Home / সাহিত্য / কুশল ইশতিয়াক-এর একগুচ্ছ কবিতা

কুশল ইশতিয়াক-এর একগুচ্ছ কবিতা

Golam-Istiaqueকুশল ইশতিয়াক- এর  একগুচ্ছ কবিতা

 

ফেরা

তেরো বছর আগে কাঠের সিন্দুকে
তুলে রেখেছিলাম রৌদ্রের ফুল।

যখন তুমি গেলে
ঝড়ে উড়ে যাচ্ছিলো আমার হাওয়াই বাড়ি।

তারপর
কাগজ তুলতে গিয়ে কতোবার হাত কেটে গেলো।
কাগজ তুলতে গিয়ে কতোবার হাত ঝরে গেলো।

তুমি ফিরে এলে,
আর আমি সিন্দুক খুলে দেখলাম একটা বাগান।

 

অপার্থিব

গ্রীষ্মের রাতে,
তোমার রূপের অপার্থিব আলোয় থেতলে গ্যাছে চাঁদ।

জ্যোৎস্না দিয়ে তৈরি বক্ষবন্ধনী তোমার। দীর্ঘ ছায়া আলগোছে সরে এসে হয়ে যায় একটা স্বর্গের গাছ। অন্ধকারে যখন তুমি আসো, আমার চোখের পাতারও ভ্রম হয়। তিন, চার, ছয় তাকে সব খোলা জানালাগুলো জুড়ে বেড়ে ওঠে অজস্র ইউক্যালিপটাস।

গ্রীষ্মের রাতে,
তোমার ঘ্রান একরাশ রহস্য নিয়ে ভাসে। তা দিয়ে আমার গভীর নেশা। তোমার স্পর্শে বদলে যায় সময়ের আদিম ধাঁধা। তোমার খোলা চুলের কাঁপন এক গোপন কুহেলিকা। তুমি যখন আসো, আমি-আমার ভেতরে আরও বেশি শূন্য হয়ে যাই।

গ্রীষ্মের রাতে,
আমার খুব খালি খালি লাগে। তোমাকে খুব বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছা হয়, খুব। ভালোবাসা য্যানো হয়ে ওঠে এক অন্ধকূপ।

কিন্তু আমি তখন অপার্থিব ফুটপ্রিন্টগুলোর অপেক্ষাতেই হেঁটে বেড়াই।

 

হারানো কবিতা

 

গ্রহ-তারা-নক্ষত্রের সাথে কবিতার হিসাব নিকাশ অনেক প্রাচীন।
বহু কোটি বছর আগে, যখন আমি গুটিসুটি মেরে বসে ছিলাম
ব্রহ্মাণ্ডের কোন গোপন কুঠুরিতে, আমারও বন্ধু ছিলো কবিতারা।
ওরা ছিলো ছোট ছোট পল্কা কনার মতো। গভীর অন্ধকারে ফুটে থাকা আলো।
ওরা ছিলো নৈঃশব্দ্যমাখা একটা তারা ভরা আকাশের রহস্য।
এরপর আমার মৃত্যু হলো।

পৃথিবীতে আসার আগে
আমিও বসে ছিলাম ইস্রাফিলের শিঙার এক গোপন গর্তে। তখনও
আমার আপন ছিলো কিছু অস্ফুট শব্দেরা। মাঝে মাঝে ওদের মনে পড়ে, আবছা।
মনে হয়, আমি আবারো একবার শব্দের ভেতর ভাসি। প্রাচীন অসুখের মতো।
কিন্তু এখানে এসে আমি ওদের ফেলেছি হারায়ে।
শব্দেরা উড়ে বেড়ায় খুব গোপনে। মাঝে মাঝে; আমারও খুব কাছে।
পার্থিবতা; আমি তো অদৃশ্য এক শেকলে বাঁধা;
পৃথিবীর টান, আর মহাবৈশ্বয়িক বিমুঢ়তা দিন দিন বেড়ে চলে।

কিন্তু আসলে কে বাঁধা? আমি শেকলের? নাকি শেকল আমার সাথে?

শুনেছি, হারানো কবিতারা নাকি মৃত্যুর সময় ফিরে আসে।

 

রাত্রি ফুরাবার আগে

 

রাত্রি ফুরাবার আগে আমরা প্রার্থনা করতে পারতাম; যেহেতু ঈশ্বরের চোখে কোনো ঘুম নেই।
সম্ভবত আরেকটু পরে সময়ের আঁতুড়ঘর থেকে ভূমিষ্ঠ হবে ভোর; তাই আমরা বেয়ে বেয়ে চললাম মাটির দিকে।
আমাদের পথে- আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিলো অজস্র ভবিষ্যৎ; কিন্তু আমাদের তুলে নিতে হলো যে কোনো একটি;
এ যেন সুদীর্ঘ যাত্রায় কোনো নির্ধারিত ফুল; অথচ আমরা খুঁজছিলাম পাথর বাগান-
যেখানে বিরতিহীনভাবে জন্মাতে থাকে অসংখ্য সবুজ এমারাল্ড; কিন্তু আমরা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
আমরা তখন অপেক্ষা করতে লাগলাম; আমাদের কানে আসছিলো কিছু সম্মোহনী শব্দ- যেমন বার্চের পাতায় বাতাস সবচেয়ে বেশি রহস্যময় হয়ে ওঠে।

প্রকৃতপক্ষে সকল গাছ ঈশ্বরের সন্তান। অথচ ওরা কখনো ওদের জন্য বেছে নেয় না কিছুই।

আসলে মৃত্যু ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন দরজা
যার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা যায় বহুবার,
কিন্তু পার হওয়া যায় মাত্র একবার।

ওরা পৃথিবীর প্রাণ; আমরা ছিলাম জল ও কাদামাটির ।

 

জলজ
১)

রাত্রি ফিসফিস করে কিছু গাইছিলো সমুদ্র তীরে; সম্ভবত গোঙাচ্ছিলো।
এটা খুব স্বাভাবিক যে- মাথার ওপর তখন ছিলো অজস্র তারা, চাঁদটার মৃত্যু হয়েছে আবারো।
তাকে মাটি দেওয়া হয়েছে শেষকৃত্যহীন।
আর ঘণ্টা দুয়েক পর ভূমিষ্ঠ হবে ভোর; কিন্তু আমরা জানি না, কোথায় আকাশের জঙ্ঘা ।
সমুদ্রের গর্জনও শোনা যাচ্ছিলো না তেমন। উপকূলে কিছু ঘুমন্ত সাইরেন।
ঢেউ এর মতো ছুটে এসে আমাদের গ্রাস করছিলো তখন অন্ধকার;
জোনাকিরা আমাদের ঝাউবনের পথ দেখায় নি কোনো।

—————————————-

(২)

অতঃপর সমুদ্র থেকে উঠে এসে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।
কিন্তু কোথায় বনের দরজা? ওটা নাকি কারুকার্যে ভরা- পথে বাধ সাধলো অসংখ্য খাড়া শ্বাসমূল।
আমাদের পথ ছিড়লো রক্তে, অথচ রক্তও ছিলো জল; আমাদের পায়ে ক্ষত হলো
শামুকের মতো সুগভীর-
যেন আমরা জাহাজের চিহ্ন নিয়ে যাচ্ছি।

তখন আমাদের কানে বাজছে ভয়ংকর শনশন; আমরা এগোলাম দরজার খোঁজে
কিন্তু একটুও আগালো না আমাদের পথ; বরং এগিয়ে এলো ভোর,
অথচ কথা ছিলো যে- আমাদের ঝাউবন হাঁটার পথে থাকবে প্রচুর বালু
আর জোনাকি;
রাত্রিরা ফুরোবে না কখনো।

 

ডাক; ২

কাঁধে পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, দূর থেকে ভেসে আসছে
পুরনো জাহাজের শব্দ।
নির্লিপ্ত মাস্তুলের পিঠে চড়ে ছেড়ে যাবো এই বন্দর এবার,
আর ফিরবো না।
চোখ এখন ক্রমশ হয়ে যাচ্ছে শীতল, সবটুকু ভালোবাসা ঘনীভূত হতে হতে একসময়
ঝরে পড়বে ঠিক
মোটা বাদামী পোশাকে আর হরিণের চামড়ায় গেঁথে নিয়েছি
পৃথিবীর মানচিত্র।
ঘুমিয়ে ছিলাম বহুকাল; মনে আছে- শেষবার যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তখন
ছিল কোনো বিকেল; তারপর কানে আর কিছুই ঢুকলো না। না কোনো
ছন্দপতন, হট্টগোল, ঘাসের উপর তোমার পায়ের শব্দ!
বেজে চললো সিম্ফনি, আমি ঘুমাচ্ছিলাম বেঘোরে কারণ
জানি-শীত এসে পড়লেই শিকারি হয়ে আমাকে চলেই যেতে হবে একদিন। মাঝ সমুদ্রের পরিষ্কার আকাশ; তারাভরা রাত্রিকে
তীক্ষ্ণ হারপুনের আঘাতে করতে হবে খুন! চোখে চেপে বসেছে মৃত্যুর নেশা ।
পিছনে ফেলে এসেছি সব; তোমাকেও; আকাশ অনেক একা..……

 

 

দেবী

 

কতোটা ভাসমান চোখ
নিয়ে তাকাতে পারো
যে
নিকটবর্তী সব লোকালয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়;
এমনকি ঝড়ো হাওয়া; গাছপালা।

প্রজাপতির পাখা ঝরে যায় বাতাসে
আমার অস্তিত্ব কুঁড়ে কুঁড়ে খায় শামুক।

সব পাথর শুধু পাথর হয় না
কখনও পাথরের গায়ে খোদাই করা থাকে
কোনো মুখ।

 

 

ব্লুম

একটা দুপুর এভাবেই কবিতা হয়ে ওঠে
নিঃসঙ্গ কিশোরীর।

আলতো করে ঠেলে পার হয়ে যায় পৃথিবী,
একটা সদ্য জন্মপ্রাপ্ত ফুল- পাপড়ি মেলে
য্যামন;
অতি সন্তর্পণে তেমনি ভাবে খুলে দেখেছে নিজের স্তন।

হাতের অপর নাম কখনও বা চোখ;
একটা হরিণ জল খেতে আসে- একবার তাকায়;
সেই চাহনিতে নিঃশব্দে মুছে যায় কলতলায় জলের
পতন
শেওলা ধরা দেয়ালে গোপন প্ররোচনা থাকে-
আর, চৌবাচ্চায় ডুবে থাকা ঝাঁ ঝাঁ

 

রোদ।

 

স্বাধীনতা শব্দটির সূত্রপাত মূলত স্নানঘরে।

 

শীতের গান

 

মূলত বাতাস, ও খড়- জীবনে;
বাতাসও কোথাও ছিলো পাখি।

জলপাই শোকে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে আমাদের
বরফ-সাগর
শীতের গান শুনতে শুনতে সূর্যের
বেলা ভুলে যায় ডুমুরের ফুল।

কেউ থাকে না;
একটু কেঁপে উঠলেই ঝরে যায়
পাতা।

 

বসন্তের ঘড়ি
—–

আজকাল দূরবীনেও ঝাপসা হয়ে আসে সব সমুদ্র
ও সমুদ্র পথ
গত চার দিন তোমার দ্বীপের কাছাকাছি
কোথাও নিমজ্জিত থাকা হলো।
তবুও এখানে ঘ্রাণ- সমুদ্র তীরবর্তী কোনো এলাচ বাগানের,
বাতাসে দোল খায়- পাতা ও
জলপাই

সূর্যের আলো ঠিকরে আসে জলে;

অনেক দূরে-
শাদা পাথরের ওপর স্নান করছে কিছু নগ্ন সাইরেন
এখন

আর তুমি বসে আছো
পুরনো টেবিলে।

 

যাপন

ঈশ্বরের হাতঘড়ি কেটে গেলে আটকে যায় দিন। বাতাসের জ্বর হয় উষ্ণ সমুদ্রের কাছাকাছি কোথাও। সমুদ্রতটে উড়তে থাকে সিসিলিয়ার চুল, সন্ধ্যার কালো মেঘ ঢুকে পড়ে রুপালী আয়নায়। অনেক দূরে ফুল নয়, ফুটে থাকে কিছু ডেল্ফিনিয়ামের ছায়া। একজন অন্তর্বাস বিক্রেতা; মুদ্রার থলেতে কিছু উপার্জিত ঘ্রাণ পুরে রাখে উদাসীনভাবে। একটা বালক, টিনের বাকশো হারিয়ে প্রকট বিষন্নতায় ভোগে। যে পথ হেঁটে এসেছো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, অন্ধ পাখি হয়ে সে পথে ফিরে যাও। এ পথে একটা প্রাচীন জাহাজ একদিন ছবি হয়ে গিয়েছিলো।

 

বায়োস্কোপ

একটা দুপুর ছিলো। ফাল্গুনের। আকাশে মেঘ ছিলো। কিন্তু বৃষ্টি হবার কোনো সম্ভাবনা ছিলো না। বাতাস ছিলো কি না খেয়াল নেই। আমার পাশে রুনু ছিলো। আমরা দু জনে একটা পথ দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। বায়োস্কোপ দেখতে। পথে পথে অনেক ফুল ফুটে ছিলো। লাল রঙ। আমরা তখন দৌড়াচ্ছিলাম।

ম্যাটিনিতে গিয়ে আমরা চার আনা দিয়ে দুটো টিকিট কিনলাম। সিট পাশাপাশি। জমিয়ে রাখা পয়সার বায়োস্কোপ। হলভর্তি দর্শক। শো শুরু হলো। দেখলাম- একটা পথ। পথে পথে ফুটে আছে ফুল। আমি আর রুনু দৌড়াচ্ছি।

অসুখ

সন্ধ্যা নামলেই বালিহাঁস হওয়ার কথা ছিলো আমার। কিন্তু বসে আছি তটে; হারিয়ে ফেলেছি রেনেলের মানচিত্র। সমুদ্রের কাছাকাছি, একটা ডালে একটা ডাহুক বসে আছে। লাল চোখ নিয়ে। দেখে মনে হয় মাত্র ডুব দিয়ে এলো সমুদ্রের জলে। আর ঠোঁটে করে নিয়ে এলো মাছদের জ্বর। বাতাসে গাছের পাতায় ঝুলছে কতগুলো ঘড়ি- ঘড়িতে লেগে আছে গ্রীষ্মের উষ্ণতা। বেলা দশটার দিকে আজ জলপাই ভর্তি জাহাজটা ছেড়ে গেছে একটা হারানো দ্বীপের খোঁজে। আর দ্বীপটা হারিয়ে গেছে কোনো এক কুমারীর চোখের ভেতর।

 

সন্ধ্যা আসার আগে

 

ফুলকে কেউ স্পর্শ করে না। না আমি-
না কোনো কবিতা। ওদিকেই-
একটি অন্ধ প্রজাপতি উঁচুতে উড়তে উড়তে
আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে যে লাটিম-
তার নাম পৃথিবী।

বিকেলের নরম রোদে ঘর ভরে গেলো। দাঁড়ালেই
বারান্দা প্রাচীন হয়ে যায়। বিছানা ছেড়ে
উঠে এসে দাঁড়াতে পারো-
আদি দিগন্তে চোখ রাখতে পারো;
কে জানে-
তুমি তাকাতেই কোনো কুমারী
তার স্নান ভুলে আলগোছে খুলে দিচ্ছে এখন
বনের দরোজা।

 

পৃথিবী একটি বিচ্ছিন্ন শব্দ

 

বছরের শুষ্কতম দিনটি ফিরে এলো ঠিক সেই
পথে-
যে পথে একদিন হারিয়ে গিয়েছিলো সমুদ্র ও মেঘ। আকাশের দিকে মুখ করে থাকি। কেন- ঠিক জানা নেই। কপাল বেয়ে
নেমে আসে কয়েক ফোটা ঘাম, ঈশ্বরের দান
বলে গ্রহণ করে নিলাম।

তিনটি বিড়ালের ছায়া হেঁটে যাচ্ছে
পাথরের ওপর দিয়ে-
খসে যাচ্ছে চেরী ব্লসমগুলো। ঘরবাড়ি বানাতে ভুল হয়ে যায়।
আরেকটু কোমল করে নি:শ্বাস নিতেই পারো; বাতাসে যেহেতু
এখন উড়ছে চুল। যেহেতু,
অনন্ত শূন্যের দিকে তাকিয়ে- তার পালিত কন্যারা
ফেরা শুরু করে নি এখনও।