Home / বইমেলা / স্মৃতিচিত্র বইমেলা (৩) – শামীম আজাদ ।

স্মৃতিচিত্র বইমেলা (৩) – শামীম আজাদ ।

Shamim-Azadস্মৃতিচিত্র বইমেলা (৩) – শামীম আজাদ ।

প্লেনের চাকা বাংলাদেশের রানওয়ে ছুঁলেই ফাইবার গ্লাসের জানালা ভেঙে লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়। আর গাড়ির চাকা রাস্তায় পরলে যারে দেখি অচেনা অথবা চিরচেনা সব্জীওলা, রিক্সাওলা, বইওলা তারেই আত্মীয় মনে হয়। গাড়ি চলছে। আমি কাঁচের কেইজে নিয়ন্ত্রিত শীতের হাওয়ায় বসে বাইরে ঘেমো ট্রাফিক পুলিশ, নিতম্বিনী নারী, পট-বেলী পাইকার সবার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকি আর ফোন করি। জাহাঙ্গীর, অদিতী, সাইফুর, বাবলী, ফেরদৌস। পথের ধারের মানুষেরা ভ্রুঁকুচকে ‘কোথায় তোমায় যেন দেখেছি…’ভাবতে ভাবতেই তাদের পেরিয়ে নেক্সট টার্গেট করি। তপ্ত দুপুরে দেশী মানুষের বাগানে যার দিকে চাই তারেই লাগে ভাল। বিশাল বিশাল বিলবোর্ড তানা না না করে মিঞা কি টোরী বাজাতে থাকে।

সেবার সেবার ঈশিতা ছিল না। সে বিলেতে গেছে তার বাপকে দেখাশোনা করতে আর তাতেই আমি একুশের বই মেলায় আসতে পেরেছি। কত লেখক আর কবি বন্ধুদের যে দেখবো! এমন কি যারা বিশ্বের অন্যন্য দেশে থাকেন তারাও এখন দেশে। ফেরদৌস নাহার, হাসান আব্দুল্লাহ, কাজল ঘোষ, চন্দ্রিমা দত্ত, সাদ কামালী, লুৎফর রহমান রিটন, জসিম মল্লিক… । আগেই আমার ঢাকা-ফোন চার্য দিয়ে রেখেছিলাম। এ আমার পুরো দেশের ফোন ইন্ডেক্স । আমার মুঠোর ময়নামতি।

বনানী চেয়ারম্যান বাড়ির পাকপাখালি রাস্তায় পড়ার পরেই রিটন পাল্টা ফোন করে আর আমি আমার পুরানো লাইন দিয়ে লাফিয়ে বলি রিটন…!!! কোথায় তোমার ফিটন?- হা হা হা আপা আইসা গেছ! ওর চনমনে গলা টান মেরে আশি-নব্বুইর বই মেলায় নিয়ে যায়। কি আড্ডা কি আড্ডার আঠা ছিলাম আমরা!

তখন আমরা কেউই দেশান্তরী হইনি। আমি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করতাম। তখন বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলায় খাবার দোকান গুলো বসতো মূল মেলার পেছনে। যেখানে পরে লিটলম্যাগ কর্ণার হয়েছিলো। তখন কোথাও কফির ব্যবস্থা নেই, টিভিগুলোর সরাসরি প্রচার নেই, লেখকদের বসার কোন জায়গা নেই, অস্থায়ী দোকানগুলো নির্মানে তেমন কোন নান্দনিকতা নেই। যেদিকে তাকাই শুধু মূলি বাঁশের ঠেকা। সে সময় আমরা ভিসিয়ার থেকে সিডিতে ল্যান্ড করছি। নবী ভাই কার্টূন করেছেন বগলে বইর বদলে ক্যাসেট। স্টলে স্টলে ভাস্বর, প্রজ্ঞা, শিমুলের কন্ঠে বাজছে রাহমান ভাই, রফিক ভাই নির্ল দা। তখন মানুষ কোপানো শুরু হয় নাই। হুমায়ুন ভাইও আছেন। রেকু কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছে। খাবার দোকানে প্লাস্টিক পাতা টেবিলে, মাথার উপরের আমগাছ থেকে পোকা পড়ছে চটপটিতে, চিনিতে ফোল্ডিং চেয়ারে। সেবক বালক খোলা হাতে লালচে মিনি চা’য়ে ঝপাঝপ লেবু টুকরা ফেলে যাচ্ছে। আমরা তাই ঠোঁটের আলে ধরে উর্বর করে তুলছি মনের সবুজ।

একবার আমি, তসলিমা, রিটন, জাওয়াদ আড্ডার একটা ধারা বানালাম। লাগাতার কথা বলে যেতে হবে একটিও ইংরাজি শব্দ ব্যবহার না করে। থামলে, তোতলামো করলে,ইংরাজি বললেই টেবিলে এক টাকা ফাইন! টাকায় টেবিল ভরার আগেই এ দিয়েই অর্ডার চলেযেতো চটপটি, সিংগারা চা। হাতে নতুন বই টেবিলে শব্দজুয়া আর দূরে কাউকে দেখলেই টান মারা। একজন উঠলে আরেকজন। আমার ফাইন হলেই বলতাম, ভাই রিটন কোথায় তোমার ফিটন! আমি ভাগবো। ক’বছর এই শব্দজুয়া চল হয়েছিল। টেবিলের চারদিকের দর্শক কবিও খেলুড়েও জুটে যেত লাগাতার। শুধু একজন ম্লান মুখে একটু দূরে বাঁশে হেলান দিয়ে হাসতো আর আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিতো।

রুদ্র ওভাবে থাকলেও মোহন সে সময় বরাদ্দ ছাড়াই নিজেই ঘাসে কাপড় বিছিয়ে নিয়ে কবিতার দোকান দিতো। বেলাল প্রতিদিন কোন না কোন সুন্দরী রমনী নিয়ে হেঁটে যেতো। তখন বাংলা একাডেমির মাঠে সত্যিকারের ঘাস ছিল, তারিক আর সানির কথায় আমাদের ম্যারাথন দৌড় ছিল। হেনা স্যারের তীব্র বাক্য ঘিরে আমুদে কৌতুক ছিল। আতিক ভাই আর সারোয়ার মুর্শেদের চলার ঋজুতা ছিল টিএসসির মোড়ে, মেলার সর্বত্র।

টেলিফোন রাখার আগে রিটন বলে -গুড, ঠিক চাইরটায় শহিদ সার্কেলে চলে আসবা। চ্যানেল আইর লাইভ কিন্তু! মানে সময় মত আসবা। মেলার দশদিন হয়ে গেছে। সে আমিরুলের প্রযোজনায় প্রতিদিন লাইভ করছে। এবার মেলায় আসছে আমার একজোড়া শিশু গল্প গ্রন্থ। একই থিমে একটা ইংরাজি আরেকটা বাংলা। বুগ্লী দা বার্গেন্ডী চিতা ও বুগ্লী নামের বেগুনী চিতা। ক্যানেডীয় আড়িয়াল পাব্লিকেশন থেকে বেরিয়েছে। কবিতার বইতো আছেই। মোড়ক উন্মোচনের জন্য আলী ইমামকে ডেকেছি ঢাকা ক্লাবে, রিটনকেও ডাকলাম। – ঠিকাছে ঠিকাছে। কিন্তু কাল টাইম ঠিক রেখো…

আমি এগারো তারিখ পারলাম না। বারো তারিখ ও না। রোজই লাইভ টাইম শেষ হলে পথের হাজার মানুষ সাঁতরে তবে হাজির হই। আন লাকি তেরো তারিখে রিটন দিল এক ঝারি। আমি বলতেই পারলাম না এজন্য দায়ী হিল জুটা আর শাড়ি। বিলেতী এই মোটু বিবির মহা হাঁটা এমন কি মিনি ম্যরাথনের ও অভিজ্ঞতাও এখানে ফেল। শাড়ি হিলে সাজুগুঁজু করা মাত্রই গতি খেয়ে ফেলি। আর শুরু হয় সেই আর্ট কলেজ থেকে গুটি গুটি ‘কইন্যা হাঁটা’।

এবার ঠিক প্রথম বসন্ত দিনে বাল্য বন্ধু শফির দেয়া জামদানি বাসন্তী রঙা শাড়ি, ঘটি হাতা টুকটুকে লাল ব্লাউস আর লাল রেশমি চূড়ি পরে বেলা দুইটা থেকে লাইন দিয়ে ঠিক ডুকে গেলাম বাংলা একাডেমিতে। আমার কবিতা বই সবই আগামী প্রকাশনী থেকে বেরুচ্ছে। আগামীতে ঢুকেই দেখি উলটো দিকে সময় এ মিলন টুকটুকে লাল শার্ট পরে অটোগ্রাফ দিতে দিতে পেরেশান। আমি ও দিচ্ছি, তবে অতো না। আমি যতো অটোগ্রাফ দিচ্ছি – আলাপ করছি তার বেশি। আমরালোকের মাথা টপকে আমরা এপাড় ওপাড় চোখাচোখি করে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম। মাইকে শুনি নজরুল মঞ্চের মোড়ক উন্মচনের ডাক পড়ছে আসাদ ভাই, আনিসের। হঠাৎ আগামীর স্বত্তাধিকারী অনুজ সম ওসমান গনি মোবাইলে কথা বলে বলেন, আপা আপনাকে আর মিলন ভাইকে চ্যানেল আই ডাকছে। আপঅনারা একজন নাকি প্রেমের কবি আর একজন প্রেমের গল্পকার হা হা হা।

আমরা গেলাম। চ্যানেল আই’র ব্যানারের পেছনে ডালিয়া কসমস ফুটে আছে। রিটন আমাদের দুজনকে ব্রিফ করলো। চারদিকে নতুন বইর গন্ধ। নতুন লেখকের লাইন । লাইট ক্যামেরা সাউন্ড! শুভ বসন্ত! রিটনের সঙ্গে পারি! আমাদের লাল পোশাক আর লেখার লালিমা নিয়ে আমাদের লেখা নিয়ে, ব্যাক্তিত্ব নিয়ে সে এমন সব মজার কথা বলতে লাগলো যে সবাই হাসতে লাগলো। সব চেয়ে জোরে শুনলাম মাযহারের শব্দ। মিলন ফোল্ডেড শার্টের হাতা হাতালো আর আমি আমার নিজের মুখস্ত কবিতা ভুলে বেকুবের মত এই বাসন্তী শাড়ি কে দিয়েছে তা বলতে শুরু করলাম। বন্ধু শফি ছিল তার নোয়াখালির ইটখোলার কাছের সুরম্য বাড়ির বাগানে। আমাকে টিভিতে দেখেই ঢাকা থেকে বন্ধু শাহজাহানের টেলিফোনের পড়ি মরি দৌড়ে এসে নাকি টিভির সামনে এলো। ততক্ষনে ক্যামেরায় শুধু আমার শাড়ি।

মিলন আর আমি আমাদের দোকানে ফিরে যাবার জন্য দেখি তার জন্য লম্বা লাইন। আমি ভির ভেঙে আগামীতে প্রবেশ করতেই শফির ফোন, আঁরে শামীম তুঁই দেই আঁর শাড়ি হিনছো! -হিনছি তয় কি অইছে তুঁই খুশি অও নো?- অইছি। কিন্তু আজাদ ভাই রাগ কইত্তো নো? -না কইত্তনো! হেঁতেনে এইগুন বুজে… হা হা হা ।

তদ্দিনে অনেক বদলে গেছে বাংলা একাডেমি। মেলা ছাড়া পরিযায়ী পাখিদের সে আড্ডাটা আর নেই। মাঝে মাঝে ওভ্যাল শেপের প্রাচীন সিঁড়িতে গিয়ে বসি। আমাদের সে বয়সও নেই। সে সময়টি নতুনদের আছে। দেখি হাতে গাঁদা, কানে জবা, চুলে চাঁপা নিয়ে দুই জোড়া যুবক-যুবতী হেঁটে গেল। কারা যেন পেছন থেকে আমাদের পাশ থেকেই কু…উ কু…উ করে ডেকে উঠালো।

১৩।২।১৪
লন্ডন