Home / সবিশেষ / মুহম্মদ নূরুল হুদা-এর একগুচ্ছ কবিতা

মুহম্মদ নূরুল হুদা-এর একগুচ্ছ কবিতা

huda-123মুহম্মদ নূরুল হুদা-এর একগুচ্ছ কবিতা

 

আমার পোশাক

 

আলোর পোশাক ছেড়ে
বদল করেছি আমি মাটির পোশাক
মাটির পোশাক ছেড়ে
আবার পরেছি আমি আলোর পোশাক

আলো হোক মাটি হোক
বস্তু ও অবস্তু হোক
ত্রিভুবন যুক্তির পোশাক,
ত্রিভুবন মুক্তির পোশাক

সেহেতু জেনেছি খাঁটি –
আমার পোশাক মানে আমি নিজে
মুক্ত, পরিপাটি।

অনন্তের যাত্রী আমি
মৃত্তিকানিবাসী হলাম এই বাংলায়,
অনন্তের বাতি আমি
জ্বেলেছি অনঙ্গ আলো এই বাংলায়।

তোমাদের নিরবতায় আমিও নিরব
তোমাদের সরবতায় আমিও সরব
আমার মোমের শিখা নক্ষত্রের মন,
আমি জ্বলি তুমি জ্বলো
মানুষের মুক্তিশিখা জ্বলে চিরন্তন।

প্রজন্ম চত্বর থেকে আগত ও অনাগত প্রজন্মের ঘরে
আমার মাটির কায়া আলোকের আত্মা তুলে ধরে
আমি আছি মানুষের গানে গানে বিজয়ী স্লোগানে
মুক্তির পতাকা আমি এই লালসবুজের প্রমুক্ত বাগানে।

১৮.০২.২০১৩ ঢাকা

 

নদী যার মাতা

নদী যার মাতা জাতিভূমি সেই বাংলাদেশে
নদীগুলি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে তার জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে,
ঘাট ছেড়ে খাত ছেড়ে চর ছেড়ে ধারা ছেড়ে ঢেউ ছেড়ে
কেউ কেউ উঠে এসেছে এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে, নানা প্রশাসনিক ভবনে;
আজ জয়পুরহাটের এই সার্কিট হাউজেও দেখি ধরা পড়েছে গোটা আটেক নদী,
পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, কপোতাক্ষ, করতোয়া, তিস্তা, তুলসীগঙ্গা, কর্ণফুলী:
কেউ ভিভিআইপি, কেউ ভিআইপি, কেউ শুধু আইপি, তবে খোপে খোপে
ওরা নাব্যতা ছেড়ে গতি ছেড়ে স্থির হয়ে আছে একএকটি কক্ষের ঘেরাটোপে,
আর ভ্রমণক্রমে আমি ঠাঁই পেয়েছি তেমনি এক কক্ষনদীর বহতা শয্যায়;

কী ভাগ্য আমার, এই নদী সেই নদী যে নদীর নাম আধুনিক বাংলা কবিতা,
এই নদী সেই নদী যে নদীর নাম জাহ্নবীর কোল ছেড়ে পুত্রের অনির্দেশ যাত্রা,
এই নদী সেই নদী যার গন্তব্য জগতের সব সাগর-জলধির মিলনমোহনা,
এই নদী সেই নদী যার বুকে বিদায়ী বজরা ভাসিয়েছিলেন
বাংলার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন রোরুদ্যবদন,
এই নদী সেই নদী যার অশ্র“স্রোতে বিশ্ববাঙালির নান্দনিক উত্তরণ;

সারারাত আমি কাটিয়ে দিলাম সেই নদীর বুকে, যার নাম কপোতাক্ষ
যার মায়া আমাকে কয়েদি রাখবে অনাদিকাল, যার গবাক্ষ দেবে সাক্ষ্য
নদী থেকে পলি, পলি থেকে এই দেশ, সেই দেশে পলল মানুষ
সেই মানুষেরা বহুবর্ণ, বহুধর্ম, বহু কৃতি, বহু সংস্কৃতি আর বহুকর্মে বহমান
তাদের সাম্যবাদী সর্বনাম বাঙালি, যদিও ব্যক্তিনাম
মনু, ভুসুকু, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা জীবনানন্দ
নদীর স্রোতের উৎসে নিষিক্ত যাদের গর্ভবদনা,
নদীর জলডানায় উন্মুক্ত যাদের প্রসবানন্দ;

যশোরের মাতৃগবাক্ষ হে কপোতাক্ষ,
জেলা পর্যায়ে প্রায় প্রতিটি সার্কিট হাউসের শয্যাকক্ষ হে কপোতাক্ষ,
বাংলার প্রতি ধুলিঅশ্র“তে নিত্যজায়মান হে কপোতাক্ষ,
বাঙালির মৌলসত্তার স্তন্যধারা হে কপোতাক্ষ,
তুমি বয়ে চলো আমার মধ্যে, আমাদের মধ্যে,
আগত অনাগত তাবৎ বাঙালি কবির মধ্যে, কবিতার মধ্যে
তুমি ভাষাবাঙালির ঘরে ফেরার হাতছানি,
তুমি তার নবায়নপ্রবণ জাতিবৈচিত্র্যের কলস্বর, নও শুধু কুলুকুলু উলুধ্বনি,
তুমি তুমি বয়ে চলেছো জাতিবাঙালির জন্ম পেরিয়ে,
মৃত্যু পেরিয়ে, পুনর্জন্ম পেরিয়ে সৃষ্টির পৌণপুণিক উৎস অবধি।

জয়পুরহাট ২১.০৯.২০১৩

 

বুদ্ধনং শরনং গচ্ছামি

বুড়ি হও ছুড়ি হও,
তোমার কাশ-শাদা হাসির অর্থই শরৎ নয়।

তোমার দশহাতে দশ বিপদসংহারী অস্ত্র হাসে;
অথচ শরৎ হাসে না।
বাঁকখালীর জলে ঢেউয়ের ত্রিভঙ্গ থেমে যায়,
অথচ আশ্বিন নেচে ওঠে না বালিতে বা ফেনায়।

ঘোর পূর্ণিমায় সোনাইছড়ির পাহাড়ে পাহাড়ে শিশির নামে।
রামুর হাজার বছরের প্রাচীন কিয়াং জোছনায় সাঁতরায়।
তখন বুদ্ধের শতফুট দীর্ঘ শান্তিশয়ান চাঁদের দিকে তৃষিত তাকায়।
এই সুযোগে নাফ আর আঁশনাই দরিয়ার মউজ পাড়ি দিয়ে
শরতের শত্র“রা গোঁট পাকায় গর্জন-সেগুনের ছায়ায়।

মধ্যযুগ পায়ে পায়ে আগ-বাড়ায়।
তখন বারুদ-ভোজালি-ইট-কাঠ-পাথর-লাঠি-কীরিচ-দেশলাই
কিংবা বুলেটরা অ্যাম্বুশ করে শারদীয় পূর্ণিমায়।
অগত্যা ধর্ম ও অধর্ম মুখোমুখি দাঁড়ায়।
আর সেই কালো জোছনার কালো পূর্ণিমায়
সিংহাসনত্যাগী রাজপুত্রের পাথুরে মূর্তির বুক
জেগে ওঠে সুনীতির সুরক্ষায়।

এই শরতে ধর্মান্ধরা যখন হননপ্রিয়,
তখনো মহামতি বুদ্ধ নির্বাণপ্রিয়।
এই শরতে মানবতার শহীদ তিনি,
মানবতার গাজী।
শুদ্ধ তিনি, যদিও অনিরুদ্ধ।
না, মহামতি বুদ্ধ নন ক্রুদ্ধ।

বুদ্ধের সঙ্গে সে, তুমি ও আমি:
বুদ্ধনং শরনং গচ্ছামি।

০৪.১০.২০১২ ঢাকা

 

ছয় পা বা দুই পা বা এক পায়ের দৌড়

ছয়পায়ের ক্ষুদে এক পিপীলিকা
বিরামহীন দৌড়ে যাচ্ছে আমার লেখার টেবিলে,
একসময়ে সে উঠে এলো
আমার আঙুল বেয়ে আমার কলমের নিবে;
তারপর সুস্বাদু আহার্য ভেবে
আমার বলপয়েন্টের কালিতে মুখ ডোবালো সে।

অগত্যা পিপীলিকাটির প্রতি নিতান্ত দয়াপরবশ হয়ে
আমি বলপয়েন্টটা তুলে রাখলাম তার বিদায়ের অপেক্ষায়,
পাছে কলম ও কাগজের সংঘর্ষে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়;
ওদিকে আরেকটি পিপীলিকা কখন আমার মুখ বেয়ে
নিচের ঠোঁটে কামড় বসিয়েছে আমি টের পাইনি।

বাম কনুইয়ের উপর পলায়নপর আরেকটি পিপীলিকা চোখে পড়তেই
আমার অজান্তে আমার ডানহাতের আঙুল তাকে পিষে মারলো;
পরমুহূর্তেই আমার কাঁধের শাহ-রগের উপর
কামড় বসালো অরেকটি ছয়পায়া;
আমি দেখলাম, আমার নোটবুকের কী-বোর্ডের ফাঁকে ফঁাঁকে
অ্যামবুশ করে আছে রাশি রাশি পিপীলিকা;
আমি জানালা গলিয়ে বাইরে চোখ রাখতেই লক্ষ্য করলাম
জানালার শিক বেয়ে মাটিতে ছুঁয়ে আমার ভিটেবাড়ি পার হয়ে
আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে সেই পিপীলিকার সারি;
তাকে অনুসরণ করছে পৃথিবীর গর্ভজাত তার অজস্র বংশধর;
আর সবার আগে আছে যে পিপীলিকাটি, তার শরীর
বড় হতে হতে গ্রাস করে ফেলছে পুরো আকাশটাকেই;

আমি বেশ বুঝতে পারলাম,
একটি প্রতিদ্ব›দ্বী পিপীলকাকেও নিবংশ করার শক্তি নাই
আপাতত পারমাণবিক শক্তিধারী
আমার মতো বিমানবিক মানুষেরও;

অগত্যা একটি দুই পায়ের পিপীলিকা হয়ে আমিও
সেই পিপীলিকার সারিতে দৌড় শুরু করলাম।

কী আশ্চর্য, আমার পেছন পেছন দৌড় শুরু করলো
কোটি কোটি বছর এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাবৎ বৃক্ষগুল্মগুলো।

২২.০৭.২০১৩ ঢাকা

 

ছায়ায়

রমনা পর্কের লেক। ক্ষণিক মিলন।
নাগলিঙ্গমের গোড়া। স্বাস্থ্যসুখী চড়–ই-মানুষ।
পতিতার পেটিকোট। ডালে ও পাতায়।

সূর্যোদয়। বসেছে হেলান দিয়ে। বাঁধানো বেঞ্চিতে।
আকাশ পড়েছে ঢাকা। ছাতায়। ছায়ায়।

১০.০৭-২০১৩ ঢাকা