Home / বই আলোচনা / বইআলোচনা: মার্জিয়া লিপি । মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্ত বিদায়

বইআলোচনা: মার্জিয়া লিপি । মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্ত বিদায়

 

মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্ত বিদায়
জহিরুল ইসলাম
প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী,
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
ঢাকা প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৩
৮০ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২২৪
দাম: ৩৫০ টাকা।

 

২০১১ সালের প্রথম দিকে কানাডা প্রবাসী লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম এ বই লেখার জন্যে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম মেজর খালেদ মোশারফের অধীনে ২নং সেক্টরের যোদ্ধা হিসেবে অন্তভূক্ত হন। পরে সেক্টর কমান্ডার সেকেন্ড ইন-কমান্ড মেজর এটিএম হায়দারের নেতৃত্বে গড়ে উঠা ক্র্যাকপ্লাটুন গেরিলা দলের যোদ্ধা হিসেবে তিনি ঢাকার বিভিন্ন রণাঙ্গনে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এসএসজি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডো অফিসার আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার বীর উত্তম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টরের অন্যতম প্রাণপুরুষ। এই গেরিলা যুদ্ধ-বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে সরাসরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাজার হাজার গেরিলা যোদ্ধা যে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের তা এক অত্যুজ্জ্বল অধ্যায়। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণে মেজর হায়দারের ছিল প্রত্যক্ষ ভূমিকা। তিনি ভারতীয় বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিংয়ের সঙ্গে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পন-সম্পৃক্ত মূল ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি যৌথ বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার সঙ্গে পরাজিত বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক নিয়াজিকে আত্মসমর্পনের জন্যে অনেকটা ঘেরাও করে দলিল স্বাক্ষরের জন্য নিয়ে যান। কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা বইটির প্রচ্ছদে রয়েছে মেজর এটিএম হায়দারের দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার চিত্র যা বইটিতে ইতিহাসে তাঁর অবস্থান ও বিষয়বস্তুটি উপস্থাপিত হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের সামরিক অভূত্থানে জড়িত না থাকলেও, ৭ নভেম্বর তথাকথিত সিপাহী-জনতার বিপ্লবে তাঁকে হত্যা করা হয়। এই বীরযোদ্ধার বীরত্বগাঁথা মুক্তিযুদ্ধের দলিল পত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের রচনায় গ্রন্থিত হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। তবে তাঁকে নিয়ে লেখা হয়নি কোনো বই। তাঁর সহযোদ্ধা জহিরুল ইসলামের দীর্ঘ গবেষণার ফল এ বই সেই অভাব পূরণ করবে। এ বই শুধু মেজর হায়দার বীর উত্তমের জীবনের ধারাক্রম নয়, ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়েরও অন্তরঙ্গ বিবরণ।
জহিরুল ইসলাম রচিত ২২৪ পৃষ্ঠার মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্ত বিদায় বইটি আটটি অধ্যায় রয়েছে। পরিবারের কথা, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে হায়দার, মুক্তিযুদ্ধে ক্যাপ্টেন হায়দার, গেরিলা গড়ার কারিগর, বাংলাদেশ হাসপাতাল, বিজয়, বিজয়ের পর ঢাকা শহরে মেজর হায়দার এবং মর্মান্তিক ও বিয়োগান্ত বিদায় নামে মোট আটটি অধ্যায় রয়েছে।
প্রথম অধ্যায় – পরিবারের কথায় জানা যায় মেজর হায়দারের মা হাকিমুন্নেছা বেগম; ডাকনাম মুক্তা। বড় ছেলে মায়ের কাছে মুক্তার চেয়েও দামি। তাই মা হাকিমুন্নেছা নিজের ডাক নাম ‘মুক্তা’র সঙ্গে মিল রেখে তাকে ডাকতে শুরু করেন ‘মুক্তো’ বলে, আসল নাম রাখেন আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার। মোহাম্মদ ইসরাইল ও হাকিমুন্নেছা বেগম মুক্তিযোদ্ধা মেজর এ.টি.এম. হায়দার (বীরপ্রতীক), ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম (বীরপ্রতীক) এবং এ.টি.এম. সাফদার এর গর্বিত বাবা-মা। প্রায় শতবর্ষ আগে হায়দারের দাদা শেখ মোহাম্মদ নিয়াজ ছেলেকে চেয়েছিলেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। মেট্রিক পরীক্ষার জন্য টেষ্ট পরীক্ষা দিয়ে পড়াশুনা ছেড়ে মোহাম্মদ ইসরাইল হঠাৎ করেই স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেন। তখন তিনি রামানন্দ হাই ইংলিশ স্কুলের (বর্তমানে স্কুলটি কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত) ছাত্র ছিলেন। বাবা এবং প্রধান শিক্ষক রায় বাহাদুর জগদীশ চন্দ চক্রবর্তীর উৎসাহে ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনি তিনটি বিষয়ে লেটারসহ প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং ভর্তি হন কলকাতার রিপন স্কুলে। ১৯২৪ সালে আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশুনায় ইস্তফা দিয়ে পুলিশ বিভাগের এএসআই পদে যোগ দিলেন মোহাম্মদ ইসরাইল এবং বিয়ে করেন ১৯২৯ সালে হাকিমুন্নেছাকে। কলকাতা শহরেই জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ ইসরাইল-হাকিমুন্নেছা দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি, কলকাতা শহরের ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার (এ.টি.এম. হায়দার)।
একাত্তরের মার্চের পর ছেলে ক্যাপ্টেন হায়দার মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মোহাম্মদ ইসরাইল পরিবার বিশেষ করে মেয়ে পাকিস্তান মেডিক্যাল আর্মির কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন সিতারার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে উৎকন্ঠায় ভুগছিলেন। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন সপরিবারে ভারতেই চলে যাবেন। জুলাই এর শেষের দিকে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা জামাল, বকুল ও সুশীল ক্যাপ্টেন হায়দারের চিঠি নিয়ে হাজির হলেন। ক্যাপ্টেন হায়দার খবর পাঠিয়েছেন, ‘‘পাকিস্তানিরা খুঁজে খুঁজে বাঙালি আর্মির লোকদের মারছে। ওরা তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও মারছে। আপনাদের দেশে থাকা আর নিরাপদ নয়। আমি যে তিনজনকে পাঠালাম, আপনারা তাঁদের সঙ্গে চলে আসুন।’’
বাবা মোহাম্মদ ইসরাইলও যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা ডা. সিতারাকে একটি ছোট পিস্তল ও গ্রেনেড দিয়ে বলেন, ‘‘আপা, হায়দারভাই এগুলো আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন (আল্লাহ না করুন), আপনি যদি পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়েন, তাহলে যেন তারা কোনো অবস্থাতেই জীবন্ত না পায়।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় মেলাঘরে মা-বাবা পৌছানোর প্রায় দু’মাস পর সেপ্টেম্বরের মাসের শেষের কোনো একদিন দিনে মেজর হায়দার সঙ্গে মেলাঘরে তাঁর মায়ের সঙ্গে দেখা করাতে গেলে মা হাকিমুন্নেছা বেগম বললেন, ‘‘হায়দার, তোর প্রশিক্ষণ দেওয়া ছেলেরা ঢাকায় বীরের মতো যুদ্ধ করছে। মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করছে। ওরা ধরা পড়ছে, পাকিস্তানিরা ওদের মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারছেনা। ওরা জীবন দিচ্ছে তবু মুখ খুলছেনা। হায়দার, তোর এই ছেলেরা আমাদের দেশকে স্বাধীন করবেই।’’
এ.টি.এম. হায়দার প্রথমে দুই নং সেক্টরের সহ-অধিনায়ক ও পরে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একজন গেরিলা কমান্ডার হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অভূতপূর্ব অবদান রাখার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে তাকে বীরউত্তম উপাধীতে ভুষিত করেন।
এ.টি.এম. হায়দারের ছোট বোন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম ও একমাত্র ছোটভাই এ.টি.এম. সফদার (জিতু) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ.টি.এম সফদার ভারতের মেলাঘরে অবস্থিত ট্রেনিংক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নেন এবং শালদা নদী এলাকায় বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের আগরতলাস্থ ৯২ বি.এস.এফ. ক্যাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধ বিষয়ক যোগাযোগ ও খবরাখবর (অফিসিয়াল) আদান-প্রদান করতেন। ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে কাজ করতেন। পাঁচশত বেডের এই হাসপাতালে তিনি একজন কমান্ডিং অফিসার হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন। হাসপাতালটি সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধে বীরপ্রতীক খেতাব পান।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। হায়দার পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীকাকুলে ট্রেনিং করেন এবং কমিশন প্রাপ্তির পর গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার হিসাবে নিয়োজিত থাকেন। পরে তিনি চেরাটে এসএসজি (Special Service Group) ট্রেনিং-এ কৃতিত্বের সাথে উর্ত্তীর্ণ হন। তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেন হিসাবে ১৯৬৯ সালের শেষে অথবা ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে এ. টি.এম হায়দারকে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে পুনরায় বদলি করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং ১৫/২০ দিন পর তাঁকে আবার কুমিল্লায় নিয়োগ দেয়া হয়।
বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান) সেনাবাহিনীর ১ম কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের কর্মকর্তা হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং শুরু থেকেই ২নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেলাঘরে অবস্থিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সকল মুক্তিযোদ্ধাকে কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা ট্রেনিংসহ হায়দার মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণ করাতেন। মেলাঘরে হায়দার প্রথম একটা স্টুডেন্ট কোম্পানি গঠন করেন। এই কোম্পানিকে তিনিই ট্রেনিং প্রদান করতেন। কিশোরগঞ্জ –ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপর তারেরঘাট পুল ও মুসল্লি রেলপুল, ঢাকা-চট্টগ্রামের রাস্তায় ফেনিতে অবস্থিত বড়পুল ধ্বংসসহ একাধিক অপারেশনের নেতৃত্ব দেন মেজর হায়দার। অক্টোবরের ৭ তারিখে খালেদ মোশাররফ নিয়মিত ব্রিগেড কে’ ফোর্সের কমান্ড গ্রহণ করলে তিনি সেক্টর অধিনায়কত্ব লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটে এবং সে খুব তার শিষ্যদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। ঐদিন প্রথম ঢাকা বেতারে ও টিভি থেকে ঘোষণা পাঠ করেন- “আমি মেজর হায়দার বলছি – মুক্তিবাহিনীর প্রতি নির্দেশ”।
স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশে সেনাবাহিনীতে মেজর হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাসে ১৩ ইস্টবেঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্ণেল পদে উন্নীত হন ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ৮ম বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে পিতার জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে ঢাকায় আসেন এবং যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধা আরেক কিংবদন্তি বীরসেনা জেনারেল খালেদ মোশাররফের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান।
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর আবু তাহেরের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থানে (সিপাহি বিপ্লব) তিনি নিহত হন সেক্টর কমান্ডার ও জেনারেল খালেদ মোশারফ ও কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদার সঙ্গে মেজর হায়দার। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বহু কমান্ডো আক্রমণের নেতৃত্ব দানকারী মেজর হায়দার, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে রেসকোর্সের ময়দানে ঐতিহাসিক আত্মসমর্পন মুহূর্তে অপূর্ব ভঙ্গিতে স্টেনগান কাঁধে মেজর হায়দার ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পনের মঞ্চে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে মেজর হায়দারের বড় বোন আখতার বেগমের বাসায় মেজর হায়দারের স্মরণে মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি ওসমানী সাহেব সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘‘আমি একটা কথা স্বীকার করতে চাই যে, ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে আমিই হায়দারকে বলেছিলাম খালেদ মোশারফ ও জিয়ার (রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) দ্বন্দ্ব মিটমাট করতে সাহায্য করতে। কারণ, হায়দারকে দুজনেই খুব পছন্দ করত। আমার কথায়ই হয়তো হায়দার বঙ্গভবনে গিয়েছিল খালেদ মোশারফের সঙ্গে আলাপ করতে।’’ (পৃষ্ঠা ২১৪- মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্ত বিদায়) উল্লেখ্য এম.এ.জি. ওসমানী মেজর হায়দারকে মাই ডিয়ার সান সম্বোধন করতেন। ১১ই নভেম্বর, ১৯৭৫ রোজ মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের খড়মপট্টি এলাকায় সমাহিত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের এই কিংবদন্তি বীর সেনানীকে।
হায়দারের মৃত্যুর ৩৯ বছর পর পরিণত বয়সে বড় বোন আখতার বেগম বলছিলেন, ‘‘এত লোকে হায়দারকে জানার বা চেনার বা তার বিখ্যাত হওয়ারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। সে যদি শুধু আমাদের আদরের ছোট ভাইটি হয়েই বেঁচে থাকতো আমাদের মাঝে, সেটিই ভালো ছিল।’’
মেজর হায়দারের ছোট বোন বীর প্রতীক ডা. সিতারা বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয় লাভ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও একটা আনন্দ ছিল। পরবর্তী সময়ে নিজেদের মধ্যে বিভক্তি, রেষারেষি, হিংসা আমাদের একেক জনকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। ১৯৭৫ সালে হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, আমার বড় ভাই বীরউত্তম এ.টি.এম. হায়দারসহ আরও অনেককে। এ জন্য দেশের প্রতি আমার অভিমান ছিল। দেশের পতাকা দেখলে আমার কান্না আসতো। (সূত্র: সিতারা বেগম বীর প্রতীকের সাক্ষাৎকার। নিয়েছেন প্রথম আলোর কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি সাইফুল হক মোল্লা)
লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলামের ভাষ্য-২ নং সেক্টরের গেরিলাযোদ্ধারা যদি এ.টি.এম. হায়দারের কথা না লিখে যাই তাহলে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনন্য অবদানের কথা স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্ম ও আগামী প্রজন্মের কাছে অজানাই থেকে যাবে; এই বীর মুক্তিযোদ্ধা হারিয়ে যাবেন কালের অতল গহ্বরে।
জহিরুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্ত বিদায় বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও এক অনন্য দলিল হিসেবে গন্য হবে।