Home / বই আলোচনা / মানুষের মন এক বৈচিত্র্যময়তার আধার যেন-অপর্ণা মম্ময়

মানুষের মন এক বৈচিত্র্যময়তার আধার যেন-অপর্ণা মম্ময়

Sadia-Sultanaমানুষের মন এক বৈচিত্র্যময়তার আধার যেন-অপর্ণা মম্ময়

 

‘ন অাকারে না।’
সাদিয়া সুলতানা
ধরন-ছোটগল্পের বই (১৫ টি ছোটগল্প)
প্রচ্ছদ-নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
মূল্য-১৫০
পৃষ্ঠা সংখ্যা-৮৮
প্রকাশনী-চৈতন্য প্রকাশনী

চৈতন্য থেকে ২০১৭ এর বইমেলায় এবার অন্যান্য বই এর সাথে প্রকাশিত হয়েছে সাদিয়া সুলতানার গল্পগ্রন্থটিও। মোট ১৫টি গল্প নিয়ে এ বই এর সম্ভার। সবগুলো গল্পই যে আমার ভালো লেগেছে সেরকম বললে হয়ত বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে কিংবা লেখক আমাকে তার অন্ধপাঠক ভাবতে পারে। বিশেষভাবে ভালো লেগেছে, বাতাসের ছুরি, সেখানে কোনো রক্ত ছিল না, তাবিজের অন্ধকার, ঘর পালানো ঘোর, গার্হস্থ্য নীতি ও ভাতফুল।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখাটা আমার কাছে জটিল মনে হলেও অনেকেই অনায়াসে কলমের আঁচড়ে সেটি ফুটিয়ে তুলতে পারে। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ে না লিখেও যে এর আবহ ভিন্ন আংগিকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব তা ” বাতাসের ছুরি” এবং ” ঘর পালানো ঘোর” গল্প দুইটি পড়লে বোঝা যায়।
“সেখানে কোনো রক্ত ছিল না ” এই গল্পটি ভালো লাগার পেছনে বিশেষভাবে কাজ করেছে যে লেখক এই গল্পে তার বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। সরকারি চাকুরীজীবি হবার কারণে পেশাগত কিছু দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা থাকে যে কারণে চাইলেও তারা অনেক অভিজ্ঞতা লেখার মাঝে তুলে ধরতে পারে না। সে হিসেবে এটা লেখক এর একটা সাহসী পদক্ষেপই বলবো।

“তাবিজের অন্ধকার” গল্পটা পড়ে চিরাচরিত একটা ব্যাপার আবার অনুধাবন করলাম। পুত্র সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা অতীতেও যেমন ছিল, বর্তমান এর পরিবার ব্যবস্থার মাঝে তা লক্ষ্য করা যায়। জয়নব বছর বছর বাচ্চা বিয়োবার পরেও নিজেও অলক্ষ্যে সেও তার শাশুড়ির মত অবচেতনে হলেও পুত্র সন্তান লাভের আশায় যে তাবিজ এক সময় ছুঁড়ে ফেলেছিল ঠিক সে তাবিজই অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে বের করে খোঁপায় গুঁজে নেয় যা লেখক এর লেখনীর মতই বলতে হয় –
“বাসনার যে বীজ তার মনের ভেতর রোপিত হয়েছিল, তার পরিচর্যা করে নিতেই মনের ভেতর চলতে থাকা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে যায়। ”

গল্পের কাঠামো, ভাষা আর চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তোলার ভঙ্গী স্বল্প পরিসারে পরিপূর্ণভাবে হয়েছে, আমার মতে। মানুষের মন এক বৈচিত্র্যময়তার আধার যেন। বিত্ত বৈভব থাকার পরেও বুকের ভেতর যে শূন্যতা তার সঠিক ব্যাখ্যা মনে হয় না দেয়া সম্ভব। যা ছন্দার মতো মানুষদের কাছে সুখে থাকতে ভুতে কিলোবার অসুখ কিন্তু চন্দ্রাদের কাছে অসীম শূন্যতা যেখানে বিস্তার করে আছে অজাত কোনো ভ্রুণের কান্না, রাতের অন্ধকারে কোনো নাম না জানা পাখির কান্না! এই গল্পের শেষটা ভীষণ অন্যরকম। চন্দ্রার বুকের কষ্ট যেন কাল্পনিক কোনো মৃত্যুব্যথার মতই বাস্তব অথবা স্বপ্নের মতো করে মৃত্যুর সাথে জুড়ে যেতে চাওয়ার আকুলতায় অভিমানী চোখে টলমল করতে করতে পাঠককে ভাবাতে বাধ্য করবে এই বই এরএর ষষ্ঠ গল্পটি আসলেই কি যে জীবন আমরা বয়ে চলেছি, কোথাও কি এক চিলতে সুখ আমাদের দেখা দিচ্ছে না অধরাই থেকে যাচ্ছে!

“ভাতফুল” চরম এক বাস্তবতার ছবি ফুটে উঠেছে। এ গল্পে একসাথে আছে দুটি ভিন্ন বিষয়। একদিকে ক্ষুধাকে অস্বীকার করতে না পারা আরেকদিকে মৃত্যু! এ গল্পটা পড়তে গিয়ে নিজের এক ঘটনার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আমার বাবা যেদিন মারা যান, সেদিন আমার এক আত্মীয় বারবার ঘুরেফিরে জিজ্ঞেস করছিল ” তুমি খাইবা না মা? দুইটা খাইয়া লইতা…” আমি স্বভাবতই বিরক্ত হচ্ছিলাম। সে সময় ক্ষুধাও লাগেনি, কান্নাও পাচ্ছিলো না। কেমন এক অস্বস্তিকর সময় তখন! কিন্তু ঐ আত্মীয় ক্ষুধা সহ্য করতে পারে না তাই আমাকে খাইয়ে সাথে সাথে নিজের ক্ষুধা নিবৃত করতে চাইছিল।

“ন আকারে না” বই এর শুরুর গল্প। তুলির গল্প। আমাদের সমাজের একজন কিশোরীর গল্প। বড় হয়ে উঠতে উঠতে তার সীমাবদ্ধ জীবনের গল্প! ভাষার কারুকাজ আছে লেখক এর এই গল্পটিতে।

” হাসি ও প্রিয় শব্দমালা” গল্পের নামটি আমার কাছে ভালো লেগেছে। গল্পের শেষটা পড়তে পড়তে দম আটকে ছিলাম এই ভেবে মিল্লাতের ছোঁড়া এসিডে দগ্ধ শরীরের দাগ নিয়ে হাসি কি মরে যাবার জন্যই চাকু নিয়ে বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড়েএ আড়ালে গেলো কিনা! না শেষ পর্যন্ত তা হয়নি বরং তীব্র ঘৃণায় গাছের গায়ে অংকিত মিলু আর হাসির নাম এর উপর আঁচড় কেটে যেন এক প্রতিবাদই জানালো হাসি।

লতা ও পুঁইলতার আত্মকথন, আদরজাল,উত্তরণ, ডাক, অলীক উড্ডয়ন, অপুষ্পক ক্যাকটাস এগুলো গতানুগতিক লেগেছে।

” একটি স্বপ্নদৃশ্যের পরিবর্তন ” এই গল্পটা নিয়ে কিছু কথা বলার আছে। যে মেয়েটি তার ভালোবাসার মানুষ রিফাতের কাছে প্রতারিত হলো কোনো এক দুর্বল মূহুর্তে আর একটা সময় প্রকাশিত হলো মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিওটি — সে হিসেবে মেয়েটির মাঝে স্বপ্ন, ঘোর,কান্নার আর ঘুমের মাঝে আশ্রয় এরকম নরম করে চরিত্র চিত্রায়ন কেন যেন স্বস্তি দিলো না।
প্রতিবাদ এর সুর লেখক এর কলম থেকে বের হবে নরম অভিমান এর বদলে এমনটাই কাম্য ছিল।
আলাদা করে যখন গল্পগুলো পড়েছি তখন বিশেষ তফাৎ করতে পারিনি ভালো লাগার, অল্প ভালো লাগার বা ভালো না লাগার। কিন্তু এত লেখার পরেও লেখক এর মাঝে যে অতৃপ্তি বয়ে চলে নিরন্তর, যে ভাবনা তাকে প্রায়শই ভাবায় হয়ত আরো ভালো লেখা যেতো, প্রতিবারই হয়ত নতুন করে সম্পাদনা করতে ইচ্ছে করে, আমার বিশ্বাস প্রতিটা লেখক এর মাঝে একই রকম অতৃপ্তি কাজ করে আর এই অতৃপ্তিই তাকে ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ লেখক করে তোলে।

শুধু লেখক হিসেবেই নয়, লেখক কারো জননী, কারো স্ত্রী। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর সংসার থেকে অনেকটা সময় কেটেছিড়ে তাকে লিখতে হয়, তার লেখক স্বত্তা তাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। লেখক হওয়া বা লিখতে পারা এক বিশেষ সাধনার নাম। লেখক সাদিয়া সুলতানার জন্য তাই রইলো শুভকামনা।

গল্পগ্রন্থ ন আকারে না পাওয়া যাবে: বাতিঘর, চট্টগ্রাম। সন্দীপন, আজিজ সুপার মার্কেট, ঢাকা। বইটি ঘরে বসে পেতে চাইলে: ০১৭১৮২৮৪৮৫৯ নম্বর এ ফোন করুন।