Home / সবিশেষ / কবিরা সুনামের কাঙাল। খালি প্রসংসা চায়; তেল চায়-মাহবুব লীলেন

কবিরা সুনামের কাঙাল। খালি প্রসংসা চায়; তেল চায়-মাহবুব লীলেন

                                                                                         Mahbub-Leelen মাহবুব লীলেন

আসছে একুশে বইমেলা ২০১৬। কবি মাহবুব লীলেন-এর সাথে বইনিউজের কথা হয় তাঁর নতুন-পুরাতন বই-সাহিত্য-বইমেলা নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বইনিউজের সম্পাদক রবীন আহসান।

বইনিউজ: আসছে একুশের বইমেলায় আপনার কী কোন নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে?

মাহবুব লীলেন: একটা গল্পের বই করার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু রক্তপাতে আতঙ্কে পলায়নে আটকে গেছে সব। আমার প্রথম বইটি একই সাথে আমাদের প্রকাশনী শুদ্ধস্বরের উদ্বোধনী ছিল। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আর ২০১৫’র অক্টোবরে বই প্রকাশনার কারণেই শুদ্ধস্বরে ঘটে গেলো রক্তপাত। এতে থমকে গেছে সব। লেখা- বই প্রকাশ- বইমেলা সবই অনিশ্চিত হয়ে আছে আমাদের…

বইনিউজ: বাংলাদেশের সমাজে নানা ধরণের আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে কিন্তু কবিতায় এর কোন প্রভাব পড়ছে না কেন?

মাহবুব লীলেন: কবিরা সমাজে থাকলে না কবিতায় সমাজের প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের কবিরা এই মুহূর্তে প্রায় সমাজবিচ্ছিন্ন এবং সম্ভবত খুবই অনগ্রসর অবস্থায় চলে গেছেন। বেশিরভাগই রাজনৈতিক-সামাজিক বিষয়গুলা বুঝতে চান না কিংবা বুঝতে পারেনই না। সমাজ কোথায় যাচ্ছে কী হচ্ছে কবিদের কাছে হয় সে সংবাদ নেই; না হয় সেই সংবাদের অর্থই বোঝেন না তারা। অথবা বুঝতে পারেন না সেই সমাজের ঠিক কোন জায়গায় তারা নিজেরা অবস্থান করেন। কে কী কারণে আন্দোলন করে; কার বিরুদ্ধে করে তার কোনো ব্যাখ্যাই বোধহয় পান না কবিরা। তারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে আছেন। এক কোনায়। কবিতা লেখেন আর মাঝে মাঝে ক্রিকেট কিংবা কোনো মডেলকন্যার বিবাহ কেলেংকারি নিয়ে দু চার লাইন লিখে সমাজে হাজিরা দেন…

বইনিউজ: আপনার লেখালেখির শুরুটা কখন থেকে? প্রথম বই কবে প্রকাশিত হয়? প্রথম বই প্রকাশের কোন মজার ঘটনা পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চান

মাহবুব লীলেন: লেখার শুরু ইশকুলবেলার শেষ দিকে। প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। কবিতার বই- কবন্ধ জিরাফ। কবি জফির সেতুর প্রথম বই  ‘বহুবর্ণ রক্তবীজ’-এর সাথে আমার বইটা ছিল শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর উদ্বোধনী প্রকাশনা।  মজার কি না জানি না তবে প্রথম বইয়ের প্রকাশ নিয়ে ঘটনা আছে। আমি আর সেতু আমাদের প্রথম বইয়ের উদ্বোধন করি নিজেরাই; রক্তদান করে- ‘দেহের রক্ত আর কবিতা ছাড়া মানুষকে দেবার অন্য কিছুই নেই আমাদের’ এরকম একটা ব্যানার টানিয়ে। রক্ত জিনিসটা শুদ্ধস্বরের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল উদ্বোধনের দিন থেকে। তারই ধারাবাহিকতায় টুটুলের শরীর থেকে রক্ত ঝরল ২০১৫ তে…

আমি কিন্তু আমার প্রথম বইয়ের প্রথম ক্রেতার নাম বলতে পারি। তিনি কবি ও সম্পাদক খন্দকার আশরাফ হোসেন। উদ্বোধনীর পরপরই আশরাফ ভাই  আমার হাত থেকে একটা বই নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কত দাম? বইয়ের মধ্যে দাম লেখা থাকলেও আমি কিন্তু দাম বলতে পারছিলাম না। তোতলাচ্ছিলাম। পরে তিনি গায়ের দাম দেখে কী সব হিসাব নিকাশ করে বললেন- চল্লিশ টাকা। টাকাটা আমি হাতে নিয়ে মনে হলো এটা টুটুলের কাছে থাকা উচিত। আমি টুটুলকে দিয়ে দিলাম। আবার মনে হলো না; আমার পয়লা বই বিক্রির পুরা টাকাটা আমারই থাকা উচিত। আবার নিয়ে নিলাম। তারপর সেই টাকা দিয়ে বাদাম আর তালমিশ্রি কিনে মোবাইল বন্ধ করে হাঁটতে থাকলাম ঢাকার রাস্তায়; কে জানি কেন?

বইনিউজ: আপনি কী মনে করেন প্রকৃত কবিতা চর্চার মানুষ কমে যাচ্ছে?

মাহবুব লীলেন: প্রকৃত কবিতা’ এই কথাটার সাথে আমার দ্বিমত আছে। এইটা আসলে কী জিনিস? কে এর প্রকৃতত্ব নির্ধারণ করে? এই কথাটা অধ্যাপক আর কবিতা সমালোচকদেরে তৈরি একটা খামাখা কথা। কবিতার মধ্যে ভালো কবিতা- ভালো লাগা কবিতা- খারাপ কবিতা- খারাপ লাগা কবিতা হতে পারে। কিন্তু ‘প্রকৃত কবিতা’ কথাটা কবিতার সাথে যায় না। কারণ কবিতার কোনো অথরিটি নেই….

কবির সংখ্যা যেহেতু কমেনি। বেড়েছে। তাহলে ভালো কবিতা চর্চার চেষ্টা কমে যাবারও তো কোনো কারণ নেই। প্রতিটা কবিই একটা দীর্ঘ যাত্রা করে কবিতার পথে। দীর্ঘ অনুশীলন যাচাই বাছাই করতে করতে সে তার নিজস্বতা পায়। আগে কবিতা প্রকাশের মাধ্যমগুলো অতী সংকীর্ণ ছিল বলে আমরা বেশিরভাগ লেখকের অপ্রাপ্তবয়স্ক রচনাগুলা দেখতে পেতাম না। তারা কবিতা ছাপানোর জন্য দৌড়াতে দৌড়াতে যখন ছাপানোর সুযোগ পেতেন ততদিনে তাদের কবিতা চর্চার বয়স যুগের কাছাকছি চলে আসতো; স্বভাবতই তাদের মেচুরিটিও তখন বেশি। নিজেই যাচাই করতে পারতেন কোনটা ছাপানো যাবে কোনটা না। তারপর যখন বই বের হতো তখন তো আরো কেটে গেছে বহুদিন; কবিও পুরাপুরি সাবালক; তার লেখাও পোক্ত। কিন্তু এখন যেহেতু লেখা শেষ করে দাঁড়ি দেবার আগেই সেটা প্রকাশ করে দেয়া যায় অনলাইনে। কিংবা পত্রিকায়। আর যেহেতু ছাপাটাও বেশ সস্তা আর কবিদের আর্থিক অবস্থাও ভালো; নিজেরাই এক মাসের চার-পাঁচ ভাগের একভাগ বেতন দিয়ে কবিতার বই ছাপিয়ে ফেলতে পারেন। সেহেতু আধাখাস্তা খসড়া লেখাগুলাও এখন বই আকারে প্রকাশিত হয়ে যায়। তাতে কিন্তু কবির জার্নি শেষ হয়ে যায় বলে মনে হয় না আমার। কারণ কোনো কবির প্রথম দিকের লেখা আর পূর্ণ সময়ের লেখা তুলনা করলেই তার যাত্রাটা টের পাওয়া যায়….

কিন্তু দীর্ঘ জীবন লিখতে থাকাই কোনোভাবেই ভালো কবিতা লেখার মানদ- না। সেটা অন্য যেকেেেনা ক্ষেত্রের মতোই সত্য; লেগে থাকলেই সব কিছুর মান ভালো হয় না। ফলে অনেক কবি কয়েক দশক লিখেও এখনো কবিতার নামে কিছু সুন্দর বাক্য রচনা করেন। সেটা স্বাভাবিক। তবে এই চর্চার কারণেই কিন্তু আমরা অনেক কবিকে ভালো কবি হয়ে উঠতে দেখি প্রতিদিনের চর্চায়। আমরা ভালো কবিতা পাই। অনেকে অবশ্য ঝরে যান কিংবা থেমে যান; এবং সেটাও তো স্বাভাবিক। তাই না?

প্রকৃত কবিতা কী জিনিস আমি জানি না। তবে আমি এই বিষয়ে নিশ্চিত যে ভালো কবিতার চর্চা হচ্ছে। এবং কবিতা আরো ভালো হয়ে উঠছে দিন দিন…

বইনিউজ: কবিতা লেখার চেয়ে কবিরা অনেক বেশী মিডিয়া নির্ভর হয়ে যাচ্ছে, মিডিয়া কী আসলে কাউকে বড় কবি বানাতে পারে?

মাহবুব লীলেন: কবিরা সুনামের কাঙাল। খালি প্রসংসা চায়; তেল চায়। এক জায়গায় পাওয়া সুনাম ভাঙিয়ে আরেক জায়গায় সুনাম নিশ্চিত করতে চায়। সুনাম ম্যানেজ করতে না পারলে নিজে নিজেই সুনামের কাহিনি বানায়। তারাশঙ্করের কবি যেমন শহরে গিয়ে কবিতা পড়ে ফেরার সময় নিজের পয়সায় চাদর কিনে গ্রামে এসে বলছিল- কবিতা শুনে খুশি হয়ে বাবুরা উপাহার দিলেন; তেমনি আরকি…

আগে একটা কবিতা লেখার পর এক বছরেও সেটা ছাপানো যেত না বুড়া সম্পাদকদের চশমার ফাঁক গলিয়ে। সেখানে এখন ডেলি যা প্রডাকশন তাই সাপ্লাই দেয়া যায় মিডিয়ায়। তো কবিরাও এখন ডেলি শত বার অনলাইনে চোখ রাখেন প্রসংশা হান্টিংএর জন্য। বারবার নিজের নাম গুগুলে সার্চ দিয়ে দেখেন তিনারে নিয়া কেউ কোনো কিছু বলছে কি না দুনিয়ার কোথাও…

খারাপ কী? এতে প্রডাকশন বাড়ছে। মিডিয়া ভালো কবিকে কম কভারেজ দিতে পারে। পচা কবির নামে ডেলি ডেলি বেলুন উড়াতে পারে। কিন্তু মিডিয়াতো আর কাউরে কবিতা লিখা দিতে পারে না। আর পাঠক তো বেকুব না। পাঠক মিডিয়া থেকে কবির নাম মুখস্থ করে ঠিকই; কিন্তু কবিতাটা তো বোঝার চেষ্টা করে নিজের মগজ দিয়ে। যার ফলে যার কবিতা ভালো লাগে তার কবিতাই পাঠক নেয়। কবিরা মিডিয়া নির্ভর হওয়ায় পাঠকরা কিন্তু বেশি সুযোগ পায় যাইচ বাছাইর…

তবে মিডিয়ার কারণে কবিদের কামড়াকামড়ি কিন্তু  বেড়েছে। আমার ধারণা কবিরা যখন ঠিকঠাকমতো কবিতা লিখতে পারে না তখন মিডিয়ায় হাজির থাকতে কবিতা-সাংবাদিকতা শুরু করে। একজনরে তেল দেয় তো আরেকজনের তেলাল চামড়া শুকিয়ে শুঁটকি বানায়। তাতে আবার নিজেদের তেলপ্রাপ্তির অধিকার নিয়ে অন্যরা লাগায় কাইজা; যেইটা আবার পাঠক এবং কবিতাবিদ্বেষীদের জন্য ভালো একটা বিনোদন…

বাঙালি সমাজে কবিরা বরাবরই একটা আকর্ষণের বিষয়। নায়ক-নায়িকার সংবাদ যেমন মিডিয়াতে পেতে মানুষ ভালোবাসে তেমনি কবিদের বিষয়টাও মানুষ পছন্দ করে। এতে মানুষ মজা পায়। তাছাড়া মিডিয়াতে উপস্থিত থাকলে বৈষয়িক দিক থেকেও কবিদের কিছুটা সুবিধা হয়। চাকরি- ব্যবসা-ঠিকাদারি- কনসালটেন্সি কিংবা পুরাস্কারের জন্য তারা কিছুটা সুবিধা পান; মাঝে মাঝে শশুর বাড়িতেও কিছু বাড়তি দাম পাওয়া যায়। তো খারাপ কী? মিডিয়ার কল্যাণে এদিক সেদিক থেকে কিছু সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে নিশ্চিন্ত কবি পরে কবিতায় সময় দিতে পারেন। ভালোইতো…

বইনিউজ: সাম্প্রতিক সময়ে কবিতার বইয়ের পাঠক প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে, এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য দায়ী কে? এক্ষেত্রে পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

মাহবুব লীলেন: কথা ঠিক। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার মত ভিন্ন। কবিতা বইয়ের বিক্রি কমলেও কবিতার পাঠক বেড়েছে বহুগুণ। আগে কবিতা পড়ার জন্য হেঁটে গিয়ে বই কিংবা পত্রিকা কিনতে হতো। এখন কিন্তু ডেলি ডেলি অনলাইনে কবিতা পাওয়া যায়। কবিরা কিন্তু প্রায় ডেলি ডেলি কবিতা পোস্ট করেন। সেগুলোতো মানুষ পড়ে আমিও পড়ি। আমি বহু বছর কবিতার বই কিংবা সাহিত্য পাতা পড়ি না। কিন্তু কবিতা পড়ি। পরিমাণে আগের থেকে বেশি। অনেক কবিরই সর্বশেষ লিখিত কবিতাটাও আমার পড়া হয়ে যায় লেখার পরের দিন। তো আমি কেন আবার তার কবিতার বই কিনতে যাব বছরের শেষে?…

কবিতার বই আদৌ আর প্রকাশ করা দরকার আছে কি না সেটা  কিন্তু এখন ভাবার সময় এসছে। প্রকাশকদের জন্য এটা একটা আস্তা লজ প্রজেক্ট। এতে ইনভেস্ট করার কোনো মানে নেই। কবিদের আগে যে সঙ্কট ছিল; প্রকাশহীনতা। সেটা কাটাতে  কবিরাই তো লিটল ম্যাগ করেছে। এখন যেহেতু তার থেকে গতিশীল ইন্টারনেট মাধ্যম আছে তখন আর ছাপা বই দরকার কেন?

কবিতার বই কিন্তু এখন সম্পূর্ণভাবে ই-বুক পাব্লিকেশন হতে পারে। কবিতা ছোট্ট জিনিস; হাঁটতে হাঁটতে হাতের মেশিনে কবিতা পড়া যায়। এর জন্য একখান বই বহন করার মতো খামাখা ঝামেলা আবার কেন?

বইনিউজ: আপনার প্রিয় কবি কে? কোন কোন কবিতার বই আপনাকে একজন কবি হিসেবে প্রভাবিত করেছে?

মাহবুব লীলেন: প্রিয় কবি তো ডেলি ডেলি বদলায়। আর সম্পূর্ণ কোনো বই-ই বোধহয় আমার ভাল্লাগেনি কোনোদিন। বরং একেকজন কবির একেকটা বই থেকে কয়েকটা কবিতা ভালো লেগেছে আমার…

বইনিউজ: বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলা নিয়ে কবি হিসেবে আপনার কোন পরামর্শ আছে কী

মাহবুব লীলেন: বাংলা একাডেমি বইমেলাটারে বরাবরই একটা আপদ হিসেবে দেখে। কোনোদিনই এটাকে নিয়ে ভালো কিছু ভাবেনি। বহুবার মেলাটারে তাদের ঘাড় থেকে নামাতে চেয়েছে। না হলে এটা কিন্তু একটা আন্তর্জাতিক বইমেলা হতে পারত। আন্তর্জাতিক সাম্প্রতিক প্রকাশনাগুলোও আমরা যেমন পেতাম তেমনি এর সূত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বই যাতায়াতের একটা সুযোগ তৈরি হতো। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের লেখকদের সাথে সাক্ষাত-পরিচয়েরও সুযোগ আমরা পেতাম একুশে বইমেলার মাধ্যমে। কিন্তু বাংলা একাডেমি তো এটারে যেনতেনভাবে করে ফেলতে পারলেই মনে করে তাদের কাজ শেষ। গত কয়েক বছর থেকে তো মেলারে বাংলা একাডেমি থেকে বহিষ্কারই করে দিয়েছে।  তাতেও না হয় মানা গেলো। কিন্তু গত বছর মোল্লাদের একটা বিবৃতি পড়ে বাংলা একাডেমি রোদেলা প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দিলো। এটা কিন্তু সম্পূর্ণভাবে বাংলা একাডেমির অধিকার বহির্ভুত কাজ। বইমেলার স্টলে যদি বাংলা একাডেমির নীতি বিরুদ্ধ কিছু পাওয়া যেত তবে সেটা পড়ে বিশ্লেষণ করে তারা সেই প্রকাশনীকে বলতে পারত সেই বই তুলে নিতে কিংবা স্টল বন্ধ করতে। কিন্তু যে বই প্রকাশনার অপরাধে তারা রোদেলার স্টল বন্ধ করল- সে বইতো বইমেলায় রোদেলার স্টলে ছিল না। বাংলা একাডেমি তা খুঁজেও দেখেনি। বইটা তারা পড়েও নি। পত্রিকায় মোল্লাদের বিবৃতি দেখে তারা রোদেলাকে নিষিদ্ধ করেছে দুই বছরের জন্য। কোনো বইকে ব্যান করার অধিকার তো আদালাতের। তাছাড়া কোনো প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করার রেকর্ড বোধহয় বাংলা একাডেমিই করল ২০১৫ সালে। এটা কীসের লক্ষণ?

গত বছর বইমেলা থেকে ফেরার পথে মৌলবাদীদের হাতে নিহত হলেন লেখক অভিজিৎ রায়; মারাত্মক আহত হলেন লেখক বন্যা আহমেদ। বাংলা একাডেমির একটা বিবৃতি কি দেখেছি আমরা সে বিষয়ে? অথচ তাদের বই তো সেই বইমেলাতেই ছিল। সেই বইমেলাতেই ছিল লেখক অনন্ত বিজয়ের বই। তিনিও খুন হলেন মৌলবাদীদের হাতে। বাংলা একাডেমি কি টু শব্দ করেছে এই বিষয়ে? একুশে বইমেলার নিয়মিত দুই প্রকাশক জাগৃতি আর শুদ্ধস্বরের উপর জঘন্য হামলা করল মৌলবাদীরা গত ৩১ অক্টোবরে। জাগৃতির ফয়সল আরেফিন দীপন নিহত হলেন। শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুল মারাত্মক আহত হলেন আরো দুই লেখক রণদীপম বসু আর তারেক রহিমের সাথে। বাংলা একাডেমি কি কিছু বলেছে এই বিষয়ে? অথচ শুদ্ধস্বরকেতো বছর দুয়েক আগে বইমেলাতেই শ্রেষ্ঠ প্রকাশক হিসেবে তারা পুরস্কৃত করেছেন?

লেখক প্রকাশকদের হত্যা কিংবা তাদের উপর আক্রমণের বিষয়ে বাংলা একাডেমি একেবারেই চুপ। কারণ বাংলা একাডেমি নিজেদেরকে বইমেলা আয়োজনের ঠিকাদার ছাড়া কিছুই ভাবে না। তারা লেখক-প্রকাশকদের সাথে কোনোদিনও একাত্ম হয়নি। অথবা লেখক-প্রকাশকদের কোনোভাবেই ভাবে না নিজেদের কিংবা একুশে মেলার অংশ…

লিটল ম্যাগাজিনকে কফিন সাইজের স্টলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগ করে লেখক পাঠক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বাংলা একাডেমি। অথচ লিটল ম্যাগাজিন চত্ত্বরটাই বইমেলায় লেখকদের প্রধান আকর্ষণ। ওখানে কেউ ম্যাগাজিন বিক্রি করে পয়সা কামাতে যায় না। যায় নিজের ম্যাগাজিন অন্যদের সাথে শেয়ার করতে। অন্যদের সাথে আড্ডা দিতে; দেখা করতে। একেকটা স্টলে আগে বিশটা ত্রিশটা লিটল ম্যাগাজিন যেমন থাকতো তেমনি একেকটা স্টলে বিশজন ত্রিশজন লেখক ঘুরে ফিরে বসতেন। এখন সেটা নেই। এখন খুপরির ভিতর পানের দোকানদারের মতো লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের বসে থাকতে হয়। আড্ডার সুযোগ বন্ধ। এটা কীসের লক্ষণ…

এই লক্ষণগুলো মূলত বইমেলাটারে আকর্ষণহীন করে তোলার প্রচেষ্টা। কয়েকদিন পরে এর থেকে লেখক-পাঠকরা আকর্ষণ হারিয়ে ফেললে এটা বিলুপ্ত ঢাকা বইমেলার চিত্র ধারণ করবে। তখন বাংলা একাডেমিও এক ঝটকায় এটাকে ফেলে দেবে নিজেদের কাঁধ থেকে…

একুশে বইমেলাটাতো শুধ্ ুবইয়ের বাজার না। একটা ঐহিত্য আর ইতিহাস। এটা বায়ান্নর ঐতিহ্য ধারণ করছে নামে আর মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য ধারণ করছে তার ইতিহাসে। এজন্যই এই মেলাটাকে মানুষ নিজেদের মেলা ভাবে। বাংলা একাডেমি এটাকে উন্নত করতে পারছে না; বরং এখন চেপে ধরেছে। আগের চাপগুলো ছিল আমলাতান্ত্রিক আর রোদেলা বন্ধ করে এবং ক্রমাগত লেখক প্রকাশকদের উপর হামলার প্রেক্ষিতে নিশ্চুপ থেকে প্রমাণ করে দিলো যে বাংলা একাডেমি এখন মৌলবাদী হিসেবেও চাপ দিচ্ছে বইমেলার উপর…

আমার প্রত্যাশা একটাই। বাংলা একাডেমি যদি এখনো মৌলবাদীদের সাথে হাত মিলিয়ে না থাকে তবে ২০১৬’র বইমেলায় অভিজিৎ রায় সহ মৌলবাদীদের হাতে নিহত সকল লেখক-প্রকাশকদের নামে একেকটা চত্বর করুক। রোদেলা প্রকাশনীর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে স্টল বরাদ্দ করুক আর লেখক-প্রকাশকদের উপর হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব রাখুক…