Home / খবর / কবি শহীদ কাদরীর জীবনাবসান

কবি শহীদ কাদরীর জীবনাবসান

yZ
বইনিউজ প্রতিবেদন

নিউ ইয়র্কের নর্থ শোর বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে আজ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় কবি শহীদ কাদরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। উচ্চ রক্তচাপ এবং জ্বর নিয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সাত দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।
শহীদ কাদরীর জন্ম ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট। শহীদ কাদরী ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়ন করে নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করে বাংলা কবিতায় সজীব বাতাস বইয়ে দিয়েছেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যের তীক্ষ্ণ শাণিত রূপ তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে শহীদ কাদরী ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে। তাঁর কবিতায় অনূভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।
আধুনিক বাংলা কবিতার ‘জনপ্রিয়তা’র জোয়ার এবং নিরীক্ষাপর্বের কবি হিসেবে শহীদ কাদরী ছিলেন এক উজ্জ্বল অধ্যায়। দেশভাগ-পরবর্তী কবিতার পালাবদলে যে অল্পকজন কবি এ ধারায় সৃজনশীলতার প্রমাণ রেখেছিলেন শহীদ কাদরী ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম কবি-প্রতিভা। ‘শহীদ কাদরীকে ভাবা হয় পঞ্চাশের সবচেয়ে মেধাবী কবি। তাঁর কবিতার তীক্ষ্ণ নাগরিকতা, নির্মেদ প্রকরণ এবং মনননির্ভরতা তাঁকে বিশিষ্ট করেছে।
শহীদ কাদরীর কবিতায় চিত্রিত নাগরিকতার যে প্রকাশ, বিশ শতকী নগর-মেজাজ, তা কালের প্রবাহে পরিবর্তিত হয়েছে। কাদরী সে গতিতে এগিয়ে চলেন নি। থেমে গেছেন। অনেকে মনে করেন তিনি অভিমানে কবিতা লেখা ছেড়েছেন। হয়তো তা সত্য। কিন্তু ভিন্নতর সত্য হলো নগর-মনস্কতার বাধ্যবাধকতা। নাগরিক কবি হওয়ার কতকগুলো সমস্যা থাকে। কাদরীরও আছে। নগরজীবনের রূপকারেরা নগর, শাহরিকতা থেকে বেশি দূর এগোতে পারেন না। হঠাৎ কোথায় যেন স্তিমিত হয়ে পড়েন। এমনটি হতে বাধ্য। আর তা ঘটে চার দেয়ালের মাঝে ভাবনার ঘুরপাক খাবার তাড়নায়। শহীদ কাদরীর তিনটি কবিতা গ্রন্থেই নগর-মনষ্কতা প্রায় একই ধারায় প্রবাহিত। রয়েছে পুনরাবৃত্তিও। ভাবের পুনরাবৃত্তি। এমন কি শব্দ-উপমারও। শেষের দিকে অনুভূতির প্রকাশও যেন অনেকটাই অতীব্রভাবে প্রক্ষেপিত।
‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ এবং ‘কোথাও কোন ক্রন্দন নেই’ এই তিনটি কাব্যগ্রন্থ দিয়েই বাংলার জনপ্রিয় কবিদের একজন হিসেবে নিজের স্থায়ী আসন গাড়েন শহীদ কাদরী। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি ও ২০১১ একুশে পদক পান তিনি। ১৯৭৮ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের বাইরে কবি। জার্মান, ইংল্যান্ড হয়ে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন তিনি।

 

শহীদ কাদরী-এর কবিতা । তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা

ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট করে চলে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো-
বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো
মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো
প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে
কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।

ভয় নেই…আমি এমন ব্যবস্থা করবো
একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী
এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা!

সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ হবে যাবে-
আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক
অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক হয়ে যাবেন
সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয় পাহারা দেবে সারাটা বৎসর
লাল নীল সোনালি মাছি-
ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা।

ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে
শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন
আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে
গণচুম্বনের ভয়ে
হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।

ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
শীতের পার্কের ওপর বসন্তের সংগোপন আক্রমণের মতো
অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে-বাজাতে বিপ্লবীরা দাঁড়াবে শহরে,

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে
গোলাপ কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান।
ভয় নেই, ভয় নেই
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।