Home / বইমেলা / আমার লেখায় প্রভাব আছে আবহমান বাংলার রূপকথা-উপকথার। জাকির তালুকদার

আমার লেখায় প্রভাব আছে আবহমান বাংলার রূপকথা-উপকথার। জাকির তালুকদার

 

boimala-2017আসছে বইলোর জন্য বইনিউজের পক্ষ থেকে কথা হয় খ্যতিমান কথাশিল্পী জাকির তালুকদার-এর সাথে।

আমার লেখায় প্রভাব আছে আবহমান বাংলার রূপকথা-উপকথার। জাকির তালুকদার

 

বইনিউজ: লেখালেখি করছেন কতদিন? এ সময়ে নিজের লেখা নিয়ে কতটা স্বস্তি ও অস্বস্তি রয়েছে?
জাকির তালুকদার: লেখালেখির বয়স তো অনেক বছরই হয়ে গেল। মানে যখন থেকে লেখালেখিই আমার জীবনের প্রধান কাজ হিসাবে হিসাবে গ্রহণ করেছি, সেই সময়বিন্দুকেই গ্রহণ করছি আমার লেখার শুরু হিসাবে। মানুষ পেশাতে যেমন ব্যয় করে প্রতিদিন আটঘণ্টা বা তারও বেশি, আমিও তখন থেকে লেখা ও লেখাসংক্রান্ত কাজে ব্যয় করতে শুরু করেছি প্রতিদিন ৬ বা ৮ ঘণ্টা। সেটা এখন কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে।
নিজের লেখা নিয়ে স্বস্তি বা সন্তুষ্টি তো লেখকের মৃত্যুর শামিল। স্বস্তি বিন্দুমাত্র নেই। অস্বস্তি আছে পুরোমাত্রায়। আমার লেখা তো সর্বত্রগামী হয়নি। একথার মানে এই নয় যে, সব স্তরের পাঠকের কাছে আমি পৌঁছুতে পারিনি। পাঠকের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারটি আমাকে ভাবায়। তবে তা প্রধান অস্বস্তি নয়। প্রধান অস্বস্তি হচ্ছে, আমি আমার দেশের সব স্তরের মানুষ ও তাদের বাহ্যিক ও ভেতরের জীবনকে আমার লেখায় এখনো তুলে আনতে পারিনি।

বইনিউজ: কথা সাহিত্য নিয়ে আপনার বিশ্বাস ও প্রত্যাশা শুনতে আগ্রহী।
জাকির তালুকদার: একটি জাতি অর্থবহ ও সম্মানজনক জীবনের জন্য ক্রমাগত যে সংগ্রাম করে যায়, সেই সংগ্রামের সার্বিক ও সত্যিকারের পরিচয় উঠে আসে কথাসাহিত্যে। প্রবন্ধে বা গবেষণাগ্রন্থে নয়। এঙ্গেলস বলতেন, এক হ্যামলেটের মধ্যে ইউরোপের ইতিহাস যেভাবে উঠে এসেছে তা আপনি ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরির সমস্ত বই পড়লেও পাবেন না। আর ইতিহাস তো কেবলমাত্র ঘটনাপঞ্জি নয়, বরং তার বর্তমান অর্থাৎ পায়ের তলায় বিরাজমান মাটির গাঁথুনি। আবার একই সাথে তার ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ণয়ের নীল-নকশা। আফ্রিকার দিকে তাকিয়ে দেখুন। সেখানে সত্যিকারের আফ্রিকাকে আফ্রিকার মানুষের কাছে চিনিয়ে দিচ্ছে তাদের কথাসাহিত্য। লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রেও একই কথা।
আমাদের বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে সেই অবদান যতখানি রাখার কথা ছিল, ততখানি পারা যায়নি। কথাসাহিত্যে এই কাজটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে এগুতে পারেনি। শুরু করেছিলেন সত্যেন সেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন, এবং আরো কেউ কেউ। কিন্তু মাঝে মাঝে তা পথ হারিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক এসে পথরোধ করে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আবার সেটি মূলখাতকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে চলেছে।
আমার বিশ্বাস এবং প্রত্যাশা, আমাদের কথাসাহিত্য আমাদের জাতির মূল স্পন্দনকে, মূল প্রণোদনাকে ঠিকভাবে ধারণ করতে সক্ষম হবে।

বইনিউজ: বই মেলায় আপনার নতুন কী বই আসছে? কি ধরনের বই? প্রকাশিতব্য বই নিয়ে আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।
জাকির তালুকদার: বইমেলা সামনে রেখে আলাদাভাবে কোনো লেখালেখি করি না আমি। নিজেকে সার্বক্ষণিক লেখক বলে দাবি করি। সেই দাবিকে নিজের কাছে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য সারাবছরই লেখালেখির মধ্যে থাকি।
তবে বইমেলা একটি বাস্তবতা। প্রকাশকরা এই সময়টাতেই বই প্রকাশ করতে চান। আমার বইও হয়তো বেরুবে। হয়তো একটি। হয়তো একাধিক। এখনো জানি না। তবে ‘১৯৯২’ নামের উপন্যাসটি বোধহয় আসবে বইমেলায়। বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা সবচাইতে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল ঐ সময়কালে। আমাদের দেশে কোনো বামতাত্ত্বিক সেইসময় সঠিক বিশ্লেষণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। হাজার হাজার কর্মী আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রকট সংকটে। সেটি হচ্ছে দর্শনের সংকট। অমন খারাপ সময় আর দেখিনি আমি। সেই সময়-সংকট এবং উত্তর খোঁজা নিয়েই আমার এই উপন্যাস ‘১৯৯২’।

বইনিউজ: কী কী বই পড়লেন এ বছর? দেশী? বিদেশী? অভিজ্ঞতা জানালে পাঠক এগিয়ে যাবে।
জাকির তালুকদার: আগে উল্লেখযোগ্য বই পড়লে সেটি সম্পর্কে কিছু নোট রাখতাম আমার ডায়েরিতে। এই বছর ডায়েরির সাথে সম্পর্ক তেমন ছিল না। তবে এই বছর আবার পাঠ করেছি শেক্সপিয়ারের নাটকগুলো, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলো, সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যসংগ্রহ। তরুণ লেখকদের অনেকগুলো গল্প ও কবিতার বই পাঠ করেছি। আর যে উপন্যাসটি লিখছি, সে সম্পর্কিত গবেষণাগ্রন্থ-ইতিহাস-স্মৃতিচারণ যা কিছু পাওয়া যায় সবই পাঠ করে চলেছি।

বইনিউজ: স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে কোন কোন উপন্যাস ও গল্পকে আপনার বিচারে সেরা নির্বাচিত করবেন? বিস্তারিত বললে খুশী হবো। পছন্দের তালিকা হিসেবেও বলতে পারেন।
জাকির তালুকদার: আমি সৃজনশীল সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘শ্রেষ্ঠ’ বা ‘সেরা’ শব্দকে নিয়ে অস্বস্তি বোধ করি। কারণ সাহিত্যে কোনো লেখা অন্য লেখার প্রতিদ্বন্দ্বি নয়– বরং পরিপূরক বা সম্পূরক। তবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কথা বললে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায়।
উপন্যাস, যেমন– শওকত আলির ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ ‘উত্তরের খেপ’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’, রিজিয়া রহমানের ‘শিলায় শিলায় আগুন’, মঞ্জু সরকারের ‘তমস’, মঈনুল আহসান সাবেরের ‘কবেজ লেঠেল’, হরিপদ দত্তর ‘জন্ম-জন্মান্তর’, শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। যে নামগুলো বললাম, তার বাইরেও বেশকিছু উপন্যাস আছে। তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়ছে না।
আর গল্পের ক্ষেত্রে আমার একটি তৈরি উত্তর আছে। তিন বছর আগে নান্দনিক প্রকাশনী থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশের গল্প’। সেগুলোই আমার সর্বাধিক পছন্দের গল্প।

বইনিউজ: লেখালেখিতে আপনার ওপর কারো প্রভাব আছে বলে মনে করেন? এই প্রভাবিত হওয়াকে কেমনভাবে গ্রহণ করেন?
জাকির তালুকদার: কারো বলতে যদি অন্য কোনো লেখককে বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে বলব যে বর্তমানে আমার লেখার উপর অন্য কোনো লেখকের প্রভাব নেই। দেশী বা বিদেশী কোনো লেখকেরই প্রভাব নেই। আমার লেখায় প্রভাব আছে আবহমান বাংলার রূপকথা-উপকথার, বিভিন্ন ধর্ম ও সমাজের মিথের, মানুষের বিচিত্র জীবনদৃষ্টির, বিশ্ব ইতিহাসের, রাজনীতির, বিচিত্র ধরনের দর্শনের, সদা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতির।
কোনো নতুন লেখকের অন্য লেখক দ্বারা প্রভাবিত হওয়া মানে অন্যের বুকের খাঁচা দিয়ে নিজের নিশ্বাস নেওয়া। এটি কাটতে অনেক সময় লাগে। অনেক সময়ই তা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বইনিউজ: এখন কী ধরণের লেখালেখির কাজ করছেন? বিস্তারিত বলবেন।
জাকির তালুকদার: আগে বলেছি যে আমি একটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করছি। ‘১৯৯২’। মোটামুটি যা বলেছি, তার চাইতে বিস্তারিত বলার কারণ ও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

বইনিউজ: কথাসাহিত্যের সম্ভাবনা কিংবা কোন অশনি সংকেত আজকের বাংলাদেশে কেমন মনে হচ্ছে?
জাকির তালুকদার: মিডিয়া বিস্ফোরণ কথাসাহিত্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের তো পাতা ভরাতে হয়। অনলাইনগুলোর স্পেস ভরাতে হয়। তাই লেখার গুণাগুণ বাছাই করার সময় এবং সুযোগ তাদের নেই। তারা ছেপে চলেছেন নতুন লিখতে আসা তরুণদের অপরিণত ও অসম্পাদিত লেখা। তরুণরা নিজেদের লেখা নিয়ে অত্মসন্তুষ্টিতে মগ্ন।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে টেলিভিশনের নাটক। যে কেউ লিখতে এসেই নিজের গল্পকে নাট্যরূপ দিয়ে দৃশ্যমাধ্যমের তারকা হয়ে যাচ্ছেন।
এগুলো অশনি সংকেত।
আর সম্ভাবনার দিক হচ্ছে, পাঠকরা এসব লেখা পড়েন না। দর্শকরা এসব নাটক দেখেন না। কাজেই তরুণ লেখকদের একসময় নিজের দিকে ফিরে তাকাতেই হবে।

বইনিউজ: তরুণ প্রজন্মের প্রতি আপনার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ যা ভবিষ্যতের নতুনদের জন্য প্রয়োজনীয় হবে বলে মনে করছেন তা জানানোর জন্য অনুরোধ করব।
জাকির তালুকদার: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ নামে লিফলেট ধরনের একটি লেখা লিখেছিলেন। সেখানে তরুণদের জন্য ১২টি উপদেশ বা নির্দেশনা আছে। সেই লিফলেটটিকেই এখন পর্যন্ত আমার কাছে তরুণ প্রজন্মের জন্য শ্রেষ্ঠ পরামর্শ বলে মনে হয়।
সেইসাথে কয়েকটি কথা যোগ করা যেতে পারে। যেমন, মাঝে মাঝে এক বা একাধিক ব্যক্তি এসে সাহিত্যের জগতে হুজুগ তৈরি করে। এমনটি অনেক দেখা যায়। তাদের বড় বড় বাকোয়াজিতে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অনভিজ্ঞ মনন ধারণা করে যে সাহিত্যে নতুন প্রবাহ এসে গেছে। আসলে এসব প্রবাহ তো নয়– ফেনা। এমন ফেনায়িত অস্বচ্ছতায় পথ হারান অনেকেই।
আরেকটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আমাদের বাংলা কথাসাহিত্যের ভাণ্ডার খুবই সমৃদ্ধ। বঙ্কিম থেকে ইলিয়াস পর্যন্ত অসংখ্য শক্তিমান লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। এই ভাণ্ডারকে তরুণ প্রজন্ম যদি মন্থন না করেন তাহলে নিজেদের বঞ্চিত করবেন। বিদেশী লেখকদের বই পড়া দোষণীয় নয়। কিন্তু ভিত্তি যদি দেশের সম্পদ দিয়ে, মানে নিজেদের সম্পদ দিয়ে গঠিত না হয়, তাহলে তা চিরকাল নড়বড়েই থাকবে।

বইনিউজ: এমন কোনও বিষয় আছে যা নিয়ে লেখার জন্য আপনি অপেক্ষা করছেন, তা জানতে ইচ্ছে করছে।
জাকির তালুকদার: আমি এমন একটি উপন্যাস লিখতে চাই যা বাংলাদেশের ছোট্ট এক প্রান্তিক গ্রামকে কেন্দ্র করে পুরো বিশ্বকে ধারণ করতে পারে। সেই কাজের মাল-মশলা আমি সংগ্রহ করে চলেছি বেশ কয়েক বছর ধরে। মনের মধ্যে ছক তৈরি হচ্ছে, আবার পরিবর্তিত হচ্ছে। আমি সেই লেখাটিকে মনের গর্ভে ধারণ করার প্রক্রিয়ায় আছি।

বইনিউজ: বইনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম নিয়ে আপনার কোনও পরামর্শ থাকলে বলবেন।
জাকির তালুকদার: কিছু প্রয়োজনীয় সাহিত্য সম্পর্কিত রচনা আপনারা নিয়মিত বিরতিতে পুনঃমুদ্রণ বা আপলোড করতে পারেন। যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের লিফলেটটির কথা বললাম। এমন দেশী-বিদেশী অনেক রচনা আছে। এগুলো নতুন-পুরাতন সব লেখক-কবির জন্যই উপকার বয়ে আনবে।