Home / শুভ জন্মদিন / আজ কথাশিল্পী শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর শুভ জন্মদিন

আজ কথাশিল্পী শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর শুভ জন্মদিন

aliবাংলা কথাসাহিত্যে শওকত আলী এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের রায়গঞ্জে তাঁর জন্ম। পারিবারিকভাবেই বেড়ে উঠেছেন রাজনীতি-সচেতন, সংস্কৃতিমনা পরিবেশে। বাবা সক্রিয়ভাবে কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। মা রাজনীতিতে পুরোমাত্রায় সক্রিয় না থাকলেও ছিলেন রাজনীতি-সচেতন। ছোটবেলা থেকেই সংস্পর্শে এসেছেন বইয়ের।
বর্ণাঢ্য আর সংগ্রামমুখর জীবন তাঁর। উত্তাল সময় আর ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের সাক্ষী তিনি। মাত্র এগারো বছর বয়সে দেখেছেন দেশভাগ। শিকার হয়েছেন নির্মম বাস্তবতার। মাতৃভূমির মাটি, মাটির গন্ধ আর প্রকৃতির নৈকট্য ছেড়ে তাঁকে আসতে হয়েছে নগরে। জন্মস্থান ছেড়ে আসার এই সুতীব্র বেদনা তাঁর রক্তে বপন করেছে সাধারণ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। জাতীয়তাবাদের জাগরণ, জাতিসত্তা আর মাটির মানুষের জন্য সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথে দৃঢ়তার সাথে হেঁটে চলার বাসনা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে রাজনীতিতে। ছাত্রাবস্থায়ই তাই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে। করেন কারাবরণ । জেল গেটে বসেই বিএ থার্ড ইয়ারের পরীক্ষা দেন। মুক্তি পেয়ে পাস করেন বিএ। তারপর বেকারজীবন, অর্থকষ্ট, স্কুলে শিক্ষকতা এবং পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা। একসময় আসেন ঢাকায়। জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন।
কর্মজীবনে একধরনের স্থিরতা এলেও শওকত আলীর মানসিক জগত্ ছিল বিশ্রামহীন। সাধারণ নিপীড়িত জনতার মুক্তি আর সৃষ্টির উন্মাদনায় উন্মাতাল, উত্তাল। শওকত আলী যেমন আপোসহীন ছিলেন তৃণমূল মানুষের মুক্তি ও প্রাপ্তির জায়গায়, তেমনি শিল্পসৃষ্টি লেখনী ও প্রকাশের জায়গায়। তাই তাঁর উপন্যাস-গল্পে যেমন ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে সাধারণ মানুষের শোষণ, নির্যাতন, বঞ্চনা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তেমনি প্রকাশের ঋজুতা, বর্ণনা, ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির ভিন্নতায় তা হয়ে উঠেছে শিল্পোত্তীর্ণ জীবনের ঘনিষ্ঠ পাঠ।
শওকত আলীর উপন্যাস ও গল্পের প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে নিম্নবর্গের মানুষ, তাদের শোষিত জীবনের কথকতা। সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে শওকত আলীর মনের বিদ্রোহ আজীবন। খুব কাছ থেকে তিনি দেখেছেন অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষদের। তাদের দুঃখ-বেদনা, হাহাকার, বঞ্চনার সাথে একাত্ম হতে পেরেছেন। তাঁর গল্পের নিপীড়িত জনতা তাই জ্বালিয়ে দেয় প্রতিরোধের আগুন, খড়ের গাদায় পুড়িয়ে দেয় মহাজনের ঘর, কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব চায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
শওকত আলী জীবনকে দেখেছেন নির্মোহভাবে। তাঁর কলমের দক্ষতায় এঁকেছেন মানুষের জীবনছবি। সে  জীবনছবি আমাদের ইতিহাস, শ্রেণী, শ্রেণীসংগ্রাম আর জীবন-আকাঙ্ক্ষার।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (ফেব্রুয়ারি ১২, ১৯৪৩ – জানুয়ারি ৪, ১৯৯৭) একজন বাংলাদেশী কথাসাহিত্যিক। তিনি একজন স্বল্পপ্রজ লেখক ছিলেন। দুইটি উপন্যাস, গোটা পাঁচেক গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সংকলন এই নিয়ে তাঁর রচনাসম্ভার। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তাঁর রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সুষমা। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র পরেই তিনি সর্বাধিক প্রশংসিত বাংলাদেশী লেখক। প্রাথমিক জীবন

আখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস ১৯৪৩ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোটিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম মঞ্জু। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বগুড়া জেলায়। তাঁর বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭-১৯৫৩) এবং মুসলিম লীগে পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন।[১] তাঁর মায়ের নাম বেগম মরিয়ম ইলিয়াস। আখতারুজ্জামান বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন (১৯৬৪)। কর্মজীবন

আখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াসের কর্মজীবন শুরু হয় জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে। এরপর তিনি মিউজিক কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রাইমারি শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক, ঢাকা কলেজের বাংলার প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনে আখতারুজ্জামান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সুরাইয়া তুতুল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন, গোপনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাঁর লেখা প্রতিশোধ, অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোঁয়ারি, মিলির হাতে স্টেনগান, অপঘাত, জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল, রেইনকোট প্রভৃতি গল্পে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলেও সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে বাকশালে যোগ দেওয়ার চাপ থাকলেও যোগ দেননি। সম্মাননা

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, “কি পশ্চিম বাংলা কি বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক।” লিখেছেন, “ইলিয়াস-এর পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।” ইমদাদুল হক মিলন বলেনঃ “গত ১৫-২০ বছরের মধ্যে তাঁর এ দু’টি উপন্যাসকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।” ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ১৯৯৬ সালে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন। সারা জীবন লড়াই করেছেন ডায়াবেটিস, জন্ডিস-সহ নানাবিধ রোগে। ১৯৯৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা কম্যুনিটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। সাংগঠনিক তৎপরতা উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৭) খোয়াবনামা (১৯৯৬) ছোট গল্প সংকলন

অন্য ঘরে অন্য স্বর (১৯৭৬) খোঁয়ারি (১৯৮২) দুধভাতে উৎপাত (১৯৮৫) দোজখের ওম (১৯৮৯) জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল (১৯৯৭)

ইলিয়াস বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন বাঙলাদেশ লেখক শিবির এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।