Home / শুভ জন্মদিন / আমাদের আউলা-ঝাউলা সময় আর আবুল হাসান পাঠ!!! রবীন আহসান

আমাদের আউলা-ঝাউলা সময় আর আবুল হাসান পাঠ!!! রবীন আহসান

robin-ahsanআমাদের আউলা-ঝাউলা সময় আর আবুল হাসান পাঠ!!!
রবীন আহসান

কবি আবুল হাসান-এর নাম আবুল হাসান ছিলনা ! ছিল আবুল হোসেন এই বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী সম্পাদক !!! খ্যাতিমান কবি আহসান হাবীব এই তরুণ কবির নাম বদলে দেন ! তখন আবুল হোসেন নামে আরো একজন বিখ্যাত কবি ছিলো। আবুল হাসানের নাম বদলের মতো আমাদেরও অনেকের নাম বদলে যায় !! যদিও আমাদের নাম বদলে কবি আহসান হাবীর-এর মত সাহিত্য সম্পদকের ভূমিকা ছিল না। আমি তখন ১৯৮৭ বরিশাল বিএম স্কুলে পড়ি ছড়ালিখি বরিশালের স্থানিয় পত্রিকাসহ ঢাকার পত্রিকায়। বিকেলে যাদের সাথে আড্ডামারি তারা সবাই বয়সে বড় !! তারা কবি তারা গায়ক তারা লিটলম্যাগ সম্পাদক তারা বইবিক্রেতা তারা প্রভাষক। আমাদের সেই আড্ডার প্রধানের নাম স্বপন হালদার!! আমার নাম ছিল কামরুল আহসান রবীন । স্বপন হালদার এখন হেনরী স্বপন!
সেই আড্ডার প্রায় সবাই এখন বাপ মায়ের নাম ওলট-পালটকরে পরিচিত হয়েছে!!

বরিশাল শহরে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চলছে । কেউ কবিতায় কেউ ছড়ায় কেউ গানে
আমরাও রাস্তায় থাকছি। লিখছি ছড়া পড়ছি কবিতা !! আমার বাপের লোহালক্করের ব্যবসা ছিল।বাপ চাইতো আমি ব্যবসায়ী হই !! আমি তখন ছড়ালিখি ছবি আঁকি পুরস্কার পাই । বড়দের সাথে আড্ডাতেই !! আমার আর স্বপনদা’র বাই সাইকেল ছিল ! বরিশাল শহরে তখন বরিশাল মেকিলে কলেজ কেন্দ্রীক একটা সাহিত্য চক্র ছিল। সব ভালো ভালো কবিতার বই পাওয়া যেত সেই মেডিকেল কলেজের সামনে। সেই বয়ের দোকান ছিল কবি অরূপ তালুকদার-এর। সদর রোডের বইয়ের দোকানে আবুল হাসান-এর বই খুজঁতে আমরা গেলাম সেই মিডিকেল কলেজের সমনের বইয়ে দোকানে। সম্ভবত কাজী হাসান হাবীব এর প্রচ্ছদে (নাসাস) ইফতেখার রসুল জর্জ প্রকাশক প্রকাশ করে ছিলেন আবুল হাসান-এর কবিতার বই ‘যে তুমি হরণ কর’, ‘রাজা যায় রাজা আসে, ‘পৃথক পাল্ঙক’। এক কবির ৩ বই এক সাথে কেনার স্মৃতি এখনও ভুলি নাই!
আমরা তখন পড়ি জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, হুমায়ুন কবির, রফিক আজাদ ,   ফরহাদ মযহার, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, নাজিম হিকমাত, জয় গোস্বামীর কবিতা। স্বপনদার সেই আড্ডা খানায় আবৃত্তির ক্যাসেট বাজত কামরুল হাসান মঞ্জুর!

মাত্র ২৬ বছর বয়সে ৩ কবিতার বইলিখে আমাদের জীবন আউলা-ঝাউলা করে দেয় যে- তিনি কবি আবুল হাসান!! আবুল হাসানের কবিতা পড়ার পর আমার যে টুকু কবিতা লেখার ইচ্ছে ছিল তাও বন্ধ হয়ে যায়!! আবুল হাসানের প্রতিটি কবিতা মনে হয় আমার লেখা !!! আবুল হাসান পাঠের বড় সমস্যা নিজেকে মনে হয় ‍’আমিই আবুল হাসান!! আবুল হাসানের ‘যে তুমি হরণ কর,’ রাজা যায় রাজা আসে, পৃথক পালঙ্ক -বইয়ের পর আমি ক্যান কবিতা লিখতে যাবো এই প্রশ্ন নিজেকে করতে করতেই ১৬+২৪ বছর কাটল!!

আবুল হাসান তাঁর সময়কে ধারণ করেছিল মাত্র ৩ বইয়ের পাতায়। তাঁর সময়তো অনেক বড় বড় ইতিহেসের সাক্ষি। মার্কিন -সোভিয়েত ঠাণ্ডা যুদ্ধ!! ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৬৯-এর গণঅভূত্থ্যান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ-১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ কলকাতায় চারু মজুমদার আর বাংলাদেশে সিরাজ সিকদার বাহিনীর ওপর নির্যাতন হত্যা, হত্যার উৎসব এসবই আবুল হাসান-এর কবিতা। হাসান শ্লোগানের কবি নয় হাসান বালিকা পটান কবি নয় তাই তাঁর মৃত্যুর ৪০ বছর পরও আবুল হাসানের কবিতা একই ভাবে পাঠককে ভাবায়!

প্রকাশক হয়ে একটা কথা বলি এই যে প্রতি বইমেলায় কবিতার বই প্রকাশকরে সমাজে কবি হতে চান যারা তারা একটু দয়াকরে আবুল হাসানের রচনাসংগ্রহের দুই মালাটে ঘুড়ে আসুন!! আমি এখনও আবুল হাসানের দুই মলাটে ঘুড়ি!! আমার আর নিজের কবিতা লেখা হয় না!! মনে হয় আমিই আবুল হাসান…

শুভ জন্মদিন । আপনি আছেন আমাদের মাঝে আর আপনার কবিতাতো আছেই আমাদের নিত্যসঙ্গি হয়ে। আবুল হাসানের একটা কবিতা আমার খুব প্রিয় সেই কতিার কয়েকটা লাইন দিয়ে এই লেখা শেষ করবো।

…রক্তে স্রোত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে, শব্দ হয়, শুনি
কিন্তু আমি রক্তের কী মাতৃভাষা এখনও জানিনা !
বেদনার কী মাতৃভাষা এখনো জানিনা !

শুধু আমি জানি আমি একটি মানুষ,
আর পৃথিবীতে এখনও আমার মাতৃভাষা, ক্ষুধা !