Home / শুভ জন্মদিন / সন্তোষ গুপ্ত : আলোর পথের দিশারী-দীপংকর গৌতম

সন্তোষ গুপ্ত : আলোর পথের দিশারী-দীপংকর গৌতম

jonmoden
সন্তোষ গুপ্ত : আলোর পথের দিশারী
বইনিউজের শ্রদ্ধাঞ্জলি

দীপংকর গৌতম

প্রথিতযশা সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলাম লেখক- অনেক বিশেষণেই তাকে ভূষিত করা যায়। এর বাইরে তার আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় রয়েছে। তিনি কবিতা লিখতেন, পাশাপাশি সাহিত্য এবং চিত্র সমালোচনায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সমকালীন রাজনীতি নিয়ে তার বিশ্লেষণ খুবই গুরুত্ববহ ছিল। ব্যক্তি সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন এ সব কিছুর উর্ধ্বে।
দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের সাংবাদিকতা জীবনে সন্তোষ গুপ্ত বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকে তার বিভিন্ন বিষয়ে লেখা প্রবন্ধ, কলাম ও সমালোচনামূলক নিবন্ধ ছাপা হতো। পাঠক মহলে সমাদৃত ছিল সন্তোষ গুপ্তের লেখা ‘অনিরুদ্ধের কলাম’। দীর্ঘ কর্মজীবনে রাজনীতি, সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও লেখালেখির মাধ্যমে জীবদ্দশাতেই তিনি আপোষহীন এক কীর্তিমান পুরুষ হিসেবে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠান রূপে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্বের অধিকারী। চিত্রকলা থেকে নাট্যকলা, দর্শন থেকে রাজনীতি, লোককথা- সবই ছিল তার নখদর্পণে। খুব কম কথা বলতেন। যা বলতেন তাও ধীর লয়ে। উত্তর দিতেন সোজা-সাপ্টা। এক কথায় বলা যায়, স্বভাবগতভাবেই তিনি ছিলেন উচিত বক্তা। সততা, নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস ছাড়া এটা মোটেও সম্ভব না। তার বিশ্বাস এবং বক্তব্যের মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না। অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। তাই তার প্রকাশটাও ছিল ভিন্ন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি তার আনুগত্য ছিল আকাশছোঁয়া। অনেকেরই জানার কথা নয়, কর্মজীবনের শুরুতে তিনি এক সময় কারাগারের কর্মকর্তা ছিলেন। তখন তিনি তাঁতীবাজার থাকতেন। কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ। এ অবস্থায় গোপনে পার্টির বড় বড় নেতাদের বৈঠক বসলো তার বাসায়। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ যে এই খবর আগেই জেনে গেছে সেটা কেউই বুঝতে পারেননি। বাসায় যথারীতি পুলিশ হানা দিল। অনেকেই পালিয়ে গেলেন। যারা ধরা পড়লেন পরে দেখা গেল তাদের মধ্যে জেল কর্মকর্তা সন্তোষ গুপ্ত নিজেই একজন। এই ঘটনার পর তিনি সরকারি চাকরিচ্যুত হন। এরপরেই তিনি যোগ দেন সাংবাদিকতায়। ‘দৈনিক আজাদ’ থেকে এর শুরু। শেষ ‘দৈনিক সংবাদ’-এ এসে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ‘দৈনিক সংবাদ’-এর সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সন্তোষ গুপ্তের দর্শনভিত্তিক লেখাগুলো পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে ভীষণ সফল হয়েছিল। আপাত অর্থে ১৯৬২ সালে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সরে দাঁড়ানো এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তা সম্পর্কে তার মতামতের নিজস্বতার প্রয়োগ থাকলেও তিনি অকপটে তা বলে গেছেন। তার মতে যেসব দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করেছে তারা সবাই একটি মডেলই ব্যবহার করেছে। তিনি বলেছেন, ক্রশ্চেভের সংশোধনবাদ ও স্ট্যালিনের শ্রম শিবিরের কথা। তিনি বহু লেখন-শিল্পী নির্যাতনের সূত্র ধরে ও অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকট নিয়েই সমাজতান্ত্রিক সমাজের অন্য ইতিহাস লিখেছেন। আবার তারই গ্রন্থ ‘স্মৃতি-বিস্মৃতির অতলে’ পড়তে গিয়ে আমরা দেখি বাংলাদেশের রাজনীতির কট্টর সমালোচনা। সেখানে প্রধান কোনো রাজনৈতিক দলই বাদ পড়েনি। তার ‘অনিরুদ্ধ’ কলামের সঙ্গেও অনেকের দ্বি-মত রয়েছে। কিন্তু তার যুক্তিকে ফেলে দেবার পথ নেই। সন্তোষ গুপ্তের লেখায় যুক্তিবাদ যেমন প্রখর ছিল তেমনি তথ্যেরও ছিল ব্যাপকতা। তার লেখ্য শৈলির গতিশীলতা পাঠককে বিমোহিত করতো। যে কারণে স্যাটেলাইটের যুগেও অনিরুদ্ধকে কেউ ভুলেনি, ভুলবে না।

ব্যক্তিগত জীবনে সৎ, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও বাম মতাদর্শের প্রতি অবিচল আস্থাশীল এই মনীষী সব সময়ই বলতেন, আমি একজন সাচ্চা মার্কসবাদী বলেই কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচনা করতে দ্বিধা করিনি। কারোরই দ্বিধা করা উচিত নয়। তাতে পার্টির ক্ষতি হয়। জীবনে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজন্যকুলের ছত্রছায়া ও কোনো প্রকার সুবিধা গ্রহণের তিনি ছিলেন বিরোধী।
সদ্য প্রয়াত দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম এক স্মৃতিচারনায় ঘনিষ্ট বন্ধু সন্তোষ গুপ্ত সম্পর্কে বলেছেন, ‘সন্তোষের মতো এমন স্মৃতি শক্তিপূর্ণ সাংবাদিক, কবি এবং লেখক আমাদের সাহিত্য জগতে আর কেউ আছেন বলে আমি ভাবতে পারিনে। আমরা দু’জনই যে বরিশাইল্যা তা আমি আগে জানতাম না। ১৯৪৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর আমি ছিলাম ঢাকার চালাক চরে। সেকথা জানতো কেবল যে জানার সে। হমিওপ্যাথিক ডোজের খামে চিরকূট গেল, এই লোকের সঙ্গে চলে আসবেন। বলা হলো- না, দিনে নয় রাতে। … ২৫ ডিসেম্বর রাতে যাদের নাম বলেছি (জ্ঞান চক্রবর্তী, মনু মিয়া, বারি সাহেব, অনিল মুখার্জি, কালিপদ চক্রবর্তী প্রমুখ) তারা তো রয়েছেনই কিন্তু আসল নাটের গুরু সেই ছিপছিপে লম্বা-পাতলা লোকটি। পরে বেরুল লোকটির নাম সন্তোষ গুপ্ত।’

সন্তোষ গুপ্ত ১৯২৫ সালের ৯ জানুয়ারি বরিশালের ঝালকাঠি জেলার রুনসী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলেবেলায় মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে বাবা ও কাকাকে হারান। ছেলেবেলা থেকেই তার যে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা অটুট ছিল। তার শৈশবের একটি ঘটনা এখনও সবাইকে বিস্মিত করে। তিনি একনাগাড়ে রবীন্দ্রনাথের ৪৪টা কবিতা মুখস্থ বলে তার শিক্ষক মহেন্দ্রবাবুকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। শিক্ষক সন্তোষ গুপ্তের আশ্চর্য মেধাশক্তি দেখে ‘সঞ্চয়িতা’ ও ‘চয়নিকা’ বই দুটি উপহার দিয়েছিলেন। শৈশবে তার সেই পড়াশুনার ভিত্তি তাকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পুরোধা ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে।

১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে আইজি প্রিজন অফিসে সন্তোষ গুপ্ত কর্মজীবন শুরু করেন। দেশ ভাগের পরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কারা বিভাগের আইজির অফিসে তার পোস্টিং হয়। ১৯৭১ সালে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫-এর ১৫ অগাস্টের ঘটনার পর এবং সে বছর ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনায় তিনি অশুভ শক্তির প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে সেই প্রতিকূল সময়ে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। বামপন্থীরা স্ব-উদ্যোগে এগিয়ে আসবেন কামনা করেছিলেন তিনি। এ প্রশ্নে বামপন্থীদের সংকীর্ণতা দেখে পরে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাই বলে যৌবনের ক্ষুরধার যে বিশ্বাস নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন, সেই বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হননি কোনো দিন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তাকে সব্যসাচী লেখক হিসেবে পরিচিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু, পিকাসো, জয়নুল, অমিয় চক্রবর্তী, শামসুর রাহমানসহ সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র সবই ছিল তার লেখার বিষয়। কবিতা, শিল্পকলা, চিত্রকলা, রাজনীতি, সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ১৪টি বই লিখেছেন। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে আবদান রাখার জন্য একুশে পদক, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, জহুর হোসেন স্মৃতি পদকসহ বিভিন্ন সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন। ২০০৪ সালের ৬ আগস্ট ৮০ বছর বয়সে এই মহান কর্মবীর মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তার বিশ্বাস এবং আদর্শের মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল তার কর্মের মধ্যে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক।