Home / সবিশেষ / আমাদের ‘সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু’ আরও ভেঙ্গে যাচ্ছে-আলফ্রেড খোকন

আমাদের ‘সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু’ আরও ভেঙ্গে যাচ্ছে-আলফ্রেড খোকন

Alfred-Khokonআলফ্রেড খোকন

চলছে বইমেলা। এবারের বইমেলা, লেখালেখি, সাহিত্য, কবি, কবিতাসহ সমসাময়িক নানান ইস্যু নিয়ে বইনিউজের সাথে কথা হয় কবি আলফ্রেড খোকনের। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বইনিউজের সম্পাদক রবীন আহসান।

 

বইনিউজ : এবারের বইমলোয় আপনার কী কোন নতুন বই প্রকাশতি হচ্ছে?
আলফ্রেড খোকন : প্রশ্নটার ভিতরে একটা কৌতুকবোধ আছে। সেটা হচ্ছে ‘নতুন বই’ । পুরাতন বই যে প্রকাশ পায় তা আমরা প্রায় ভুলেই গেছি। পুরাতন বই যে নতুন করে প্রকাশ পেতে পারে, সংস্করন বেরুতে পারে, সেটাও তো প্রকাশ। না আমার কোন নতুন বই প্রকাশ পাবে না। তবে পুরনো কয়েকটি বই পূর্ণমুদ্রণ হওয়ার কথা রয়েছে, প্রকাশকগণকে কথাও দিয়েছি। যদি আমার আলস্য ভাঙে, তবেই তার সংস্করণ বেরুবে। আশা করছি সেকথা রাখা সম্ভবপর হবে।

বইনিউজ : বাংলাদেশের সমাজে নানা ধরণের আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে কিন্তু কবিতায় এর কোন প্রভাব পড়ছে না কেন?
আলফ্রেড খোকন : কবিতায় এর প্রভাব পড়ছে না, কে বলেছে। বলা যেতে পারে অনেকের কবিতায় এর প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু সবার কবিতায় পড়ছে না, এমন নয়। প্রভাবের অনেক রকমফের রয়েছে। অনেক প্রভাব আছে গভীর থেকে উৎসারিত। খালি চোখে দেখা যায় না। অর্ন্তদৃষ্টির চোখ থাকতে হয়। আবার অনেক প্রভাব আছে সরাসরি, যা স্লোগানের মত মনে হয়। আর সময়ের নিজের ক্ষমতা এমন যে তার প্রভাবের বলয় থেকে কেউই আলাদা নয়।

বইনিউজ : আপনার লেখালেখির শুরুটা কখন থেকে? প্রথম বই কবে প্রকাশিত হয়? প্রথম বই প্রকাশের কোন মজার ঘটনা পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চান?
আলফ্রেড খোকন : আক্ষরিকভাবে আমার লেখার শুরুটা ছোটবেলায়। মনে রাখার শুরুটা হচ্ছে ক্লাস নাইন। ১৯৮৫ সনের গোড়ার দিকে। মনে রাখতে পারা প্রথম লেখা কবিতার নাম ‘বৃষ্টি’। আমার এখনও মুখস্থ রয়েছে। যদিও এর পাণ্ডুলিপি আমার কাছে নেই। একটি মেয়ের কাছে ছিল। তার সঙ্গে দেখা না-হওয়ার বয়স ২৯ বছর।
প্রথম বই বেরয় ১৯৯৭ সালে। ‘উড়ে যাচ্ছো মেঘ’, প্রকাশ করে শ্রাবণ প্রকাশনী। এবং সেটা ৩০০ কপি ছাপা হয়েছিল। স্ক্রীন প্রিন্টে প্রচ্ছদ করেছিলেন তরুণ ছড়াকার ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী রবীন আহসান। ‘উড়ে যাচ্ছো মেঘ’ কাব্যগ্রন্থটি সত্যি সত্যি বইমেলায় উড়ে গিয়েছিল। এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমার কবিখ্যাতি বড়দের কাছে পৌঁছায়। তখন অনেক নামী লেখক আমার সঙ্গে পরিচিত হয়। সেলিম আল দীন আমাকে নিয়ে জাতীয় দৈনিকে তিন-চার লাইন লিখেও ফেলেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক হয়। শামসুর রাহমানের সঙ্গে, আল মাহমুদের সঙ্গে, আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে, মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে, রফিক আজাদের সঙ্গেও। আর আমার সমকালের অনেক বন্ধুদের সঙ্গে এ সময়েই কবি-সম্পর্কের যাত্রা। মজার ঘটনাও ছিল, সেকথা আরেকদিন বলব।

বইনিউজ : আপনি কী মনে করেন প্রকৃত কবিতা চর্চার মানুষ কমে যাচ্ছে?
আলফ্রেড খোকন : এই একটা বিষয়-অতীতেও যা কম ছিল বর্তমানেও তা কমই থাকবে। যেমন মানুষ বাড়ে দ্রুত, মানবিকতা বাড়ে ধীরে। কবিতা চর্চার না, কবিতার পাঠক কমেছে কিছু। এই কমাটা বই কিনে পড়ার কমা। এখন বই না কিনেও অন্তত ৫টি শক্তিশালী মাধ্যম থেকে কবিতা পাঠ করা যায়।

বইনিউজ : কবিতা লেখার চেয়ে কবিরা অনেক বেশী মিডিয়া নির্ভর হয়ে যাচ্ছে, মিডিয়া কী আসলে কাউকে বড় কবি বানাতে পারে?
আলফ্রেড খোকন : এটা সব কালেই ছিল। এখন মিডিয়া বেশি, মুখ বেশি। তাই দেখাদেখি বেশি। কিন্তু গভীরে চোখ ফেলুন। দেখতে পাবেন, মিডিয়াতে কাজ করেও কেউ তো মিডিয়া বিমুখ থাকতেও পারছে। কবিতা যদি তার প্রধান না হয় তবে তো তাকে মিডিয়াবাজি করতেই হবে। মিডিয়া আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে অনেককে বড় বানিয়ে দিতে তো পারেই। সেটা তো সব সময়ই হচ্ছে। কিন্তু পাঠকের কবি হয়ে ওঠা তো সহজ সম্ভব নয়। অমুককে পুরস্কার দিচ্ছে। তমুকের জন্মদিন হচ্ছে। ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু তো দেখা যায়। কিন্তু বিচারক যে সময়, তার কথা তো ভুলেই থাকছে সবাই! আমি মনে করি আমাদের ‘সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু’ আরও ভেঙ্গে যাচ্ছে। ভাঙতে ভাঙতে এটা একসময় ভেঙ্গে পড়বে। এর পরিবর্তন না হলে, না ঘটাতে পারলে ভাল আড়ালেই দাঁড়িয়ে থাকবে। এরকম আরও অনেকদিন চলবে, যদি পরিবর্তন ঘটাতে না পারা যায় তবে নষ্টের চূড়ান্ত বিকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যেমন পূঁজিবাদের চূড়ান্ত বিকাশের অপেক্ষায় বিশ্ব। এরপর কি হবে? যে কোন কিছুরই চূড়ান্ত বিকাশ না হলে তো তার অগ্নিজ্বলা ভস্ম পাওয়া যাবে না, পরিবর্তনও আসবে না।

বইনিউজ : সাম্প্রতিক সময়ে কবিতার বইয়ের পাঠক প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে, এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য দায়ী কে? এক্ষেত্রে পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?
আলফ্রেড খোকন : হ্যা বইয়ের পাঠক কমেছে কিন্তু কবিতার পাঠক কমেছে এরকম নয়। অনলাইন, ফেইসবুক আরও অনেকভাবেই এখন কবিতা পাওয়া যায়। কষ্টের পাঠ কমেছে। আগে একটা বই সংগ্রহ করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হত, এখন তা হয় না। সহজলভ্য হয়েছে। পছন্দের কিংবা প্রয়োজনে একজন কবির কবিতা পড়তে হলে অনেকেই অনলাইনে গুগল গিয়ে সার্চ দিবে। পেয়েও যাবে কিছু না কিছু। কিন্তু বই পেতে হলে তো দোকানে যেতে হবে। কিনতে হবে। অন্য একটি প্রশ্নোত্তরে বলেছি এখন বই না কিনেও অন্তত ৫টি শক্তিশালী মাধ্যম থেকে কবিতা পাঠ করা যায়। যেমন- ফেচবুক, টুইটার, লেখকের ওয়েব সাইট, ব্লগ ইত্যাদি।

বইনিউজ : আপনার প্রিয় কবি কে? কোন কোন কবিতার বই আপনাকে একজন কবি হিসেবে প্রভাবিত করেছে?
আলফ্রেড খোকন : আমার প্রিয় কবির তালিকা দীর্ঘ। তাদের সবার নাম একবারে বলাও স্থান ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবু কয়েকজনের নাম না বলেই পারছি না। যেমন চর্যা জ্ঞান দাস, গোবিন্দ দাস, বড়ু চন্ডী দাস, মাইকেল মধুসূদন, গোবিন্দ চন্দ্র দাস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্‌দীন, জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আহসান হাবীব, আবুল হাসান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, জয় গোস্বামী, নাগিব মাহফুজ, শেকসপীয়র, শেলী, কিটস, বায়রন, টেনিসন, রাইনের মারিয়া রিলকে, পল এল্যুয়ার, লোরকা, বোর্হেস, ফ্রস্ট- এ মুহূর্তে এঁদের নাম মনে ভাসছে। আরও কমপক্ষে ২০ জন আছে, এঁদের সবার লেখারই প্রভাবজাত আমি।

বইনিউজ : বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমলো নিয়ে কবি হিসেবে আপনার কোন পরার্মশ আছে কী?
আলফ্রেড খোকন : এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে না। এদের কোন পরামর্শ দিয়ে লাভ নেই। তারা যা ভাবেন তাই করবেন। এরা দিন দিন আকৃতিতে বড় হচ্ছে আর প্রকৃতিতে বাজারি হচ্ছে।