Home / সবিশেষ / ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র একগুচ্ছ কবিতা

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র একগুচ্ছ কবিতা

lorka-2ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র একগুচ্ছ কবিতা

অনুবাদ : নাজনীন খলিল

লেখক পরিচিতি
ফেদেরিকো দেল সাগরাদো কোরাসোন খেসুস গারসিয়া লোরকা
জন্ম      ৫ জুন ১৮৯৮
          ফুনেতে ভাকুএরোস,গ্রানাদা
          আন্দালুসিয়া, স্পেন            
 মৃত্যু     ১৯ আগস্ট ১৯৩৬ (৩৮ বছর)
          কাছাকাছি  অলফাকার ,গ্রানাদা,স্পেন

             
জাতীয়তা  স্পেনীয়

পেশা      নাট্যকার, কবি, থিয়েটার পরিচালক
রাজনৈতিক আন্দোলন   Generation Of ’27

পিতা-মাতা   ফেদেরিকো গারসিয়া রদ্রিগেজ
               ভিসেন্তা লোরকা রোমেরো ।।

  ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা বিশ্বসাহিত্য- অঙ্গনে এক সুপরিচিত নাম।লোরকা কে গন্য করা হয় স্পেনের সর্বাপেক্ষা মহান কবি এবং নাট্যকারের একজন  হিসেবে।
           বিশ্বসাহিত্য বা শিল্পাঙ্গনে স্প্যানিশদের আসন অত্যন্ত সমৃদ্ধ । শতাব্দী প্রাচীন এক বনেদিয়ানা।আর সেই তারকামন্ডিত আকাশে ‘ লোরকা ‘যেন   ধ্রুবতারা । পৃথিবী তাঁকে দিয়েছে  খুব স্বল্পকালীন জীবনযাপনের এক সময়সীমা। কিন্তু এই ক্ষুদ্র জীবনের গন্ডী প্রতিবন্ধক হতে পারেনি তাঁর বিশ্বজয়ের।ভিনি ভিডি ভিসি। এলেন। দেখলেন। জয় করলেন। হয়ে গেলেন বিশ্ববিশ্রুত এক নাম। শিল্পসাহিত্য জগতের  ধ্রুবতারা । ‘ সিয়েমপ্রে’ ; চিরকালিন । ]

যে নগরী ঘুমায়না

(City That Does Not Sleep // Federico García Lorca )

আকাশে কেউ ঘুমায়না  । কেউনা, কেউ নয়।
ঘুমায়না কেউ ।

চাঁদের প্রাণিগুলো  ঘুরছিল আর শুঁকছিল তাদের কুটীরের চারপাশ।
যে লোকগুলো স্বপ্ন দেখেনা তাদের কামড়ে দেবে এসে  জীবন্ত গুঁইসাপ ,
এবং যে লোকগুলো  দ্রুত পালিয়েছিল উদ্যমহীনতায়
মিলবে  রাস্তার  মোড়ে
তারাদের মৃদু প্রতিবাদের শান্ত তলদেশে অবিশ্বাস্য কুমিরগুলো ।

ঘুমায়না কেউ পৃথিবীতে।কেউ নয়,কেউনা।
কেউ ঘুমায়না।

দূরের এক সমাধিতে একটি শবদেহ

গোঙ্গাচ্ছে তিন বৎসর ধরে
কারণ তার হাটুর নীচে একটি  গ্রামীন শুষ্ক ভূমি
এবং  যে সকালে  তারা সমাধিস্থ করেছিল ওই ছেলেটিকে কেঁদেছিল অনেক
তাকে শান্ত করার জন্য প্রয়োজন ছিল কুকুরগুলোকে ডেকে  পাঠানোর।

জীবন একটি স্বপ্ন নয়, সাবধান! সাবধান! সাবধান!
আমরা সিঁড়ি থেকে নেমে যাই ভেজামাটির স্বাদ অনুভবের জন্য
অথবা আরোহন করি বরফের ক্ষুরধার প্রান্তে মৃত ডালিয়ার কন্ঠস্বরের সাথে।

কিন্তু বিস্মরণের কোন অস্থিত্ব নেই , কোন অস্থিত্ব নেই স্বপ্নের।
অস্থিত্ব আছে মাংসের।নতুন একগুচ্ছ শিরায়
চুম্বন আমাদের মুখগুলোকে জুড়ে রাখে,

এবং  এই ব্যাথাকে যে জেনেছে সে আজীবন জেনেই যাবে
এবং  আজীবন মৃত্যুকে বহন করবে তার কাঁধে যে  ভয় পায় সে ।

একদিন
ঘোড়াগুলো বাস করতে আসবে পান্থশালায়
এবং ক্ষিপ্ত পিঁপড়েগুলো
নিজেদের নিক্ষেপ করবে  গরুর চোখে আশ্রিত হলুদ আকাশে।

একদিন
আমরা সংরক্ষিত প্রজাপতিগুলোকে দেখবো মৃতদেহ থেকে উঠে আসতে
কিন্তু তখনও হাঁটছে  ধুসর শৈবাল এবং স্তব্দ নৌকার রাজ্যে।
আমরা দেখবো আমাদের আংটিগুলোর বিচ্ছুরণ এবং জিহ্‌বা থেকে গোলাপের ঠিকরে ওঠা।
সাবধান! সাবধান হও! সাবধান হও!

যে লোকটির এখনো  আছে বজ্রপাত এবং নখরের চিহ্নগুলো,
এবং ওই ছেলেটি যে কাঁদে কোনদিন সেতু আবিষ্কারের গল্প
শুনেনি বলে,
অথবা ওই মৃত লোকটি যে  এখন  মালিক শুধু তার একটি জুতো এবং মাথাটার ,
আমরা অবশ্যই তাদের নিয়ে যাবো সেই দেয়ালের কাছে  যেখানে অপেক্ষায় আছে গুঁইসাপ
এবং বিষধরেরা ,

যেখানে ভালুকের দাঁতগুলো অপেক্ষায় আছে,
যেখানে অপেক্ষায় আছে ছেলেটির মমিকৃত হাত,
শেষপ্রান্তে দাঁড়ায় উটের কেশরগুলো তীব্র নীল কম্পনের সাথে ।

কেউ ঘুমাচ্ছেনা আকাশে।কেউ নয়,কেউনা।
ঘুমাচ্ছেনা কেউ ।
যদি কেউ বন্ধ করে তার চোখ
একটি চাবুক, ছেলেরা, একটি চাবুক !
খোলাচোখগুলোর  দৃশ্যচিত্র হতে দাও

এবং আগুনের যন্ত্রনাক্ত ক্ষত।
এই পৃথিবীতে কেউ ঘুমাচ্ছেনা।একজনও না,নয় একজনও ।
আমি এটা আগেই বলেছি।

কোন একজনও ঘুমাচ্ছেনা।
কিন্তু কেউ যদি রাত্রে তার মন্দিরে খুব বেশি শেঁওলার জন্ম দেয়,
মঞ্চের চোরাদরোজাগুলো খুলে দাও সে যেন চাঁদনি দেখতে পারে
মিথ্যা পানপাত্রগুলো,বিষ,এবং রঙ্গমঞ্চের খুলি।

ভোরের আগে

(Before The Dawn//Federico García Lorca)

তীরন্দাজেরাও কিন্তু
প্রেমের মতো অন্ধ।
সবুজ রাতে
উষ্ণ লিলির নকশাচিহ্ন  রেখে যায়
তীক্ষ বর্শাগুলো।

চাঁদের কীলক
বিদ্ধ করে বেগুনী মেঘদল
এবং তাদের তূনীরগুলো
শিশিরপূর্ণ হয়।

হ্যাঁ,প্রেমের মতো
তীরন্দাজেরাও
অন্ধ!

অন্ধকার মৃত্যুর হরিণ

(Gacela Of The Dark Death//Federico García Lorca )

এই  আপেলগুলোর স্বপ্নে আমি ঘুমুতে চাই,
সমাধিক্ষেত্রের কোলাহল থেকে উঠে এসে।
ওই শিশুটির স্বপ্নে আমি ঘুমুতে চাই
যে উত্তাল সমুদ্রে ছিন্ন করতে চেয়েছিল তার হৃদয়।

মৃতদের রক্তক্ষরণ হয়না একথাটি আর শুনতে চাইনা,
ওই যে গলিত মুখগুলো যায় জলের সন্ধানে,
আমি শিখতে চাইনা  ঘাসের এই নির্যাতন,
দেখতে চাইনা ভোরের আগে কর্মচঞ্চল চাঁদের সর্পাকৃতি মুখ।

কিছুক্ষন ঘুমুতে চাই
কিছুক্ষণ ,এক মিনিট, এক শতাব্দী;
কিন্তু সবাইকে অবশ্যই তা জানতে হবে আমি মরে যাইনি ।
যেহেতু আমার ঠোঁটগুলোতে স্বর্ণখন্ড
যেহেতু আমি ওয়েস্ট উইংয়ের এক ক্ষুদে বন্ধু
যেহেতু আমি আমার কান্নার তীব্র ছায়া।

ভোরে আমাকে ঢেকে রেখো একটি আচ্ছাদনে
কারণ ভোর আমার দিকে ছুড়ে দেবে মুঠোভর্তি পিপীলিকা,
এবং আমার জুতোগুলো ভিজিয়ে দিও খর জলে
যেন পিছলে যেতে পারে বৃশ্চিকের চিমটিগুলো।

যেহেতু আমি আপেলগুলোর স্বপ্নে ঘুমুতে চাই
শিখতে চাই সেই আর্তনাদ যা আমাকে শুচি করে দেবে মৃত্তিকার সাথে ;
যেহেতু আমি থাকতে চাই ওই তমসাচ্ছন্ন শিশুটির সাথে
যে তার হৃদয় ছিন্ন করতে চেয়েছিল উত্তাল সমুদ্রে।

অচিন্ত্য প্রেমের হরিণ

(Gacela Of  Unforseen  Love//Federico García Lorca)

কেউ বুঝতে পারেনি তোমার জরায়ুর
গাঢ় ম্যাগনোলিয়ার সৌরভ।
কেউ জানতোনা তুমি দাঁতের ফাঁকে সয়েছিলে
ভালবাসার একটি হামিংবার্ড তাও।

তোমার কপালের শশীকলার সাথে খোলাপ্রান্তরে
ঘুমিয়ে পড়েছিল সহস্র ক্ষুদে পার্সিয়ান ঘোড়া,
তুষারের শত্রু,
যখন চার রাত তোমার কোমর রেখেছিলাম আলিঙ্গনাবদ্ধ করে।

প্লাস্টার এবং যূথিকার ফাঁকে তোমার চকিতচাহনি
ছিল একটি বিবর্ণ বীজশাখা।
তোমাকে দেবার জন্য আমার হৃদয়ে খুঁজেছিলাম
গজদন্ত অক্ষরগুলো যা বলে, “সিয়েমপ্রে” ,
“সিয়েমপ্রে “,”সিয়েমপ্রে” :  আমার নিদারুণ যন্ত্রনার উদ্যান,
সর্বদাই ধরাছোঁয়ার বাইরে তোমার শরীর,
আমার মুখবিবরে তোমার ধমনীর ওই রক্ত,
ইতিমধ্যেই তোমার মুখগহবর আলোহীন
আমার মৃত্যুর জন্য।