Home / সবিশেষ / এক স্বপ্নবাজ, আড্ডাবাজ বন্ধুকে হারিয়ে… I রবীন আহসান

এক স্বপ্নবাজ, আড্ডাবাজ বন্ধুকে হারিয়ে… I রবীন আহসান

diponএক স্বপ্নবাজ, আড্ডাবাজ বন্ধুকে হারিয়ে…

 

রবীন আহসান

মুক্তবুদ্ধির চর্চায় আঘাত বাংলাদেশের জন্য কোন নতুন ঘটনা নয়। তবুও একই দিনে, একই সময়ে দুজন তরুণ প্রকাশক, আহেমদূর রশীদ টুটুলকে ও তার সাথে থাকা  দুই লেখক রণদীপম বসু এবং তারেক রহিমকে হত্যার চেষ্টা এবং ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যার মতো এতো বড় ঘটনা এই প্রথম। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার বই প্রকাশের অপরাধে জবাই করে প্রকাশক হত্যার ঘটনাও এই প্রথম। যার শিকার আমাদের প্রকাশক বন্ধু দীপন। প্রায় দুই দশক আগে আজিজ সুপার মার্কেটে আমার আগমন। সেই সময় থেকে আমার সাথে নানাভাবে যারা সঙ্গ দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দীপন ভাই। শুধু সঙ্গই নয় বইমেলা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ নানান বিষয়ে আমাদের আড্ডার নিয়মিত অংশীদারও  ছিলেন তিনি। সেই আড্ডায় নানান ইস্যুতে আমাদের মধ্যে কখনো তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, কখনো কখনো বই প্রকাশনাসহ সাংগঠনিক নানান ইস্যু নিয়ে আমাদের মাঝে ঝগড়াঝাটিও হয়েছে। কিন্তু কখনোই মনে হয়নি এভাবে না জানিয়ে হঠাৎ করে এক দুপর বেলায় আততায়ী খুনীদের হাতে প্রাণ যাবে সদা হাস্যোজ্জল এই মানুষটির।
আজিজ সুপার মার্কেটে আমরা তিন প্রকাশক (অনেকে তিন পাগলও বলে থাকেন) প্রকাশনাকে শুধুমাত্র বাণিজ্যিকভাবেই চিন্তা করিনি। এই তিনজনের মধ্যে আমি ছাড়াও ছিল পড়ুয়া’র কাজল ভাই এবং জাগৃতি’ প্রকাশনীর দীপন ভাই। আমরা তিনজনে মিলে বিভিন্ন ধরণের বইমেলা করেছি এবং সেসব বইমেলা থেকে আমরা কখনোই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হইনি। কিন্তু বইমেলার সেই পাগলামি আমাদের মাথা থেকে নামেনি কখনোই। ২০০১ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত ঢাকা বইমেলায় আমরা তিনজনে মিলে বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথম একটি প্যাভিলিয়ন নিয়েছিলাম। তখনো পর্যন্ত আমরা জানিই না প্যাভিলিয়ন মানে কী?  প্রায় ২০ হাজার টাকা ভাড়া দেয়ার পর পুরাতন বিমানবন্দর মাঠের এক কোণায় ফিতা দিয়ে কয়েক ফিট জায়গা মেপে দেয়া হয়। তারপর সেই মাঠে পড়ুয়া, জাগৃতি এবং শ্রাবণ প্রকাশনীর তিন প্রকাশক মিলে আমরা একটি প্যাভিলিয়ন বানাই। সেই বইমেলায় প্যাভিলিয়ন বানানোর জন্য আমরা তিনজনেই রাতভর কাজ করেছিলাম। দীপন ভাইয়ের ঘর-সংসার থাকলেও আমার আর কাজল ভাইয়ের সেসব ছিলনা বলে আমাদের কাছে অবাকই লাগতো দীপন ভাইয়ের আচরণ। সে বউ-বাচ্চাদের রেখে আমাদের মতো বইপাগলদের! সাথেই সময় কাটাতেন। সেবছর ছিল প্রচন্ড শীত। প্রবল ঠাণ্ডা এবং গ্রন্থকেন্দ্রের অব্যবস্থাপনার জন্য ক্রেতাশূণ্য সেই বইমেলায় ১৫ দিনে আমাদের মোট বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১৬০০ টাকা।
শুধু তাই নয় একুশের বইমেলায়ও আমরা দুজন একসাথে কাজ করেছি। একসময় একুশের বইমেলাতে প্রায় একই বই সকল স্টলে বিক্রি হতো। আমিই প্রথম এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলি যে বাংলা একাডেমির নীতিমালা অনুযায়ী যার যার প্রকাশিত বই তাকেই বিক্রি করতে হবে। এই ব্যবস্থাকে আইনগতভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য যে আন্দোলন গড়ে তুলি সেই আন্দোলনেও আমার সাথে এগিয়ে আসে ফয়সল আরেফিন দীপন। এখনকার বাংলা একাডেমির বইমেলায় একেকটি প্রকাশনী তার নিজের প্রকাশিত বই নিয়ে পরিচিত হচ্ছে, এর মানে হচ্ছে প্রকাশক এবং প্রকাশনা সংস্থার মানগুলো সম্পর্কে পাঠক গত ১০ বছর ধরে জানতে পারছে এবং বাংলাদেশী প্রকাশনা সংস্থাগুলোও তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরতে পারছে পাঠকদের কাছে। এর ফলে বাংলাদেশের শুধুমাত্র হাতেগোনা কয়েকজন জনপ্রিয় লেখকদের বই যেভাবে সারা বইমেলা জুড়ে থাকতো সেটি বন্ধ হয়েছিল।
২০০৯ সালে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতিতে দীপন ভাই ছিল পাঠাগার উন্নয়ন সম্পাদক এবং আমি ছিলাম প্রচার প্রকাশনা সম্পাদক। নিজেরদের প্রকাশনার পাশাপাশি আমরা সবসময়েই চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের সবাইকে নিয়েই কাজ করার। ওই সংগঠনের নেতাদের সাথে কিছুদিনের মধ্যেই আমার মতবিরোধ দেখা দেয়। তারপর সেই নেতারা নানা টালবাহানা করে এক পর্যায়ে আমার সদস্যপদও বাতিল করে দেয়। এর দুবছর পরে দীপন ভাই ওই সংগঠনের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক) নির্বাচিত হন। তিনি নানাভাবে ওই সংগঠনে আমাদের একসাথে কাজ করার চেষ্টা করলেও একটা পর্যায়ে এসে আমরা দুজনেই ওই সংগঠনে কাজ করতে পারিনি। কিন্তু তারপরেও আমরা থেমে থাকিনি, পরবর্তীতে আমরা বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির শাহবাগ শাখার ব্যানারে হেমন্তের বইমেলা থেকে শুরু করে আরো অনেক কাজকর্ম করেছি।
২০১৩ সালে বাংলা একাডেমিতে অগ্নিকান্ডে যেসব প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল সেসব ক্ষতিগ্রস্থ প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণ আদায়ে যে আন্দোলন তখন বাংলা একাডেমিতে গড়ে উঠেছিল সেই আন্দোলনে আমিসহ ফয়সল আরেফিন দীপন, খান মাহবুব এবং আলমগীর শিকদার লোটন ছিলেন প্রধান সারির নেতা। আমাদের আন্দোলনের ফলে তখন বাংলা একাডেমি বাধ্য হয়েছিল ক্ষতিগ্রস্থ প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণ দিতে।
২০১৩ সালে আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর শোরুমে আমরা ঈদ বইমেলার আয়োজন করেছিলাম। ঈদের সময় আজিজ সুপার মার্কেটে কাপড়-চোপড় কিনতে আসা ক্রেতারা ঈদ উপলক্ষ্যে বইও কিনেছিল অনেক। আমরা মনে করেছিলাম প্রতিবছর এরকম ঈদ বইমেলার আয়োজন করতে পারলে ঈদের সময় প্রকাশকদের কিছু আর্থিক সুবিধা হবে, কিন্তু সেই উদ্যোগও অল্পদিনের মধ্যেই বিভিন্ন চক্রান্তের কারণে বন্ধ হয়ে যায়।
এবছরের বইমেলায় অভিজিৎ রায়কে হত্যা করার পর দীপন ভাইয়ের উপরও নেমে আসে একের পর হুমকির খড়গ। হুমকিদাতারা সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকে ও মোবাইলে গত আট মাস পর্যন্ত একাধিকবার হুমকির পর শেষ পর্যন্ত ৩১ নভেম্বর তাকে নিজ কার্যালয়ে চাপাতি দিয়ে কুঁপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেদিন দুপুরবেলা আক্রমণের ঘটনা আমি প্রথম শুনি সাংবাদিক রাজীব নূরের কাছে। রাজীব ভাই আমাকে বলেন,লালমাটিয়ায় শুদ্ধ্বস্বরের প্রকাশক টুটুল এবং তার দুই বন্ধু রণদীপম বসু ও তারেক রহিমকে কোপানো হয়েছে। এই খবর শোনার সাথে সাথে আমি আজিজ মার্কেটের তিন তলায়, আমার অফিসের ঠিক উপরে জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে তাকে খুঁজতে যাই। তার অফিস তালাবন্ধ দেখে তাকে বেশ কয়েকবার ফোনও করি, কিন্তু বারবার রিং হলেও দীপন ভাই ফোন ধরেননি। আমি তখনো পর্যন্ত ভাবতেই পারিনি যে দীপন ভাইকে এরকম নৃশংসভাবে খুন হতে হবে।
এরপর আমি এবং আমার আজিজ মার্কেটের কয়েকজন প্রকাশক বন্ধু মিলে টুটুল ভাইয়ের খোঁজ নিতে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে দ্রুত ছুটে যাই। সেখানে আহতদের খবরাখবর নেয়ার পাশাপাশি গণমাধ্যমের বন্ধুদের সাথে আহতদের চিকিৎসা বিষয়ে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা করি। এর মধ্যে সন্ধ্যায় শুনতে পাই জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তার সেই বিকৃত লাশ দেখার ইচ্ছা আমার হয়নি, কারণ আমার এখনো মনে হয় একটু পরেই হয়তো দীপন ভাই আজিজ মার্কেটেই আমার সামনের রাস্তা দিয়েই হেটে যাবেন। হাসছেন, আড্ডা দিচ্ছেন, চা খাচ্ছেন আর আগামী বইমেলার জন্য অনেক অনেক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন স্বপ্নবান, এমন আড্ডাবাজ, এমন হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল মানুষকে আমার মনেই হয়না আজিমপুরের সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে তিনি শুয়ে আছেন। আমি তার লাশের ছবি দেখিনি (যদিও আমি তার বাড়িতে, জানাজায়, এবং দাফনে অংশ নিয়েছি, কিন্তু তার লাশ দেখার মতো মানসিক শক্তি আমার ছিলো না) , কারণ আমি এখনো মনে করি দীপন ভাই তার সেই চিরচেনা রঙ্গীন পাঞ্জাবী, চোখে চশমা পড়ে হঠাৎ করেই আমার রুমে ঢুকে বলবেন, চায়ের অর্ডার দেন রবীন ভাই।
লেখক অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পরে বিভিন্নভাবে তার উপর যে হুমকিগুলো আসতো তিনি তা তার বাবা, মা এমনকি স্বয়ং স্ত্রীর সাথেও শেয়ার করেননি। তবে দীপন ভাই এই বিষয়ে অনেক কিছুই শেয়ার করতেন আমার সাথে। তিনি একান্তে আমাকে অনেক কিছুই বলতেন, বলে বলে তার নিজের উপর জমে থাকা ভার কমানোর চেষ্টা করতেন। ৩১ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রকাশনার ইতিহাসে একজন তরুণ, উদ্যমী, প্রতিভাবান প্রকাশককে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে হয়তো আমাদের আরো কিছুটা সময় লাগবে। আমরা যারা মুক্তবুদ্ধি চর্চার কথা বলি, তারা এবার দেখলাম প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তবুদ্ধির চর্চার শত্রুরা লেখককে হত্যা করার পরে লেখকের যে অমূল্য সৃষ্টি বই, সেটিকেও পৃথিবী থেকে নির্মূল করার যে নীলনকশা এঁকেছেন তার প্রথম বলি হলেন ফয়সল আরেফিন দীপন। একজন লেখকের মৃত্যুর হাজার বছর পরেও একটি বই বেঁচে থাকে পাঠক-প্রকাশকের কল্যাণে। প্রকাশক বইটি পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সেটি নতুন নতুনভাবে মুদ্রণ করে। কিন্তু একজন মুক্তচিন্তার প্রকাশককে হত্যার মধ্য দিয়ে ঘাতকেরা সেই পথ বন্ধ করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের প্রকাশনার জগতে আগামীতে একুশের বইমেলায় অভিজিৎ রায় হত্যার যে আতঙ্ক, দীপন হত্যার যে আতঙ্ক, টুটুলকে হত্যাচেষ্টার যে আতঙ্ক, ও তার লেখক বন্ধুদের উপর হামলার যে আতঙ্ক, সেই আতঙ্ক হয়তো কয়েক বছরের মধ্যে আমরা কাটিয়ে উঠব। কিন্তু আমরা কখনোই আর ফিরে পাবো না একুশের বইমেলায়, হেমন্তের বইমেলায়, চায়ের আড্ডায় আমাদের বন্ধু ফয়সল আরেফিন দীপনকে।
আমি মনে করি, ফয়সল আরেফিন দীপনের খুনীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার ও বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এখন যে বিচারহীনতার এবং আতংকের যে সমাজ চলছে তার অবসান হবে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী, লেখক, প্রকাশক, পাঠকের সহবস্থান গড়ে উঠবে আগামী একুশের বইমেলায়।