Home / সম্পাদকের কথা / একুশে বইমেলা ক্রমশ বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে যাচ্ছে -রবীন আহসান

একুশে বইমেলা ক্রমশ বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে যাচ্ছে -রবীন আহসান

robin-ahsanগত কয়েক বছর থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলা বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে উঠছে। এই একুশে বইমেলাই ছিল সামরিক সরকার, ধর্মান্ধ রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে জনমত গঠনের প্রধান কেন্দ্র। এ দেশের তরুণ প্রথিতযশা শিল্পী, কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্বদের আড্ডা ও আন্দোলনের স্থান।
কিন্তু বাংলা একাডেমি প্রকাশকদের একটি ছোট অংশের বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের জন্য ঐতিহ্যবাহী অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে সমস্ত সংগঠনকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া বাতিল করে। যার ফলে শুধুমাত্র প্রকাশকদের একচেটিয়া বাণিজ্যের জায়গায় পরিণত হয়েছে মহান ভাষা আন্দোলনের পীঠস্থান বাংলা একাডেমি। দেশে গড়ে উঠেছে কর্পোরেট প্রকাশনা সংস্থা। তাদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।
৮০’র দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সূতীকাগার ছিল এই বাংলা একাডেমি। লেখক, প্রকাশক, লিটল ম্যাগকর্মী, প্রগতিশীল রাজনৈতিককর্মী, সাংস্কৃতকর্মীর অগ্রসর অংশের তুমুল আড্ডায় গড়ে ওঠা এদেশের প্রিয় প্রাঙ্গণ বাংলা একাডেমি এখন হারিয়েছে তার জৌলুস। কর্পোরেট ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান স্পন্সর নির্ভর এবং লোভী প্রকাশকদের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এখনকার একুশে বইমেলা। গত ছয় বছর থেকে মূলত বাংলা একাডেমী কর্পোরেট স্বার্থ ও প্রকাশকদের বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বাংলা একাডেমি অমর একুশে গ্রন্থমেলার ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।
বাংলা একাডেমি কেন প্রকাশকদের বাণিজ্যিক স্বার্থ দেখতে যাবে। সারা পৃথিবীতে প্রকাশক সমিতির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন হয়। আর সেই আয়োজনের পেছনে প্রকাশকদের ভূমিকাই থাকে প্রধান এবং সেইসব বইমেলা প্রকাশকরা আয়োজন করে থাকে বাণিজ্যিক স্বার্থে। বাংলাদেশের প্রকাশকদের বিভিন্ন অংশের দলাদলির কারণে তারা নিজেরাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করতে ব্যর্থ। তাদের এই ব্যর্থতার দায় জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার বাংলা একাডেমি কেন বহন করবে।
আমি মনে করি এদেশের ছোট বড় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্টল দেওয়া এবং লেখক, বুদ্ধিজীবি ও সাংস্কৃতকর্মীদের আড্ডা দেওয়ার জন্যও ব্যবস্থা করা হোক। সর্বগ্রাসী বাণিজ্যিকীকরণ থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে রক্ষা করা হোক।
বাংলা একাডেমি যদি প্রকাশক নেতাদের পরামর্শে বইমেলার আয়োজন এভাবে বছরের উপর বছর চালিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এদেশের প্রকাশকরা আন্তর্জাতিক বইমেলাতো দূরের কথা নিজ উদ্যোগে একটি আঞ্চলিক বইমেলাও আয়োজন করতে পারবে না।
তাই বাংলা একাডেমীর বইমেলার স্বকীয়তা বজায় রেখে দেশে আরো একটি বইমেলার আয়োজন করতে পারে। সেখানে দেশী-বিদেশী প্রকাশনা সংস্থার অংশগ্রহণ থাকবে এবং সেই বইমেলার নেতৃত্ব দিবে বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থার নেতৃবৃন্দ এবং সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশের অগ্রসরমান তরুণ লেখক ও সাংস্কৃতিককর্মীদের প্রতি আহ্বান অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে সর্বগ্রাসী বাণিজ্যিক আগ্রাসন থেকে মুক্ত করারা লক্ষ্যে এগিয়ে আসুন। আমি দেখেছি গত বছর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা শুরু হওয়ার আগে দেশের ছোট বড় প্রায় ৫০টি প্রকাশনা সংস্থা প্রাণ কোম্পানির আমের আচার, চানাচুর, ঝালমুড়ি ইত্যাদি পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের মূল লোগো ঢেকে ফেলেছিল (মেলা শুরুর আগের দিন সেই সাইনবোর্ড গুলো মুছে ফেলা হয়)। যেকোন বই ক্রেতা ওই মেলায় ঢুকলে মনে করতেন এটা কি বইমেলা নাকি প্রাণ কোম্পানির পণ্যের মেলা।
আমরা চাই অমর একুশে গ্রন্থমেলা তার আগের ঐতিহ্যে ফিরে আসুক।