Home / বই আলোচনা / ছিঁড়ে খুঁড়ে বাঁচতে শেখা । রুহিনা ফেরদৌস

ছিঁড়ে খুঁড়ে বাঁচতে শেখা । রুহিনা ফেরদৌস

 

ছিঁড়ে খুঁড়ে বাঁচতে শেখা
মুশফিকুর রহমান
প্রকাশক : শ্রাবণ প্রকাশনী
মূল্য: ২০০ টাকা

ছিঁড়ে খুঁড়ে বাঁচতে শেখা । রুহিনা ফেরদৌস

কবি তার উপলব্ধি দিয়ে জগেক চেনে, দেখে, ধারণ করে। দ্রোহ, প্রেম, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বিপন্নতার সে শাশ্বত সাবলীল যে অনুভূতিগুলো খুঁজে পায়, তার নাম কবিতা। কবিতারা তাই কখনো কবির একান্ত অনুভূতি, বুকের ভেতর মুচড়ে যাওয়া মুহূর্ত, চোখের তীব্র দেখা, রক্তের ভেতর ওম জাগানো প্রবাহ, চূর্ণ হয়ে যাওয়া সময়। কবি মুশফিকুর রহমানের কবিতার বই ‘ছিঁড়ে খুঁড়ে বাঁচতে শেখা’ ব্যক্ত এসবের মুহূর্তের বয়ান। তারা পাঠকের হাতে আলতো স্পর্শ রেখে প্রথমে সহজ কিছু অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়। চার খণ্ডে বিভক্ত বইটির প্রথম পর্বের নাম ‘প্রেম ও প্রণয়’। খুব সহজ কথায় কবি এখানে তার যাপিত সময়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ‘সেদিনও ফাগুন ছিল, আগুন ছিল প্রাণে’ —এ লাইনটি দিয়ে কবি পাঠকের কাছে খুলে ধরেন তার অন্তর্গত কিছু অনুভব। যেসব অনুভূতি পাঠককে তার ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতা ওল্টাতে সাহায্য করে। পাঠককে নিয়ে যায় যার যার একান্ত কয়েকটি দিনের কাছে। ‘কান্নার নোনাজলের স্রোত তুমি, ফেলে আসা মায়াবী অতীত/ বেঁচে থাকা বর্তমানের স্মিতকাহন!’ বলে দেয় কোনো মানুষই অতীতের মুগ্ধতা মাড়িয়ে বাঁচতে পারে না।

বইটির প্রথম পর্বটি পূর্ণতা পায় দ্বিতীয় খণ্ড অর্থাত্ ‘বিরহ দহন’-এ এসে। ‘শরতের বৃষ্টির মতো খুব মন খারাপ হয় আজকাল/ হঠাত্ হঠাত্/ কোনো কারণ ছাড়াই বিমর্ষ একদলা বিষণ্নতা/ হুট করেই ঢেকে ফেলে মগজের কফিন।’ লাইনগুলো পাঠকের উপলব্ধির কপাটে কড়া নেড়ে বলে দেয় এটাই তো জীবন। যেখানে অসুখ-সুখের অনুভূতিগুলো অজানা কোনো মুহূর্তে টুপটাপ ঝরে পড়ে। আমরা জানি না, কখন কোন ঘটনায় আমাদের চোখে-মুখে তীব্র হাওয়া ঝাপটা দিয়ে চলে যাবে। কবি তাই আহত কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘‘বলা হ’লো না কিছুই, অথচ বুঝে নিলে/ জেনে গ্যাছো পুরোটাই/ দ্যাখা হ’লো না কিছুই, অথচ দিব্যি শামুকের খোলসে/ আটকে ফেললে গোটা নিজেকেই!’’—শব্দের এ আকুতিগুলো লেপ্টে থাকে, থমকে থাকে দীর্ঘক্ষণ।

নিজেকে পুড়িয়ে মানুষ নতুন করে নিজেকে খুঁজে পায়। ‘জীবন দর্শন’-এর পঙিক্তগুলো তেমন পুড়তে থাকা সময়ের। যেখানে কবি ঘুরেফিরে নিজেকে প্রশ্ন করে, পাল্টা উত্তর দেয়, ফের প্রশ্ন করে। এভাবে গড়াতে থাকে সময়। কবি তার চেতনার আলোয় নিজেকে খুঁজে পায়। সেখানেই মূলত দ্বন্দ্বের শুরু। ‘দ্বন্দ্ব রাজনীতি’ পর্বে এসে কবি আমাদের চোখে আঙুল চালিয়ে ‘জনান্তিক’-এর গল্প বলে। যে জনান্তিক সমাজের আটপৌরে ঘেরাটোপে বন্দি নয়। যে জনান্তিক মানুষের অযাচিত সংস্কার, অন্ধত্ব, তুচ্ছতা উপেক্ষা করে অসীমের সমান এক মানচিত্র বুকে নিয়ে চলে। ‘ছিঁড়ে খুঁড়ে বাঁচতে শেখা’ বইয়ের শেষ পর্বটি পড়তে তাই পাঠকের প্রস্তুতি প্রয়োজন। কারণ কবি তার নিজের উপলব্ধিগুলোর কথা বলতে বলতে আমাদের নতুন এক বোধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।