Home / শুভ জন্মদিন / ফরিদুর রেজা সাগরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা আহমাদ মাযহার

ফরিদুর রেজা সাগরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা আহমাদ মাযহার

raza-1শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর একজন ব্যতিক্রমি ব্যক্তিসত্তা। আমাদের সাহিত্যের ভুবনে শিশুসাহিত্য চর্চাকে হৃদয়ের সবটুকুকে দিয়ে ভালোবেসেছেন, ছোটদের জন্য লিখেছেন অঙ্গীকারাদ্ধ হয়ে এমন মানুষ খুব বেশি নেই। আমাদের অতীত ইতিহাসে যে-সব ব্যক্তির উজ্জ্বলতা দেখা যায় তাঁদের মধ্যে সাহিত্য ও শিল্পের প্রতিনিধিত্ব বেশি হলেও শিশুসাহিত্য চর্চায় নিবিষ্ট মানুষ বেশি নেই। সেদিক থেকেই তাঁকে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিসত্তা বলা যায়। আরো একটি দিক থেকে সাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর ব্যতিক্রমী মানুষ। তিনি এমন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন ও বিকশিত হয়েছেন যেখানে অর্থনৈতিক উদ্যোগ ছিল সুদূর সাফল্যের স্বপ্ন, তুলনায় সাহিত্যিক ও শৈল্পিক পরিম-লের উজ্জ্বলতা ছিল বাস্তব। মা বাংলাদেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, বাবা ফজলুল হক এদেশে সিনেমা নির্মাণের আগেই সিনেমাপত্রিকা সম্পাদনার পথিকৃৎ ও নানামুখী সৃষ্টিশীল উৎসাহে কম্পমান স্বাপ্নিক এক মানুষ। হয়তো সেই সূত্রেই ব্যক্তি হিশেবে শিশুকাল থেকেই সাহিত্যিক ও উদ্যোক্তাÑএই দ্বৈত সত্তার বিকাশ ফরিদুর রেজা সাগরের জীবনে ঘটেছিল। বর্তমানে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচয়ে দুই সত্তার একটি অপরটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না, বরং একটি হয়ে ওঠে অপরটির পরিপূরক। ফলে অবিকশিত অর্থনৈতিক পরিম-লে সমাজ মানসে কী ধরনের ভাবনা¯্রােতের প্রবাহ চলে তার বাস্তবতা যেমন তিনি অনুভব করতে পারেন তেমনি পারেন বৈশ্বিক উন্নতির চূড়ান্ত অবস্থানের বাস্তবতাকেও অনুভব করতে। এর পটভূমি যদি আমরা সন্ধান করতে চাই তাহলে আমরা দেখব যে, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পরিম-লেই বাংলাদেশের মানুষের ব্যক্তিসত্তা বিকশিত হয়েছে। পাশ্চাত্যে শিল্পবিপ্লবের তুমুল বিস্তারের যুগে তার ঢেউ বাংলাদেশে প্রায় দেখাই যায় না। এমন কথা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে বাঙালির ব্যবসাবুদ্ধি নেই। একথা এখন আর কেউ মানতে চাইবেন না। কারণ স্বাধীনতা-উত্তর কালে অর্থনৈতিক নানা খাতে জাগরণ ঘটেছে। বহু সৃষ্টিশীল মানুষের সম্মিলিত সামর্থ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আমাদের অর্থনীতির এই প্রবল প্রতাপান্বিত জাগরণের অনেক আগেই সমৃদ্ধ ছিল আমাদের সাহিত্য ও লোকায়ত শিল্পকলাসমূহ। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সীমানার মধ্যেও ব্যক্তির অনুভূতিলোক ছিল সজীব। সে-কারণেই সাহিত্যের উজ্জ্বল ঐতিহ্য আমাদের গর্বের বিষয়। অন্যতর জাগতিক সাফল্যকে স্থূল ব্যাপার হিশেবেই বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন এ অবস্থার বদল ঘটেছে। আমাদের সমাজেও দেখা মিলছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চিহ্ন। বুর্জোয়া-সংস্কৃতির প্রভাব সমাজকে এখনও যথেষ্ট পরিশীলিত করে তুলতে না পারলেও এর উত্তাপ আসতে শুরু করেছে। এই পটভূমিতেই ফরিদুর রেজা সাগরের সাহিত্য চর্চার মধ্যে আমরা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ঐতিহ্যানুসারিতা ও বর্তমান কালের বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির সাংস্কৃতিক আবহের এক ভারসাম্যময় প্রতিফলন পাই।
প্রথম দিকে শিশুসাহিত্যের আধুনিক সংযোজন কল্পবিজ্ঞান ছিল তাঁর চর্চার বিষয়–প্রথম বইটিই ছিল ঐ ধারার। পরে মুক্তিযুদ্ধও প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশের কিশোর পাঠকেরা গত শতাব্দীর ঘনাদা-টেনিদা-ফেলুদা বা কাকাবাবুর ধারায় বা ব্যোমকেশ বক্সী-কিরীটি রায়ের ধারায় কোনো চরিত্র পায়নি। ফরিদুর রেজা সাগর গত এক দশক ধরে অন্তত দুটি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন বর্তমান কালের বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে। একটি চরিত্র ‘ছোটকাকু’, অন্যটি ‘সাহেব’। ছোটকাকুর বিচরণক্ষেত্র বাংলাদেশে। কারণ এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক চান বাংলাদেশকে খুঁজে নিতে। ছোটকাকু চরিত্রটির মধ্যে একযোগে পাওয়া যায় দেশপ্রেম ও বুদ্ধির প্রতিভাস। সাহেব চরিত্রটির বিচরণ বাংলাদেশের বাইরে। কিন্তু এই চত্রিটিরও আরব্ধ বাংলাদেশের পক্ষে কোনো-না-কোনো অর্জন। কল্পবিজ্ঞানের জগৎ এই সিরিজের বইগুলোকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।
ফরিদুর রেজা সাগর কিশোর বয়স থেকেই শিশু-কিশোর সংগঠনের নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে নিজের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে চলেছেন। কিশোর বয়সেই অংশগ্রহণ করেছেন একই সঙ্গে চলচ্চিত্র অভিনয় ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নির্মাণে ও নানামুখি অংশগ্রহণে জীবনের প্রথমভাগকে যেমন তিনি সমৃদ্ধ করেছেন তেমনি উত্তরভাগে হয়েছেন বাংলাদেশে স্যাটেলাইট চ্যানেলের পথিকৃৎ উদ্যোক্তা। টেলিভিশন সম্পর্কিত শ্রুতি ও স্মৃতি তাঁর সাহিত্য চর্চায় রেখেছে গভীর চিহ্ন। বর্তমান বইয়ে সে-সবেরও নিদর্শন পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও তাঁর লেখা স্মৃতিমূলক রচনাসমূহ বহু নেপথ্য ঘটনার স্মৃতি ও উপলব্ধিকে পাঠকদের সামনে হাজির করেছে।
ব্যবসায়ের কাজে বা নিছক ভ্রমণের আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যেও তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর সেই ভ্রমণও আর দশজন ভ্রমণকারীর মতো নয়। তাঁর ভ্রমণসাহিত্যে ভিনদেশ সর্বদাই বাংলাদেশের সঙ্গে তুল্য। এর স্বদেশী পাঠকদের তিনি উস্কে দিতে চান উত্তরণের অভিযাত্রায়।
উদ্যোক্তা হিশেবে সাফল্য পেতে হলে মানুষের জীবনকে গভীর ভাবে পাঠ করতে হয়। তিনি সেই গভীর জীবনপাঠের নিদর্শন রেখেছেন তাঁর জার্নালধর্মী সাহিত্যে। আর শিশুর জগতে পরিভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা তো তাঁর জাগরুক থাকে সবসময়ই! বাবার সূত্রে ছোটবেলাতেই সিনেমার বর্ণঢ্যতাকে দেখেছেন। সেই বর্ণাঢ্যতার চিহ্নকেও ধারণ করে আছে তাঁর অনেক গল্প। সহজের সাধনা করে চলেছেন তিনি তাঁর সাহিত্যিক অভিযাত্রায়। তাই সমৃদ্ধির অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ফরিদুর রেজা সাগরের বয়স্কজনপাঠ্য রচনাবলি যেমন কিশোরদের পাঠ্য হিশেবে আনন্দময় তেমনি শিশু-কিশোরোপযেগী রচনাবলি হয়ে ওঠে বয়স্কজনেরও পাঠ্য।
আজ ২২ ফেব্রুয়ারি ফরিদুর রেজা সাগরের জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই!