Home / বই আলোচনা / “আগস্ট আবছায়া” এবঙ পাঠক হৃদয়জাত কথামালা-নুরুন্নাহার শিরীন

“আগস্ট আবছায়া” এবঙ পাঠক হৃদয়জাত কথামালা-নুরুন্নাহার শিরীন

“আগস্ট আবছায়া” এবঙ পাঠক হৃদয়জাত কথামালা-নুরুন্নাহার শিরীন

আগস্ট আবছায়া (উপন্যাস) লেখক মাসুরুর আরেফিন । প্রকাশ করেছে : প্রথমা প্রকাশনী
দাম: ৮০০ টাকা

এই মার্চে হাতে পাওয়া “আগস্ট আবছায়া”-র প্রচ্ছদ ও নামটি আকৃষ্ট হবার মতো। সেইসঙ্গে চমকিত হবার মতো।
প্রচ্ছদের এককোণে দুফোঁটা করে রূপালি বৃষ্টিবিন্দুর মতো চোখের জলের বিন্দুর মতো জলের ফোঁটা চারটা যেন আগস্টের কান্নাবিন্দুর মতো হৃদয়ছোঁয়া কিছু গভীর কথামালা মলাটবন্দী ঘুমিয়ে আছে – পড়তে গেলে ছড়িয়ে পড়বে পাঠকেরও চোখ ছাপিয়ে মনে – এমন লাগলো আমার। যে কোনও একটি বই পড়তে পাঠকচিত্ত উৎসুক হবার জন্য এ নিশ্চয় বড় বিষয়।

ঝকঝকে নতুন প্রকাশিত বইটি ছোটভাই মুনির (ডঃ কাজী মুনির Munir Kazi) দিয়েছে আমাকে। হাতে নিতেই ভালো লাগলো। ভাবলাম – পড়তে হবে। এবঙ লাগাতার ক’দিন ধরে পড়েছি, শেষ করেছি। প্রথম পাঠের মুগ্ধতাঘোর সমেত রিভিউ লিখতে বসলাম। সমালোচনা নয়। সমালোচনা শব্দটি ভালোবাসিনা বলে যা ভালোলাগে তা নিয়ে কেবল ভালোলাগাটুকু লিখতে ভালোবাসি। তো, বইয়ের প্রথম পাতায় চোখ আমার আঠা প্রায় – লেখক লিখেছেন –
উৎসর্গ পাতায় –

” পিতা এস এম আবুল কাশেম (১৯৩৬-২০০৭), যিনি আজ বেঁচে থাকলে খুলনা শহরের নানা জায়গায় বিভিন্ন কাজে বেড়িয়ে পড়তেন এ উপন্যাসটা হাতে করে এবং যার সঙ্গে দেখা হতো, তাকেই চরম বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আশ্চর্য ! আপনি এখনো এ বই পড়েননি? ‘ ”

লেখক মনে পড়িয়ে দিলেন বাবার কথা। লেখার শুরুতেই। সজল হোলাম। এইখানেই কৃতিত্ব, যখন লেখা পাঠকদের কাছে নিজেকে মনে পড়িয়ে দেয়।

এদেশে ১৫ আগস্টের চরম অন্যায় হত্যাকান্ডে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা লেখকের উপন্যাস জুড়ে অবসেশন রূপে, মেধাবী চিন্তাচেতনা ঘিরে, দেশি-বিদেশি চরিত্র চিত্রনের মাঝে ঘুরেফিরেই ঘটমান বর্তমানের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের গভীরে ঢুকে পড়েছে অবলীলায়। এবঙ ডিজিটাল উপস্থাপনার ফাঁকেফাঁকেই ঘটনার পেছনকার খুনী দানবদের দানবিক চরিত্রকে নিপুণ কারিগরের মতো লেখক ফুটিয়েছেন দক্ষ হাতে। যেন বা চিত্রকল্প। প্রতিটি চরিত্রের যথার্থ একটি রূপ পাঠকদের সামনে হাজির। ক’জন লেখক পারেন এমন করে লিখতে জীবন্ত জীবন থেকে নেওয়া হত্যার নেপথ্যের চিত্রপট? চমকিত হবার মতো ঘটনা প্রবাহ। সবচে’ বড় কথাটি এই যে – বইটি শুরু এবঙ শেষ অব্দি না পড়ে উপায় নেই পাঠকদের। লেখকের এটাও বড় সার্থকতা।

আমাকে বিশেষভাবে আপ্লুত করেছে মাসরুর আরেফিনের আধুনিক চিন্তাচেতনার বিষয়বস্তু, উপন্যাসে দেশি-বিদেশি চরিত্রদের গভীর মনো-দৈহিক উপস্থিতি অনায়াসে ফুটিয়ে তোলা। কবিতা লিখলেও যেমন ‘কেউ কেউ কবি’ তেমন উপন্যাসও অনেকে লিখলেও কেবল ‘কেউ কেউ ঔপন্যাসিক’ হিসেবে মাসরুর আরেফিন নিঃসন্দেহে প্রথম উপন্যাস “আগস্ট আবছায়া” লিখেই এদেশের উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক বিবেচ্য হলেন। এই উপন্যাসের মেহেরনাজ, সুরভি, লুনা ও নূর হোসেন, উইলিস বার্নস্টেইন, ইবরাহিম, আইয়ার, মাসুম, ফারজানা হায়াত, সরফরাজ নওয়াজ, পিংকি, বঙ্গবন্ধুর খুনীদল এবঙ লেখক স্বয়ং পাঠকের হৃদয়ে কড়া নাড়তে পেরেছেন ঘটনা প্রবাহের উৎসারিত স্রোতধারায়। পুরো বইটি পাঠশেষে বলতে পারি যেন বা – লেখকেরই ভাষায় – ‘কসাইয়ের পশুর গর্দানে কোপ মারার ধরনে — রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের এক নির্মম ধারাভাষ্য’। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে লেখক তার জন্মসাল অনুসারে তখন ৬ বছর বয়সের একটি শিশু। অথচ, এই বয়সে তার মননশীল মন ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রের দানবদের হত্যাচিত্রের দানবিকতা উপন্যাসে তুলে ধরেন – ‘অন্যায় হয়েছে বঙ্গবন্ধুর এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের প্রতিও — বিরাট অন্যায়।’ আদতে পৃথিবীর মানুষরূপী অমানবিক দানবদের চরিত্র বিবেক বর্জিত, লেখক তাই ১৫ আগস্টের পরের দানবিক হত্যাকাণ্ডগুলোর উৎপত্তি এদেশে ঘটে যাওয়া ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকেই, ধারণা করেন। তার উপন্যাসে বিধৃত ঘটনাগুলো সেই কথাটি পাঠকদের বলতে চেয়েছে বারংবার।

এই যে বেদনাহত তাড়না থেকে লিখিত “আগস্ট আবছায়া” – লেখক নিজেকে ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রের ভিতর অশরীরি লুকানো অবস্থানে অবলোকন করেন, দেখতে পান সেদিনকার নেপথ্য দানবদের কুকীর্তি সমূহ, সাক্ষাৎ শয়তানের দলের কথোপকথন – ‘অস্ত্রাগার খোলা হবে, … কোনো বাধা দেবে না খালেদ মোশাররফ, জেনারেল জিয়া, ব্রিগেডিয়ার রউফ, কোনো বাধা দেবে না কেউ —- নো ওয়ান ইজ গোয়িং টু স্টপ অ্যানিথিং। ক্লিয়ার স্যার? অ্যবসুলিউটলি বি শিওর অ্যাবাউট আওয়ার সাকসেস টুমরো আর্লি মর্নিং। ঘুমোন স্যার … ‘

আমরা যারা আজও বেদনাহত ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে – লেখকের সত্য চিত্রায়নের বর্ণনায় রক্তাক্ত ছবিটি আমরাও দেখতে পাই – লেখক যখন লেখেন – সেই রাতের মোশতাকের মনের কথা – ‘এই ক্যু ব্যর্থ হলে সে বঙ্গবন্ধুর সামনে দাঁড়াবে কী করে? বেগম মুজিব, দুকন্যা হাসিনা-রেহানা, পুত্র কামাল, যারা সবাই তার নিজের পরিবারের মতো, মতোও নয় একেবারে নিজেরই পরিবার — এদের চোখে সে চোখ রাখবে কী করে? ‘ লেখক আবারও লেখেন মোশতাকের ভাবনা – ‘এই লোকটাকে কোনোভাবেই ঢাকায় কিংবা ঢাকার আশেপাশে কোথাও দাফন দেওয়া যাবে না। টুঙ্গিপাড়াই তাঁর গন্তব্য’ এমন দৃশ্যপটের বর্ণনা আমাদেরকে মর্মাহত ও শিহরিত না করে পারেই না। দৃশ্যমান বর্ণনা আরও আছে – লেখক অশরীরি দেখেন ফারুকের উস্কানিমূলক গলা – ‘আগামীকাল মানে আজকে সকালে ১৫ আগস্ট সকালে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে প্রেসিডেন্টের মিটিং হবে। সেই মিটিংয়ে রাজতন্ত্র ঘোষণা হবে। শেখ মুজিব আজীবন রাষ্ট্রপতি হবেন, শেখ কামাল যুবলীগের প্রধান হবেন, শেখ ফজলুল হক মণি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন, আর আর্মিতে শেখ জামালকে অনেক উঁচু একটা পোস্ট দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীকেও বাকশালের আওতায় আনা হবে। ভারত এইদেশ চালাবে। ভারত এখন আমাদের রক্ষীবাহিনী চালাচ্ছে, সামনে তারা পুরো দেশ চালাবে, ভারতের সঙ্গে গোপন চুক্তি হয়ে গেছে, সেটা আপনারা জানেন। ধর্মকর্ম আর কিছু করতে পারবেন না, চাকরি করে পরিবারের মুখে দুটো দানাও দিতে পারবেন না সামনের দিনে। আমরা এই বাংলাদেশি জাতি স্রেফ, স্রেফ ভারতের সেবাদাসে পরিণত হয়েছি। — চূড়ান্ত আঘাত হানার সময় এসে গেছে ভাইয়েরা। বিদেশি শক্তির কাছে দেশ বিক্রি করতে চান? রাজতন্ত্র চান?’ লেখক দেখেন, শোনেন – এবার সবাই জোরে বলে উঠলো – ”না, যেমন কালো পোশাকের ল্যান্সার বা আরমারড বাহিনী, তেমন খাকি পোশাকের আর্টিলারি সেনারা। ফারুক এবার বলল – তোমাদের ‘না’ শুনে আমি খুশি। এখন আমি যা বলব এবং আমার অফিসাররা যা বলবে, তোমাদের আজ রাতে সেইমতো চলতে হবে।”

এই যে বর্ণনা এটাই যথেষ্ট সেদিনকার উস্কানি কীভাবে ঘটেছিলো। কীভাবে অভাবিত চরম অন্যায়ভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো ১৫ আগস্টে লেখক অশরীরি সেসব দেখলেন এবঙ লিখলেন আশ্চর্যজনক শিউরে ওঠার মতো ভাষায় –
” এসএইচএমবি নূর। আজ থেকে এর ফুল ফর্ম হবে, হি শট মিস্টার বঙ্গবন্ধু নূর। হা-হা। ” লেখক দেখেন কীভাবে সেদিন বিবেক বর্জিত সেনারা চুরি করছে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির যাবতীয় জিনিসপত্র, এমন কী ছাদের টাইলস, টাকাপয়সা, হাঁস, মুরগী, গরু দুইটা ! অতঃপর অনবরত রেডিওর ঘোষণা – “আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচার শেখ মুজিবকে (এবার কাশির শব্দ) হত্যা করা হয়েছে। খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে (আবার ছোট ক্ষীণ একটা কাশি) কারফিউ জারি করা হয়েছে। ‘ তারপর লেখক দেখেন বঙ্গবন্ধুর কফিন, বরফে বরফে ঠাসা হেলিকপ্টারে ওঠানো হলো, টুঙ্গিপাড়ায় নামানো হলো। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির মজনু , মৌলভি সাহেব ভয় না পেয়ে বঙ্গবন্ধুর গোসল, দাফন-কাফন বিষয়ক অনড় সিদ্ধান্ত নেয়ায় জানাজা পড়ানো শেষে বঙ্গবন্ধুকে টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে শোয়ানো হলো। লেখক দেখলেন সেনাবাহিনী ভয়ে-ভয়ে উঠলো হেলিকপ্টারে।

লেখক সবশেষে পরিশিষ্টে লিখলেন – উপন্যাসের চরিত্ররা এখন কে কোথায় কীভাবে জীবন অতিবাহিত করছে – যা পড়ে পাঠকের আরেকদফা চমকে ওঠার পালা। আমার এমনই লেগেছে। সেখানে লেখক ‘আমি’ হিসেবে নিজেকেও উপস্থাপনের কাজটি করতে ভোলেননি। তখন তিনি নিজের আগামী উপন্যাস ” টুঙ্গিপাড়া বিদ্রোহ” লেখার কথা জানান দিয়েছেন। এবঙ সেই উপন্যাসে তিনি ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ দাফনের দিনে তাঁর গ্রামের বাড়ির দীর্ঘদিনের কাজের লোক বৈকুণ্ঠের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে লোমহর্ষক ও অনেক কূটপ্রশ্নে ভরা সাধারণ জনতার বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো – মানুষের মনের ইতিহাসে – লেখক সেই ঘটনা নিয়ে “টুঙ্গিপাড়া বিদ্রোহ” লিখুন – এ আমার হৃদয়জাত শুভ কামনা , বেঁচে থাকলে পাঠ করার, আপ্লুত হবার আর রিভউ লেখার অদম্য ইচ্ছে রইলো। একইসঙ্গে আশাবাদ রইলো – মাসরুর আরেফিনের হাতে লিখিত হবে জীবন থেকে নেওয়া অনন্য আরও বহুবিধ উপন্যাস। যা পাঠে পাঠক আপ্লুত, ভাবিত হবে, হৃদয় হতে হৃদয়ে ইতিহাস বিকৃতভাষ্যে নয় নতুন রূপে উন্মোচিত হবে।

মার্চ ২০১৯ সাল।