছে গিয়েছি, নিজের ভিতরে নিজে সেঁধিয়ে গেছি। খুব কম সংখ্যক প্রিয় কবিদের সাথে আমি পরিচিত হয়েছি। প্রিয় কবি রফিক আজাদ এর ক্ষেত্রে আমার এই সংকট ছিলো বিশ্রি রকম। নব্বই দশকের মাঝামাঝি আমি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসি। চট্টগ্রামে বসে আমরা তরুণ লেখকরা সব সময় বলতাম, লেখক হতে হলে ঢাকায় যেতে হবে। সেই ইচ্ছে পুরনেই ঢাকায় আসা। সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থাকার সুবাদে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রফিক আজাদকে আমি দূর থেকে দেখেছি। কখনো পরিচিত হইনি। বাসায় ফেরার পর এ নিয়ে মনে কোন প্রশ্ন জাগতো না। কেবল ভাবতাম আমাকে কবি হিসেবে অবস্থান তৈরী করতে হবে। তারপর একদিন পরিচিত হবো প্রিয় কবির সাথে। নব্বইয়ের শেষ দিকে আমি পেশাগত কারণে ধানমন্ডি এক নাম্বার রোড়ে বেল টাওয়ারের বারো তলায় বসতাম। সেখানো কোথাও ঘন ঘন যাওয়া আসা করতেন কবি রফিক আজাদ। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার প্রিয় কবিকে কাছে থেকে দেখতাম। তখনও কেমন অসুস্থ-ম্লান মনে হতো। মৃদু হেঁটে যখন পাশ দিয়ে চলে যেতেন তাকিয়ে থাকতাম। বন্ধুদের বলতাম,‘কবি রফিক আজাদ যাচ্ছেন।‘ এভাবে তিন বছরে বেল টাওয়ার এলাকায় কবিকে অসংখ্যবার দেখেছি। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় কখনো তাঁর কবিতা স্মরণ করে উদ্দীপ্ত হয়েছি, কখনো হয়েছি শীতল।
‘ভালোবাসা মানে একে অপরের প্রতি খুব
করে ঝুঁকে থাকা;
ভালোবাসা মানে ব্যাপক বৃষ্টি, বৃষ্টির
একটানা
ভিতরে-বাহিরে দুজনের হেঁটে যাওয়া;
ভালোবাসা মানে ঠান্ডা কফির
পেয়ালা সামনে
অবিরল কথা বলা;‘(ভালোবাসার সংজ্ঞা)
অথবা
যদি ভালবাসা পাই আবার শুধরে নেব
জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘপথে
তুলে নেব ঝোলাঝুলি
যদি ভালবাসা পাই শীতের রাতের শেষে
মখমল দিন পাব
যদি ভালবাসা পাই পাহাড় ডিঙ্গাবো
আর সমুদ্র সাঁতরাবো
যদি ভালবাসা পাই আমার আকাশ হবে
দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালবাসা পাই জীবনে আমিও পাব
মধ্য অন্তমিল। (যদি ভালবাসা পাই)
যে কবিকে দ্রোহের কবি হিসেবে পাঠের সূচনা করেছিলাম, পর্যায়ক্রমে তাঁকে প্রেমে আবিস্কার করি। নারীর প্রতি তাঁর আহ্বানের যে শক্তি তা পুরোপুরি ভিন্ন মাত্রার। মুক্তিযোদ্ধা কবি রফিক আজাদ নারীর চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলেন দেশকে।
‘ভুল করে অন্ধ গলি-ঘুঁজি পার হয়ে, যদি এই
আঁধার প্রকোষ্ঠে আসো
দেখবে উবুড় হয়ে বাংলার এই মানচিত্রে
মুখ থুবড়ে প’ড়ে আছে চল্লিশ বছর. . .
আমার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ঠেকে আছে
পদ্মার ওপর
এবং আমার দু’চোখের অবিরল ধারা বয়ে গিয়ে
কানায়-কানায় ভ’রে দিচ্ছে সব ক’টি শুষ্ক নদী,
এবং দেখতে পাবে
শ্যামল শস্যের মাঠ
আমার বুকের নিচে আগলে রেখেছি. . .(আমাকে খুঁজো না বৃথা)

কবি বিদেশ বিভুঁইয়ে ঘুরেছেন অনেক। কোথাও শেকড় গাড়তে চান নি। তাই অন্য কোথাও না খুঁজে তাঁকে যেনো বাংলাদেশেই খোঁজে সেই আহ্বান।
আমার প্রিয় কবিকে যত পাঠ করেছি তত অনুরক্ত হয়েছি। কিন্তু তবুও বিষন্ন অপরাধবোধে আজ নিজেকে কেবলি হীনমন্য মনে হচ্ছে। ঢাকায় কেবল ধানমন্ডিতে নয় অসংখ্য অনুষ্ঠানে কবিকে দেখেছি, কোথাও কোনদিন কবির সাথে পরিচিত হইনি। দূরে থেকে দেখেছি। আর মনে মনে বলেছি, ‘আমিও একদিন তোমার মতো হব কবি‘। সর্বশেষ ২০০৮ সালে কবি রফিক আজাদ লন্ডনে আসেন। সংহতি সাহিত্য পরিষদের কবিতা উৎসবে। আমি সেই অনুষ্ঠানেও ছিলাম। কবি মোহাম্মদ বেলালও এসেছিলেন সেবার। আশ্চর্য হীনমন্যতা নিয়ে সেবারও দুই কবির সাথে আমি দেখাও করি নি। আমার এই স্বভাব নিজের কাছেও প্রিয় নয়। একবার এক মনোবিজ্ঞানীর কাছে এর ব্যাখ্যা চেয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন, এটা মানসিক কোন সমস্যা নয়। জন্ম থেকে পাওয়া সংকীর্ণ লজ্জাবোধ। এর কারণে অনেক কোলাহলের মধ্যেও আমি একা হয়ে থাকি। আজ এসব ব্যাখ্যাও আমাকে অপরাধ থেকে মুক্ত করতে পারছে না। কবি চলে গেলেন, আমার প্রিয় কবি। তাঁর সাথে আমার অনেক কথা। কিভাবে বলবো? তুমি আমায় ক্ষমা করো না কবি। আমি তোমার ভক্ত হওয়ার যোগ্য নই। এমন বাড়ন্ত অপরাধবোধে কেবল বলতে পারি কবি আপনি যে রচনা সম্ভার রেখে গেছেন তা আমাদের জন্য মুক্তোর খনি। সেখান থেকে প্রতিনিয়ত এক একটি মুক্তো তুলবো আর নিজেকে অলঙ্কৃত করে তোমার মৌলিকত্বকে নিজের গায়ে জড়াবো। কারণ তুমি আমাদের কাছে একজন পূর্ণাঙ্গ মৌলিক দলিল দিয়ে গেছো। যেখানো অন্য কোন প্রভাব নেই। যে প্রেমের ভাষা তুমি মুখে তুলে দিয়ে গেছো তাও অনন্য। তোমার চুনিয়া গ্রামের মত শান্ত বিশ্বব্যাপ্ত সরোবর তুমি আমাদের করে গেলে। তোমায় পাঁজরলগ্ন করে রাখি কবি।