Home / সবিশেষ / স্মৃতি কথার ভিড়ে কবি রফিক আজাদই আমার প্রিয়-রবীন আহসান

স্মৃতি কথার ভিড়ে কবি রফিক আজাদই আমার প্রিয়-রবীন আহসান

16রবীন আহসান
রফিক আজাদের কবিতার সাথে পরিচয় প্রথমে বই নয় ক্যাসেটে কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। আমি তখনো স্কুলে পড়ি। কামরুল হাসান মঞ্জু’র কণ্ঠে ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটি আমি প্রথম শুনি। কবি রফিক আজাদ বলতে যা বোঝায় আমার কাছে তার পুরোটাই ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতা। তখনো এই কবিতার শব্দ, উপমা এবং ঝংকারের সাথে খুব একটা সম্পৃক্ত হতে পারিনি কারণ তখনকার বয়স, শব্দভান্ডার এবং ইতিহাস ছিল আমার অজানা। কিন্তু পরবর্তীতে বাবা-মায়ের কাছে অনেক গল্প শুনেছি চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের। সদ্য স্বাধীন একটা দেশে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ তখনকার মধ্যবিত্ত সমাজকেও না খাইয়ে রেখেছিল অন্তঃত দুবেলা। অনেকেই তখন ভাতের বদলে একবেলা রুটি খেতেন। লবনের দর চড়া, অনেক নিম্নবিত্ত পরিবার ভাতের মাড় খেয়ে তখন বেঁচে ছিলেন। এসব এখন গল্পের মতো শোনালেও সেই সময়টিকে নিয়ে লেখা রফিক আজাদের অমর কবিতা ‘ভাত দে হারামজাদা, তা নাহলে মানচিত্র খাবো’, এই শব্দের ঝংকারে সেই সময়ের একটি রাষ্ট্রের জনগণের স্বপ্নভঙ্গের সব কথাই ফুঁটে উঠেছিল অবলীলায়।
ঢাকায় আমার সাথে যখন রফিক ভাইয়ের পরিচয় হয় তখন ভয়ে ভয়ে তার সাথে কথা বলি। রফিক আজাদ শুধু একজন কবিই নন, ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধাও। মুক্তিযোদ্ধা এবং কবি, এই দুয়ের সমন্বয়েই রফিক আজাদের কবিতা ‘ভাত দে হারামজাদা’। রফিক আজাদ মূলত তার মানচিত্রের সবগুলো রেখা চেনেন। তার প্রতিদিনকার জীবনযাপন, সংগ্রাম, বেড়ে ওঠা। প্রেম, বেদনা, কান্না এসব এক করেই রফিক আজাদের কবিতা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মানচিত্রের এক একটি রেখা।
ব্যক্তিগতভাবে রফিক ভাইয়ের সাথে যখন পরিচয় হয় তখনো আমি তার সাথে খুব একটা খোলামেলা কথাবার্তা বলতাম না। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এই মানুষটিকে দূর থেকেই চেনার চেষ্টা করেছি। ভেতরে অনেক রাগী এই মানুষটি যখন কারো সাথে আড্ডা দিতেন, তখন বোঝাই যেতো না যে এ আসলে কোন রফিক আজাদ।
২০০৭ সালে ‘আজিজ মার্কেট’ নামে একটি নাটক একুশে টেলিভিশনে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। সেই সময় ঐ নাটকের নাট্যকার একদিন শ্রাবণে এসে বলেন যে শ্রাবণও আজিজ মার্কেটের একটি ইতিহাস, তাই শ্রাবণে শ্যুটিং করতে চাই। সেই নাট্যকারকে প্রথমে শ্রাবণে শুটিং করতে না দেয়ায় তিনি কবি রফিক আজাদকে ধরে নিয়ে আসেন। আমার মনে আছে রফিক ভাই তিনি ছিলেন একটা লাল ফতুয়া পরিহিত। রফিক ভাই এসে আমাকে বলেন, ‘তোর দোকানে শ্যুটিং করবো। আমার লগে তুইও অভিনয় করবি। তারপর আমি সাকুরায়…। রফিক ভাইকে যেহেতু না করা যায়নি তাই ঠিক হলো আমি প্রকাশক আর রফিক ভাই তার লেখক পরিচয়েই শ্যুটিং করবেন নাটকে।
কিন্তু গোল বাঁধলো সংলাপে এসে। নাটকের সংলাপ ছিলো এরকম যে, রফিক ভাইয়ের একটি কবিতার বই আমার প্রকাশনী থেকে ছাপা হয়েছে, কিন্তু সেটা ভুল বানানে একেবারে ঠাঁসা। এজন্য রফিক ভাই আমাকে বকাঝকা করবেন। নাটকের এই অংশে এসে মাই বেঁকে বসলাম। রফিক ভাইকে বললাম, আপনি যেহেতু একজন প্রকৃত কবি এবং আমি যেহেতু একজন প্রকৃত প্রকাশক তাই এরকম চরিত্রে অভিনয় করা আমার পক্ষে সম্ভব না। সংলাপ বদলাতে হবে।
রফিক ভাইকে আমি বললাম, সংলাপ হবে, আপনি বইয়ের প্রুফ দেখেছেন, সেখানে বানান ভুল ছিল। বানান-টানান ঠিক করে সেটা আগামীতে আবার ছাপা হবে। এরপর আমরা দুজনেই সেই নাটকে লেখক-প্রকাশক হিসেবে অভিনয় করি। প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর রফিক ভাই হাসতে হাসতে সাকুরায় যাওয়ার সময় আমাকে বললেন, ‘সাকুরায় চল। আজ তুইও আমার সাথে খাবি’। আমি বললাম, ‘না রফিক ভাই, আমি ওসব খাই না’।
এরপর রফিক ভাইয়ের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়ে রফিক ভাই গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর। ২০০৯ সালে রফিক ভাই গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০৭-২০০৯ এই তিন বছরে আমি পরপর তিনবার জার্মান সরকারের আমন্ত্রনে ফ্রাঙ্কফুর্ট ঘুরে আসি। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ফেরার পরে সে বছর ঢাকা বইমেলায় আমাকে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক কমিটিতে রাখা হয়। আমার দায়িত্ব ছিল ঢাকা বইমেলাকে গণমাধ্যম ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া। সেজন্য রফিক ভাইয়ের সাথে আমার প্রায়ই মিটিং হতো। সেসব মিটিংয়ে অনেক বিষয় নিয়ে রফিক ভাইয়ের সাথে হাসাহাসি চলতো। যেমন গ্রন্থকেন্দ্রের ওয়েবসাইট না থাকা, মেইল অ্যাড্রেস না থাকা, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট না থাকা ইত্যাদি।
একবার এরকম একটি মিটিংয়ে রফিক ভাইকে আমি প্রশ্ন করি, এতসব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও আপনি কীভাবে কাজ করেন? রফিক ভাই আমাকে বললেন, আমার অফিসের কারো সহায়তা নেয়া তোর দরকার নেই। তোর যা ইচ্ছা তাই কর। সেবারের ঢাকা বইমেলায় আমি তিনটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক এবং একটি অনুষ্ঠানের আলোচক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। মেলা চলাকালীন আমাকে উপস্থাপক করায় একজন খ্যাতিমান লেখকের সাথে রফিক ভাইয়ের তর্কাতর্কিও হয়েছিল। রফিক ভাই তার পরেও অনুষ্ঠানের তালিকা থেকে আমার নাম সরাননি। সেসময় ঢাকা বইমেলা নিয়ে আমি দৈনিক সমকালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সমালোচনা করে একটি কলাম লিখি। সেই লেখা পড়ে গ্রন্থকেন্দ্রের কোনো কোনো কর্মকর্তারা আমার উপর দারুন চটেছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন গিয়ে রফিক ভাইয়ের কাছে আমার নামে বলতে গেলে রফিক ভাই গ্রন্থকেন্দ্রের এক কর্মকর্তাকে বললেন, ‘রবীন কী গ্রন্থকেন্দ্রের চাকর যে গ্রন্থকেন্দ্রেরে ফুলাইয়া লেখবে। ও যা লিখছে লেখুক। সমালোচনা ভালো না লাগলে চুপচাপ থাকো।
সেবছর গ্রন্থকেন্দ্রের বইমেলাটা অন্য অনেক সময়ের চেয়ে ভালো ছিল, রফিক আজাদের সাংগঠনিক যোগ্যতা ও স্বতস্ফুর্ততার কারণেই এটি সম্ভব ছিল। আমাদের দেশে মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের তেল দেয়া লেখক-সাংবাদিক এরাই সবচেয়ে বেশী জায়গা দখল করে রাখে, প্রকৃত কবি-লেখকেরা সচরাচর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কিছুই পান না। কিন্তু রফিক ভাইয়ের সময়ে গ্রন্থকেন্দ্রের ভূমিকা ছিল একেবারেই অন্যরকম।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র প্রতিষ্ঠানটিকে আমি চিনি বহু বছর ধরে। এই প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালককে আমি একবার দরজা বন্ধ করে রেখেছিলাম অনেকক্ষন, আরেকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে করেছিলাম সংবাদ সম্মেলন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আমার যেমন কর্মকান্ড ছিল তেমনি আহমদ মুসা এবং রফিক আজাদের মতো সাংগঠনিক, দক্ষ পরিচালকদের সাথে এই গ্রন্থকেন্দ্রেই বাংলাদেশের বই নিয়ে নানা কর্মসূচীতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইতিহাসও রয়েছে। বই বিষয়ক নানা আন্দোলন সংগ্রামে আমি যখনই ঝাঁপিয়ে পড়েছি তখনই আমার পাশে অনেক খ্যাতিমান লেখকেরা এসে দাড়িয়েছেন। এরকম আন্দোলন-সংগ্রামের যিনি সবসময় একজন বন্ধুর মতো আমার পাশে থাকতেন, আমার বাবার চেয়েও যার বয়স দশবছর বেশী, সেই কবি রফিক আজাদ।
এইতো কিছুদিন আগেও কোন একটি আন্দোলনের সময় এক সন্ধ্যায় রফিক ভাইকে আমি ফোন করি। ফোনে বললাম, ‘… হে উৎসবের বিরুদ্ধে আমরা প্রেসক্লাবে দাঁড়াতে চাই। আপনি কী আমাদের সাথে থাকবেন? রফিক ভাই বললেন, ‘… সকালে আমারে বাসা থিকা নিয়া আসিস’। অসুস্থ রফিক আজাদ সেই সকালে এসে মাইকে দুর্দান্ত এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন, আমি ছিলাম তার পাশে।
গ্রন্থকেন্দ্রে কোন এক বছর আমার প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার বই তালিকায় নির্বাচিত হলো। কিন্তু প্রথমে আমি এই বই জমা দিইনি। একদিন রফিক ভাই আমাকে ফোন করে বললো, ‘কীরে বইপত্র বেচবি না’। আমি বললাম, ‘বেচুম তো’। এরপরেই আমাকে দিলেন এক ধমক, মনে আছে তার ধমক খেয়ে সেবার সাতদিনের মধ্যে আমি গ্রন্থকেন্দ্রে বই জমা দিয়েছিলাম।
অনেকদিন পরে গ্রন্থকেন্দ্রে আমি সেই বইয়ের চেক আনতে যাই। রফিক ভাই তখন বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গুরুতরভাবে আহত। তার মাথার আঘাতটাও তখনকারই। রফিক ভাই হসপিটাল-বাসা করেই সময় কাটান, অফিসে আসেন না। তো সেদিন গ্রন্থকেন্দ্রে রফিক ভাইয়ের রুমে যাওয়ার পর তার একান্ত সহকারী আমাকে বললেন, ‘স্যার কখন আসে কখন যায় তার ঠিক নাই। আজকে নাও আসতে পারেন’। তার মুখে একথা শোনার পর আমি রফিক ভাইকে ফোন দিলাম। তার শরীর-স্বাস্থ্যের খবর নেয়ার পর বললাম আজকে কী আসবেন? রফিক ভাই বললেন, ‘দুপুরের পরে আসতে পারি, শরীর খারাপ। তোর কী চেকটা জরুরি? তাহলে তিনটার পরে আয়’। আমি আর গ্রন্থকেন্দ্র থেকে নড়লাম না, সেখানেই বসে রইলাম। অসুস্থ কবি রফিক আজাদ আমার চেকটি দেয়ার জন্যই বেলা তিনটায় গ্রন্থকেন্দ্রে আসলেন।
সেই যে অসুস্থ রফিক আজাদ, সেই যে বাথরুমে পা পিছলে পড়া, সেই যে মাথায় আঘাত পাওয়া আর সুস্থ হয়ে উঠলেন না টগবগে রফিক আজাদের মতো। যার হাতে পিতলের ব্রেসলেট, ঝাঁকড়া চুল, লাল রঙা গেঞ্জি, পুরুষ্ট গোঁফ আর অসম্ভব সাহসী মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদ ফিরলেন না। শেষবার ছেলেমেয়ের সাথে কানাডায় বেড়িয়ে আসার পরে ৫৮ দিন জীবন যুদ্ধের সাথে পরাজিত হয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু প্রকৃত কবি বেঁচে থাকেন তার কবিতায়, আমাদের শত সহস্র স্মৃতিচারণের বাইরেও রফিক আজাদ বেঁচে থাকবেন মূলত তার সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর মাঝে। আমরা হয়তো কেউ কেউ রফিক ভাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করবো, একসময় হয়তো আমরাও আর থাকবো না কিন্তু এই স্মৃতিচারনের বাইরেরও ঠিকই থাকবেন রফিক আজাদ, থাকবে তার অমর কবিতা গুলো।