Home / প্রকাশনা উৎসব / ‘ঢাকার গণপাঠাগার, আলোয় ভরা ভুবন’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসব

‘ঢাকার গণপাঠাগার, আলোয় ভরা ভুবন’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসব

‘ঢাকার গণপাঠাগার, আলোয় ভরা ভুবন’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসব

বইনিউজ প্রতিবেদক
এই বইয়ের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে পাঠাগারচর্চার ইতিহাস দুটো আমগাছের তলায় সারি সারি চেয়ার পাতা। সামনে মঞ্চ। প্রকৃতিতে হেমন্তের হাতছানি। ভরপুর আলোর বিকেল।
শুক্রবার বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা। সাড়ে চারটা বাজতেই একজন, দুজন করে শুরু হয়ে গেল অতিথিদের আগমন। কথা ছিল ‘ঢাকার গণপাঠাগার, আলোয় ভরা ভুবন’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি হবে আড্ডার মেজাজে। শেষ পযন্ত তা রূপ পেল আনুষ্ঠানিকতায়। কারণ উপস্থিত সবার মনেই ছিল দীর্ঘদিনের জমানো কথা। আর তা শুনতে শুনতে আর ‘সমাধান সূত্র’ বের করতে বাজল রাত ৯টা।
অনুষ্ঠানস্থান ঢাকার পরীবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র। এখানকার কর্মীদের সহযোগিতার মনোভাব যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনকেই যেন এক ধাপ এগিয়ে রাখে। এক্ষেত্রেও তাই হলো।
একে একে এলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক, কবি, সাংবাদিক মিনার মনসুর, লেখক, কলামিস্ট ইকরাম কবীর, দনিয়া পাঠাগারের সভাপতি, নাট্য সংগঠক মো. শাহনেওয়াজ, নামী প্রকাশক আলমগীর শিকদার লোটন।
বইয়ের প্রকাশক শ্রাবণ প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী রবীন আহসান করলেন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা।ঢাকার লাইব্রেরি সংগঠকদের বক্তব্য ও ফাঁকে ফাঁকে কবিতা আবৃত্তি এভাবেই চলছিল অনুষ্ঠান।

লেখক, কলামিস্ট ইকরাম কবীর বক্তব্য রাখছেন।

শুরুতে প্রকাশক রবীন আহসান বললেন, এটি ভিন্ন রকম একটি বই। এতে ঢাকার পাঠাগার চর্চার দেড়শ বছরের ইতিহাস উঠে এসেছে। করোনাকালে এ রকম বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু আনন্দের খবর হলো, দুই সপ্তাহের প্রি-অর্ডার চলাকালে ২০০ কপি বই বিক্রি হয়ে গেছে। এটা আমাদের উৎসাহ দিয়েছে।
অনুষ্ঠানটা ছিল প্রকৃতই ভিন্ন রকম। সবাই ছিলেন বই ও পাঠাগার আন্দোলনের মানুষ।
কড়া বক্তব্য দিলেন পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার কামাল স্মৃতি পাঠাগারের আবু তাহের বকুল। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা, রাষ্ট্র কেন পাঠাগারগুলোর দায়িত্ব নেয় না।
মিরপুরের সৃষ্টি পাঠোদ্যানের আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য, সরকারি ছুটির দিনে কেন সরকারি গণগ্রন্থাগার বন্ধ থাকবে। পার্ক, জাদুঘর খোলা থাকলে লাইব্রেরি কেন নয়।
খিলগাঁও ইসলামি পাঠাগারের আলতাফ হোসেন বললেন, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের যে লাইব্রেরিটি আছে সেটা ‘লাইব্রেরির লাইব্রেরি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক, যাতে বেসরকারি লাইব্রেরিগুলো তাদের কাছ থেকে শিখতে পারে।
জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জেবউননেছার কথা, বই বিমুখতার জন্য মুঠোফোনকে দায়ী করা ঠিক হবে না। দায়ী করতে হবে সিস্টেমকে। কীভাবে শিশুদের কাছে বই আনা যাবে তা নিয়ে অনুপুঙ্খ ভাবতে হবে।

করোনাকালে মুখে মাস্ক, দর্শকদের এক অংশ

শহীদ বুদ্ধিজীবী পাঠাগারের ফাহিমা কানিজ লাভা বললেন, সরকার সব কিছুতে এত এত বরাদ্দ দিচ্ছেন, কিন্তু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র পাঠাগুলোর এত রুগ্ন দশা কেন, বুঝতে পারি না।
বক্তব্যের মাঝে কবিতা আবৃত্তি করলেন শিল্পী মায়মুনা হায়দার চৌধুরী, ওহি আল জারিফ, দেবব্রত সুবীরসহ আরও অনেকেই।
অনুষ্ঠানে আরও এসেছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক মানজারে হাসান সুইট, গ্রন্থবিতানের মো. জহিরউদ্দিন, সীমান্ত গ্রন্থাগারের কাজী সুলতান টোকন, রামমোন রায় পাঠাগারের রণবীর পাল রবি, বেরাইদ গণপাঠাগারের এমদাদ হোসেন ভূঁইয়া, শহীদ বুদ্ধিজীবী পাঠাগারের আবু নাঈম, সারা দেশে বৃক্ষরোপণ আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবী জুবায়ের আল মাহমুদ রাসেল, আইইডিসিআরের মাসুদ বিল্লাহ, দুযোগ মন্ত্রণালয়ের ইসমাইল হোসেনসহ অনেকে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইকরাম কবীর বললেন, ‘ঢাকার গণপাঠাগার, আলোয় ভরা ভুবন’ বইটি ৩০ বা ৪০ বছর পরে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হবে। ঢাকায় যে এত বেসরকারি পাঠাগার আছে, জানতাম না। তিনি পাঠাগার নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনার কথা শোনালেন।
প্রকাশক আলমগীর শিকদার লোটন বলেন, আমরা গত ৭০ বছর ধরে চেষ্টা করেও ঢাকার এমন ইতিহাস তুলে ধরতে পারিনি, যা কাজী আলিম-উজ-জামান ও রবীন আহসান পেরেছেন।
লেখক কাজী আলিম-উজ-জামান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বাংলা অঞ্চলে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরেন। পুরান ঢাকার আজাদ মুসলিম লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা ও কিংবদন্তির ঢাকা বইয়ের লেখক নাজির হোসেনের ফটিক চাঁদের গল্প বলে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক মিনার মনসুর বলেন, প্রকৃতপক্ষে বই পড়ার জন্য আন্দোলন সব যুগেই করতে হয়েছে। বেগম রোকেয়া, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও আন্দোলন করেছেন।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বেসরকারি পাঠাগারগুলোর অনুদান পেতে আগের জটিলতার অবসান হয়েছে, সে তথ্যও জানান তিনি। এ ছাড়া লালমনিরহাট জেলায় ‘সেলুন লাইব্রেরি’র মতো নতুন উদ্যোগ সারা দেশে আরও নেওয়ার কথা ঘোষণা দেন তিনি।
তাঁর একটা কথা, বছরে সারা দেশে ৭৫০টি লাইব্রেরিকে ৩ কোটি টাকা ও বই সহায়তা দেওয়া হয়। এই বইগুলো কোথায় যায়, সে বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।
তিনি ঢাকা বিভাগের ২০০ পাঠাগার নিয়ে খুব শিগগিরিই সভা করার কথা জানান।
সভাপতির বক্তব্যে মো. শাহনেওয়াজ বলেন, আমরা একদিন থাকবো না। হয়তো আমাদের লাইব্রেরিও থাকবে না। কিন্তু ‘ঢাকার গণপাঠাগার আলোয় ভরা ভুবন বইটি হাজার বছর টিকে থাকবে‘। আর এই বইয়ের মধ্য দিয়ে আমরা বেঁচে থাকবো। আমাদের পাঠাগারচর্চার ইতিহাস বেঁচে থাকবে।

                                                                             জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক মিনার মনসুর, লেখক কাজী আলিম-উজ-জামান ও মোঃ পাঠাগার সংগঠক শাহনেওয়াজ আড্ডায়!