Home / সবিশেষ / সিরিয়াস ধারার লেখাগুলো পাঠকের মনোযোগ পেতে সময় লাগে-আহমাদ মোস্তফা কামাল।

সিরিয়াস ধারার লেখাগুলো পাঠকের মনোযোগ পেতে সময় লাগে-আহমাদ মোস্তফা কামাল।

Ahmad-Mostofa-Kamalআহমাদ মোস্তফা কামাল

আসছে একুশে বইমেলা ২০১৬। কথাশিল্পী আহমাদ মোস্তফা কামাল-এর সাথে বইনিউজের কথা হয় তাঁর নতুন-পুরাতন বই-সাহিত্য- বইমেলা নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বইনিউজের সম্পাদক -রবীন আহসান।

বইনিউজ: আসছে একুশের বইমেলায় আপনার কী কোন নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে?

কামাল : হ্যাঁ হচ্ছে। আমার নতুন গল্পগ্রন্থ ‘কোথাও এখনো মায়া রহিয়া গেল’ প্রকাশিত হচ্ছে ‘গদ্যপদ্য’ প্রকাশন থেকে।

বইনিউজ: বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের এখন এক দুঃসময় চলছে, একদিকে যেমন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকের অভাব রয়েছে তেমনি সিরিয়াস ধারার লেখকেরও সংকট আছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী?

কামাল : আমি আপনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কথাসাহিত্য চর্চায় সংকট চলছে বলে আমি মনে করি না। হুমায়ূনের মতো লেখক যুগে যুগে জন্মান না, তাঁর অনুপস্থিতি যে সংকটের জন্ম দেবে সেটি আগে থেকেই অনুমিত ছিল। আবার যুগে যুগে মাহমুদুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো লেখকও জন্মান না। কিন্তু এও তো সত্যি যে, তাঁদের মতো বড় মাপের লেখকরাও পাঠকের দ্বারা আবিষ্কৃত হয়েছেন তাঁরা লেখালেখি শুরু করার অনেক পরে। কথাসাহিত্য এমন এক মাধ্যম যেটিকে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সিরিয়াস ধারার লেখাগুলো পাঠকের মনোযোগ পেতে সময় লাগে। এখন যে লেখাগুলো হচ্ছে বা গত দশ-পনের বছরে যে লেখাগুলো হয়েছে সেগুলো এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি যে পাঠকের হাতে হাতে বা মুখে মুখে ফিরবে। সেজন্যই একটা শূন্যতা অনুভুত হচ্ছে। তবে আমার বিশ্বাস – গত দশ-পনের বছরে প্রকাশিত অনেক গল্প-উপন্যাসই একসময় পাঠকেদের দ্বারা তুমুলভাবে সম্বর্ধিত হবে।

বইনিউজ: আপনার লেখালেখির শুরুটা কখন থেকে? প্রথম বই কবে প্রকাশিত হয়?

কামাল : শুরু হয়েছিল স্কুল-জীবনেই, যদিও তখন সিরিয়াসলি কিছু ভাবিনি এ নিয়ে। স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য লেখা আমার প্রথম গল্পটি পড়ে আমার অতি প্রিয় এবং শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক হরিপদ সূত্রধর বললেন – ‘লেগে থাকিস, লেগে থাকলে তোর হবে।’ মানে, আমি যদি গল্প লেখার বেদনা বহন করেও লেগে থাকি, তাহলে আমার হবে! তো, আমি লেগে রইলাম। পরবর্তী পাঁচ-ছ বছর একটানা লিখে চললাম গল্প, খাতার পাতায়, লুকিয়ে। সেই খাতাগুলো হারিয়ে ফেলেছি বলে মাঝে মাঝে দুঃখ হয়। কী যে লিখছিলাম এত, মনে নেই। সেটিই ছিল আমার প্রস্তুতিকাল। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মনে হলো – এবার বোধ হয় দু-একটা গল্প প্রকাশ করা যায়। এই তো প্রকাশ্যে লিখতে শুরু করার গল্প।
প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল দিব্যপ্রকাশ থেকে, ‘দ্বিতীয় মানুষ’, ১৯৯৮ সালে, মঈনুল আহসান সাবের ভাইয়ের বদান্যতায়।

বইনিউজ: গত বইমেলায় লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছে এরপর সম্প্রতি একজন প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে এবং আরো তিনজন লেখক-প্রকাশকের উপর হামলা হয়েছে। আগামী একুশের বইমেলায় এর কোন প্রভাব পড়বে কী?

কামাল : এইসব ঘটনায় একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। লেখক-প্রকাশক কেউই আর নিরাপদ নন এই দেশে, এই সময়ে। কিন্তু এর জন্য বইমেলা বন্ধ হয়ে যাবে বা বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমার মনে হয় না। আমরা শোককে অতিক্রম করে যেতে পারি প্রতিবাদ দিয়ে, আর আমাদের প্রতিবাদের ভাষাও হিংস্র নয়। যে শঙ্কাটুকু তৈরি হয়েছে, লেখক-পাঠক-প্রকাশক মিলে সেটি কাটিয়ে উঠবেন বলে বিশ্বাস করি আমি। একটা উৎসবমুখর জমজমাট বইমেলা আয়োজন করে আমরা তাদেরকে জবাব দিয়ে দেবো যারা আমাদেরকে থামিয়ে দিতে চায়।

বইনিউজ: মুক্তচিন্তায় একের পর এক লেখক-প্রকাশক হত্যা হচ্ছে, আপনি কী মনে করেন এর মধ্য দিয়ে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে?

কামাল : রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এবং ইতিহাসের আদিকাল থেকেই নানাভাবে এই চেষ্টাটি করা হয়েছে। কিন্তু মুক্তচিন্তাকে কখনো রুদ্ধ করা যায় না। মানুষের প্রগতি ও সভ্যতাই প্রমাণ করে যে মুক্তিচিন্তাই জয়ী হয়েছে সবসময়, বদ্ধচিন্তকরা হারিয়ে গেছে কালের ধুলোয়।

বইনিউজ: সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে পাঠকদের পাঠকদের অনুপ্রানিত করবে এমন কিছু বলবেন

কামাল : দুঃখজনকভাবে কাউকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা আমার নেই। এ নিয়ে আমি ব্যথিতও নই। সবার তো আর সব ক্ষমতা থাকে না। আর তাছাড়া, যাঁরা সাহিত্যের পাঠক তাঁরা কেবল নিজ ভাষার সাহিত্যই পড়েন না, বিশ্বসাহিত্যের লেখাগুলোও পড়েন। এ এক অনিবার্য প্রক্রিয়া। পাঠ-ক্ষুধাই পাঠককে টেনে নিয়ে যায় অবারিত বিশ্বসাহিত্যের পরিমন্ডলে। তাঁদেরকে আর আমি নতুন করে কী বলতে পারি?

বইনিউজ: পাঠকের সাথে বইয়ের সেতুবন্ধন একুশের বইমেলা ছাড়া কীভাবে গড়ে তোলা যায়?

কামাল : বাংলাদেশে বইয়ের প্রচার-প্রচারণা-প্রকাশনা সবই বইমেলাকেন্দ্রিক। ফেব্রুয়ারি পার হলে বই নিয়ে সাড়াশব্দ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ভালো বইগুলো রিভিউ করারও প্রয়োজন বোধ করেন না কেউ। ‘কালি ও কলম’ এবং ‘শব্দঘর’ এই দুটো পত্রিকা ছাড়া সারা বছর অন্য কোথাও বইয়ের আলোচনা তেমন একটা চোখে পড়ে না। যেটুকু হয় তা বইমেলার সময়কার উন্মাদনার তুলনায় খুবই কম। মেলার সময় প্রতিটি পত্রিকা মেলার খবরের জন্য ব্যাক কভারপৃষ্টার একটা অংশ বরাদ্দ করে, সারাবছর তারা যদি ওই জায়গাটি বইয়ের রিভিউয়ের জন্য বরাদ্দ রাখতেন তাহলে বাংলাদেশে প্রকাশনা জগতের চেহারা পাল্টে যেত। মানুষকে তো জানাতে হবে, প্রেরণা জাগাতে হবে, নইলে নতুন নতুন পাঠক তৈরি হবে কীভাবে? যাহোক, সেটা যেহেতু হচ্ছে না, দায়িত্বটা এসে পড়ছে লেখক-প্রকাশকদের কাঁধেই। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে প্রকাশকদের কাঁধে। কারণ লেখকদের সাংগাঠনিক ক্ষমতা নেই বলতে গেলে, প্রকাশকরা সাংগাঠনিকভাবেই ব্যাপারটা এগিয়ে নিতে পারেন। প্রতিটি জেলায় লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের যৌথ উদ্যোগে দু-তিনদিনের বইভিত্তিক আয়োজন করা যেতে পারে। প্রকাশকরা উদ্যোগ নিলে লেখকরা নিশ্চয়ই সেখানে যাবেন, যাবেন পাঠকরাও। এইভাবে একটা সেতুবন্ধন গড়ে তোলা যায়। তাছাড়া প্রকাশকদের পক্ষ থেকে বইভিত্তিক একটা পত্রিকা এবং ওয়েবসাইট তৈরি করার কথাও ভাবা যেতে পারে। লেখকরাও নিশ্চয়ই তাতে সানন্দে অংশ নেবেন। এটা আসলে একা কারোর পক্ষে করা সম্ভব নয়। সম্মিলিত একটা উদ্যোগ নেয়া খুব দরকার।

বইনিউজ: বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলা নিয়ে লেখক হিসেবে আপনার কোন পরামর্শ আছে কী?

কামাল : না, কোনো পরামর্শ নেই। পরামর্শ দেয়াটা অর্থহীন বলেই নেই। শুধু একটা কথা বলি। বইমেলাকে দু-ভাগে ভাগ করে (একাডেমি প্রাঙ্গন ও সোহরোওয়ার্দি পার্ক) একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। স্থান সংকুলান হচ্ছিল না বলে সেটি করতে হয়েছে সেটি আমরা জানি এবং মেনেও নিয়েছি। তাই বলে একেবারে বিচ্ছিন্ন দুটো দ্বীপ হয়ে থাকবে? কোনো বিকল্প চিন্তা কি করা যায় না যেন রাস্তার দুপাশে হলেও একটা মেলাই বলে মনে হয় দুটোকে? কর্তৃপক্ষ কি একটু ভেবে দেখতে পারেন?