Home / বই আলোচনা / আজন্ম প্রশ্ন তার নিজের ঠোঁটের কাছে-মাজহার সরকার

আজন্ম প্রশ্ন তার নিজের ঠোঁটের কাছে-মাজহার সরকার

boi-1বই আলোচনা
আজন্ম প্রশ্ন তার নিজের ঠোঁটের কাছে-মাজহার সরকার

বই:অসময়ে নদী ডাকে, কবি:আবু হাসান শাহরিয়ার, প্রকাশকাল:বইমেলা ২০১৭,

প্রকাশক:প্লাটফর্ম, প্রচ্ছদ:মোস্তাফিজ কারিগর, পৃষ্ঠা:৬৪, মূল্য:১৬০ টাকা

ধরা যাক, এটাই একমাত্র কবিতার বই যেটা আবু হাসান শাহরিয়ার নামে একজন অজানা কবি লিখে রেখেছেন। বইটি আমার হাতে এসেছে। এই বইয়ের কবিতা ও কবি সম্পর্কে কিছু ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবো।
‘ভোঁতা আর পুরনো কথা কত আর শোনা যায়, বলো?’- এটিই এই বইয়ের প্রথম কবিতা ‘ঢেউভাষা’র প্রথম পঙক্তি। তাহলে কবি নতুন কী শোনাতে চাইছেন যা আমরা আগে কোনদিন শোনেনি? এর পরের পঙক্তিগুলোতে কবি যা বললেন তা মোটেও অশ্রুত মনে হয়নি, বরং মনে হয়েছে বারবার পড়া। কিন্তু শেষ বাক্য- ‘ঢেউ নেই, ভাষাও অচল’, এই থেকে ‘অসময়ে নদী ডাকে’র একটি আহ্বান শুনতে পাই।
সেই আহ্বান আমাদের এই অনবরত কথনবিশ্বে এক অন্তঃশীল গতির কথা বলে। কিন্তু ঢেউ না থাকলে ভাষা কেন থাকবে না! যে দেশে নদী নেই সে দেশে কি ভাষা নেই! না, এই ঢেউ জীবনের সংসক্ত জৈবনিকতা, কালস্থিত আত্মপীড়া, আতুরতা আর জড়তার বিপরীতে কোন শক্তিশালী ‘ডাক’। যে দেশে বৃক্ষের দেখা পাওয়া ভার সেই মরুভূমি বা বরফের দেশে কি কবিতা নেই! না, এই বৃক্ষ আসলে মানব শরীর!
ঠিক পরের কবিতা ‘বিবর্তন’-এ কবি লিখেন, ‘দীর্ঘদিন পরে বলে চেনাদৃশ্য এতোটা অচেনা/ মুছে গেছে দত্তদের শ্যাওলাপুকুর/ যেখানে নদীটা ছিল, সেখানেও নগরসন্ত্রাস’। শেষ পঙক্তি, ‘হাতে কি বোতলজাত মিনারেল নদী?’
পুরো বইজুড়ে কবিতার পর কবিতায় এমন অনেক প্রশ্নে কবি আমাদের এক আত্মজিজ্ঞসার মুখোমুখি করেছেন। যেমন- ‘পৌষের শীত চায়ের দোকানে থামে/ তখনই কে যেন বেঢপ প্রশ্ন করে- চা না কফি?’, ‘বয়ামে কি ছাতাধরা মন?’, ‘সুরভি মানুষ নয়, কে সে?’, ‘সুরের পূজারী আমি, কার সাথে কিসের বিরোধ?’, ‘ধরা যাক, ফের সব শুরু থেকে শুরু করা গেল/ ভুলগুলো করা গেলো একই প্রকরণে/ কী মধুর ভুল, সবই ভুল?/…ধরা যাক, ধরা তো যেতেই পারে, নাকি?’, ‘হ্যালো মেঘ/ তুমি কি মৃণাল বসুচৌধুরীকে চেনো?’, ‘কেউ কি নির্ভুল জানে-/ কার গুলি কোন দিকে ছোটে?’, ‘এত যে বিদ্যুৎ মেঘে,/ তবু কেন বনগ্রাসী ক্ষুধা?/ ধর্ষকামী সভ্যতা কি সবুজের পরিভাষা বোঝে?’, ‘কেউ আছ?’, ‘কী যেন সে বলেছিল কাকে?/ কে যেন তা মনে রেখেছিলো? কারা যেন অন্ধকারে হেঁটেছিল রাত্রিচেরা পথ?’, ‘এখন কোথায় পাব রোগহারা ভেষজ-আষাঢ়?/…আনন্দভৈরবরসে কে ভাসাবে লগিবতী ভেলা?’, ‘কাসাই নদী তোমাকে যেন কী নামে ডাকে রোজ?/ হিজলগাছে ঘুঘুরা যেন কী করে বলাবলি?/ তো লাগি প্রাণ দেবিকি মুহি, খেলেইটা কে নিলা?’, ‘এটা কোন চিত্রকল্প হল?’, কে তুমি নতুন ঠোঁটে প্রাচীন চুম্বন আঁকো আজ?…কে ডাকো কোকিলকণ্ঠে সারস্বত শহিদ মিনারে? কে কবি পুথির বলে ঢেঁকিছাটা বর্ণমালা খোঁজো?’, ‘শিশি শিশি আলতা হয়ে কেন খোঁজো কাহ্নপার ঘর?’, ‘কাবিননামাই যদি সব হত, কই যেত ছুটাদাগে লেখা প্রেমাবলি?…বিনাদাগে কত প্রেম সিকস্তি হয়েছে, তার পয়ন্তি কি জাতীয় বাজেটে খুঁজে পাবে?’, ‘ঘুমেই কাটিয়ে দিলে শিউলিফোটা ভোর?/ কর্পদকশূন্য হাতে কে একা দাঁড়িয়ে আছ রাত্রির কিনারে?’, ‘কে আমাকে বাধা দেবে, আমি যদি ঘুড়িতেই আকাশ ওড়াই?/ লাটাই বানাই পৃথিবীকে?/ তারার মার্বেল খেলি অতিদূর ভূশণ্ডির মাঠে?’, ‘বিখ্যাত বটগাছের আড়ে নবীন পাতার হাসি/ প্রশ্ন করে- আসতে পারি? আসি?’, ‘জলের শ্রুতিতে মিশে কে মাছ শ্যাওলার কথা শোনে?/ কে গাছ শিকড় খোঁজে পরের আপনে?’, ‘নদী যদি নদী হয়, জলের কণাও আঁকে ঢেউ/ প্রেম?’, ‘কবি কি সমাস নাকি, পা দোলাবে ব্যাকরণগাছে?’ ইত্যাদি।
কিন্তু এই প্রশ্ন ও প্রশ্নের আগের পঙ্কতিগুলো বিবৃতি বা মন্তব্যপরায়ন হয়ে উঠে না। কারণ কবি যা পাঠ করাতে চান তা দ্রুত জায়গা বদল করে অন্য নতুন পাঠে। যেমন ‘শুভিরাত্রি’ কবিতার একটি পঙক্তি- ‘জল নয়, রক্ত পড়ে- কই, কোনও পাতা তো নড়ে না?’ এইখানে কবিতার ইতিহাস বোধের সামগ্রিকতার ইতিহাস। এই পরিসর ধারণ করে নদী ও বৃক্ষ- যে দুটিকে ‘শিক্ষক’ বলে মানেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার।
কেতাবি আধুনিকতা ও চমকে দেওয়ার চেষ্টার বাইরে কবি আমাদের দেন এক শিল্পিত স্বভাব। ‘বিউটি বোর্ডিং’ কবিতায় লিখেন, ‘কবিতা-পদ্য অনেক লিখেছি, এখন পারি না/ যারা পারে আমি তাদের মুগ্ধ পাঠক/ যেমন নদীর, যেমন শিশুর হাসির/ যেমন মায়ের ভাতমাখা হাত/ ভাতের নলায় চুল/ ওই চুলই গাঢ় কবিতার ব্যাঞ্জনা/ দাও, দাও- পাঠ করি’।
আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা সিদ্ধান্ত কবিকে বিচলিত করে, পীড়া দেয়। ‘স্তব্ধতার কোরাসে’ তিনি লিখেন, ‘ক্ষমতা ধর্মের ষাঁড়, খিদে পেলে জিরাফেও আছে/ কী হবে বিদ্যুৎ দিয়ে বনে যদি সবুজই না থাকে?/ কুড়িগ্রাম বানে ভাসে,/ নদী আজ সমুদ্রে যাবে না/ খাদ্য জরুরি নয়/ ভালো থাকো অস্ত্র-বেচাকেনা’। ‘বাঁচাও সুন্দরবন, বাঁচো’ কবিতায়- ‘অনাদি সুন্দরবনে কলের বিদ্যুৎ হতে দেব না, দেব না।’। ‘কবি একা মনপ্রতিনিধি’ কবিতায়- ‘জনপ্রতিনিধিগণ মিছে তর্ক করে/ কবি একা মনপ্রতিনিধি/ গাছের পাতাই তার কবিতার খাতা। তোমার মনে কি আছে, কাঁঠাল পাতারা সব জানে।’
বইটির নামকবিতা ‘অসময়ে নদী ডাকে’ র পঙক্তি- ‘আর কিছু আরও কিছু কথা বাকি আছে/ মেঘে মেঘে বেলা বয়ে যায়/ দুপুর গড়িয়ে আয়ু বিকেলও পেরুলে/ কথোপকথনে পড়ে মৌনতার যতি’। এক দূর অনাগত জগতে মানবশুদ্ধির অনুষ্ঠান ঘটবে, কবি তার দিকে হেঁটে যান। কিন্তু এই গমন তাকে গন্তব্যে না পৌঁছালেও ক্রমশ স্রোতে ও পরিবর্তনশীলতায় এক মনীষা ও পবিত্রতায় প্রতিষ্ঠিত করে। কবি লিখেন, ‘নদী যদি ডাকে, আজও পাঁজরে ঝংকার শুনি তার/…এ জীবন ভুলে ভরা, ভ্রমে তো যেতেই পারে মতি’।
কবির আরাধ্য তবু আজ কেবল ভাষা নয়, মূলত জীবন । ‘স্বপ্নাদেশ’ কবিতার পঙক্তি- ‘আমিই ঈশ্বর, শোনো, কানে কানে ভালো কথা বলি-/ একটাই জীবন, তাকে রোজই করো সাষ্টাঙ্গে প্রণাম’। একটিমাত্র পঙক্তির কবিতা ‘আত্মা’য়- ‘আমি নই, অন্য কেউ বেঁচেছিল আমার শরীরে’।
মূর্খ-স্থূল লোককে নগদ শাসন করতে পারেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। ‘পাঠকের প্রতি’ কবিতার পঙক্তি- ‘নদী যদি টানে, জলে নেমো/ ঢেউ পাঠে নেই কোন বাধ্যবাধকতা/ ঢেঁকিছাঁটা কথা এই- অহেতুক প্রশ্ন করো না’।
কবি সবচেয়ে নিদারুণ প্রশ্ন করেছেন ‘দুপুরের রোদে রামকিঙ্কর বেইজ’ কবিতায়- ‘সব কথা কেন লিখে রেখে যেতে হবে?/ কার জানা আছে আদিকথা, শেষকথা?/ কার ভাণ্ডারে সব রত্মাদি আছে?/ চাক্ষিক জানে কুড়াতে দৃশ্যাবলি/ কে বলেছে সব ওইপারে গেলে পাবে?’। কবি জানেন শব্দ দিয়ে দু’একটি কবিতা লেখা যায়, কিন্তু কবি হতে গেলে দরকার শব্দের অধিক অজ্ঞানবোধ। পঙক্তিটি আবারও উল্লেখ করি, ‘কে বলেছে সব ওইপারে গেলে পাবে?’
কবিতাবিশ্বের সমস্ত কিছুই এক উত্তরহীন প্রশ্নায়কের আশ্রয়ভূমি। প্রশ্ন নেই তো জীবন নেই। এই প্রশ্ন কার কাছে রাখেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার? এই শব্দবীজ কী উৎপন্ন করে কেবল আরেকটা প্রশ্ন ছাড়া!
এই প্রশ্ন তাই আজন্ম তার নিজের ঠোঁটের কাছে। ‘অসময়ে নদী ডাকে’র আহ্বান পাওয়া এই কবি প্রজ্বলিত হৃদয়ের বোধে বারবার নদীর পারে গিয়ে দাঁড়ান। সূর্যের সঙ্গে সবুজে উদিত হন, লাল হয়ে ডোবেন।