Home / শুভ জন্মদিন / শাকুর মজিদ এক মুগ্ধ জাদুকর!!! রেজা ঘটক

শাকুর মজিদ এক মুগ্ধ জাদুকর!!! রেজা ঘটক

 

শাকুর মজিদ এক মুগ্ধ জাদুকর!!!

রেজা ঘটক

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন- শাকুর মজিদের প্রধান পরিচয় কী? আমি কিন্তু জবাব দিতে গিয়ে অনেকটাই গুলিয়ে ফেলব। শাকুর মজিদ নাট্যকার, ভ্রমণকাহিনী লেখক, তথ্যচিত্র নির্মাতা, স্থপতি, শিক্ষক, পর্যটক, আড্ডাবাজ, বন্ধুবৎসলসহ সবমিলিয়ে একজন অমায়িক মানুষ। এতগুলো পরিচয়ের মধ্যে ঠিক কোনটা শাকুর মজিদের ক্ষেত্রে শুরুতে বসাবো, এটা কিন্তু আমার জন্য একটা বড় সমস্যা। আমার অন্তত তাই মনে হয়। আর এই সমস্যার যিনি নাটের গুরু, তিনি স্বয়ং শাকুর মজিদ। আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ শাকুর ভাই।

মাথার স্ক্রু যাদের একটু আলগা থাকে, তারা যে ক্রিয়েটিভ পাগলামীটা করেন, সেই সকল পাগলদের সাথে কেমন করে যেন আমার এক ধরনের সখ্যতা তৈরি হয়। আমি যতদূর ধারণা করতে পারি, সেই সূত্রে শাকুর ভাই’র মাথার স্ক্রু হয়তো খানিকটা আলগা আছে! যে কারণে এত বহুমুখী ক্রিয়েটিভ পাগলামীটা শাকুর ভাই অনায়াসে খুব স্বাচ্ছন্দে করতে পারেন। সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার মাথিউরা গ্রাম থেকে সেই সুদূর চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই শাকুর ভাই’র ওই পাগলামী’র শুরু!

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর শাকুর ভাই’র সেই পাগলামীতে আরো জোয়ার আসে। তখন স্টিল ক্যামেরা নিয়ে তরুণ শাকুর মজিদ গোটা ঢাকা শহর চষে বেড়াতেন। মাঝে মাঝে পত্রিকায় লিখতেন। তারপর সিলেট বেতারে ‘রেডিও নাটক’ লিখে শাকুর ভাই’র পাগলামীতে চূড়ান্ত হাতেখড়ি। নাট্যকার জীবনেরও তখন থেকেই শুরু। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় শাকুর ভাই লিখলেন ‘যে যাহা করোরে বান্দা আপনার লাগিয়া।’

‘লন্ডনী কইন্যা’ নামে একটি টেলিভিশন নাটক লিখে শাকুর ভাই সিলেটে ও লন্ডনে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। এর আগে ছোটবেলায় শাকুর ভাই আড়ালে আবডালে কবিতা চর্চা করতেন। গল্প লিখতেন। এই কবিতা চর্চা করতে গিয়েই মূলত শাকুর ভাই’র ক্রিয়েটিভ শিং গজাতে শুরু করে। তারপরের কাহিনী তো সবার জানা। বুয়েট থেকে স্থাপত্যকলায় পাশ করার পর পেশায় একজন স্থপতি হলেও শাকুর মজিদ লেখালেখি’র জগতে এখন সবার কাছেই একটি পরিচিত নাম।

লেখালেখির পাশাপাশি ক্যামেরার সাথে সখ্যতা হবার পর ভ্রমণপিয়াসু শাকুর ভাই শুরু করলেন তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ। পাশাপাশি বাইরের যেসব দেশ ভ্রমণ করেন, সেসব ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকেই লিখতে শুরু করলেন ভ্রমণ কাহিনী। শাকুর ভাই’র ভ্রমণ কাহিনীতে আমি যে টেস্টটা পাই, সহজ কথায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি ভ্রমণের রঙ্গরসের সাথে শাকুর ভাই এমন কিছু ঘটনার অবতারণা করেন, যা কেবল একজন দক্ষ পর্যটকের দৃষ্টিতে কোনো নগর ইতিহাস লেখার সময় এমনটি হবার কথা।

ইতিহাসের সাথে ভূগোল, স্থাপত্য, সাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনীতি, ঐতিহ্য ও কৃষ্টি, নগরের বৈশিষ্ট্যসহ শাকুর ভাই এমন এক মোহের জগত ভ্রমণ কাহিনীতে তুলে ধরেন, যা পড়ে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে সেই মোহের ঘোর কাটিয়ে ওঠা আমার পক্ষে অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে যায়। তখন সেই ঘোর কাটাতে আমি কৌশল হিসেবে শাকুর ভাই’র সঙ্গে কিছুদিনের জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলি! আমার কেবলই মনে হয়, মানুষটা হয়তো জাদু জানে! জাদুকর না হলে এমন বহুমুখী ঘোর লাগানো কী আদৌ সম্ভব!

মঞ্চের জন্যেও শাকুর ভাই নাটক লিখেছেন। একবার শিল্পকলা একাডেমিতে শাকুর ভাই’র লেখা ‘মহাজনের নাও’নাটকটি দেখার পর ঘোর কাটানোর কৌশল হিসেবে শাকুর ভাইয়ের থেকে আমি নগদ পাঁচশো টাকা আদায় করেছিলাম। যাতে পরবর্তী সময়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সেদিনের ঘোর থেকে অন্তত মুক্তি মেলে! কিন্তু সেই ঘোর থেকে মুক্তি আদৌ মিলেছে কিনা এখনো বলা মুশকিল!

বিদেশে ভ্রমণের সময় শাকুর ভাই ক্যামেরায় স্টিল ছবি তোলার পাশাপাশি ভিডিও করেন। সেই সব ছবি ও ভিডিও থেকে ভ্রমণ কাহিনী লেখার পাশাপাশি নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র। এছাড়া শাকুর ভাই বেশ কিছু ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছেন। বিশেষ করে বাউল শাহ আবদুল করিমের উপর শাকুর ভাই তিন ফরমেটে কাজ করেছেন। বাউল শাহ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শন নিয়ে লিখেছেন মঞ্চনাটক ‘মহাজনের নাও’। ২০০৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ বছরে প্রায় ১০ বার বাউল শাহ আবদুল করিমের মুখোমুখী হয়ে শাকুর ভাই নির্মাণ করেছেন তথ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ’। বাউল শাহ আবদুল করিমের জীবন নিয়ে তথ্যচিত্র বানাতে গিয়ে শাকুর ভাই দীর্ঘ ছয় বছরে যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, সেসব অভিজ্ঞতার আলোকে তারপর লিখেছেন স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘ভাটির পুরুষ-কথা’।

১৯৬৫ সালের ২২ নভেম্বর, সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার মাথিউরা গ্রামে শাকুর মজিদের জন্ম। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা করার পর শাকুর ভাই’র সামনে অনেক সুযোগ ছিল। শাকুর ভাই মেরিন একাডেমিতে চান্স পেয়েছিলেন, মেরিনার হতে পারতেন। এয়ারফোর্সে যাবার সুযোগ ছিল, পাইলট হতে পারতেন। মেডিকেলে চান্স পেয়েছিলেন, ডাক্তার হতে পারতেন। কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শাকুর ভাই অবশ্য ভর্তি পরীক্ষা দেন নাই। শেষপর্যন্ত বুয়েটে ভর্তি হয়ে শাকুর ভাই হলেন স্থপতি। কিন্তু মন থেকে আজও একটা আফছোস তাড়াতে পারেননি শাকুর ভাই। সেটি হলো- শাকুর ভাই’র ধারণা- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়লে হয়তো আরো ভালো করতেন। সেজন্যই শুরুতে বলছিলাম যে, শাকুর ভাই’র স্ক্রু আসলেই একটু ঢিলা আছে। নইলে এমন আফছোস কেন করবেন!

আজ শাকুর ভাই’র ৫২তম জন্মদিন। জন্মদিনে শাকুর ভাইকে বেশি জ্বালানো মনে হয় ঠিক হবে না। শাকুর ভাই’র আরো বিচিত্র কর্মমুখর এক আলোকিত জীবন কামনা করি। আফছোস থাকুক নইলে কাজের প্রতি নেশা চাপে না। শাকুর ভাই’র বিচিত্র কাজের প্রতি এই নেশাটাই আসলে আমার দারুণ ভালো লাগে। ভালো থাকুন শাকুর ভাই। জন্মদিনের অফুরান শুভেচ্ছা।
————————–
২২ নভেম্বর ২০১৭
রেজা ঘটক
কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা